নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বড় সম্ভাবনা এখন সৌরবিদ্যুৎ। বিশ্বজুড়ে বাড়ছে এই জ্বালানির ব্যবহার। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ-সংকট বেড়ে যাওয়ায় দিনে দিনে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছে। চলতি বাজেটেও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে ছাড় দেওয়া হয়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্ট এবং অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্ভাবনা থাকলেও উচ্চ হারে আমদানি শুল্ক, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত জায়গার অভাব, দুর্বল বিতরণব্যবস্থার কারণে সৌরবিদ্যুৎ খাতের ব্যবসা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এ ছাড়া দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা, ঋণ প্রাপ্তিতে জটিলতা, নীতিনির্ধারণের অভাবও সৌরবিদ্যুৎ খাতের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। স্থানের অভাবে ভাসমান সৌর প্যানেলের সমস্যাও এ খাতের জন্য বাধা। সম্ভাবনা থাকলে উচ্চ আমদানি শুল্কের কারণে সৌরবিদ্যুতের প্রসার হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ খাতে গড়ে ৩৭ থেকে ৫৬ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ককর দিতে হয়। তবে বিশ্ববাজারে সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রপাতির দাম কমে আসছে। এতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন খরচও কমতে পারে। অসাধু ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে দাম বাড়িয়ে দেয়।
আবার সৌর প্যানেল এবং সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামাদি স্থাপন করা বেশ ব্যয়বহুল। এ খাতের বিনিয়োগের জন্য এটি একটি বড় বাধা। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাও রয়েছে এ খাতে। সৌর প্যানেলের কর্মক্ষমতা আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। মেঘলা আকাশ বা বৃষ্টির দিনে বিদ্যুতের উৎপাদন কমে যায়। এ ছাড়া সৌর প্যানেলের কার্যকারিতা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হ্রাস পায়। নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ প্রসারের জন্য সরকারের সুস্পষ্ট নীতিমালা ও প্রণোদনার অভাব রয়েছে।
ভাসমান সৌর প্যানেলের ক্ষেত্রেও কিছু সমস্যা রয়েছে। যেমন- পানির গুণগত মান, প্যানেলের স্থায়িত্ব এবং রক্ষণাবেক্ষণের মতো বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হয়। সোলার প্যানেলের বড় অংশ এখনো আমদানিনির্ভর। দেশেও সীমিত পরিসরে সোলার প্যানেল তৈরি হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব সবুজ জ্বালানি হিসেবে দুনিয়াজুড়ে এর ব্যবহার বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনতে সৌরবিদ্যুৎ বড় ভরসা হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাসাবাড়ি, অফিস, কারখানায় সৌরবিদ্যুতের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। নিয়মিত খরচ কমাতে অনেকে এখন সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ঝুঁকছেন। দেশে তাই সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রপাতি তৈরি করছে কেউ কেউ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে নিম্নমানের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি বিক্রি হচ্ছে বলেও অভিযোগ আছে। বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা আছে। এ ক্ষেত্রে জমির স্বল্পতা একটি বড় সমস্যা। অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হলেও জমির স্বল্পতা নির্ধারিত সময়ে এসব কেন্দ্র কাজ শুরু করতে পারেনি। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দেশের সৌরবিদ্যুৎ খাতের চলমান সমস্যার সমাধান করতে পারলে এ খাত বহুদূর এগিয়ে যাবে।
সবুজ জ্বালানি থেকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাংলাদেশে খুব ধীরগতিতে এগিয়ে চলেছে। এ খাতের প্রতি আন্তরিক হতে হবে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন খবরের কাগজকে বলেন, দেশে বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়াতে সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এ খাতের যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক কমাতে হবে। ঋণপত্র খোলা এবং বিশেষ ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।
দেশে সৌরবিদ্যুৎ একটি উচ্চ সম্ভাবনাময় খাত। বিদ্যুতের ওপর চাপ কমাতে সৌরবিদ্যুৎ বা সোলার প্যানেল পদ্ধতি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হচ্ছে। বাংলাদেশও দিনে দিনে এর চাহিদা বাড়ছে। তবে এর বিকাশের সঙ্গে রয়েছে নানা বাধা। সরঞ্জাম আমদানিতে উচ্চ শুল্ক, যা এর বিকাশে অন্তরায় হয়ে দেখা দিয়েছে। এ বাধা দূর করতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সরকারের স্পষ্ট নীতিমালা এবং প্রণোদনা থাকতে হবে। ঋণ-প্রক্রিয়া সহজ করতে পদক্ষেপ নিতে হবে। আশা করছি, সরকার অচিরেই সৌরবিদ্যুৎ খাতকে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে অগ্রাধিকার দিয়ে সমস্যার সমাধানে পদক্ষেপ নেবে।