১৯৭১ সালে আমার বয়স ছিল সাত বছর। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় ২৫ মার্চ আমরা চট্টগ্রাম শহরের বাসায় ছিলাম। আমাদের বাসাটি ছিল চট্টগ্রামের চন্দনপুরা। কুখ্যাত মুসলিম লীগ নেতা ফ কা চৌধুরীর গুডস হিলের কাছাকাছি ফেরদৌস মঞ্জিলে।
ওই রাতে সন্ধ্যা থেকেই বড়দের মধ্যে অস্বস্তি, উত্তেজনা। সারা রাত আমরা রেডিও ছেড়ে জেগে ছিলাম। যদিও রাত ১২টার পর ঘুমের কাছে হার মেনে আমি মায়ের বিছানায় শুয়ে পড়েছিলাম।
সকালে হইচই শুনে ঘুম ভেঙে যায়। আব্বা পাশের বাসার ফোরখ মিয়াসহ আমাদের সামনের ঘরে আলোচনা শুনে বুঝতে পারি বড় কিছু ঘটেছে।
আম্মাকে জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন, পাকিস্তানি আর্মিরা গতকাল ঢাকা শহর তছনছ করে দিয়েছে। শেখ সাহেবকে গ্রেপ্তার করেছে। বহু মানুষ হতাহত হয়েছে।
সকাল ৭টার বিবিসি সংবাদ চলছিল তখন। নাস্তা সেরে পাশের বাসার মানিক, ভুট্টোর সঙ্গে সামনের মাঠে ঘোরাঘুরি করছি। বড়রা কেউ আমাদের ওপর হম্বিতম্বি করছে না। হঠাৎ নিজেদের স্বাধীন স্বাধীন মনে হচ্ছে।
১০টার কিছু পর বাসার গেটের বাইরে সিরাজুদ্দৌলা রোডে বড়দের সঙ্গে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে গেলাম। গাড়ি চলাচল খুবই কম। উৎকণ্ঠিত মানুষের সমাবেশ, উদ্বেগ।
কিছুক্ষণ পর রাস্তার পাশে দাঁড়ানো মানুষের মধ্যে সাড়া পড়ে যায়। পরপর দুটি ট্রাকে করে কিছু গেঞ্জি, লুঙ্গি, হাফপ্যান্ট পরা মানুষ এগিয়ে আসে। হাতে বন্দুক। সবাই ‘জয় বাংলা’ বলে চিৎকার দিয়ে ওঠে। পরে জানতে পারি এরা ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালিয়ে আসা সেনা সদস্য ও ইপিআর।
বাবা আমাদের ভাইবোনদের এপ্রিলের শুরুতে গ্রামের বাড়ি পটিয়া উপজেলার বড়লিয়া গ্রামে পাঠিয়ে দিলেন। মাকে নিয়ে তিনি শহরেই রইলেন। বাবা সরকারি চাকুরে। কো-অপারেটিভ সোসাইটির ডেপুটি রেজিস্ট্রার। জেলা শহরের প্রধান পদ।
১৯৭১-এর মে মাসের দিকে গ্রামে আমার শিক্ষক হলেন আমার জেঠাতো ভাই ভাসানী ন্যাপ নেতা বজলুস সাত্তার। আমাদের বাড়িতে উনাকে বাবা পাঠিয়েছিলেন। পাকিস্তানি মিলিটারির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য। বজলুস ছাত্তার যাকে আমরা বজু বদ্দা ডাকতাম। উনি আমাকে পুকুরে সাঁতার শেখালেন, জাগো অনশন গান শোনাতেন।
এর মধ্যে নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে এলাকার এক কুখ্যাত ডাকাতকে ধরে এনে পাশের পাড়ার কামালের নেতৃত্বে একদল মুক্তিযোদ্ধা আমাদের দেউড়িতে অবস্থান করলেন। ডাকাতের নাম নাকাইয়া। রাতে মুক্তিযোদ্ধারা সেই ডাকাতকে অদূরবর্তী কাজীর খালের পাড়ে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলে।
পাড়ায় সবাই ভীত। এই খবর মিলিটারিরা জানলে পুরো পাড়া শেষ করে দেবে। উপরন্ত জুমার দিন মুক্তিযোদ্ধা কামাল মসজিদে খুতবার সময় ইমাম সাহেবকে জোর করে ‘হুকুমতে বাংলাদেশ’ বলিয়ে ছাড়ে। এটা ধর্মীয় বিধান। অর্থাৎ যে রাষ্ট্রের অধীনে বসবাস জুমার খুতবায় সেই রাষ্ট্রের নাম উচ্চারণ করতে হয়।
শঙ্কা ও উত্তেজনায় ডিসেম্বর এসে যায়। গ্রামে দীর্ঘদিন এই প্রথম আমার থাকা। মুক্ত আকাশ, সবুজ ধানখেত, বাড়ির স্নিগ্ধ বকুলতলা আমাকে আবেশে জড়িয়ে রাখে। স্কুল নেই, বিধিনিষেধ নেই। আমি এক সুখী মুক্ত পাখি। দিগন্তে যার অবাধ বিচরণ। অক্টোবরে মা গ্রামে চলে আসেন, বাবা চলে আসেন ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে।
