গাজায় ইসরায়েলের দুঃসহ অমানবিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই গাজা দখলে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে ইসরায়েল। গত শুক্রবার এই অনুমোদন দিয়েছে দেশটির নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রিসভা। ইসরায়েলের এই পদক্ষেপে বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় উঠেছে। ইসরায়েলের পশ্চিমা মিত্ররাও এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করছে। বিশ্বনেতারা ইসরাইয়েলের গাজা দখলের পরিকল্পনা বাদ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘ, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশ এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বলেছে, ইসরায়েলের গাজা দখলের কাজটি হবে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি। বর্তমানে সেখানে যে অমানবিক সংকট চলছে তা আরও তীব্র হবে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনের প্রধান ভলকার টুর্ক বলেছেন, অধিকৃত গাজা উপত্যকা দখলের ইসরায়েলি পরিকল্পনা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। এটি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায়ের পরিপন্থি। ইসরায়েলি সরকারকে এই পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। তিনি বলেছেন, এই পদক্ষেপ ইসরায়েল-ফিলিস্তিনি সংঘাতের অবসান ঘটাতে পারবে না। সংঘাত শুধু রক্তপাত ডেকে আনবে। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং ইসরায়েলের প্রতি একই আহ্বান জানিয়েছেন। চীন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ইসরায়েলকে তাৎক্ষণিকভাবে বিপজ্জনক এই পদক্ষেপ থেকে সরে আসার কথা বলেছে। তুরস্কও একই প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। দেশটি আরও এগিয়ে আন্তর্জাতিক মহলকে এই পরিকল্পনা আটকে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মূল উদ্বেগ হচ্ছে, ইসরায়েল গাজা দখল করলে গাজার মানবিক সংকট আরও গভীর হবে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এই দিকটির প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন, এই অমানবিকতা গাজাবাসী এবং হামাসের হাতে জিম্মি দুই তরফেই ঘটবে। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি বলেছেন, ইসরায়েলের গাজা দখল গাজার মানবিক বিপর্যয়কে আরও ভয়াবহ করে তুলবে। চীন বলেছে গাজা ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ড। সেখানকার চলমান মানবিক বিপর্যয় রোধ করা আর জিম্মি মুক্তির সঠিক পথ হলো তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি।
শুধু বহির্বিশ্ব নয়, খোদ ইসরায়েলের মধ্যে এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি উঠেছে। উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব। ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার ল্যাপিড বলেছেন, গাজা দখলের সিদ্ধান্ত ইসরায়েলকে আরও বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাবে। এতে হামাসের হাতে জিম্মি ইসরায়েলিদের মৃত্যু হবে আর অনেক ইসরায়েলি সৈনিক নিহত হবে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু উগ্র জাতীয়তাবাদীদের চাপে গাজা দখলের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর একজন শীর্ষ কর্মকর্তাও এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। তিনি নেতানিয়াহুকে সতর্ক করে বলেছেন, এতে হামাসের কাছে এখনো জিম্মি ২০ জন ইসরায়েলি, যাদের জীবিত বলে মনে করা হচ্ছে, তাদের জীবনকে আরও বিপন্ন করে তুলবে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক মহাপরিচালক অ্যালন লিয়েল শঙ্কা প্রকাশ করেছেন, বিভিন্ন দেশ যখন ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিচ্ছে, ইসরায়েল সেখানে উল্টো পথে হাঁটছে। পুরো বিশ্বকে সে উপেক্ষা করছে। গাজা দখলের ঘটনা ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিকভাবে তাই সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে।
এ সমস্যার তাহলে সমাধান কী? বিভিন্ন দেশ সমস্যা সমাধানের দুটি দিকের কথা বলেছে। প্রথমত, এখনই ইসরায়েলকে গাজা দখলের পরিকল্পনা বাদ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। আমরাও মনে করি, অবৈধ দখলদারত্বের মধ্য দিয়ে গাজায় ইসরায়েল যে অবর্ণনীয় মানবিক সংকটের সৃষ্টি করেছে, তা থেকে তাকে সরে আসতে হবে। দিনের পর দিন ফিলিস্তিনিদের ওপর যে অত্যাচার-নির্যাতন চালানো হচ্ছে, তাও গ্রহণযোগ্য নয়।
সংঘাত থামিয়ে যুদ্ধবিরতিই এই সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান। তবে স্থায়ী সমাধান খুঁজতে হবে দ্বিরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মধ্যে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে ইসরায়েলের প্রতি সহানুভূতিশীল দেশগুলো যেভাবে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে দ্বিরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা স্থায়ী সমাধান আনতে পারে। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, ইসরায়েল হয়তো এভাবে সংকটের সমাধান চাইছে না।
ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে দখলে রাখা আর এরই ধারাবাহিকতায় ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়াই হচ্ছে ইসরায়েলের লক্ষ্য। সেই পরিকল্পনা থেকেই গাজা দখলের পরিকল্পনা করেছেন নেতানিয়াহু। কিন্তু এতে বহু ফিলিস্তিনির প্রাণহানি ঘটবে। সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী আর মানবিক বিপর্যয় তীব্র হবে। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাও নষ্ট হতে পারে। আমরা তাই ইসরায়েলের গাজা দখল পরিকল্পনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। সেই সঙ্গে সমকালীন বিশ্বের আসন্ন নারকীয় ঘটনা ঘটার আগে বিশ্ববাসীকে তা রুখে দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।