জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি ড. আলী রীয়াজ কমিশনের কাজের অগ্রগতি জানাতে গত সোমবার জাতীয় সংসদের এলডি হলে সংবাদ সম্মেলন করেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, জাতীয় ঐকমত্য তৈরির লক্ষ্যে পাঁচটি সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে কমিশন। ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে ৪৫টি অধিবেশন করে কমিশন। এর মাধ্যমে প্রথম পর্যায়ের আলোচনা শেষ হয়েছে। ক্ষমতার ভারসাম্যসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্নে এখনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি কমিশন। তবে তত্ত্বাবধায়ক ও দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠাসহ অনেক বিষয়েই তারা একমত হতে পেরেছেন বলে তিনি জানান।
সূত্রমতে, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাপান সফর শেষে দেশে ফেরার পর আগামী ১ বা ২ জুন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারেন। ড. আলী রীয়াজ জানান, সংস্কারের ব্যাপারে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শিগগিরই দ্বিতীয় পর্বের আলোচনা শুরুর প্রস্তুতি চলছে কমিশনের। এ পর্বে যেসব বিষয়ে আগে ঐকমত্য হয়নি বা দলগুলোর অবস্থান কাছাকাছি, সেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। এ ছাড়া রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। যেসব মৌলিক বিষয়ে এখনো মতভিন্নতা রয়েছে, সেসব বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার জন্যই দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনা করবে কমিশন।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি জানিয়েছেন, আগামী জুলাইয়ের মধ্যে সনদ তৈরির ব্যাপারে আশাবাদী কমিশন। মতভিন্নতা থাকা মৌলিক ইস্যুগুলোতে ঐক্যবদ্ধ প্রতিষ্ঠা এবং সংস্কার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নির্ধারণে রাজনীতিবিদদের ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি। কারণ সংবিধান কীভাবে সংস্কার হবে, সংস্কারের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের রূপরেখা চূড়ান্ত করার দায়িত্ব কমিশনের নয়, রাজনৈতিক দল ও সরকারের। কোন কোন বিষয়ে সংস্কার প্রয়োজন, সেগুলোর ব্যাপারে এক ধরনের ঐকমত্যে এসে জুলাই সনদ তৈরি করা গেলে তখন বাস্তবায়ন-প্রক্রিয়ার প্রশ্নটি আসবে। তারা আশা করছেন, দলগুলো একটি পথরেখা নির্ধারণ করতে পারবে। আর কিছু সুপারিশের বিষয় সরকারকে জানানো হয়েছে। সরকার সেগুলোর কিছু বাস্তবায়ন করবে।
সংবিধানে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, বহুত্ববাদ ও গণতন্ত্র অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবে ‘বহুত্ববাদ’ না রাখার ব্যাপারে অধিকাংশ দল মতামত দিয়েছে। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা গঠনের ব্যাপারে অধিকাংশ দল নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। কিছু দল অবশ্য এক কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা বহাল রাখার পক্ষে মত দিয়েছে। নিম্নকক্ষে নারীদের জন্য ১০০ আসন সংরক্ষণের প্রশ্নে এক ধরনের ঐকমত্য রয়েছে দলগুলোর মধ্যে। তবে এর পদ্ধতি কী হবে, তা নিয়ে মতভিন্নতা রয়েছে। উচ্চকক্ষ গঠনকে যেসব দল সমর্থন করে তারা ১০০ সদস্য নিয়ে উচ্চকক্ষ গঠনের ব্যাপারে একমত। তবে এই প্রতিনিধিদের কীভাবে নির্বাচন করা হবে, সে বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো যায়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কাজ করছে। কমিশন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও অংশীজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে যাচ্ছে। প্রথম দফা আলোচনা শেষ করে দ্বিতীয় দফা আলোচনার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে কমিশন। এরই মধ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি ড. আলী রীয়াজ সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের অগ্রগতি তুলে ধরেছেন। সেখানে জানানো হয়েছে, তারা জুলাই মাসে জাতীয় সনদ তৈরির প্রত্যাশায় রয়েছেন। এখন বিষয় হলো, রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া। রাজনৈতিক দলগুলোকেও এ ক্ষেত্রে নিজেদের দলীয় স্বার্থের বাইরে এসে জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি ভাবতে হবে। আশা করছি, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি সবার মতামতের ভিত্তিতে একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্মে পৌঁছাতে সক্ষম হবেন।