একদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি অন্যদিকে গ্যাস সংকট ভোক্তাদের কাছে যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। রাজধানীতেই চলছে তীব্র গ্যাস সংকট। কিছু কিছু এলাকায় গত কয়েকদিন গ্যাসের চুলা জ্বলেনি। ইতোমধ্যে সমস্যাটি সাধারণ মানুষের কাছে মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণত শীত মৌসুমে এ ধরনের সমস্যা প্রকট হয়। কিন্তু এবার অনেক আগেই রাজধানীতে গ্যাস সংকট শুরু হয়েছে।
প্রাকৃতিক গ্যাসের এ সংকট কেবল আবাসিকেই নয়, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্প-কারখানাসহ সিএনজি স্টেশনেও ভোগান্তি বাড়িয়েছে। হুমকিতে ফেলেছে ব্যবসা-বাণিজ্য, রপ্তানি ও উৎপাদন খাতকে।
খবরের কাগজ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, ডলার সংকট, স্পট মার্কেটে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম বৃদ্ধি, এলএনজি টার্মিনালে ত্রুটি, মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সেলারেটের টার্মিনাল মেরামত এবং ঘোড়াশাল সার কারখানা উৎপাদনে যাওয়ায় রাজধানীতে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। শীতে এ সমস্যা আরও প্রকট হতে পারে। আসন্ন নির্বাচনে এর প্রভাব পড়তে পারে, এমন আশঙ্কা থেকে অস্বস্তিতে পড়েছে সরকার। এ সংকট নিরসনে আপাতত এক্সেলারেটকে তাদের টার্মিনাল মেরামত দুই মাস পেছানোর অনুরোধ করেছে সরকার। টার্মিনাল থেকে এলএনজি সরবরাহ কমায় দেশে গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। এতদিন এলএনজি টার্মিনাল থেকে ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও গত শনিবার থেকে তা কমিয়ে ৬০০ মিলিয়নে নামিয়ে আনা হয়েছে। এলএনজি মজুতেও কিছুটা সংকট আছে। পরবর্তী শিডিউলের সঙ্গে ব্যালান্স করে এখন কিছুটা কমিয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে। তাই পিক আওয়ার সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত কিছুদিন সংকট থাকবে।
টার্মিনাল সূত্র জানায়, ১০-১২ দিন ধরে এলএনজি সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে পেট্রোবাংলা। আগামী ১ নভেম্বর থেকে টার্মিনালটির মেরামত শুরু হবে এবং শেষ হতে সময় লাগবে অন্তত দুই মাস। এ সময় টার্মিনাল দিয়ে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে। ফলে আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত গ্যাস সংকট থাকবে। চলমান গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, দেশে দিনে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে গতকাল পেট্রোবাংলা সরবরাহ করেছে ২ হাজার ৬৯১ মিলিয়ন ঘনফুট। গত মাসেও দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ছিল ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। এর আগের মাসে ছিল প্রায় ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জনেন্দ্রনাথ সরকার খবরের কাগজ-কে বলেন, ‘১ নভেম্বর থেকে এক্সেলারেট এনার্জির টার্মিনাল মেরামতে যাবে বলে আমাদের জানিয়েছে। যে কারণে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট করে গ্যাস গ্রিডে দেওয়া হবে। ১ নভেম্বর থেকে এলএনজির সরবরাহ আরও কিছুটা কমে যাবে। এতে গ্যাসের সংকট বাড়তে পারে। সামনে শীত মৌসুম, বিদ্যুতের চাহিদা কমে গেলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় গ্যাসের চাহিদা কিছুটা কম হবে। সব মিলিয়ে সেই সময়ের গ্যাস সরবরাহ দিয়েই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হবে।’
নরসিংদীর ঘোড়াশালে নতুন ইউরিয়া সার কারখানার একটি ইউনিট চালু হয়েছে। প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর এ সার কারখানায় বিপুল সরবরাহ বাড়ায় চাপ পড়ছে অন্যদিকে। ফলে শিল্প-কারখানার পাশাপাশি ঢাকায় আবাসিক সরবরাহ কমেছে। তাই সংকটও প্রকট হয়ে উঠছে।
জনসংখ্যার চাপ নগরজীবনকে অসহনীয় করে তুলেছে। নগরায়ণের ফলে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ভবন নির্মাণ। এসব ভবনে গ্যাস সংযোগ দিতে পড়তে হচ্ছে বাড়তি চাপে। এ ছাড়া পরিবহন, শিল্প-কারখানা, গৃহস্থালি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানায় দিন দিন জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে গ্যাস আমদানি করা কঠিন। কারণ, দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ডলার সংকট রয়েছে। ফলে গ্যাস আমদানির ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। সংকট উত্তরণের জন্য গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার- এগুলোর ওপর সরকারকে জোর দিতে হবে। পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস সংকটের কারণে তাদের উৎপাদন কমছে। চাহিদার সঙ্গে জোগানের বিস্তর ফারাক থাকায় গ্যাস ও বিদ্যুৎনির্ভর শিল্প-কারখানাগুলোর উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। দেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট কমিয়ে আনতে হবে।