দিন দিন বাজেটের আকার বাড়ছে। বড় বাজেট শুধু কাগজেই। বাস্তবে প্রকৃত খরচ বা বাস্তবায়ন অনেক কম। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, বাস্তবায়নের সক্ষমতা ক্রমান্বয়ে কমছে। যদিও সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে সেসব কোনো কাজে আসছে না। গত পাঁচ অর্থবছরের বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঘোষিত বা মূল বাজেট থেকে প্রকৃত বাজেটের পার্থক্য ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ বাজেটের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় করতে পারছে না সরকার। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বড় বাজেটের পেছনে যতটা অর্থনৈতিক যুক্তি কাজ করে, তার থেকে বেশি কাজ করে রাজনৈতিক প্রভাব। বাজেটের সুফল সাধারণ জনগণ খুব কমই পায়। তাদের মতে, বাজেটের আকারের চেয়ে প্রকৃত ব্যয় হলো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রকৃত খরচই অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। বড় বাজেট দিলেই হবে না। দেখতে হবে দেশের অর্থনীতির সেটা ধারণ করার ক্ষমতা রয়েছে কি না। তা না হলে বাজেটের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাবে না জনগণ।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, আগের ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থবছর শেষে খরচ হতে পারে ৬ লাখ ৪৭ হাজার ৫১৮ কোটি টাকা। ঘোষিত বাজেটের চেয়ে কম ব্যয় হতে পারে ১ লাখ ১৪ হাজার ২৬৭ কোটি টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে আগামী বাজেটে ব্যয় সংকোচননীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। সে জন্য আসন্ন ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সম্ভাব্য বাজেটের আকার ধরা হচ্ছে ৭ লাখ ৯৬ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এটি চলতি অর্থবছরের বাজেট অপেক্ষা প্রায় ৫ শতাংশ বেশি। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, উন্নয়ন বাজেট বা এডিপির বাস্তবায়ন হার ৮০ শতাংশের ঘরে থাকলেও অনুন্নয়ন বা পরিচালন বাজেটের বাস্তবায়ন ৯০ শতাংশের বেশি হয়।
উন্নয়ন বাজেটের বাস্তবায়ন তাড়াহুড়ো করে হয় শেষ দিকে। যেমন, গত পাঁচ অর্থবছর আগে থেকে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাস পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়নের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতি অর্থবছরেই প্রথম ৯ মাসে উন্নয়ন বাজেটের বাস্তবায়ন হয়েছিল ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ। পরের তিন মাসে হয় বাকিটা। শেষ সময়ে বাস্তবায়ন বেশি হওয়ায় সরকারি অর্থের অপচয় হয় বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। তথ্যমতে, উন্নয়ন বাজেট তথা এডিবি বাস্তবায়নে নানা দুর্বলতা রয়েছে। এসব কারণের মধ্যে প্রকল্প পরিচালকদের কর্মস্থলে না থাকা অন্যতম।
কোনোভাবেই তাদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। পাশাপাশি বরাদ্দ অর্থ ছাড় নিয়েও সমস্যা রয়েছে। এ ছাড়া ভূমি অধিগ্রহণ, দরপত্র-প্রক্রিয়ায় জটিলতা, যন্ত্রপাতি, জনবলের ঘাটতিও এডিপি বাস্তবায়ন কম হওয়ার অন্যতম কারণ। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, সুনির্দিষ্ট ও সময়নিষ্ঠ পরিকল্পনার অভাবে বাজেট বাস্তবায়ন ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে সরকারি ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবায়ন ব্যর্থতার কারণগুলো নিয়ে জাতীয় সংসদে তেমন আলোচনাও হয় না। অথচ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করতে এবং বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান তৈরি ও আয় বৃদ্ধির অন্যতম অনুঘটক হচ্ছে এডিপি বাস্তবায়ন। এডিপি বাস্তবায়ন পিছিয়ে থাকলে পুরো বাজেটের বাস্তবায়ন পিছিয়ে পড়বে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, বাজেট ঘোষণার সময় যে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়, বছর শেষে তার চেয়ে অনেক কম খরচ হয়। প্রতিবছর এ প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সম্প্রতি বরাদ্দের চেয়ে প্রকৃত ব্যয়ের পার্থক্য বেশি হচ্ছে। বেশির ভাগ লক্ষ্য অর্জিত হয় না। ফলে বাজেট এখন কাগজে পরিণত হয়েছে। বাজেট বাস্তবায়নে সক্ষমতা আগের চেয়ে কমে গেছে। বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট দেওয়ার কথা বলা হলেও সেটি কখনো আমলে নিচ্ছে না সরকার। বড় বাজেটের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করে। এতে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়া যায়। কিন্তু লক্ষ্য পূরণ না হলে বাজেটের কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না।
বাজেট বাস্তবায়নের ঘাটতি মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়াতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আন্তমন্ত্রণালয়ের বিরোধ দূর করতে হবে। কর্মসংস্থান ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির জন্য বাজেট বড় করতে হবে। রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে। সর্বোপরি বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়াতে হলে আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করতে হবে।