ঢাকার আশুলিয়ায় স্বামী-স্ত্রী ও তাদের শিশু সন্তানকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় এক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। সোমবার (২ অক্টোবর) রাতে গাজীপুরের শফিপুর এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে র্যাব-৪ এর একটি দল।
র্যাব জানায়, কবিরাজ সেজে তারা আশুলিয়ার ওই বাসায় ঢোকেন। এরপর কৌশলে ইসবগুলের শরবতের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে বাসার তিন জনকে খাইয়ে দেন। শরবত খেয়ে তারা ঘুমিয়ে পড়লে বাসায় আশানুরূপ অর্থ না পেয়ে একে এক তিন জনকে গলা কেটে হত্যা করেন।
গ্রেপ্তার দুজন হলেন– হত্যাকাণ্ডের মূলহোতা সাগর আলী (৩১) ও তার স্ত্রী ঈশিতা বেগম (২৫)। এর আগে ২০২০ সালে একই কায়দায় টাঙ্গাইলে চারজনকে হত্যার ঘটনায় আসামি ছিলেন সাগর।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান র্যাব সদর দপ্তরের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
তিনি জানান, ৯০ হাজার টাকা চুক্তিতে কবিরাজি চিকিৎসার কথা বলে বাসায় গিয়ে ইসবগুলের শরবতের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে খাওয়ানো হয়। এরপর কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয় স্বামী-স্ত্রী ও তাদের শিশু সন্তানকে।
র্যাব কর্মকর্তা জানান, নিহত মোক্তার হোসেন ও তার স্ত্রী সাহিদা বেগম আশুলিয়ার একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। তার সন্তান মেহেদী হাসান জয় স্থানীয় একটি স্কুলে ৭ম শ্রেণির ছাত্র। ওই দম্পতি চাকরির উদ্দেশে সন্তানসহ বেশ কিছুদিন আগে ঠাকুরগাঁও থেকে আশুলিয়ায় এসে বসবাস শুরু করেন।
মঈন বলেন, এরমধ্যে গত ৩০ সেপ্টেম্বর সাভারের আশুলিয়া জামগড়া এলাকায় বহুতল ভবনের ৪র্থ তলার একটি ফ্ল্যাট থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে ভবনের অন্য ভাড়াটিয়ারা বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবগত করেন। পরে ফ্ল্যাট থেকে তাদের অর্ধগলিত গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তিনি জানান, নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের পর রোববার (১ অক্টোবর) আশুলিয়া থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে একটি মামলা হয়। এরপর র্যাব গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে। গত রাতে র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র্যাব-৪ এর একটি দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গাজীপুরের শফিপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে হত্যাকাণ্ডের মূলহোতা মো. সাগর আলী ও তার স্ত্রী ঈশিতা বেগমকে গ্রেপ্তার করে। এসময় তাদের কাছ থেকে লুট করা আংটি উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার দম্পতি জানান, প্রথমে অর্থের লোভে এবং পরে ওই অর্থ না পেয়ে ক্ষোভ থেকে তাদের হত্যা করা হয়।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে র্যাব মুখপাত্র জানান, গত ২৮ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার সাগর সাভার বারইপাড়া এলাকার একটা চায়ের দোকানে চা খাওয়ার সময় মোক্তারকে পাশের একটি কবিরাজি ও ভেষজ ওষুধের দোকানে তার শারীরিক সমস্যার চিকিৎসা নিয়ে কথা বলতে দেখেন। সাগর জানতে পারেন, মোক্তার ওই দোকানে ভেষজ ও কবিরাজি চিকিৎসা বাবদ ১৫-২০ হাজার টাকা খরচ করেও কোনো ফল পাননি। এরপর সাগর কৌশলে মোক্তারকে ডেকে নিয়ে আলাপচারিতায় ভেষজ ও কবিরাজি চিকিৎসার প্রতি তার আগ্রহ ও আস্থার কথা জানতে পারেন। মোক্তার তার ও তার পরিবারের বেশ কিছু শারীরিক সমস্যার কথাও সাগরকে জানান। এরপর সাগর জানান, তার স্ত্রী একজন ভালো কবিরাজ এবং তিনি তার সমস্যার সমাধান করে দেবেন। এমন মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে কথাবার্তার এক পর্যায়ে ৯০ হাজার টাকার চুক্তি করেন। সাগর ও তার স্ত্রী পরেরদিন (২৯ সেপ্টেম্বর) সকালে ওষুধসহ তার বাসায় গিয়ে চিকিৎসা করবেন বলে জানান। যোগাযোগের জন্য মোক্তারকে সাগর নিজের নম্বর না দিয়ে এক আত্মীয়ের মোবাইল নম্বর দেন।
কমান্ডার মঈন বলেন, বাসায় গিয়ে সাগর ঈশিতাকে পুরো ঘটনা ও পরিকল্পনার কথা জানান। স্ত্রী নগদ বিপুল অঙ্কের অর্থ পাওয়ার আশায় রাজি হন। তারা পরিকল্পনা করেন ভুক্তভোগী মোক্তারের বাসায় গিয়ে ভেষজ ও কবিরাজি চিকিৎসার কথা বলে তার পরিবারের সবাইকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে তাদের অর্থসহ মূল্যবান সামগ্রী লুট করবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী সাগর গাজীপুরের মৌচাক এলাকার একটি ফার্মেসি থেকে এক বক্স (৫০ পিচ) ঘুমের ওষুধ কেনন। ২৯ সেপ্টেম্বর সকালে সাগর ও তার স্ত্রী গাজীপুরের মৌচাক থেকে মোক্তারের সঙ্গে জামগড়া মোড়ে সাক্ষাৎ শেষে বাসায় যান। সেখানে প্রাথমিক পরিচয়ের পর ঈশিতা তাদের সমস্যার কথা শুনেন এবং ইসবগুলের শরবতের সঙ্গে চেতনানাশক ওষুধ মিশিয়ে কৌশলে খাওয়ান। ওষুধ খেয়ে মোক্তার, তার স্ত্রী ও ছেলে ঘুমিয়ে পড়লে সাগর ও তার স্ত্রী মিলে প্রথমে মোক্তারের কক্ষে গিয়ে মোক্তারের হাত ও পা বাঁধেন, পরে মোক্তারের স্ত্রীর হাত-পা বাঁধেন।
পরে তারা মোক্তারের মানিব্যাগ, তার স্ত্রীর পার্স ও বাসার অন্য স্থানে অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রীর জন্য তল্লাশি করে মাত্র ৫ হাজার টাকা পান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে বাসার বটি দিয়ে প্রথমে মোক্তারের গলায় উপর্যুপরি কোপ দিয়ে হত্যা করেন। পরে অন্য কক্ষে গিয়ে ছেলে ও স্ত্রীকে একই বটি দিয়ে পর্যায়ক্রমে কুপিয়ে হত্যা করেন। পালানোর আগে তারা মোক্তারের হাতে থাকা আংটি খুলে নিয়ে যান।
র্যাব কর্মকর্তা মঈন জানান, গ্রেপ্তার দম্পতি ভিন্ন পথে রিকশাযোগে গাজীপুরের মৌচাকে তার শ্বশুরবাড়ি যান এবং সেখানেই অবস্থান করতে থাকেন। হত্যাকাণ্ডের ঘটনা গণমাধ্যমে প্রচারের পর তারা আত্মগোপনে চলে যান।
২০২০ সালে একই কায়দায় টাঙ্গাইলে সাগর চার জনকে হত্যা করেছে এমনটা জানিয়ে কমান্ডার মঈন বলেন, তিনি মাদকাসক্ত এবং বিভিন্ন পেশার আড়ালে চুরি ও ছিনতাই করতেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন। টাঙ্গাইলের মধুপুরে ২শত টাকার জন্য একই পরিবারের চার জনকে চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে একই কায়দায় গলা কেটে হত্যার আসামি ছিলেন সাগর। ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাগর গ্রেপ্তার হয়ে সাড়ে তিন বছর কারাভোগ করে ২০২৩ সালের জুন মাসে জামিন পান।
দীর্ঘদিন জেলহাজতে থাকায় আসামির আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকার সুবাদে বিভিন্ন রকম কাজকর্ম করতেন। তিনি রাজমিস্ত্রি, কৃষি শ্রমিকের কাজকর্ম করার কারণে ঢাকা, সিলেট ও টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করতেন। অনেক সময় পেশার আড়ালে সুযোগ বুঝে চুরি ছিনতাই করতেন।