কোটা সংস্কার আন্দোলন-পরবর্তী সহিংসতায় যে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। যারা সন্তান হারিয়েছেন তারাই কেবল অনুধাবন করতে পারবেন হারানোর ব্যথা-বেদনা; সন্তান হারানোর মর্মবেদনা। অন্যরা কোনোভাবেই বুঝতে পারবেন না। সরকার ইতোমধ্যে প্রতিটি হত্যার কারণ উদঘাটন করতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এ ব্যাপারে সরকার ত্বরিত সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং কমিটি জোরেশোরে কাজ শুরু করে দিয়েছে।
এদিকে কোটার রায় নিয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির মাধ্যমে প্রত্যেক ছাত্র মৃত্যুর কারণ উদঘাটন করে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেবে সরকার। কাজেই যারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে অশান্ত করতে সংঘর্ষ বাধিয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়েছে, প্রত্যেককে চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা অতীব জরুরি।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল হাসান আরিফ কোটা নির্ধারণ নিয়ে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের রায়ের পর বলেন, ‘রায়ে আদালত কোটা নিয়ে একটি মাপকাঠি দিয়েছেন। সার্বিক বিবেচনায় আদালতের রায় যৌক্তিক, সমস্যা সমাধানে প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে।’
সম্প্রতি আদালতের রায়ের ব্যাপারে তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘আদালত কিন্তু আগেই একটা স্থিতাবস্থা দিয়েছেন।... এটি হয়তো চাপা পড়ে গেছে বা ওইভাবে সামনে আসেনি। জোরালোভাবে সামনে না আনার কারণে বা বোধগম্য না হওয়ার কারণে মাঝখানে এতগুলো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে গেল। যেটা কারও কাম্য নয়।’
অর্থাৎ আদালত যেহেতু একটি স্থিতাবস্থা দিয়েছিল, সেহেতু আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত অবধি সব পক্ষকেই শান্তিপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখা উচিত ছিল। কাজেই শিক্ষার্থীদের যারা এ বিষয়ে ভুল বুঝিয়েছেন, কিংবা বলেছেন- এটা দিয়ে আসলে আপনাদের দাবি আদায় হবে না, তারাও এ ধরনের অচলাবস্থা তথা সংঘর্ষের জন্য দায়ী। এ গ্রুপটিই একটি শান্তিকামী আন্দোলনকে অশান্ত ও উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে সহায়তা করেছে। কোটার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে যারা সহিংস আন্দোলনে রূপ দিয়েছে, তাদের কারণেই অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন এবং রাষ্ট্রের প্রচুর সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
হাসান আরিফ তার বক্তব্যে আরও তুলে ধরেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ সব আলোচনার ঊর্ধ্বে, বিতর্কের ঊর্ধ্বে। মুক্তিযুদ্ধের ফলেই এই দেশ, এই সংবিধান। আর সংবিধানের কারণেই আদালত, যেখানে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আইন নিয়ে আলোচনা হতে পারে, মুক্তিযুদ্ধকে বিচার করার জন্য নয়।’
ইউনিলিভারের চেয়ারম্যান জাভেদ আখতার জানিয়েছেন, গত ৫-৭ দিনে ইউনিলিভার বাংলাদেশের ১০০-১৫০ কোটি টাকার ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে নিত্যব্যবহার্য ভোক্তাপণ্যের ১০ কোটি ডলারের ক্ষতিসাধিত হয়েছে। এ কয়েক দিনে জিডিপির আনুমানিক ক্ষতি হয়েছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০ কোটি ডলার। সংঘর্ষে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে আইসিটি খাতে, মহাখালীতে ডেটা সেন্টার পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ইন্টারনেট সেবা-পরিষেবা বন্ধ রয়েছে কয়েক দিন ধরে।
খবরে জানা যায়, প্রতিদিন আইসিটি খাতে ক্ষতি হয় ৮০ কোটি টাকা। বাংলাদেশের একটি বিরাট শ্রেণি ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছেন। ইন্টারনেটের অবনমনে তাদের বাজার ক্রমশ ছোট হয়ে আসবে। নরসিংদী জেলা কারাগারে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়েছে। কারা অভ্যন্তরে পেট্রলবোমা মেরে বন্দিদের থাকার জায়গাসহ বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে ৮২৬ বন্দি কারাগার থেকে পালিয়ে যান। হামলাকারীরা অস্ত্রাগার ও কারারক্ষীদের কাছ থেকে ৮৫টি অস্ত্র এবং ৮ হাজার ১৫০টি গুলি লুট করে। এসব কি শিক্ষার্থীদের কর্মকাণ্ড হতে পারে? কখনোই নয়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে পুঁজি করে একটি বিশেষ গোষ্ঠী এ ধরনের হামলা চালিয়েছে। দায়িত্বশীলরা জানান, এ কারাগারটি ঠিক হতে এক বছর সময় লাগবে এবং কারাগারটি পুরোনো হওয়ায় আগের স্থাপনা পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব হবে না। এ ছাড়া সারা দেশে আন্দোলনের নামে দুর্বৃত্তরা সরকারি সম্পদের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে।
মেট্রোরেল ঢাকার বাসিন্দাদের কাছে স্বপ্নের পরিবহন। মেট্রোরেলের মিরপুর-১০ ও কাজীপাড়া স্টেশনে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে হামলাকারীরা। তারা স্টেশনের আসবাবপত্র লুট করে নিয়েছে। খবরে জানা যায়, এসব স্টেশন মেরামত করে পুনরায় চালু করতে এক বছর সময় লাগবে। কেননা এসব স্টেশনের নষ্ট করা সরঞ্জামাদি বিদেশ (জাপান ও ইউরোপ) থেকে আনতে হবে এবং যথেষ্ট ব্যয়সাপেক্ষ। এ ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২২টি গাড়িতে আগুন ও ৩২টি গাড়ি ভাঙচুর করে হামলাকারীরা। এসব কি সাধারণ শিক্ষার্থীদের কর্মকাণ্ড হতে পারে? বিকেএমইএর সভাপতি জানান, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রতিদিন ১৫ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চার দিনে ৬০ কোটি বা ৬০০ মিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়নি। এর ক্ষতিপূর্ণ কি দুষ্কৃতকারীরা প্রদান করবে?
