সড়ক-মহাসড়কে প্রতিদিনই বাড়ছে দুর্ঘটনা। কিছুতেই মৃত্যুর মিছিল থামছে না। সরকার দুর্ঘটনা রোধে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও সড়কে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। পদক্ষেপগুলো কার্যকর করার ক্ষেত্রে শৈথিল্য লক্ষ্য করা যায়। অধিকাংশ চালকই সড়কে গাড়ি চালানোর নিয়ম মেনে চলেন না। অনেক চালক ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত হয়ে একটানা দীর্ঘ সময় ঘুম ঘুম চোখে গাড়ি চালান। এতে করে সড়কে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বাসমালিকদের অত্যধিক ব্যবসায়িক মনোভাবের কারণে চালকরা নিয়ম মেনে চলতে পারেন না।
এ প্রবণতা রোধ করতে হলে সরকারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পরিসংখ্যান বলছে, গত জুলাইয়ের তুলনায় আগস্ট মাসে সড়ক দুর্ঘটনা কিছুটা কমলেও মৃত্যুর হার বেড়েছে ১০ শতাংশ। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, গত জুলাইয়ের তুলনায় আগস্ট মাসে দুর্ঘটনার হার বেড়েছে ১ দশমিক ৮০ শতাংশ; মৃত্যুর হার বেড়েছে ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ। পরিসংখ্যান বলছে, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনার শিকার হয় মোটরসাইকেল। গত জুলাই-আগস্টে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান দুর্ঘটনার হারও সমানতালে বেড়েছে, যা মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার প্রায় সমান। গত দুই মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় নিরীহ পথচারীদের প্রাণহানির ঘটনাও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। দুর্ঘটনা রোধে সময়োপযোগী সড়ক পরিবহন আইন করা হয়েছে। কিন্তু এর যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিআরটিএর পরিসংখ্যান মতে, গত আগস্টে সড়কে ৪১৭টি দুর্ঘটনায় ৪১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১১৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১১৯ জনের মৃত্যু হয়। শতকরা হিসাবে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ১৯ দশমিক ০৪ শতাংশ। গত আগস্টে দুর্ঘটনার দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান দুর্ঘটনার হার। পরিসংখ্যান মতে, আগস্টে ১২২টি ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান দুর্ঘটনায় ২৯ জন মারা গেছেন। শতকরা হিসেবে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান দুর্ঘটনার হার ১৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। বিআরটিএর পরিসংখ্যান মতে, গত জুলাইয়ে ১৩৩ ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান দুর্ঘটনায় ৪৮ জন মারা যান।
বিআরটিএ এবং হাইওয়ে পুলিশের মাথাব্যথার বড় কারণ, সড়কের থ্রি-হুইলার এবং ব্যাটারিচালিত নানা যানবাহনের দৌরাত্ম্য। বিআরটিএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়কে এসব যানবাহনের কারণে দুর্ঘটনার হার বেড়েছে। বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ বলছে, ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। চালকদের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। নজরদারি ও তদারকি কার্যক্রম বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, পেশাগত সুযোগ-সুবিধা বিশেষ করে নিয়োগপত্র বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকার কারণে যানবাহনের অধিকাংশ চালক শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ। তারা সবসময় অস্বাভাবিক আচরণ করেন এবং বেপরোয়াভাবে যানবাহন চালান। এর ফলে দুর্ঘটনা বেশি হয়। সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে হলে পরিবহনশ্রমিকদের পেশাগত
সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
সড়ক-মহাসড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিতে এবং দুর্ঘটনা রোধে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সড়ক-মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে পরিবহন আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রশিক্ষিত চালক তৈরির জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। সড়ক থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ বাসগুলো সরিয়ে উন্নত মানের বাস সার্ভিস চালু করতে হবে। পরিবহন মালিকরা শ্রমিকদের পেশাগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করবেন। দুর্ঘটনায় প্রতিদিনই তাজাপ্রাণ ঝরে পড়ছে। এ ধরনের মৃত্যুর মিছিল আর দেখতে চাই না। আশা করছি, সরকার নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতে আধুনিক, টেকসই ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সক্ষম হবে।