অন্তর্বর্তী সরকারের এক মাস পূর্ণ হতে চলেছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এসেছে এই সরকার। স্বাভাবিকভাবেই এই সরকারের কাছে জনগণের চাওয়া-পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা অনেক। প্রধান উপদেষ্টা এক বক্তব্যে বলেছেন, তার সরকার কবে যাবে, সে সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে আসবে। রাজনৈতিক দল বিএনপি দাবি করেছে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচনটা। তবে সচেতন মহলে আলোচনা হচ্ছে, দেশ সংস্কার সবার আগে অগ্রাধিকার।
এ জন্য প্রয়োজন অন্তর্বর্তী সরকারকে উপযুক্ত সময় দেওয়া। সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নিষ্পেষিত বিভিন্নভাবে। একদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অন্যদিকে দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা। নব্বই-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থা হয়ে পড়েছিল শোচনীয়। তখন ওই অবস্থায় এসেছিল ‘ওয়ান-ইলেভেন’। ওয়ান-ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারও সংস্কার চেয়েছিল। কিন্তু নানা প্রতিকূলতার কারণে তা হয়ে ওঠেনি। বহুল আলোচিত দুর্নীতিবিরোধী অভিযানও শেষ করতে পারেনি তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার।
তারা দুই বছর দেশ চালিয়ে একটি নির্বাচন দিয়ে তাদের সময়ের পরিসমাপ্তি ঘটায়। এরপর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে দেশ পরিচালনা করে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে নজিরবিহীন দলীয়করণের শিকার হতে হয় জনপ্রশাসনকে। পুলিশ বিভাগে এর চরম প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এ বিভাগে সবার আগে সংস্কার প্রয়োজন। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এ বাহিনীর ভূমিকা সর্বাগ্রে। তাই এই বাহিনীকে দলীয় প্রভাব থেকে মুক্ত রেখে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পুলিশ প্রশাসন গড়ে তুলতে হবে।
রাষ্ট্র মেরামতের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কারের জন্য জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গত মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় শীর্ষস্থানীয় ২০ পত্রিকার সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এ বিষয়ে গুরুত্ব দেন। ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে বৈঠকের বিষয়ে ব্রিফিং করেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান রাষ্ট্র মেরামত করার জন্য মস্ত বড় সুযোগ এনে দিয়েছে। বাংলাদেশকে নতুন শিখরে নেওয়ার জন্য এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। তবে এর জন্য জাতীয় ঐক্যের খুব প্রয়োজন।
জানা যায়, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার মতবিনিময়কালে তারা বলেছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যেন যৌক্তিক সময় পর্যন্ত থাকে। প্রধান উপদেষ্টা সম্পাদকদের কাছে পরামর্শ চেয়েছেন এই সময়টাতে কী কী মৌলিক কাজ সরকারের করা উচিত। মতবিনিময় সভায় সম্পাদকরা বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। অনেকে বলেছেন, অন্তত দুই বছর মেয়াদ হলে ভালো হয়, কেউবা দুই থেকে তিন বছরের কথা বলেছেন।
আবার কেউ কেউ প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করতে যতটা সময় লাগে তা দেওয়ার পক্ষে মত দেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ নিয়ে বেশির ভাগই বলেছেন, যেসব সংস্কারকাজ বা কর্মপরিকল্পনা অন্তর্বর্তী সরকারের রয়েছে, সেটিই আসলে নির্ধারণ করবে এই সরকারের মেয়াদ কতদিন হবে। সম্পাদকদের পক্ষ থেকে বেশ কিছু পরামর্শ তুলে ধরা হয়েছে- সংবিধান সংশোধন, সংবিধান পুনর্লিখন, আইন কমিশন, সংবিধান কমিশন, মিডিয়া কমিশন ও পুলিশ কমিশন গঠনের কথা এসেছে। পুলিশকে আরও কীভাবে কার্যকর করা যায় এবং নির্বাচন কমিশন সংস্কারের কথা এসেছে।
প্রধান উপদেষ্টা জানান, তিনি গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন এবং মুক্ত, প্রাণবন্ত ও গতিশীল গণমাধ্যম দেখতে চান। তিনি সম্পাদকদের বলেন, ‘আপনারা লিখুন, আমাদের দোষত্রুটি হলে তা নিয়ে লিখুন। আমরা আপনাদের কথা শুনতে চাই। মতামত জানতে চাই।’
রাষ্ট্রীয় সংস্কার হতে হবে জনকল্যাণার্থে। দেশের আপামর জনসাধারণের ব্যক্তিস্বাধীনতা যাতে খর্ব না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। গণমাধ্যমকে পুরোপুরি স্বাধীনতা দিতে হবে। মনে রাখতে হবে এটি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। এর মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। দেশের স্বার্থেই সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ও নতুন সরকারের রাষ্ট্র মেরামত সফলতা পাক, সেই প্রত্যাশা সবার।