সমাজ থেকে ধীরে ধীরে হারাতে বসেছে সমাজ-সংস্কৃতির ধারাগুলো। পারিবারিক বন্ধন, অনুশাসনের দিকগুলোর অনুপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে শিশু থেকে উঠতি বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে। বিশ্বায়নের প্রভাব ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে শিশু-কিশোরদের মনোজগতে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ, তা বোঝার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলছে তারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাধ ব্যবহার ও পরিবারের সদস্যদের উদাসীনতায় ভুল পথে যাচ্ছে তারা। এতে মা-বাবার মনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়াচ্ছে।
মনোজগতের পরিবর্তনে তারা অনেক সময় নিজের বাবা-মা, পরিবার-পরিজন, সহপাঠী-বন্ধু- সবকিছুর মায়া ত্যাগ করে ভিন্ন কোনো পথকে বেছে নিচ্ছে অনায়াসে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু-কিশোরদের ভুল পথে পা বাড়ানোর পেছনে এককভাবে কেউ দায়ী নন। বাবা-মা, পরিবার, সমাজ সবারই দায় আছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার অন্যতম সমস্যা। সঙ্গদোষে বা নানা কারণে উঠতি বয়সী শিশু-কিশোররা অনেক সময় বিপথগামী হয়ে উঠছে। ফলে স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে সন্তান কী করছে, কার সঙ্গে মিশছে, কোনো ভুলে জড়িয়ে যাচ্ছে কি না, সেগুলো ভালোভাবে তাদের সঙ্গে মিশে দেখভাল করতে হবে। সম্প্রতি ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী শিশু সুবার ঘটনায় মূলত সারা দেশেই সচেতন অভিভাবকদের মনে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য বিকাশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. হেলাল উদ্দিন বলেন, বাবা-মাকে বাগানের মালীর ভূমিকা পালন করতে হবে। কোনটি ইতিবাচক বা কোনটি নেতিবাচক তা পরিষ্কার করতে হবে। এককভাবে কাউকে দায়ী না করে বরং পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান- সবারই এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, সন্তানদের সঙ্গে বাবা-মা তথা পরিবারের সদস্যদের ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে হবে। সন্তানের মনোজগতে কী হচ্ছে, সেটা উপলব্ধি করতে হবে। পরিবার ও সমাজের প্রতি মূল্যবোধ বাড়াতে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। এ ছাড়া শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশের বাধাগুলো দূর করতে পারলে তারা ভুল পথে যাবে না বা উদ্বেগের কারণ হবে না।
বর্তমানে শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশে পরিবারকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সমাজ ও রাষ্ট্রকেও বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে দায়িত্বশীলতা ও সচেতনতা বাড়ানোর জন্য কিছু কার্যক্রম চালাতে হবে। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য বিকাশে কাজ করছে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংগঠন বা এলাকাভিক্তিক যুব উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলোকে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে আরও সক্রিয় হতে হবে। অভিভাবকদের তাদের সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। আবার তাদের সন্তানদের প্রতি অধিক কঠোরতা দেখানো যাবে না। উঠতি বয়সীদের ভুল পথ থেকে সঠিক পথে আনতে হলে পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান- সবাইকে এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।