ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরে দাঁড়ানোর পর যাত্রা শুরু করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। ‘দরিদ্রের ব্যাংকার’ হিসেবে পরিচিত ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে এক কঠিন পথ পাড়ি দিতে যাচ্ছেন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ‘স্বপ্নের বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে কাজ এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে নেতৃত্ব দেবেন তিনি।
বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব এখন তার কাঁধে। তার মন্ত্রিসভায় আলাদা একটা বিশেষত্ব আমরা দেখতে পেয়েছি, সেখানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দুজন সমন্বয়কও রয়েছেন। যারা বয়সে অনেক তরুণ। তারা সঠিক নেতৃত্ব যদি দিতে পারেন, তাহলে আগামী প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা হবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে সরকার গুরুত্ব দিলেও আরও কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। কার্যত একদলীয় শাসনে মানবাধিকার লঙ্ঘন, বাকস্বাধীনতা খর্ব, অপশাসন, দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, উচ্চ বেকারত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভে জনসাধারণও ছাত্রদের আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করেছিলেন। এই ক্ষোভ প্রশমনে নতুন সরকারকে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজটি করতে হবে বিচক্ষণতার সঙ্গে। নাজুক অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং বিপুল বিদেশি ঋণের চাপ মোকাবিলা করে এগিয়ে নিতে হবে দেশের অর্থনীতিকে।
পুলিশ ও জনগণ একে অপরের পরিপূরক। পুলিশ ছাড়া রাষ্ট্রের শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এ জন্য পুলিশ বাহিনীকে জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পুলিশ ও জনগণের মধ্যে আস্থার জায়গা নষ্ট হওয়ায় সম্প্রতি এত হানাহানি ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানোই নতুন সরকারের অগ্রাধিকার বলে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘বাহিনীগুলোর আত্মবিশ্বাস ফেরানো অগ্রাধিকার। এটা চরমভাবে কমে গেছে বলে মনে করি।’
ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি ফেরাতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অতি দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা। তারা বলেছেন, আইনশৃঙ্খলার অবনতি হলে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে। এ জন্য নতুন সরকারকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে নিম্ন আয়ের মানুষকে স্বস্তি দিতে হবে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী বাড়াতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের প্রথম বৈঠকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তরুণদের দেশ গড়ার কাজে সম্পৃক্ত করতে নতুন অন্তর্বর্তী সরকার সব মন্ত্রণালয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী প্রতিনিধি রাখবে বলে মত দিয়েছে। এটা অত্যন্ত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। প্রধান উপদেষ্টা নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে রয়েছে ২৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের দায়িত্ব। দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সব দায়িত্ব এখন প্রধান উপদেষ্টার কাঁধে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, ৬৩৯ থানার মধ্যে শুক্রবার পর্যন্ত ৫৩৮টি থানায় পুলিশের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। থানাগুলোর নিরাপত্তায় সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত থানাগুলো তাদের কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। এ সুযোগে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দুষ্কৃতকারীরা ঢুকে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও লুটপাট করছে। এ অবস্থায় সংস্কার ছাড়া নির্বাচন হলে দেশে একদলীয় শাসন কায়েম হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মত দিয়েছেন। চাঁদাবাজি বন্ধ ও নিত্যপণ্যের যৌক্তিক দর নিশ্চিত করতে বাজারে এখন শিক্ষার্থীরা।
এতদিন সরকার যা পারেনি শিক্ষার্থীরা তা করে দেখিয়েছেন। তারা পণ্যের মূল্যতালিকা ঝোলানো নিশ্চিত করা, দোকানের সামনে পরিচ্ছন্ন রাখাসহ নানা বিষয়ে নজরদারি করছেন। চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেটের তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছেন তারা। তরুণ শিক্ষার্থীদের এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন ক্রেতা এবং বিক্রেতারা। ইতোমধ্যে তারা রাজধানীর যানজট নিরসনে ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করছেন। দেশ সংস্কারকাজে তারুণ্যের উদ্দীপনা চোখে পড়ার মতো। বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় রাত জেগে তারা পাহারা দিচ্ছেন।
প্রশাসনিক সংস্কার করতে হলে সবার আগে দরকার প্রতিটি সেক্টরে সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে সবার আগে এ বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে কোনো পদক্ষেপই কাজে আসবে না। বেশ কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা শক্ত হাতে দমন করতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারকে অতি দ্রুত উন্নয়নের রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে। বিশিষ্টজন ও অর্থনীতিবিদরা দেশের সংকট উত্তরণে ভালো পরামর্শ ও মতামত দিতে পারেন। সামষ্টিক অর্থনীতির কাঠামো পুনরুদ্ধার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ এখন বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থনীতির গভীরে যে সমস্যাগুলো রয়েছে, সেগুলোর জন্য সরকারকে জরুরিভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে। সেগুলোতে দক্ষ ও চৌকস ব্যক্তিদের দিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হবে। বাংলাদেশের সময় এসেছে ঘুরে দাঁড়ানোর।