ক্যাশলেস (নগদবিহীন) বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। এই উদ্যোগের ফলে কম খরচে অর্থ লেনদেন বা আদায় ও পরিশোধ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ক্যাশলেস সোসাইটি প্রতিষ্ঠায় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বা সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণ চায় সরকার। আর এই লক্ষ্যে কাজ শুরু হয় ২০২২ সালে। ক্যাশলেস লেনদেন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালেই সম্পন্ন হওয়া মোট লেনদেনের ৩০ শতাংশ ক্যাশলেস করতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক।
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ব্যাংকগুলোকে এ ব্যাপারে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগদবিহীন লেনদেন হলে একদিকে কমবে ঘুষ দুর্নীতি। অন্যদিকে কমবে ব্যবসার খরচ। এতে প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারবেন। ফলে ব্যবসায় ব্যয় কমবে। এর মাধ্যমে ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়ার যে লক্ষ্য সেটাও অর্জিত হবে।
এই পদ্ধতিতে প্রত্যেক ইউজার বা ব্যবহারকারী একটি ইউনিক কিউআর কোড পাবেন, যা স্ক্যান করে লেনদেন করবেন। এ কিউআর কোড ব্যবহারকারী যেকোনো ব্যাংক থেকে তার হিসাবের বিপরীতে অর্থ পেতে পারেন। ব্যাংক এমনভাবে এ কিউআর কোড করবে, যেন তা হবে সর্বজনীন। সব ব্যাংক ও গ্রাহক এতে এক্সেস পাবেন বা লেনদেন করতে পারবেন। এটি স্ক্যান করে ব্যবহারকারী পণ্য বা সেবামূল্য পরিশোধ করতে পারবেন। একই সঙ্গে যেকোনো পাওনা নিজের অনুকূলে নিতে পারবেন।
দেশে ক্যাশলেস বা নগদবিহীন ব্যবস্থা শুরু হয়েছে। কিন্তু এখনো খুব কম সংখ্যক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি এর আওতায় এসেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে তাগিদ দিয়ে বলেছে, আগামী বছরের মধ্যে ক্যাশলেস লেনদেন ৩০ শতাংশে নিতে হবে। এ লক্ষ্যে কাজ করছে ব্যাংকগুলো। ক্যাশলেস বা নগদবিহীন অর্থনীতি গড়ে তুলতে সব উপাদান আমাদের দেশে রয়েছে। তরুণ জনগোষ্ঠী, ক্রমবিকাশমান ভোক্তাশ্রেণি, দেশব্যাপী বিস্তৃত মোবাইল নেটওয়ার্ক কভারেজ, পূর্ণবয়স্ক ও উপার্জনক্ষম জনগণের বেশির ভাগই মোবাইল ফোন গ্রাহক।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মোবাইল মানি সেবা চালু হলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে চীনে প্রথম ক্যাশলেস সোসাইটির ব্যাপকতা দেখা যায়। প্রতিবেশী দেশ ভারতও এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে। দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির কারণে বর্তমান সময়ে আর্থিক লেনদেন প্রতিনিয়ত বাড়ছে। গত মার্চ মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসেবে এমএফএস হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ কোটি। এসব হিসাবে প্রতি মাসে গড়ে লেনদেন সংখ্যা প্রায় ৬০ কোটির মতো। টাকার অঙ্কে লেনদেনের পরিমাণ প্রায় দেড় শ কোটির মতো।
শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি আইটি প্রতিষ্ঠান নবটেল লিমিটেডের পরিচালক মো. হাসিবুর রশিদ খবরের কাগজকে বলেন, নীতিসহায়তা পেলে আমরা ক্যাশলেস সোসাইটি পেতেই পারি। অর্থ স্থানান্তর সেবা সাধারণ মানুষের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। এসব সুবিধা চালুর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাইছে নগদ টাকার ব্যবহার কমিয়ে আনতে। নগদ অর্থ কম লাগলে টাকা ছাপানোর খরচ কমবে। তার পাশাপাশি প্রতিটি লেনদেনের হিসাব থাকবে। অপরাধে কোনো অর্থ ব্যবহার হলে তার রেকর্ডও সহজে পাওয়া যাবে। নগদ টাকা সংরক্ষণ ও বহনের ঝামেলা থাকবে না। এতে সময়ের সাশ্রয় হওয়ার পাশাপাশি জীবন আরও স্বস্তি ও স্বাচ্ছন্দ্যময় হবে।
ক্যাশলেস সমাজ প্রতিষ্ঠায় চ্যালেঞ্জ যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে সম্ভাবনাও। এটিকে গতিসঞ্চার করতে হলে গ্রাহকের চাহিদা তৈরিতে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা থাকতে হবে। ক্যাশলেস হওয়ার জন্য সরকার কিছু প্রণোদনার ব্যবস্থাও করতে পারে। যেসব উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী এ পদ্ধতিতে লেনদেন করবে তাদের কর হারে সরকার ছাড় দেওয়ার ব্যবস্থা বিবেচনা করতে পারে। সব ট্রানজ্যাকশনের ডিজিটাল ফুট প্রিন্ট নিশ্চিত করতে পারলে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির একটা সম্ভাবনাও তৈরি হবে। এ পদ্ধতি চালু হলে অবৈধ লেনদেন ও বন্ধ হবে। এ ক্ষেত্রে অর্থনীতিতে গতিসঞ্চার হবে।