সঙ্গে নিয়ে আসেন লম্বা লাল সাদা আমাদের ‘মারফি’ রেডিওটি। এতদিন সবাই একটি ফিলিপস রেডিওতে স্বাধীন বাংলা বেতার, বিবিসি, আকাশবাণী, ভয়েস অব আমেরিকা শুনতাম। ডিসেম্বরের ১৪ তারিখ আমাদের বাড়ির বকুলতলায় সবার জমায়েত হয়।
শঙ্কা ও কিছুটা আশার আলো নিয়ে সবাই যুদ্ধের আলাপ করতে থাকে। পাকিস্তানি মিলিটারি আমাদের ইউনিয়ন জঙ্গলখাইনের হিন্দু বাড়িতে আসতে পারে বলে অনেকে শঙ্কিত, কারণ সেখানে এলেই আমাদের এখানে চলে আসবে। আমাদের বাড়ির নাম মিয়াবাড়ি। আব্বাকে সবাই ছোটমিয়া বলত।
উনি ১৯৩১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিষয় নিয়ে এমএ পাস করেন। সবাই আব্বার পরামর্শ চায়। আব্বা সবাইকে আর কয়টা দিন অপেক্ষা করতে বলেন। যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণের কথা বলেন। আমাদের পাড়ায় রাজাকার ছিল না। তবে কয়েকজন গোড়া মুসলিমলীগ সমর্থক ছিল।
সালইম্মা বাপ তাদের একজন। তিনি সমর্থক ছিলেন তবে পাড়ার মানুষের মতের বাইরে যেতেন না। সালইম্মা বাপের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল গুরা ফোয়ার কাছে (ছোট ছেলেদের কাছে) পাকিস্তানি বাহিনী কোনোদিন হারতে পারে না।
১৫ ডিসেম্বর রাতে আকাশে বিমানের ছোটাছুটি। বোমাবর্ষণ হচ্ছে, আওয়াজ হচ্ছে আমরা বুঝতে পারছি। সবার ধারণা, পটিয়ার মিলিটারি ক্যাম্পে বোমাবর্ষণ হচ্ছে। বিবিসি, আকাশবাণী, ভয়েস অব আমেরিকায় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের যুদ্ধ ঘোষণার কথা বলা হচ্ছে। বারবার পাকিস্তানি বাহিনীর উদ্দেশে জেনারেল মানেকশ ঘোষণা করছেন ‘হাতিয়ার ফেক দো।’
এলো ১৬ ডিসেম্বরের শুভ্র সকাল। বিবিসি পাকিস্তান বাহিনীর পরাজয়ের কথা বলছে। রেডিওর কাছ থেকে কেউ নড়ছে না। সকাল ১১টার দিকে আব্বা বললেন, ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করবে। এদিকে পাড়ার লোকদের সঙ্গে আমার সেজো ভাই পটিয়া চলে গেছে কেউ টেরই পায়নি। আম্মার উৎকণ্ঠা।
দুপুরে সেজো ভাই (মুসলিম হাইস্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র) এসে বলতে শুরু করল, পটিয়া থানায় মিলিটারি ও রাজাকারদের বন্দি করা হয়েছে। মানুষ তাদের জুতো ছুড়ে মারছে। জোহরের নামাজের সময় হওয়ার আগেই সবাই জেনে গেল দেশ স্বাধীন হয়েছে। মসজিদে হুজুর নতুন দেশের জন্য দোয়া করলেন। আমরা ছোটরা ‘জয় বাংলা’ ‘জয় বাংলা’ বলে দলবদ্ধ হয়ে এদিক সেদিক ছোটাছুটি শুরু করলাম।
আমার শিশুমন বুঝতে পেরেছিল যুদ্ধ বন্ধ হয়েছে, আমাদের দেশের নতুন নাম হয়েছে ‘বাংলাদেশ’। বাড়িতে স্বাধীন বাংলার দোমড়ানো-মোচড়ানো একটি পতাকা ছিল। সবাই মিলে বাঁশের মাথায় সেটি দড়ি দিয়ে বেঁধে বাড়ির গেটের ওপর উড়িয়ে দিল। সন্ধ্যায় মুক্তিযোদ্ধা কামালসহ তিন-চারজন অস্ত্র নিয়ে আব্বার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। আম্মা নতুন চালের সিন্নি খাওয়ালেন তাদের।
সন্ধ্যার সময় সালইম্মার বাপ আমাদের বাড়িতে এসে সে কি কান্না! তার মতে, মুসলমানরা হিন্দুর কাছে পরাজিত হয়েছে। পাড়ার ছেলেরা সালইম্মা বাপের কাছে এসে জোরে ‘জয় বাংলা’ বলে দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছিল, আর সালইম্মা বাপ ক্ষেপে গিয়ে ওদের বকাবকি করছিল।
আর সারা দিন ছোটাছুটির ক্লান্তিতে সাত বছরের এক শিশু একটি নতুন দেশ সৃষ্টির আনন্দ নিয়ে নতুন আলোর স্বপ্ন দেখতে দেখতে ঘুমের রাজ্যে চলে গেল।
কলি