রাষ্ট্র পরিচালনার তিনটি বিভাগের একটি শাসন বিভাগ। এ শাসন বিভাগের অধীন হচ্ছে প্রশাসন। এটি বাংলাদেশে ক্ষমতাচর্চার অন্যতম শীর্ষ কেন্দ্র। এ প্রশাসনেই এখন চলছে অস্থিরতা। চলছে একধরনের নৈরাজ্য। ক্ষমতাপ্রত্যাশী দুই দলের চাপে প্রশাসনের চিড়েচ্যাপ্টা অবস্থা। এতে স্থবির হয়ে পড়েছে সামগ্রিক প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড। বাধাটা আপাতদৃষ্টিতে অদৃশ্য, কিন্তু এতে ব্যাঘাত ঘটছে নৈমিত্তিক কাজে। প্রশাসন সুস্থির হয়ে কাজ করতে পারছে না। সমস্যা এতটাই গভীর যে, পদোন্নতি ও পদায়নের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা ‘জনপ্রশাসনবিষয়ক কমিটি’র সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে পারছেন না। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে নানা বাধার মুখে পড়ছে। এ বাধা আসছে ক্ষমতাপ্রত্যাশী দুটি দলের কাছ থেকে। আসন্ন নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করাকে কেন্দ্র করে এ দুই দলের মধ্যে প্রশাসনিক বিষয়ে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। প্রশাসনসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞরা মনে করছেন, আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল নিজেদের লোকজনকে পছন্দমতো জায়গায় বসাতে একধরনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে। এ কারণেই প্রশাসনের নৈমিত্তিক কাজে গতি আসছে না। গতকাল খবরের কাগজে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে প্রশাসনিক এ ত্রিশঙ্কু অবস্থার কথা।
প্রশাসন বিভাগের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে আমাদের প্রতিবেদক জানতে পেরেছেন, প্রচণ্ড রাজনৈতিক চাপে পড়েছে প্রশাসনিক ‘চেইন অব কমান্ড’। এই চেইন অব কমান্ড প্রশাসনের উঁচু স্তর থেকে নিচু পর্যন্ত প্রয়োজনীয় শৃঙ্খলা বজায় রেখে প্রশাসনিক কাজ করে থাকে। প্রশাসনের সব স্তরে ক্ষমতার চর্চা এভাবেই উঁচু থেকে নিচু পর্যন্ত বিস্তৃত। কিন্তু এ কাঠামোই এখন ভেঙে পড়ছে। নিজেদের প্রভাববলয় তৈরির জন্য দুটি রাজনৈতিক দল প্রশাসনে ‘নিজেদের লোক’ বসাচ্ছে। কোন রাজনৈতিক দল কাকে কোন পদে বসাবে, তাই নিয়ে চলছে দ্বন্দ্ব। দুই দলই নির্বাচনে ভূমিকা রাখতে পারে সে রকম জায়গায় নিজেদের লোক বসাতে যাচ্ছে। এ কারণেই প্রশাসনে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা, সিদ্ধান্তহীনতা ও নৈরাজ্য।
প্রশাসন সব ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কাজ করবে, এটাই নিয়ম। কিন্তু তারা তা করতে পারছে না। শঙ্কার মধ্যে আছে। দুই দলের দ্বিমুখী টানাপোড়েনের মধ্যে তারা সতর্ক হয়ে চলার নীতি গ্রহণ করেছে। এ সতর্কতা হচ্ছে, কোন দল নির্বাচনে জয়ী হবে, কর্মকর্তারা তা বোঝার চেষ্টা করছেন। সে অনুযায়ী নিজেদের কর্মকৌশল নির্ধারণ করছেন। এতেই প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে।
পূর্বঘোষণা অনুসারে আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, সম্ভাব্য সরকার গঠন বা রাষ্ট্রক্ষমতার সমীকরণ নিয়ে ততই দ্বন্দ্ব দেখা দিচ্ছে। নিজস্ব প্রভাববলয় সৃষ্টির জন্য দুই দলই অনমনীয় অবস্থান নিয়েছে। নির্বাচনি ব্যবস্থাপনায় প্রশাসন বিভাগ বেশ গুরুত্ব বহন করে থাকে। নির্বাচনের আগে তাই ক্ষমতাপ্রত্যাশী বড় দুটি রাজনৈতিক দল বিভিন্ন দপ্তর, জেলা-উপজেলায় নিজেদের লোক বসিয়ে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালাচ্ছে। মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ পদ জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে পছন্দের লোকদের নিয়োগ, নিয়োগ-বিতর্ক ও অপপ্রচার। সচিবদের পদ শূন্য হওয়া আর পদায়ন নিয়ে চলেছে তুঘলকি কাণ্ড। দুই দলের টানাপোড়েনের চাপে খুবই গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রশাসন সচিবের শূন্য পদে ২১ দিন পর নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়। ধর্ম মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, পরিকল্পনা বিভাগ ও সমবায় বিভাগ সচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ চারটি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কাউকে নিয়োগ দিতে গেলে কোনো না কোনো পক্ষের বাধার মুখে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগ দিয়েও তারা সেই নিয়োগ কার্যকর করতে পারছেন না। সিদ্ধান্ত বদলাতে হচ্ছে। পদ-পদায়ন নিয়ে ভাগ-বাঁটোয়ারার ব্যাপার ঘটছে।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে ঘিরে দুটি রাজনৈতিক দলের দুটি অলিখিত সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। ফলে প্রশাসনে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা, স্থবিরতা, অসুস্থ প্রতিযোগিতা। রাষ্ট্র যেন এদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্র দল দুটিকে বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে, যা তারা রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য ব্যবহার করবে। বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে এটা নিঃসন্দেহে একটা বিস্ময়কর ঘটনা। আমরা মনে করি, অনতিবিলম্বে এ ভাগাভাগির পদায়ন বন্ধ হওয়া দরকার।
প্রধান উপদেষ্টা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। প্রশাসনে যদি এ অবস্থা চলতে থাকে, তা তার ভাবমূর্তির জন্যও ক্ষতিকর। এটি চলতে থাকলে ভবিষ্যতে নির্বাচনও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বেন। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে এখনই দেশের স্বার্থে প্রশাসনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ হওয়া দরকার। প্রশাসনকে গতিশীল ও স্বাভাবিক করার কোনো বিকল্প নেই। সরকারের এ দিকটির প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি।