দেশের পেঁয়াজ আমদানিকারকরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ৩ লাখ ১০ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি নিয়েছেন। এর বিপরীতে গত তিন মাসে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে ৬ দেশ থেকে মাত্র ৭ হাজার ৩১৪ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। যা চাহিদার তুলনায় একেবারেই কম বলে জানিয়েছেন খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে পাইকারি বাজারে এসব পেঁয়াজের সরবরাহও কম রয়েছে বলে জানান তারা। ঘুরেফিরে পুরো বাজার এখন নির্ভর করছে দেশি ও ভারতীয় পেঁয়াজের ওপর।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মসলা গবেষণা কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী দেশে বছরে ৪০ লাখ টন পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। ফলন ভালো হলে সর্বোচ্চ ৩৬ লাখ টন পর্যন্ত পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। কোনো কারণে ফলন কম হলে সে বছর গড়ে ১০ লাখ টন পর্যন্ত পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়।
জানা গেছে, পেঁয়াজ আমদানি করতে পাকিস্তান ও চায়না থেকে ১০ থেকে ১২ দিন, মিসর থেকে ১৫ দিন, তুর্কি থেকে ২০ দিন এবং মায়ানমার ও থাইল্যান্ড থেকে ৭ থেকে ৮ দিন সময় লাগে। এদিকে সময় কম লাগায় ভারত থেকে পেঁয়াজ আনতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন আমদানিকারকরা। কিন্তু গত ৬ মাসেরও বেশি সময় ধরে ভারতে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি ও ৪০ শতাংশ শুল্ক থাকায় আমদানিকারকের প্রতি কেজি পেঁয়াজ আনতে খরচ পড়ত ৯০ টাকার ওপরে। এ কারণে বিকল্প দেশ থেকে পণ্যটির আমদানি শুরু হয়। তবে তা চাহিদার তুলনায় একেবারেই কম।
উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্র চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর জানিয়েছে, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ৩ লাখ ১০ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেওয়া আছে। এই তিন মাসে চায়না, পাকিস্তান, মিসর, তুর্কি, মায়ানমার ও থাইল্যান্ড থেকে এখন পর্যন্ত ৭ হাজার ৩১৪ টন পেঁয়াজ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে খালাস হয়েছে। এর মধ্যে পাকিস্তান থেকে ৪ হাজার ৮৩৭ টন, চায়না থেকে ৬৯৪ টন, মিসর থেকে ১ হাজার ৫৮২ টন, মায়ানমার থেকে ১৯৬ টন ও থাইল্যান্ড থেকে ৫ টন পেঁয়াজ খালাস হয়েছে।
গত তিন অর্থবছরে পেঁয়াজ আমদানির হালচাল
গত তিন অর্থবছরেও চাহিদার তুলনায় কম পরিমাণে পেঁয়াজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১-২২ অর্থবছরে পাকিস্তান, চায়না, মিসর ও তুর্কি থেকে মাত্র ১২ হাজার ৬০৫ টন পেঁয়াজ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে এসেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে শুধুমাত্র তুর্কি থেকে ৩ হাজার ৬৮৭ টন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পাকিস্তান, চায়না ও থাইল্যান্ড থেকে ৩ হাজার ২০৯ টন পেঁয়াজ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে এসেছে।
উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্র চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের উপপরিচালক ড. মোহাম্মদ শাহ আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘ভারত থেকে স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ বেশি আসে। চলতি অর্থবছরের তিন মাসে ৩ লাখ ১০ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেওয়া আছে। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি তুলনামূলকভাবে অনেক কম হয়। এই তিন মাসে এসেছে মাত্র ৭ হাজার ৩১৪ টন। তবে পাইপলাইনে আরও পেঁয়াজ রয়েছে। সেগুলো দ্রুত সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসবে।’
এদিকে ভারত শুল্কহার ৪০ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ কমিয়েছে। পাশাপাশি দেশটিতে পেঁয়াজের দামও কমেছে। এ কারণে গত সপ্তাহে সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে এসেছে প্রায় ১৮ হাজার টন পেঁয়াজ। এসব পেঁয়াজ আনতে আমদানিকারকের কেজি প্রতি খরচ পড়েছে ৭২ টাকা।
দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানিকারক মো. মোবারক হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘ভারতে পেঁয়াজের দাম ও শুল্ক কমলেও পেঁয়াজের বেচাকেনা তুলনামূলক কমে গেছে। তাই আমদানিও কিছুটা কমেছে। পণ্যটি পচনশীল হওয়ায় আমরা কম দামে বিক্রি করে দিচ্ছি। প্রতি গাড়িতে প্রায় ৫০ হাজার টাকা লোকসান গুনছি।’
খাতুনগঞ্জের হালচাল
চট্টগ্রামের বড় বাজার খাতুনগঞ্জে বর্তমানে প্রতি কেজি ভারতীয় নাসিক জাতের পেঁয়াজ ৯৫ থেকে ৯৭ টাকা, সাউথ থেকে আসা পেঁয়াজ ৮৫ থেকে ৯২ টাকা, মায়ানমার থেকে ৭৫ থেকে ৮০ টাকা ও পাকিস্তানি থেকে আসা পেঁয়াজ ৭৮ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
খাতুনগঞ্জের হামিদুল্লাহ মিয়া মার্কেট ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস খবরের কাগজকে বলেন, ‘চলতি মাসে ভারত থেকে প্রচুর পেঁয়াজ এসেছে। বর্তমানে দেশি ও ভারতীয় পেঁয়াজের সরবরাহ বেশি রয়েছে। সে তুলনায় বেচাকেনা অনেক কম। তবে সরবরাহ বাড়লেও এর সুফল পাচ্ছেন না ভোক্তারা। খুচরা বাজারে এখনো ভারতীয়, দেশি পেঁয়াজ কিনতে খরচ পড়ছে ১১০ থেকে ১১৫ টাকা।
চট্টগ্রাম মহানগরের নাসিরাবাদ এলাকার বাসিন্দা মো. জহির উদ্দিন বলেন, ‘আমদানি বাড়ার আগে আমরা যে দরে পেঁয়াজ কিনছি, আমদানি বাড়ার পরও একই দরে পেঁয়াজ কিনছি। দু-সপ্তাহ আগে পাকিস্তানি পেঁয়াজ কিনেছিলাম, এখন খুচরা বাজারে পাচ্ছি না। ভারত পেঁয়াজ রপ্তানিতে শুল্ক কমিয়ে লাভ কী হলো? বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজ প্রচুর। গতকালও ১১০ টাকা কেজি দরে ভারতের পেঁয়াজ কিনেছি। ভোক্তা অধিকার, প্রশাসনের খুচরা পর্যায়েও অভিযান পরিচালনা করা দরকার।’
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘সম্প্রতি আমরা লক্ষ্য করেছি, স্বল্প জনবল নিয়ে চট্টগ্রামে ভোক্তা অধিকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে বাজার মনিটরিং করার। তবে আমরা ভেবেছি, চট্টগ্রামের নতুন জেলা প্রশাসক এসেই ভোগ্যপণ্যের প্রতি নজর দিবেন। কিন্তু জেলা প্রশাসক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের ভূমিকা দেখে আমরা হতাশ হচ্ছি। আমরা চাই সব সেক্টরের কর্মকর্তারা ভোগ্যপণ্যের বাজার কঠোরভাবে তদারকি করুক। না হলে ভোক্তারা কখনোই এর সুফল পাবেন না।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক ফয়েজ উল্যাহ বলেন, চট্টগ্রামে বেশকিছু ভোগ্যপণ্যের বড় বাজার রয়েছে। সম্প্রতি আমরা এসব বাজারে অভিযান পরিচালনাকালে দেখেছি ব্যবসায়ীরা মূল্য তালিকা না টানিয়ে বাড়তি দরে পেঁয়াজ বিক্রি করছে। তাদেরকে জরিমানা ও সতর্ক করেছি। তবে ব্যবসায়ীদেরকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।