রাজধানীতে ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল একটি মারাত্মক সমস্যা। নগরীর বিভিন্ন অলিগলি এবং ব্যস্ততম সড়কে যত্রতত্র এমন ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল দেখা যায়। পথচারীদের চলাচলে বিপজ্জনক মরণ ফাঁদ এটি। পথচারীদের প্রায়ই দুর্ঘটনায় পড়তে হচ্ছে। এমনকি মৃত্যুও ঘটছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরের ম্যানহোলের ঢাকনা চুরির ঘটনা এখন প্রতিদিনের বাস্তবতা। চোর চক্রের প্রথম লক্ষ্য থাকে নতুন নির্মিত লোহার ঢাকনা।
লাগাতার চুরি বাড়ায় সড়কে নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে। এর ভুক্তভোগী একদিকে যেমন পথচারী অন্যদিকে যানবাহন ও চালকরাও। ঢাকনাবিহীন ম্যানহোলের উপচেপড়া নর্দমার পানিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ, বাড়ছে মশা। এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলাকে দায়ী করা হচ্ছে। ঢাকনাবিহীন ম্যানহোলগুলো সংস্কার করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্থার গাফিলতি ও সমন্বয়হীনতার অভাব লক্ষ্য করা গেছে।
ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা রোধে জরুরি ভিত্তিতে সব ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল ঢেকে দিতে, সুরক্ষাবেষ্টনী নির্মাণ ও স্পষ্ট সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপনের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এরপরও কর্তৃপক্ষের কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। রাজধানীর ম্যানহোল ও স্যুয়ারেজ লাইনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসা এবং উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের। বাস্তবে দেখা যায়, দুর্ঘটনা ঘটলে কোনো প্রতিষ্ঠানই দায়িত্ব নিতে চায় না। একে অপরের ওপর দায় চাপিয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ করার চেষ্টা করে।
তথ্যমতে, ঢাকা ওয়াসার নিয়ন্ত্রণে থাকা ম্যানহোলের সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দেড় হাজারের বেশি গভীর ও অগভীর ড্রেন রয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার ম্যানহোল। ঢাকা ওয়াসার গভীর ড্রেনের দৈর্ঘ্য ৩৪৬ কিলোমিটার আর উত্তর সিটির ড্রেনের দৈর্ঘ্য প্রায় ২ হাজার ৬০০ কিলোমিটার। এসব ড্রেনের ওপরে ম্যানহোলগুলোর অন্তত ১০ শতাংশ বর্তমানে ঢাকাবিহীন। এ ঢাকনাবিহীন ম্যানহোলের কারণে ঝুঁকিতে রয়েছে নগরবাসী।
টানা বৃষ্টির ফলে বিভিন্ন সড়কে পানি জমে তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। তখন ফুটপাতে বা সড়কে কোথায় ম্যানহোল তা বোঝার উপায় থাকে না। এতে প্রতিনিয়তই দুর্ঘটনায় পড়তে হয় পথচারীদের। খবরের কাগজের তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে খোলা ম্যানহোলে পড়ে প্রাণ গেছে অন্তত ৩০ জনের। এর মধ্যে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় মারা গেছেন ১২ জন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশুও রয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান খবরের কাগজকে বলেন, নগরীতে ম্যানহোলের ঢাকনা উন্মুক্ত থাকায় শিশু, বৃদ্ধসহ অনেকেই মারা গেছেন। কর্তৃপক্ষ এ ইস্যুকে গুরুত্ব দেয়নি। যারা ঢাকনা চুরি করে এবং যেখানে বিক্রি করে সেই স্পটগুলো চিহ্নিত করে রাখা দরকার। আবার লোহার বদলে বিকল্প কিছু চিন্তা করা প্রয়োজন, যাতে চুরি কম হয়। সিটি করপোরেশনসহ অন্য সংস্থাগুলোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক এবং প্রতিটি অলিগলির বাড়িওয়ালাদের সংযুক্ত করে সচেতন করতে হবে।
এ জন্য সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন। ঢাকনা নির্মাণে টেকসই কংক্রিট ও আধুনিক প্রযুক্তির প্লাস্টিক ফাইবার ব্যবহার করা যেতে পারে। চুরির মালামাল ভাঙারি ব্যবসায়ীরা যাতে না কিনতে পারে সে জন্য কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনকে এ ব্যাপারে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। জনসচেতনতা বাড়াতে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আশা করছি, কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বিবেচনায় নিতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে।