কোটা সংস্কারের দাবিতে জোরদার আন্দোলন প্রথম আমরা দেখি ২০১৮ সালে। সেই আন্দোলন কঠোর এবং কৌশলী পদ্ধতির মাধ্যমে শেষ করা হয়েছিল পুরো কোটা বাতিল করে দিয়ে। আন্দোলনের দাবি পুরো কোটা বাতিল ছিল না এবং তা আইনে টেকারও কথা নয়। টেকেনি এবং সরকারের এ বিষয়ে জেদ ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে সেই আন্দোলনের পুনরুত্থান ঘটল এ বছরের জুনে। প্রথম থেকে শান্তিপূর্ণ এই আন্দোলন অসংখ্য শিক্ষার্থীকে একত্রিত করতে সক্ষম হয়। গত বহু বছর আর কোনো প্রতিবাদ এত বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থীকে জড়ো করতে পারেনি।
এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর প্রতিবাদে শামিল হওয়ার যথেষ্ট যুক্তি আছে। একদিকে তাদের ন্যায্য অধিকারের প্রশ্ন, অন্যদিকে জুলুমের প্রতিবাদ। শিক্ষা শেষ করার পরও যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি না পাওয়ার অভিজ্ঞতা, চাকরির পরীক্ষায় ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম, নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস, স্বজনপ্রীতির পাশাপাশি নিয়োগ নিয়ে ব্যাপক বাণিজ্য এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এসব ঘটনা যুক্তিযুক্ত কারণেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা, হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
প্রকৃতপক্ষে এই তরুণ প্রজন্ম কর্মসংস্থান সংকট ও সর্বব্যাপী দুর্নীতি-লুটপাটের শিকার। দেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দেখা যায় কিন্তু কর্মসংস্থানে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে না। এদিকে সরকারি খাতে বিশেষ করে শিক্ষা (স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়) এবং চিকিৎসা খাতে (হাসপাতাল) কয়েক লাখ শূন্যপদ থাকা সত্ত্বেও তাতে নিয়োগ করা হচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে, সরকার ক্ষমতাবান লোকদের দুর্নীতির সহযোগী বিভিন্ন প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে রাজি থাকলেও অনেক প্রয়োজনীয় খাতে অর্থ বরাদ্দে আগ্রহী নয়। বিপুল ব্যয়বহুল অনেক প্রকল্পই কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে না। বরং বেশ কয়েকটি বিরূপ ভূমিকা পালন করছে।
এসব মিলিয়ে সম্মানজনক কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। উন্নয়ন পরিকল্পনায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার উদ্যোগও খুব কম। উল্টো বহু উদ্যোগ যেমন পাট, চিনিশিল্প বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যেগুলোতে অনেক কর্মসংস্থান বাড়ানো সম্ভব ছিল। এসব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ দিনে দিনে দানা বাঁধছে। বৈরী পরিস্থিতির কারণে অসংখ্য তরুণ দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছে, করে বিপদেও পড়ছে অনেকে। যারা দেশ ছাড়তে পারবে না বা যেতে চায় না, তারা দেশে কাজ খুঁজছে। যে উন্নয়ন মডেল কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারছে না তা পরিবর্তন তো তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সে জন্য যতটুকু সুযোগ দেশে আছে, সেটা কার্যকর করাই তাদের চেষ্টা।
এই মুহূর্তে দেশে বিসিএস নিয়মিত এবং নিরাপদ চাকরির সন্ধান দেয় এবং সে কারণে এর সুযোগ যাতে বৈষম্যহীন হয়, এটাই তাদের এই সময়ের বড় চাওয়া। কিন্তু বিসিএস পরীক্ষার নির্বাচন-প্রক্রিয়ায় যে কোটা পদ্ধতি ছিল তাতে ৫৬ শতাংশই ছিল কোটা, মানে প্রতিযোগিতার আওতার বাইরে। তাতে শিক্ষার্থীদের বড় উল্লেখযোগ্য অংশ চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল, এতে মেধা ও বুদ্ধিমত্তার সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছিল না।
কোটা পদ্ধতি, প্রশ্ন ফাঁস, নিয়োগে স্বজনপ্রীতি এবং দুর্নীতির মতো ইস্যুতে অনৈতিক ও অবৈধভাবে অনেক চাকরির সুযোগ নষ্ট হচ্ছে। এই সমস্যাগুলো বন্ধ করতে এবং আংশিক হলেও তাদের সমাধান করতে শিক্ষার্থীরা এই দৃশ্যপট পরিবর্তন করার আশায় আন্দোলন-সংগ্রামে যোগ দিয়েছে।
ছাত্র আন্দোলনের জবাবে সরকার সংবেদনশীল বা যৌক্তিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। আগেই বলেছি, ২০১৮ সালে যখন বিক্ষোভ চলছিল, সরকার চাকরিতে কোটা সম্পূর্ণরূপে বাতিল করেছিল; যা আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল না। তাদের দাবি ছিল কোটা সংস্কার যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। কোটার ভিত্তিতে ৫০ শতাংশের বেশি চাকরি বরাদ্দের বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়। কোটা সম্পূর্ণরূপে বাতিল সেই সব লোকদের ক্ষতি করেছে, যাদের প্রকৃতপক্ষে তাদের কোটার দরকার ছিল, যেমন- ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিরা। বোধগম্যভাবে কোটা বাতিলে সরকারের সিদ্ধান্তকে উচ্চ আদালত বেআইনি বলে গণ্য করেছিলেন।
