জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে সংস্কার নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আলোচনা চলছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর জাতির এক ক্রান্তিলগ্নে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এই সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে দেশের বিভিন্ন খাতে সংস্কার সাধন করা। এ লক্ষ্যে সংস্কার প্রস্তাব তৈরির জন্য গত বছরের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন ও বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন গঠন করে সরকার। গত ফেব্রুয়ারি মাসে এই ছয় কমিশন তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। পরে এসব কমিশনের প্রধানদের নিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন বলেছে, রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কার কমিশনের যেসব সুপারিশ সম্পর্কে একমত হবে, সেগুলোর ভিত্তিতে তৈরি হবে ‘জুলাই চার্টার’ বা জুলাই সনদ। এরপর এই ছয় কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো স্প্রেড শিটে ছকের আকারে ৩৮টি দলের কাছে পাঠিয়ে প্রতিটি সুপারিশের ক্ষেত্রে দুটি বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়। প্রথমটি হলো, সংশ্লিষ্ট সুপারিশের বিষয়ে একমত কি না। এতে তিনটি বিকল্প রাখা হয়েছে। সেগুলো হলো ‘একমত’, ‘একমত নই’ এবং ‘আংশিকভাবে একমত’। দ্বিতীয়তটি হলো প্রতিটি সুপারিশের বিষয়ে সংস্কারের সময়কাল ও বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে মতামত চাওয়া হয়।
ইতোমধ্যে সংস্কার কমিশনগুলোর সুপারিশ নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে বিভিন্ন দলের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এবং তা চলমান রয়েছে। একে একে রাজনৈতিক দলগুলো এই আলোচনায় অংশগ্রহণ করছে। আলোচনায় উঠে আসছে সংস্কার কমিশনগুলোর সুপারিশের বিষয়ে তাদের মতামত ও সিদ্ধান্ত। মতাদর্শিক বা আদর্শগত দিক থেকে দলগুলোর মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য থাকায় তারা কিছু সুপারিশের পক্ষে ইতিবাচক, কিছু বিষয়ে নেতিবাচক মতামত দিচ্ছেন। কোনোটির সম্পূর্ণ, কোনোটির আংশিক মেনে নেওয়ার কথা বলছেন। সুপারিশগুলোর পরিসর যেহেতু অনেক বিস্তৃত, সংখ্যা অনেক; ফলে আলোচনায় মতপ্রকাশের জন্য দীর্ঘ সময় লাগছে। লাগারই কথা। রাষ্ট্র সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পর্কে দলগুলোর গভীরভাবে ভেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। যেহেতু এই সংস্কারই হবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি, ফলে দলগুলোর কাছে সংস্কারের দিকগুলো অনেক গুরুত্ব পাচ্ছে।
যৌক্তিক দিক থেকে দেখলে সংস্কার আসলে একটা চলমান প্রক্রিয়া। সামগ্রিকভাবে সংস্কারের বিষয়গুলো সম্পর্কে তাই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সহজ নয়। ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে সরকার। এর মধ্যে ৬টি কমিশনের সংস্কার নিয়ে ঐকমত্য কমিশন আলোচনা করছে। কিন্তু এর বাইরেও রয়ে গেছে আরও ৫টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশ। সেই সব কমিশনের প্রতিবেদন এখনো সরকারের হাতে আসেনি; এলে সেগুলো আবার দলগুলোর কাছে পাঠানো হবে। কোনো কোনো কমিশনের প্রতিবেদনে এও বলা হয়েছে, কিছু সংস্কার অন্তর্বর্তী সরকার করে যেতে পারে আর কিছু পরবর্তী নির্বাচিত সরকার করবে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে আলোচনার পর দলগুলোর প্রতিনিধিরা যেভাবে বলছেন, তাতে কিছু বিষয়ে ঐকমত্য হবে, কিছু বিষয়ে আংশিক হবে, কিছু বিষয়ে একেবারেই হবে না। তবে এ জন্য আমাদের থেমে থাকার সুযোগ নেই।
এখন রাজনীতির মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছে নির্বাচন। সংস্কার যেমন প্রয়োজন, তেমনি নির্বাচনও হওয়া জরুরি। বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ভোটাধিকারের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের মতামত জানাতে পারেননি। এবার সেই সুযোগ এসেছে। জনগণই যেখানে শেষ কথা, তাদের মতামতের ভিত্তিতে গঠিত জাতীয় সংসদের হাতেই সংস্কারের ভার ছেড়ে দেওয়াই হবে যুক্তিযুক্ত। ৫ আগস্টের পর একটা উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের যে স্বপ্ন বাংলাদেশের মানুষ দেখছে, সে জন্য একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিকল্প নেই।