গত জুলাই ও আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণে দেশের নিত্যপণ্যের বাজারব্যবস্থা স্বাভাবিক গতিতে ফেরেনি। দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সঙ্গে পূর্বাঞ্চলে চলমান বন্যা পরিস্থিতির কারণে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। এবার মৌসুমের শুরু থেকে আলু ও পেঁয়াজের দাম বাড়তি। ভোক্তা অধিদপ্তর বারবার বাজার তদারকি করার পরও কমছে না দাম।
বাধ্য হয়ে অন্তর্বর্তী সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় আলু ও পেঁয়াজের দাম কমাতে আমদানি শুল্ক হ্রাস করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সপ্তাহখানেক পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের নেতৃত্বে চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট বন্ধ, পণ্য ক্রয়বিক্রয়ের পাকা রশিদ সংরক্ষণ করাসহ ১২টি প্রস্তাব দেওয়া হয় জাতীয় ভোক্তা অধিদপ্তরে। কিন্তু ২০ দিন চলে গেলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বাজারে। চাল, ডাল, আটা, ডিম, মাংস, পেঁয়াজ, আলুসহ অধিকাংশ নিত্যপণ্য আগের মতোই চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাঁদাবাজির হাত বদল হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি আগের থেকেও বেশি হচ্ছে। চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করাও যাবে না। চাঁদাবাজির ফলে নিত্যপণ্যের দাম কমছেও না। ভোক্তা অধিদপ্তরের সঙ্গে সরকারের অন্যান্য সংস্থা একসঙ্গে কাজ করলে বাজার নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। সরকার শুল্ক কমানোর ঘোষণা দেওয়ার পরও বাজারে এর প্রতিফলন নেই বললেই চলে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মধ্যে চাল, ডিম, আলু, পেঁয়াজ অন্যতম। অথচ এসব নিত্যপণ্যকে ঘিরে বাজার সিন্ডিকেট প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। এসব সিন্ডিকেট কৌশলে ভোক্তার পকেট কাটছে। কিছু কিছু পণ্যের দাম হাতের নাগালের বাইরে। সাধারণ মানুষকে এসব নিত্যপণ্য কিনতে এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে।
বিক্রেতারা বলছেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর হঠাৎ করে বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। এ ছাড়া দেশের কয়েকটি বন্যাকবলিত জেলায় ত্রাণ সরবরাহের জন্য হঠাৎ করে চালের বিক্রি বেড়ে গেছে। বিশেষ করে মোটা চালের চাহিদা এখন অনেক বেশি। এর পাশাপাশি ধানের দামও সম্প্রতি আরেক দফা বেড়েছে। এসব কারণে খুচরা পর্যায়ে আগের চেয়ে বেশি দামে চাল বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতারা বলছেন, একবার কোনো অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়লে আর কমে না। সরকার পরিবর্তন হওয়ার পর আশা করা হয়েছিল এটি নিয়ন্ত্রণ হবে। কিন্তু তা আর হলো না। আগের মতোই পেঁয়াজের কেজি ১১০ থেকে ১২০ টাকা, আলু ৫৫ থেকে ৬০ টাকা ও রসুন ২০০ থেকে ২৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, উত্তরবঙ্গ থেকে রাজধানীতে একটি কৃষিপণ্য নিয়ে আসতে কয়েক জায়গায় আগের মতোই চাঁদা দেওয়া লাগে। বাজারগুলোতে চাঁদা দিতে হয়। এতে পণ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে। এসব চক্র মোবাইলের বার্তার মাধ্যমে দাম জানিয়ে দিচ্ছে অন্য পক্ষকে। ফলের প্রতিনিয়ত ভোক্তাদের প্রতারিত হতে হচ্ছে।
সরকারের কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, একটি ডিম উৎপাদন খরচ হয় ৮ টাকা ৮১ পয়সা। বর্তমানে বাজারে প্রতি পিস ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৩ টাকার ওপরে। প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ ১৩ টাকা ১৯ পয়সা। খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হওয়ার কথা ছিল ২৯ টাকা। অথচ সিন্ডিকেটের কারণে বেশি টাকায় বিক্রি হচ্ছে আলু। প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ উৎপাদন খরচ ৩৪ টাকা। বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১১৫ টাকার বেশি। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণের দেখা যায়, এসব পণ্য উৎপাদন খরচের তুলনায় ভোক্তা পর্যায়ে দাম দ্বিগুণেরও বেশি।
অন্তর্বর্তী সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা দিন দিন কমে যাওয়ায় ভোগান্তি এখন চরমে। চাঁদাবাজির হাত বদল হওয়ায় সিন্ডিকেট চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাই অন্তর্বর্তী সরকারকে বাজার নিয়ন্ত্রণ ও পথে পথে চাঁদাবাজি কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অবৈধ বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পাশাপাশি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো এ ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। এটি আপামর জনসাধারণের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। আশা করছি, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার অবৈধ বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে।