দেশে আগের তুলনায় সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর প্রবণতা অনেকটা কমেছে। গত জানুয়ারি থেকে সরকার সুদহার বৃদ্ধিসহ পূর্ণ বিনিয়োগ ও আয়কর রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতা শিথিল করেছে। ফলে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নতুন বিনিয়োগ না হলেও ভাঙানোর প্রবণতা কমায় বিনিয়োগ দুই মাস ধরে ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। সুদহার বাড়ানো ছাড়াও ব্যক্তি পর্যায়ে সব সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষে পুনর্বিনিয়োগ সুবিধা চালু করা হয়েছে। ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের মেয়াদি হিসাবের পুনর্বিনিয়োগ সুবিধা আবার চালু করা হয়েছে। ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ডের বিনিয়োগসীমা প্রত্যাহার করা হয়েছে। পেনশনার সঞ্চয়পত্রে মুনাফা তিন মাসের পরিবর্তে প্রতি মাসে দেওয়া হচ্ছে। আগামী অর্থবছর থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র কেনায় আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র দেখানোর শর্ত শিথিল করেছে বর্তমান সরকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে অধিকাংশ মানুষের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়েছে। এ অবস্থায় তাদের পক্ষে নতুন করে সঞ্চয় বা বিনিয়োগ- কোনোটাই করার সামর্থ্য নেই। এ ছাড়া সরকার পরিবর্তনের পর ধনীরা সঞ্চয়পত্র থেকে তাদের বিনিয়োগ তুলে নিয়েছেন। এসব কারণে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে গেছে।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, সর্বশেষ এপ্রিল মাসে তার আগের মাসের চেয়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমেছে প্রায় ৭ শতাংশ। মোট বিক্রি কমলেও আলোচ্য মাসে সঞ্চয়পত্র নগদায়ন কমেছে প্রায় ২৬ শতাংশ। ফলে এপ্রিলে বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা। মার্চেও বিক্রি ইতিবাচক ছিল প্রায় ৮০ কোটি টাকা। এর আগে টানা পাঁচ মাস বিক্রি ঋণাত্মক ধারায় ছিল। এ কারণে চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসের হিসাবে (জুলাই-এপ্রিল) বিক্রি ঋণাত্মক হয়েছে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ আলোচ্য সময়ে সার্বিকভাবে সঞ্চয়পত্র কেনার চেয়ে ভাঙানোর চাপ বেশি ছিল।
বাংলাদেশের সঙ্গে আইএমএফের চলমান ৪৭০ কোটি ডলারের যে ঋণচুক্তি রয়েছে, সেখানে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ কমানোর পরামর্শ রয়েছে। প্রতিবছর বাজেট ঘাটতি হিসেবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকার যে পরিমাণ ঋণ করে, সঞ্চয়পত্র থেকে তার এক-চতুর্থাংশের বেশি ঋণ নিতে পারবে না। সেই সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের সুদহার বাজারভিত্তিক করতে হবে। সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ সরকারের ঋণ হিসেবে গণ্য হয়। এটা বাজেট ঘাটতির অর্থায়নে ব্যবহার করে সরকার।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, দেশের অর্থনীতির বর্তমান যে পরিস্থিতি তাতে বিনিয়োগ, মজুরি এবং শ্রমবাজার কোথাও খুব বেশি সুখবর নেই। শুধু রেমিট্যান্স এবং রপ্তানি বাদে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির কোনো খাতেই আয় বাড়ছে না। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতিও চড়া। অর্থাৎ মানুষের আয় না বাড়লেও ব্যয় বাড়ছে। এ অবস্থায় নতুন করে সঞ্চয় করার মতো সক্ষমতা অধিকাংশ মানুষেরই নেই। তবে সুদহার বাড়ানোসহ বেশ কিছু সুবিধা বাড়ানোর ফলে সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর প্রবণতা আগের তুলনায় কমেছে। যা বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সঞ্চয়পত্রের সুদহার বাড়ানোয় বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গত জানুয়ারি থেকে সরকার সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বাড়াতে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এর মধ্যে সুদহার বাড়ানো, পুনর্বিনিয়োগের সুযোগ এবং আয়কর রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতা শিথিল করার বিষয়গুলো উল্লেখযোগ্য। এ ধারা অব্যাহত থাকুক এটাই প্রত্যাশা।