একটা আপ্তবাক্য আমরা প্রায়ই শুনে থাকি; ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড’। কিন্তু এ মেরুদণ্ড উন্নত রাখতে যারা সহায়তা করে থাকেন, সেই শিক্ষকরা অনেক ক্ষেত্রেই বঞ্চনা ও বিড়ম্বনার শিকার হন। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যারা কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন, তারাও এ থেকে মুক্ত থাকতে পারেন না। এর প্রভাবে তাদেরও বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ রকমই বিড়ম্বিত হওয়ার একটা সংবাদ খবরের কাগজে ‘স্বস্তির বদলে কান্না’ শিরোনামে শীর্ষ সংবাদ হয়েছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তহবিলসংকটের কারণে আটকে আছে অবসরে যাওয়া বেসরকারি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর অবসর ভাতা। এ ভাতা পাওয়ার মাধ্যমে অবসরজীবনে তাদের যেখানে স্বস্তিতে থাকার কথা, সেখানে অবসরের পর প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা পেতে তারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। স্বস্তির বদলে কান্নাই হয়ে উঠেছে নিত্যসঙ্গী।
‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড’ থেকে এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসরকালীন ভাতা দেওয়া হয়। এই বোর্ডেই প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষকরা তাদের অবসরের পর প্রাপ্য অর্থের জন্য ধরনা দিচ্ছেন। আবেদনের খোঁজখবর নিতে আসছেন। ফাইল নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ওই দপ্তরের বিভিন্ন কক্ষে ঘুরছেন আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ফিরে যাচ্ছেন চরম হতাশা নিয়ে।
আমাদের দেশে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা থেকে শুরু করে সবকিছুতেই সুযোগ-সুবিধা কম। একে তো তারা এভাবে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন সারা জীবন, এর ওপর পেনশনের টাকাও পাচ্ছেন সরকারি শিক্ষকদের তুলনায় অনেক বিলম্বে। চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন তারা। দিনের পর দিন অবসরকালীন ভাতা বোর্ডে এসে ঘুর ঘুর করছেন। অনেকের অবসরের পর চার বছর পর্যন্ত কেটে গেছে, তবু ভাতার টাকা মিলছে না। অর্থসংকটে সংসারেও হারাচ্ছেন সম্মান।
এ বয়সে, অর্থাৎ অবসরকালীন বয়সে এসব ধকল সহ্য করা কঠিন। আমাদের প্রতিবেদককে উল্লিখিত বোর্ডে নিজের ভাতার খোঁজ নিতে আসা একজন শিক্ষক তো কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেই ফেলেছেন, ‘লেখালেখি করেন, শিক্ষকদের কষ্ট যেন কমে।’ এই আকুতি নিঃসন্দেহে মর্মস্পর্শী। এ রকম হাজারও অবসরে যাওয়া শিক্ষক চরম অর্থকষ্টে আছেন এখন। অর্থকষ্ট থেকে মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছেন।
একটু ভাবলেই বোঝা যায়, এটাই স্বাভাবিক। একে তো অবসরজীবন, সেই অর্থে কোনো কাজ থাকে না। অবসরজীবনে কর্মহীন থাকার বিষয়টি আগে থেকেই জানা থাকে। এর জন্য একধরনের মানসিক প্রস্তুতিও থাকে। অর্থাভাবে চলার বিড়ম্বনা অসহনীয়। সে কথাই আমাদের প্রতিবেদককে বলেছেন কয়েকজন শিক্ষক। একে তো সারা জীবন তুলনামূলক কম বেতনে কাজ করে এসেছেন, এখন যদি অবসরের ভাতাটাও বিলম্বে পান, তাহলে তারা দাঁড়াবেন কোথায়? নিজের সংসারেও স্বস্তিতে নেই তারা। কীভাবে কাটাবেন অবশিষ্ট জীবন?
অবসর সুবিধা বোর্ডের কর্মকর্তা জানিয়েছেন আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা। সংকট পর্যাপ্ত তহবিলের। প্রতিষ্ঠানটি চেষ্টা করছে সর্বোচ্চ ফান্ড বা অর্থ পেতে। শিক্ষকদের কাছ থেকে পাওয়া আবেদনকে তারা অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করছেন। কিন্তু টাকার অভাবে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৬ হাজার কোটি টাকা হলেই অপেক্ষমাণ সব আবেদনের চাহিদা তারা মেটাতে পারতেন। কিন্তু সেই অর্থ তাদের নেই। সরকার বরাদ্দ দেয়নি। বাজেটে চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ অনেক কম। সরকারের দূরদর্শিতার অভাবে এ তহবিলসংকট চলছে।
সরকার নানা ক্ষেত্রে নানা উন্নয়নের নামে অর্থ ব্যয় করে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু মানবসম্পদ সৃষ্টিতে যারা বছরের পর বছর অবদান রেখে গেছেন, তাদের ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত রাখা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সরকারের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্পূর্ণ তহবিল সৃষ্টি করে তাদের পাওনা মিটিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।
শিক্ষা উপদেষ্টা নিজেই একজন শিক্ষক; সরকার ও তিনি নিশ্চয়ই বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ভাতাসংক্রান্ত বিষয়ে এভাবে নিগৃহীত হওয়ার বিষয়টি অনুধাবন করবেন। সরকারের প্রয়োজন হলো, তহবিল তৈরি করে তাদের পাওনা টাকা পরিশোধ করা। সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে আমরা আশা করছি।