গাজীপুরে বিআরটিএর প্রকল্পের ১৬ এক্সকাভেটর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিআরটিএর ভবনে রাখা সব গাড়ি পোড়ানো হয়েছে। মিরপুরের ভেহিক্যাল টেস্টিং সেন্টার পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। বিআরটিএ ভবনে দুই দফা আগুনে ৫৫টি গাড়ি পুড়ে গেছে। হামলাকারীরা আগুন দেওয়ার আগে ভবনের কম্পিউটার, টিভি, ল্যাপটপসহ অন্যান্য জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে গেছে।
এ ছাড়া দুর্যোগ ভবন, খাজা টাওয়ারের ডেটা সেন্টার, রামপুরার বিটিভি ভবন, বিভিন্ন পুলিশ ফাঁড়ি, ডাকঘর, থানা ভবন, হানিফ ফ্লাইওভারের টোল প্লাজা, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের টোল প্লাজাসহ অসংখ্য স্থাপনায় ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। একজন প্রকল্প বিশেষজ্ঞের মতে, অল্প কয়েক দিনের ধ্বংসলীলায় ক্ষতির পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকার মতো। একবার ভাবা যায়, কত বড় ক্ষতি হয়েছে রাষ্ট্রের! সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হিসেবে দাঁড়িয়েছে, এই ক্ষতির খেসারত কীভাবে পূরণ করবে বাংলাদেশ। কারা এই ক্ষতির জন্য দায়ী? সামনের দিনগুলোতে রাষ্ট্রকে এই প্রশ্নের উত্তরগুলো খুঁজে বের করতে হবে।
সাম্প্রতিক সহিংসতা ও সংঘর্ষকে ঘিরে পুলিশের আইজিপি বলেছেন, কোটা আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে বিএনপি-জামায়াতের লোকজন বিশৃঙ্খলা তৈরি করে সরকার হটাতে দেশে ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালাচ্ছে। এসব ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের তথ্য ও পরিচয় দিলে উপযুক্ত পুরস্কার দেওয়া হবে। অবশ্য বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল ঘোষণা দিয়ে জানিয়েছে, কোটাবিরোধী আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত ছাত্রদল। এ বক্তব্যে পরিষ্কার, আন্দোলন সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়ও সাংবাদিকরা বলেছেন, হামলায় দুর্বৃত্তরা জড়িত। শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সহিংসতার দিকে পরিচালনার পথে দায়ীদের অবশ্যই সরকার বের করবে। অন্যদিকে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের মহাপরিচালক বলেছেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনের নামে চলমান সংঘর্ষমূলক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। নাশকতাকারীরা কেউ শিক্ষার্থী নয়। আবার প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কোটা আন্দোলনে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে বিএনপি ও জামায়াত।
আন্দোলনের নামে যারা সহিংসতায় জড়িয়েছে, তাদের সাধারণ জনগণ কখনোই ক্ষমা করবে না। মূলত সংঘর্ষকারীরা রাষ্ট্রের ক্ষতি করেছে, এ দেশের জনগণের সম্পদের ক্ষতি করেছে, মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে। শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনায় গঠিত বিচার বিভাগীয় কমিশন নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের খুঁজে বের করবে- এটাই সবার প্রত্যাশা। অন্যদিকে হামলাকারীদের কাছে প্রশ্ন, আপনারা রাষ্ট্রের সম্পদ ক্ষতি করে কী পেয়েছেন, হয়তো এককালীন কিছু টাকা পেয়েছেন। কিন্তু আপনি এবং আপনারা অনাগত ভবিষ্যতের ক্ষতিসাধন করেছেন। এখন সরকারের কর্তব্য হচ্ছে, হামলাকারীদের খুঁজে বের করার পাশাপাশি পরোক্ষভাবে হলেও যারা এহেন কর্মকাণ্ডে মদদ দিয়েছে, অর্থ দিয়েছে, অস্ত্রের জোগান দিয়েছে কিংবা হুকুম দিয়েছে; তাদের প্রত্যেককে শনাক্ত করতে হবে। অন্যদিকে যারা হুকুমের তাঁবেদার হয়ে রাষ্ট্রের সম্পদ বিনষ্ট করেছেন, তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। রাষ্ট্র আমাদের সবার, এ বোধটুকু সবার মধ্যে জাগরূক হোক। দুষ্কৃতকারী ও দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে সব পেশা-শ্রেণির মানুষের একযোগে দেশের স্বার্থে কাজ করা অবশ্যকর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও সভাপতি ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়