এরপর ছাত্র বিক্ষোভ ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের সব বিভাগে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ছাত্রছাত্রীরা অংশগ্রহণ করে। তাদের দাবি ছিল কোটা সংস্কারে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করুক। সরকার সব সময়ই বলে এসেছে যে, বিষয়টি আদালতের এখতিয়ার, তাদের কিছু করার নেই। তবে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, সরকার চাইলে কোটা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে পারে। সুতরাং সরকারের কোনো ভূমিকা নেই এমন দাবি ছিল ভুল।
এতদিনে আদালত, সরকারের সিদ্ধান্ত সবই তড়িঘড়ি হলো। আন্দোলনের শুরুতেই সরকার যদি শিক্ষার্থীরা কী চায় তা বোঝার জন্য একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিত, তাদের দাবির পেছনে যুক্তি খুঁজে বের করত, যাদের কোটা দরকার তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করত এবং কীভাবে সংস্কার করা যায় তা বোঝার চেষ্টা করত, তাহলে এ রকম ভয়ংকর প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি হতো না। শিক্ষার্থীদের একটি সরল প্রত্যাশা ছিল: সরকার তাদের কথা শুনবে এবং প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের জন্য যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবে। তার পরিবর্তে সরকার একটি বিরূপ পথ বেছে নিয়েছিল, বিক্ষোভকারীদের সম্পর্কে অপ্রয়োজনীয় নেতিবাচক মন্তব্য করে এবং বিভিন্ন হুমকির কথা বলে তাদের উসকে দেয়। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য অবমাননাকর ও উসকানিমূলক ছিল।
এরপর ওবায়দুল কাদেরের কথামতো দিনরাত আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালাতে থাকে ছাত্রলীগ। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। এমনকি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ হামলা চালায়। জনসাধারণের দাবিসংবলিত একটি জাতীয় সমস্যা সমাধানে সরকার স্বৈরাচারী এবং অনমনীয় মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে। এটা খুবই দুঃখজনক এবং অগ্রহণযোগ্য বিষয়।
আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা আরও দেখেছি যে, যখনই নাগরিকরা তাদের অধিকার আদায়ের দাবিতে বা কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে আওয়াজ তোলেন, সরকার সংবেদনশীলতার বদলে কঠোর সহিংসতার সঙ্গে তা মোকাবিলা করে। তারা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শ্রমিকগোষ্ঠী বা শিক্ষার্থী যেই হোক না কেন। ভুল তথ্য ছড়ানো এবং উসকানি দেওয়াও চলতে থাকে। ন্যায়সংগত আন্দোলনকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য পুলিশ বা শাসক দলের গুন্ডাদের নিয়োজিত করার ঘটনাও আমরা প্রায়ই দেখি। এমনকি মাসের পর মাস শিক্ষকদের রাস্তায় বসে থাকার পর তাদের ওপর পুলিশি আক্রমণের ঘটনাও দেখেছি। কিছুদিন আগেই শ্রমিকদের মজুরি আন্দোলনে গুলি করা হয়েছে, হতাহত হয়েছেন শ্রমিকরা।
সরকারের মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গি এমন যে, সাধারণ নাগরিকদের দাবি করা বা প্রতিবাদ করার অধিকার নেই। সরকার যা খুশি তাই করতে পারে এবং তা সবাইকে মেনে নিতে হবে। কেউ ভিন্ন অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করলে তাকে কঠিন পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। এই স্বৈরাচারী আচরণকে টিকিয়ে রাখার জন্য ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ এবং করদাতার টাকায় প্রতিপালিত পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
গত কিছুদিনে সরকার নাগরিকদের জন্য সমাধানযোগ্য সমস্যাকে জটিল ও সহিংস করে তুলেছে। শিক্ষার্থীদের কথা শোনা, তাদের দাবি বোঝা এবং তাদের মানিয়ে নেওয়ার মতো সময় সরকারের নেই। শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক ও ন্যায্য দাবি যদি পুলিশ ও ছাত্রলীগের বর্বরোচিত হামলার শিকার হয়, সে ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ বিরোধিতা করতে বাধ্য। গত কয়দিনে ২ শতাধিক প্রাণহানি, কয়েক হাজার ক্ষমতবিক্ষত মানুষ, দেশের বিপুল সম্পদের ধ্বংস, অসংখ্য পরিবারের অচিন্তনীয় ক্ষতির দায়দায়িত্ব তাই প্রধানত সরকারকেই নিতে হবে।
শিক্ষার্থীরা কিছু চুরি করতে, কাউকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে, দুর্নীতিতে লিপ্ত বা অন্যের কাছ থেকে সুযোগ কেড়ে নেওয়ার দাবি তোলেনি। তারা কেবল তাদের মেধা এবং মস্তিষ্ক দিয়ে তাদের সফলতা পাওয়ার পথ চেয়েছে। যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়নের দাবি তোলায় যখন এই শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হয়, রক্তাক্ত করা হয়, মেরে ফেলা হয় বা হাসপাতালে পাঠানো হয়, তখন তা সারা দেশের ওপর হামলা করার শামিল।
দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা রক্তপাত চাই না। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই তরুণ-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা-হয়রানি বন্ধ করতে। মূল কথা- নাগরিকদের প্রতি সরকারের বৈরী দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। আন্দোলনকারীদের যুক্তিসম্মত দাবি মেনে নিয়ে দেশের মানুষকে ভয়াবহ অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে হবে এবং টেকসই সমাধানের জন্য সব ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথ তৈরি করতে হবে।
লেখক: শিক্ষাবিদ
[email protected]