চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) আবর্জনা অপসারণ কার্যক্রমে জ্বালানিসংকটের প্রভাব পড়েছে। এতে প্রতিদিনের অন্তত ২০ শতাংশ আবর্জনা ভাগাড়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে আবর্জনা সংগ্রহে নিয়োজিত ভেন্ডরদের বাতিল করে নিজস্ব লোকবল দিয়ে আবর্জনা অপসারণের সিদ্ধান্ত এই সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে। বিষয়টি স্বীকার করেছেন সংস্থাটির প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দিন আহমদ।
চসিকের পরিচ্ছন্নতা বিভাগ সূত্র জানায়, প্রতিদিন ১৮টি ওয়ার্ড থেকে সংগৃহীত ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টন আবর্জনা হালিশহর ট্রেঞ্চিং গ্রাউন্ডে (টিজি) ফেলা হয়। অন্যদিকে ২৩টি ওয়ার্ড থেকে সংগৃহীত ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টন আবর্জনা আরেফিন টিজিতে ফেলে সংস্থাটি। এসব আবর্জনা পরিবহনের জন্য প্রতিদিন সংস্থাটির জ্বালানি তেল প্রয়োজন হয় সাড়ে ছয় হাজার লিটার। তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরুর পরের সপ্তাহ থেকে জ্বালানি তেলের সংকট শুরু হয়। তখন থেকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনও রেশনিং করে তেল পাচ্ছে। তারা দৈনিক অন্তত দেড় হাজার লিটার কম তেল পাচ্ছে। এ কারণে গাড়ির ট্রিপ কমে যাওয়ায় সব ময়লা ভাগাড়ে নিতে পারছে না।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘জ্বালানিসংকট এখন বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনও তার বাইরে নয়। আমরা মানুষের বাসাবাড়ি থেকে যেসব আবর্জনা সংগ্রহ করি, আগে তা এলাকাভিত্তিক ছোট গাড়িতে করে সরাসরি টিজিতে চলে যেত। এখন সব গাড়ি টিজিতে যেতে পারছে না। কারণ আমরা সব গাড়িকে পর্যাপ্ত তেল দিতে পারছি না। কিছু গাড়ি আমাদের সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনে (এসটিএস) আবর্জনা রেখে দিচ্ছে। সুযোগমতো আমরা বড় গাড়ি করে সেসব আবর্জনা প্রধান দুই ভাগাড়ে ফেলার চেষ্টা করি। তবে এ কথা সত্য, দিনে আমাদের অন্তত ২০ শতাংশ আবর্জনা এসটিএসে থেকে যাচ্ছে। প্রতিদিন জমে গিয়ে সেখানেও আবর্জনার বিশাল স্তূপ হয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম শহরে মাত্র ৯টি এসটিএস আছে। অথচ প্রতি ওয়ার্ডেই এসটিএস দরকার। কিন্তু জায়গার অভাবে আমরা তা করতে পারছি না।’
এদিকে সিটি করপোরেশন গত মার্চ মাস থেকে নগরীর বাসাবাড়িতে ডোর-টু-ডোর বর্জ্য সংগ্রহে বেসরকারি ভেন্ডরদের কার্যক্রম বন্ধ করেছে। এপ্রিল থেকে তাদের টাকা না দিতে গণবিজ্ঞপ্তিও জারি করে। চসিকের নিজস্ব জনবল দিয়েই ডোর-টু-ডোর আবর্জনা সংগ্রহ করার ঘোষণা দেন মেয়র। তার এই সিদ্ধান্ত পরিচ্ছন্ন বিভাগকে কার্যকর করার নির্দেশ দেন। কিন্তু বাস্তবে ভেন্ডররা এখনো বাসাবাড়ি থেকে টাকা সংগ্রহ করছেন। টাকা না দিলে ময়লা অপসারণ না করার কথা তারা সাফ জানিয়ে দিচ্ছেন। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চসিকের কঠোর সমালোচনা করা হচ্ছে।
নগরবাসীর অভিযোগ, চসিক ভেন্ডরদের টাকা দিতে নিষেধ করেছে। কিন্তু বাসা থেকে কে ময়লা সংগ্রহ করবে তার সিদ্ধান্ত দেয়নি। আগে যারা ময়লা নিত, তারাই এখন ময়লা সংগ্রহ করছে। তারাই টাকা আদায় করছে। এটি একটি অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভেন্ডর জানান, কোনো আলোচনা ছাড়াই সিটি করপোরেশন চুক্তি বাতিল করেছে। অথচ তারা আবর্জনা সংগ্রহের জন্য ওয়ার্ডভিত্তিক লোকবল নিয়োগ দিয়েছেন। আবর্জনা পরিবহনের জন্য গাড়ি ও ইক্যুইপমেন্ট কিনেছেন। এই বিনিয়োগ তোলারও সময় তাদের দেওয়া হয়নি। তা ছাড়া কিছু এলাকায় এখনো তারা আবর্জনা সংগ্রহ করছেন বলেই ওই সব এলাকা পরিষ্কার থাকছে। না হলে যার যার বাসার ময়লা তার বাসায় পড়ে থাকত। কারণ প্রতিটি বাসা থেকে আবর্জনা সংগ্রহ করার মতো লোকবল সিটি করপোরেশনের নেই।
চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘পরিচ্ছন্নতা বিভাগে জনবল আছে ৩ হাজার ৪০ জন। এর মধ্যে একটি অংশ সড়কে ঝাড়ু দেওয়ার কাজে নিয়োজিত রয়েছে। ২০০ জনের বেশি রয়েছেন মশক নিধন কার্যক্রমে। বড় একটি অংশ নিয়োজিত রয়েছে নালা পরিষ্কারের কাজে। বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত থাকার পর আসলে বাসাবাড়ি থেকে আবর্জনা সংগ্রহের জন্য খুব বেশি লোকবল হাতে থাকে না। তার পরও নগরবাসীর কথা চিন্তা করে মেয়র এজেন্ট বাতিল করে নিজস্ব লোকবল দিয়ে আবর্জনা সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা আমাদের সীমাবদ্ধতার মাঝে চেষ্টা করে যাচ্ছি। এই কাজে সফল হতে গেলে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ দিতে হবে। বিষয়টি সময়সাপেক্ষ। ধীরে ধীরে সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে হবে।’