দিনাজপুরের ফুলবাড়ী সরকারি কলেজের প্রিয় মুখ প্রফেসর খন্দকার মো. হুমায়ুন রেজা কবীর। প্রায় ১৮ বছর ধরে তিনি এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেছেন। গড়েছেন অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ। সহকর্মীদের কাছেও ছিলেন আস্থার প্রতীক। এই কলেজেই তার শিক্ষাজীবনের শুরু, পরে শিক্ষকতা ও শেষে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। তাই অবসরের দিনে ভালোবাসা আর সম্মানে ভিন্নভাবে বিদায় দেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরা। প্রিয় এই মানুষটিকে ঘোড়ার গাড়িতে করে রাজকীয় আয়োজনে বিদায় জানিয়ে স্মরণীয় করে রাখেন তার শেষ কর্মদিবস।
গত সোমবার কলেজ প্রাঙ্গণে এ বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও স্মৃতিচারণার আবহ। সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের ভালোবাসায় এই আয়োজন আবেগঘন মুহূর্তে পরিণত হয়।
কলেজশিক্ষক পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উপাধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আহসান হাবীব। সঞ্চালনা করেন শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক মো. সাইফুদ্দীন এমরান। অনুষ্ঠানে শতাধিক শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন। তারা প্রিয় অধ্যক্ষকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করেন।
অনুষ্ঠান শেষে দেখা যায় ভিন্নধর্মী এক আয়োজন। কলেজের সব বিভাগের উদ্যোগে অধ্যক্ষকে ঘোড়ার গাড়িতে করে বিদায় জানানো হয়।
কলেজ প্রাঙ্গণ থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে তাকে দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার পূর্ব জগন্নাথপুর গ্রামে তার নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। ফুলবাড়ীতে এ ধরনের আয়োজন এই প্রথম বলে জানা গেছে। এতে উপস্থিত সবার মধ্যে গভীর আবেগের সৃষ্টি হয়।
১৯৬৭ সালে জন্ম নেওয়া প্রফেসর খন্দকার মো. হুমায়ুন রেজা কবীরের কর্মজীবন প্রায় ২৯ বছরের। তিনি এই কলেজেরই শিক্ষার্থী ছিলেন। পরে দীর্ঘ ১৮ বছর এখানে শিক্ষকতা করেন। সর্বশেষ প্রায় এক বছর অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রম ও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। ন্যায়নিষ্ঠা, সততা ও মানবিক গুণাবলির জন্য তিনি সবার কাছে শ্রদ্ধেয় ছিলেন। বিশেষ করে গরিব ও অসহায় শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে তিনি সব সময় এগিয়ে আসতেন।
বিদায় বক্তব্যে আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, ‘এই কলেজ আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়। এখানেই আমি শিখেছি, বেড়ে উঠেছি এবং সেবা করার সুযোগ পেয়েছি। সব সময় ন্যায়ের পথে থাকার চেষ্টা করেছি। তোমাদের ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’
সহকর্মী শিক্ষকরা বলেন, তিনি শুধু একজন প্রশাসকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অভিভাবক। নীতির প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন। মানবিকতায় অনন্য এই মানুষটির বিদায়ে কলেজ পরিবার এক আদর্শ ব্যক্তিত্বকে হারাল।
শিক্ষার্থীরা জানান, অধ্যক্ষ তাদের কাছে অভিভাবকের মতো ছিলেন। যেকোনো সমস্যায় তার কাছে গেলে কখনো খালি হাতে ফিরতে হয়নি। তার বিদায়ে তারা গভীর শূন্যতা অনুভব করছেন।
অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘স্যার সব সময় ন্যায়ের পক্ষে কথা বলতেন। গরিব শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি ছিলেন ভরসার জায়গা। তার মতো মানুষ খুব কমই পাওয়া যায়। আমরা স্যারকে মিস করব।’
কর্মচারীরাও জানান, তিনি সব সময় তাদের সম্মান দিতেন এবং প্রয়োজন হলে সহায়তা করতেন। অনেক অসহায় মানুষ তার কাছ থেকে উপকৃত হয়েছেন।
বিদায়ী সংবর্ধনা উপলক্ষে শিক্ষক পরিষদের আয়োজনে একটি আলোচনা সভাও অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তার কর্মজীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। সহকর্মীরা গভীর আবেগে স্মৃতিচারণা করেন।