আজ থেকে এক বছর আগে দেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন হয়। এ অভ্যুত্থানের পেছনে দীর্ঘদিনের অগণতান্ত্রিক চর্চার ক্ষোভ লুকিয়ে ছিল। এ ক্ষেত্রে সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেড়ে যায়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর জনগণের পালস বোঝার চেষ্টা করে। সে অনুযায়ী দেশের গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরগুলো সংস্কারের লক্ষ্যে কাজ শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকার। আগের সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। অর্থ উপদেষ্টা অনেকটা দক্ষতার সঙ্গে অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করেন। যদিও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে ব্যবসায়ীদের ওপর বারবার নানা ঘাত-প্রতিঘাত এসেছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রভাব এ দেশের অর্থনীতিকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। সম্প্রতি সরকারের কূটনৈতিক কৌশলগত দক্ষতায় ট্রাম্পের শুল্কনীতিতে ছাড় পেয়েছে বাংলাদেশ। এটি অন্তর্বর্তী সরকারের একটি বড় সাফল্য। ব্যবসায়ীদের জন্য এটি স্বস্তিরও সংবাদ। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছেন এবং জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করেছেন। এটি অত্যন্ত আনন্দের সংবাদ। কারণ নির্বাচনের দিনক্ষণ নিয়ে দেশে জল্পনা-কল্পনা কম হয়নি। এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে সরকার ইসিকে নির্বাচনের সব প্রস্তুতি ও প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন শুরুর নির্দেশ দিয়েছে। আইন অনুযায়ী ভোটের দুই মাস আগেই হবে তফসিল ঘোষণা।
গণতান্ত্রিক কাঠামো বিনির্মাণের কাজটি অতটা মসৃণ নয়। সরকারকে এটি করতে হলে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। আমরা দেখেছি, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি হয়েছে। মব সৃষ্টি করে যেখানে-সেখানে মানুষকে মেরে ফেলা হয়েছে। পুলিশের মনোবল ভেঙে যাওয়ায় তারা তাদের স্বাভাবিক বা রুটিন কাজ ঠিকমতো করতে পারেনি। পুলিশকে এ অবস্থায় কাজে ফেরানো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এ অবস্থার অনেকটা উত্তরণ ঘটেছে, তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সরকারকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী হতে হবে। আরেকটা বিষয় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে; তা হলো সারা দেশে চাঁদাবাজি, দখলবাজি উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এখন অনেক দলের নেতা-কর্মীরা সেই কাজ করে চলেছেন। উন্নত গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রাখতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে সংস্কার হওয়া জরুরি। তা না হলে জনগণ যে উদ্দেশ্য নিয়ে আগের সরকারকে বিদায় করেছে, তা সাফল্যের মুখ দেখবে না।
গত ৫ আগস্ট সারা দেশে উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের বার্ষিকী উদ্যাপিত হয়েছে। যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে এত বড় একটি পরিবর্তন এল, সে ক্ষেত্রে দেশকে এ সরকার কতটা দিতে পেরেছে, এটাই মুখ্য বিষয়। কর্তৃত্ববাদী সরকার পতন-পরবর্তী এক বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি শীর্ষক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় যে তথ্য উঠে এসেছে, তা আশাব্যঞ্জক নয়। জনপ্রত্যাশার আলোকে অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে ঐকমত্য কমিশন গঠন করে। আমরা লক্ষ করেছি, ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে সংস্কার বিষয়ে বৈঠক করেছে। বৈঠকে সংস্কারের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিতেও দেখা গেছে। এ ক্ষেত্রে কমিশনকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনেকটা কঠিন অবস্থায় পড়তে হয়েছে বা হচ্ছে।
তবে কমিশন তাদের বৈঠক অব্যাহত রেখেছে। অচিরেই রাজনৈতিক দলগুলো কমিশনকে সহযোগিতা করে সরকারের নেওয়া উদ্যোগ সফল করবে। আরেকটি বিষয় গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করা গেছে, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম কার্যালয় মব সহিংসতার মাধ্যমে দখল হয়েছে। বেশ কিছু সাংবাদিককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। আমরা আগেও দেখেছি কর্তৃত্ববাদী সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সাইবার নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগ করে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করেছে। এটা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য চরম হুমকি বলে মনে করি। এটাও লক্ষ করা গেছে, ৫ আগস্ট-পরবর্তী প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গেও বিভিন্ন কারণে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কৌশলগত কারণে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলাই উত্তম। দুর্নীতিমুক্ত জবাবদিহিমূলক সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছিল, তা আলোর মুখ দেখেনি। তবে অচিরেই সরকার একটি সুষ্ঠু, সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে জাতিকে সঠিক পথনির্দেশনা দেবে। দেশের সংকটকালীন রাজনৈতিক দলগুলোকে সরকারের পাশে থেকে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগোতে হবে।