রাজস্ব আহরণে বাংলাদেশে অনুমাননির্ভর হিসাব ধরে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ফলে সাধারণ মানুষের ওপর করের চাপ বাড়ছে। উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করায় অর্থনীতির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধারা থেকে বের হয়ে বাস্তবতার আলোকে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। বাংলাদেশে প্রতিবছর যে পরিমাণ রাজস্ব আহরণ হয়, তার চেয়ে কমপক্ষে দুই লাখ কোটি টাকা ফাঁকি হয়। এই টাকা দিয়ে কমপক্ষে ৭টি পদ্মা সেতু তৈরি করা যায়।
সূত্রমতে, অর্থনীতির আয়তন জিডিপিতে শিল্প ও সেবা খাতের অবদান, কর ফাঁকি ইত্যাদি বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত হওয়া উচিত কমপক্ষে ১৭ শতাংশ; কিন্তু এখন আছে মাত্র ৮ শতাংশ। কর-জিডিপির এই হার বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে কম। পাঁচ বছর আগে তৈরি করা এক সমীক্ষায় বলা হয়, শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় অপব্যবহারের মাধ্যমে বছরে কমপক্ষে ৬০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়। ভ্যাট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বছরে যে পরিমাণ ভ্যাট আদায় হওয়ার কথা, তার চেয়ে ৭৫ শতাংশ কম আদায় হয়। সেবা খাত থেকে নামমাত্র ভ্যাট আদায় হয়। অর্থাৎ আদায়যোগ্য ভ্যাটের বড় একটি অংশ ফাঁকি হয়। আয়করে ফাঁকির পরিমাণ আরও বেশি। পক্ষান্তরে আমদানি পর্যায়ে আদায়যোগ্য শুল্কের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই আদায় কম হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এনবিআরকে প্রতিবছর বিশাল লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়। কিন্তু সংস্থাটির সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ তেমন একটা নেই। কোভিড ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে গত কয়েক বছরে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় হয়নি। তবে আইএমএফের ঋণের শর্ত পূরণে এখন এনবিআরে নানা ধরনের সংস্কার হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর সুফল আগামী দু-এক বছরের মধ্যে পাওয়া যেতে পারে। এনবিআরের জন্য একটি লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া শেষ কথা নয়।
নীতিনির্ধারকদের এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজস্ব আদায়ের কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। কৌশল ঠিকমতো বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা কঠোরভাবে নজরদারি করতে হবে। উন্নত দেশগুলোতে গবেষণার মাধ্যমে পাওয়া তথ্য ধরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। আমাদের দেশের শক্তিশালী গবেষণা সেল নেই। তাই অনুমাননির্ভর হিসাব ধরে এনবিআরের রাজস্ব আদায় নির্ধারণ করা হয়। উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা ধরার ফলে শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতির অনেক কিছু বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। এনবিআরের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সুশাসনের অভাবের কারণে অর্থনীতিতে আশানুরূপ রাজস্ব আয় বাড়ছে না। এ সমস্যা বহুমুখী ও দীর্ঘদিনের।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, বাজেটের আকার বাড়ছে। তার সঙ্গে কাগজে-কলমে হিসাব মেলানোর জন্য রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও বাড়ানো হচ্ছে, যা উচ্চাভিলাষী। এনবিআর রাজস্ব আদায়ে উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করায় অর্থনীতিতে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। সরকারকে এ ধারা থেকে সরে এসে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। সরকারের আয় বাড়াতে হবে। অপ্রচলিত খাত থেকে রাজস্ব আদায় বাড়ানো দরকার। আয়কর ও ভ্যাট আদায়ে স্বচ্ছতা আনতে হবে।
অর্থনীতির সুস্বাস্থ্যের সঙ্গে রাজস্ব আয়ের একটি সুসম্পর্ক আছে। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে রাজস্ব আয়ের কোনো সামঞ্জস্য নেই। অর্থনীতির বড় একটি অংশ হিসাবের বাইরে থাকায় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি হয়। যে কারণে দেশের রাজস্ব ও জিডিপির ব্যবধান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি। নানা কারণে এগুলো ঘটছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি, যা কালোটাকাকে উৎসাহিত করছে। বিভিন্ন খাতে কর অব্যাহতি ও অবকাশ সুবিধা, রাজস্ব বোর্ডের সক্ষমতার ঘাটতি, কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও অদক্ষতা, রাজস্ব বিভাগকে অটোমেশনে রূপান্তর করতে না পারা এবং দুর্বল কর সংস্কৃতি।
রাজস্ব আয় বাড়াতে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অর্জন নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষায় উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ পরিহার করতে হবে। বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। এনবিআরের সক্ষমতা বাড়াতে সংস্কার জরুরি। অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজস্ব আদায়ের কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। গবেষণা বাড়াতে হবে। সর্বোপরি এনবিআরের সুশাসন নিশ্চিত করতে পারলে অর্থনীতির বহুমুখী সমস্যার সমাধান হবে।