তোমরা আমার মাইয়া আর পোলাডারে দেখচো? মাসুরা চারবাড়ির পথে পথে দৌড়ায়, যাকে পায়, তাকেই আকুল প্রশ্ন করে, অগো পাইতেছি না দুপরের পর থাইকা।
পথেও আজকাল কাউকে পাওয়া যায় না। যদিও গ্রাম কিন্তু গঞ্জের কাছে হওয়ায় রাজাকার আর পাকিস্তানের আর্মিরা যখন তখন আসে। আগে আসত গরু ছাগল হাঁস মুরগি কেড়ে নিতে। উজানগাঁও গ্রামের অনেকেই পালিয়েছে ঘরবাড়ি ছেড়ে।
যাদের যাওয়ার জায়গা নেই, বাধ্য হয়ে রয়ে গেছে। মাসুরার বাপের ঘরবাড়ি কয়েক বছর আগে কচানদীতে ভেঙে নিয়ে গেছে। রাস্তার ওপর ছাউনি দিয়ে থাকে। সেখানে যাওয়ার সুযোগ নেই।
ছেলে অমিত আর মেয়ে বকুলকে নিয়ে কোনোভাবে খেয়ে না খেয়ে টিকে আছে। বকুল বড়, অমিত ছোট। বকুল পড়ে ক্লাস ফোরে অমিত পড়ে টুয়ে। দুই ভাইবোন ঝগড়া মারামারি করলেও একসঙ্গে থাকে।
মাসুরা এদিক দিয়ে নিশ্চিত ছিল। কিন্তু সমস্যা হলো এলাকায় রাজাকার বাহিনীর আনাগোনা। আনোগোনা আরও বাড়ছে, বকুলের বাপের খোঁজ চায় রাজাকার আব্বাস আলী খান।
গ্রামেরই মানুষ আব্বাস। কিন্তু রাজাকার হওয়ার পর লোকটাকে আর চেনা যায় না। এসেই জানতে চায়, শিমুল কোথায়?
আমি কইতে পারি না, মাথায় ঘোমটা দিয়ে নিচু স্বরে জানায় মাসুরা।
কইতে পার না? আব্বাসের গলায় বিদ্রূপ। পায়ের আঙুল দিয়ে মাটি খোটে মাসুরা।
তোমার পোলায় যে কইল, তোমার স্বামী ভারতে গেচে?
ও ছোট মানুষ, কী কইতে কী হোনচে?
তুমি নিজেরে খুব চতুর ভাবো, না? দাঁতে দাঁত পেষে আব্বাস আলী খান, তুমি কচানদীর পাড়ের আমগো হেমায়েত জাউলার মাইয়া বইলা কিচু করতে আচি না।
হেমায়েত চাচায় হেদিন হাত-পাও ধইরা মাফ চাইছে, নাইলে...। হোনো যেহান থেহে পারো শিমুলরে হাজির হরো আমার সামনে। সমায় চাইর দিন দিলাম। চাইর দিন পর বকুলের বাপরে না পাইলে তোমারে তো নিমুই, লগে মাইয়াডারেও লইয়া যামু।
দলবল নিয়ে চলে যায় আব্বাস রাজাকার। মাসুরা ভয়ে কাঁপতে থাকে। মায়ের সঙ্গে আব্বাস রাজাকারের কথা শুনেছে ঘরের আড়ালে দাঁড়িয়ে বকুল আর অমিত।
মাসুরা উঠোনে মাটির ওপর বসে পড়ে, দুচোখে পানি আর পানি। কী করবে? কার কাছে যাবে, কিছুই মাথায় আসছে না।
ঘরের ভেতর থেকে ভাইবোন এসে মাকে জড়িয়ে ধরে। মাসুরা ছেলে আর মেয়েকে বুকের মধ্যে নিয়ে আরও ফুপিয়ে কাঁদতে থাকে। অমিত মায়ের
চোখের জল মুছে প্রশ্ন করে, মা বাজান কই গেছে? আমারে কও, ডাইকা আনি?
ভাইয়ের সঙ্গে গলা মিলায় বকুলও, মা অমিত তো ঠিকই কইচে। বাজানরে ডাইকা আনলে তো লোকটা...
মারে! হু হু কান্না উৎলে ওঠে মাসুরার গলায়- তোর বাপরে হাতের মইধ্যে পাইলে ওরা মাইরা ফালাইব। এক মিনিটও বাঁচতে দেবে না।
ক্যা মা? বাজান কী করচে? প্রশ্ন করে বকুল।
তোমাগো বাজান যুদ্ধে গেছে।
জানতে চায় অমিত-যুদ্ধ কোথায় অয় মা?
