সিসা একটি বিষাক্ত ভারী ধাতু। এ ধাতু নীরবে লাখো মানুষের, বিশেষ করে শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে চলেছে। রাজধানী ঢাকার বস্তির শিশুদের দেহে বিপজ্জনক মাত্রার বিষাক্ত নীরব ধাতু সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এ শিশুদের ৯৮ শতাংশের দেহে প্রতি ডেসিলিটার রক্তে ৬৭ মাইক্রোগ্রাম সিসা শনাক্ত করা হয়েছে। গত বুধবার রাজধানীর মহাখালীতে ‘বাংলাদেশে সিসাদূষণ প্রতিরোধ: অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ' শীর্ষক এক আলোচনা সভার আয়োজন করে আইসিডিডিআরবি। এ সভার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের সিসাদূষণের ব্যাপকতা এবং এর ভয়াবহতা তুলে ধরা। কীভাবে এ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব সে নির্দেশনা দেওয়া।
আলোচনা সভায় উপস্থাপিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ঢাকার বস্তি এলাকায় দুই বছরের কম বয়সী ৮৭ শতাংশ শিশুর রক্তের প্রতি লিটারে সিসার মাত্রা ৫০ মাইক্রোগ্রামের বেশি ছিল। এ মাত্রা তাদের শারীরিক বৃদ্ধির প্রতিবন্ধকতার একটি প্রধান কারণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিসাদূষণ বাংলাদেশের একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা, যা প্রায়ই আমাদের নজর এড়িয়ে যায়। বিশেষ করে দূষণ সৃষ্টিকারী শিল্পকারখানার আশপাশের শিশুরা এর বড় শিকার। সিসা শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। এতে বুদ্ধিমত্তা ও শেখার ক্ষমতা কমে যায়।
পরবর্তী প্রজন্মের ওপর স্থায়ী প্রভাব ফেলে। আমরা নিশ্বাসের সঙ্গে যে বাতাস নিই, যে খাবার খাই, দূষিত মাটি বা ধূলিকণা স্পর্শ করি, এমনকি গর্ভাবস্থায় মায়ের প্লাসেন্টা থেকেও সিসা শরীরে প্রবেশ করে। এ রকম নানাভাবে সিসা আমাদের শরীরে প্রবেশ করে বলে এর মূল উৎসগুলো বন্ধ করা জরুরি।
২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাজধানী ঢাকার দুই অংশে গবেষণা পরিচালনা করা হয়। আইসিডিডিআরবির সহকারী বিজ্ঞানী জেসমিন সুলতানা বলেন, এ গবেষণায় দুই থেকে চার বছর বয়সী ৫০০ জন শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তিনি জানান, প্রতিটি শিশুর রক্তেই মধ্যম মাত্রার ৬৭ মাইক্রোগ্রাম সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গবেষণায় সিসা পোড়ানো, রিসাইক্লিং, ভাঙা- এসব কর্মকাণ্ড যেখানে হয়, সেসব এলাকার শিশুদের মধ্যে সিসায় আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি।
গবেষণায় চিহ্নিত সিসানির্ভর শিল্প স্থাপনার এক কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী শিশুদের রক্তের সিসার মাত্রা ছিল ৫ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে বসবাসকারী শিশুদের তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেশি। সিসার অন্য উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে ঘরের ভেতরে ধূমপান, দূষিত ধূলিকণা, সিসাযুক্ত প্রসাধনসামগ্রী ও রান্নার পাত্র।
সিসাদূষণ নিয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘ ২২ বছর ধরে কাজ করছেন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিনের (সংক্রামক রোগ) অধ্যাপক স্টিভ লুবি। তিনি গবেষণার ফলাফল প্রকাশের অনুষ্ঠানে সিসাদূষণের ক্ষতি নিয়ে বক্তব্য দেন। স্টিভ লুবি বলেন, বিশ্বে প্রতিবছর ৫০ লাখ মানুষ হৃদযন্ত্রের নানা রোগে (কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ) ভুগে অকালে মারা যায়। এর পেছনে সিসার একটা ভূমিকা আছে। শুধু তাই নয়, সিসা পরিপাকতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে, মনোযোগ কমায়, স্মৃতিশক্তি নষ্ট করে এবং বিষণ্নতা বাড়ায়। যে শিশুর দেহে যত বেশি সিসা, তার চিন্তা করার ক্ষমতা তত কম। কারণ এটি ব্রেন সেলকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সিসাদূষণ ঘটতে পারে শ্বাস-প্রশ্বাসের সময়, খাদ্য গ্রহণের সময়, ত্বকের ভেতর দিয়ে। তিনি বলেন, এ থেকে মুক্তি পেতে হলে সিসামুক্ত প্রযুক্তির আশ্রয় নিতে হবে।
শিশুরাই আমাদের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। সিসা আমাদের সমাজের শিশুদের সুন্দর সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ কেড়ে নিচ্ছে। প্রত্যেক শিশু যাতে সুস্থ, কর্মক্ষম এবং বুদ্ধিমান হয়ে বেড়ে উঠতে পারে, সে জন্য আমাদের সুন্দর পরিবেশ গড়ে দিতে হবে। সরকারকে এ ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। যেসব কারখানা বা স্থাপনায় সিসা গলানো বা পোড়ানো হয়, সেগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সিসাদূষণ নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। সরকার শিশুর বাসযোগ্য পৃথিবী গড়তে আরও সচেষ্ট হবে, এটাই প্রত্যাশা।