কইতে পারি না বাজান। হুনি হারা দেশে যুদ্ধ অইতেছে রাজাকার, পাকিস্তানের মিলিটারি আর মুক্তিবাহিনীর লগে। তোমাগো বাপে কোথায় যুদ্ধ হরে
আমি জানি না। নিজেকে শান্ত করে উঠে দাঁড়ায় মাসুরা। তোরা নাইয়া আয়, আমি রান্দন চড়াইতেছি।
আইচ্ছা মা।
ছেলেমেয়েকে উঠোনে রেখে মাসুরা ঢোকে রান্নাঘরে। চালও তেমন নেই। আর দুই দিন চলবে- দুই দিন পর কোথায় চাল পাবে, ছেলেমেয়েদের মুখে দানাপানি কোত্থেকে আসবে, ভেবে আবার পাথর হয়ে বসে থাকে রান্নাঘরের মেঝেতে।
রান্না শেষ করে মাসুরা দেখে, বাড়ির মধ্যে বকুল আর অমিত নেই। মনে করেছিল কচানদীর পাড়ে গেছে, আসবে কিছুক্ষণের মধ্যে। নিজে পুকুরে গোসল সেরে উঠোনে কাপড় রোদে দিয়ে নদীপথের দিকে তাকায়, নেই, ওদের ছায়া নেই।
বুকটা ধরাস করে ওঠে। খুঁজতে শুরু করে অমিত আর বকুলকে পথে পথে, এই বাড়ি সেই বাড়ি, যাকে সামনে পায়, ধরে ধরে আকুল বেদনায় প্রশ্ন করে, আমার পোলা-মাইয়াডারে দেখচো?
মাসুরা রান্নাঘরে ঢুকলেই বকুল হাত ধরে অমিতের, চল যাই।
কোথায়?
বাজানরে খোঁজতে।
হাসি ফোটে অমিতের মুখে, হ যাই।
দুই ভাইবোনে হাত ধরে দ্রুত বেগে বাড়ির বাইরে চলে যায়। বাড়ির বাইরে এসে যেদিকে দুচোখ যায়, হাঁটতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে উজানগাঁও গ্রাম পার হয়ে পাশের গ্রাম সুজনপুরে আসে। অনেক খিদে পায় দুজনের। পথের পাশে একটা ছাড়াবাড়ির সামনে বসে পড়ে ঘাসের ওপর।ছাড়াবাড়ির ছেছনে বড় বড় জঙ্গল।
আফা, বাজান কই?
কেউ তো কইতে পারছে না বাজানের খবর।
মুই আর আটতে পারমু না আফা। দ্যাখ, পাও ফুইল্যা গেচে।
মোরও পাও ফোলচে।
আফা, খিদা লাগছে।
মোরও ।
তোমরা এখানে কী করছ? কোত্থেকে এসেছ?
মাথায় গামছা বাঁধা কাঁধে লাঙ্গল নিয়ে কৃষক মজিবুর অমিত আর বুকলকে দেখে অবাক। গত কয়েকদিনে গ্রামে কোনো মানুষ নেই। যে যার মতো পালিয়েছে।
বাজানরে খোঁজতে আইচি, জবাব দেয় বকুল।
পাশে বসে মজিবুর, কোথায় তোমার বাজান?
যুদ্ধে গেছে মোগো বাজান। আপনে বাজানরে দেকচেন? শুকনো মুখে ধীরে ধীরে কথা বলে অমিত।
তোমার বাজানের নাম কী? শিমুল।
শিমুল?
মাথা নাড়ায় ভাইবোন।
বাড়ি কোথায়?
ওই দিকে, হাত বাড়িয়ে দেখায় বকুল। দেকচেন বাজানরে?
মজিবুরের শরীরজুড়ে কাঁপুনি আসে, বকুলের বাড়ানো হাতের দিকে প্রশ্ন করে, উজানগাঁও তোমাদের বাড়ি?
হ, মাথা নাড়ায় ভাইবোন।
আসো আমার সঙ্গে- অমিতকে কোলে নিয়ে হাত ধরে বকুলের।
বাজানের কাছে যাইতেছেন?
বকুলের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে দ্রুত হেঁটে ছাড়াবাড়ি পার হয়ে ঢোকে জঙ্গলে। মিনিট পাঁচেক হাঁটার পর বকুল দেখতে পায় আরও কয়েকজন মানুষ বসে আছে ছোট একটা টংঘরের সামনে। মজিবুরকে পাঠিয়েছিল, গ্রামের পরিবেশ দেখে আসতে। কিন্তু সঙ্গে নিয়ে এসেছে দুটি শিশু।
কমান্ডার সুভাষ বসু প্রশ্ন করে, ওরা কারা?
বুকের সঙ্গে জাপটে ধরে মজিবুর অমিতকে আরও জোরে, বুকলকে টেনে নেয় কোমরের কাছে, ওরা বাজানকে খুঁজতে এসেছে উজানগাঁও গ্রাম থেকে।
কে ওদের বাজান?
শিমুল!
কমান্ডার ধরা গলায় বলেন, শিমুল?
সব মুক্তিযোদ্ধা ঘিরে দাঁড়ায় বকুল, অমিত আর মজিবুরকে। তাকায় অমিত আর বকুলের নিষ্পাপ পবিত্র মুখের দিকে। গতকাল রাজাকারদের সঙ্গে যুদ্ধে শহীদ হয়েছে শিমুল।
শরীর ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে কচানদীতে। স্তব্ধতার শোকে পুরো জঙ্গল, গাছপালার সবুজ পত্রালী কাঁদতে শুরু করে, সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধারাও।
কিন্তু অমিত আর বকুল শোকের মধ্যেও এদিক ওদিকে তাকিয়ে খুঁজতে থাকে বাজানকে।
কলি