দীর্ঘ ৮ মাস, ৭২টির বেশি বৈঠক, দফায় দফায় আলোচনা। অবশেষে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে গত পরশু দুপুরে হস্তান্তর করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। মুহাম্মদ ইউনূস ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি।
স্মরণ করা যেতে পারে, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কিছুদিন পর থেকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল জুলাই সনদ। সংস্কারের মাধ্যমে সুশাসন, গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি রোধ করার উদ্দেশ্যে অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমনের ব্যবস্থায় সংস্কারের সুপারিশ দেওয়ার জন্য ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করে। এই ছয় কমিশনের সুপারিশের বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার জন্য জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়।
অনেক জল্পনা-কল্পনা ও টানাপোড়েনের পর রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের লক্ষ্যে চূড়ান্তভাবে ৪৮ দফা সংস্কারের সুপারিশ তৈরি করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। কীভাবে এসব বাস্তবায়িত করা হবে, এবার বাস্তবায়নের সেই উপায় সম্পর্কে সুপারিশ করল ঐকমত্য কমিশন।
স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতে এবারই এত বড় গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব বা সুপারিশ প্রণয়ন করা হলো। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর জন-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে এই সংস্কার প্রস্তাব গত ৮ মাসে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে তৈরি করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন; যদিও সব ইস্যুতে এখনো দলগুলো একমত হতে পারেনি। এসব প্রস্তাব অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে অনুমোদনের পর অধ্যাদেশ জারি এবং পরে গণভোটের মাধ্যমে গৃহীত হওয়ার কথা রয়েছে।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের উপায়সংক্রান্ত সুপারিশ অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে হস্তান্তর করার পর এই সুপারিশ সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিভিন্ন দলের নেতারা। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এটা প্রতারণা। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ঐকমত্য কমিশন ও সরকারের কর্মকাণ্ডে হতাশা প্রকাশ করেছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এই সুপারিশকে দেখছে ইতিবাচকভাবে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেছেন, নির্বাচনের আগে গণভোটের আয়োজন অপ্রয়োজনীয়। এদিকে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে নভেম্বরেই গণভোট দেওয়াসহ পাঁচ
দাবিতে নতুন কর্মসূচি দিয়েছে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা জামায়াতসহ আট ইসলামপন্থি দল।
এই কর্মসূচি এবং নেতাদের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, এই সুপারিশ নিয়ে ঐকমত্য বলতে যা বোঝায় ঠিক তা হয়নি। দলগুলোর পৃথক অবস্থান রাজনীতিতে আবারও অস্থিরতা ও সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এরই মধ্যে গতকাল নির্বাচন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার বেশ কিছু আদেশ-নির্দেশ দিয়েছে এবং পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলেছে। ১৫ নভেম্বরের মধ্যে নির্বাচনি প্রস্তুতি শেষ করার তাগিদ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। ১ নভেম্বর থেকে নির্বাচনকালীন পদায়ন শুরু হবে। ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হবে আর ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে হতে পারে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন।
সরকারের উল্লিখিত পদক্ষেপগুলো ইতিবাচক। সরকার পূর্বঘোষিত সময়, অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তবে নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন দল নানা সময়ে সন্দেহ পোষণ করে আসছে। জনমনেও এই সন্দেহ সঞ্চারিত হয়েছে। গতকালও গণভোট না হলে জাতীয় নির্বাচন দেরিতে অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে সংশয় প্রকাশ করেছেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। নির্বাচন কবে অনুষ্ঠিত হবে প্রধান উপদেষ্টার বরাত দিয়ে প্রেস সচিব তা স্পষ্ট করেছেন।
এই মুহূর্তে দেশের মানুষ একটা নির্বাচনের অপেক্ষায় রয়েছেন। তারা একধরনের মানসিক প্রস্তুতিও নিয়ে ফেলেছেন বলে ধারণা করা যায়। ঘোষিত সময়ে নির্বাচন হলে দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে বলে বিশেষজ্ঞরা নানা সময়ে অভিমত দিয়েছেন।
নির্বাচনের এই ট্রেনটিকে মসৃণ গতিতে গন্তব্যের শেষ স্টেশনে পৌঁছানোর জন্য সরকার পুরোপুরি মনোযোগী হবে বলে আমরা আশা করি। যে জুলাই সনদের সুপারিশ ও বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল, তা কেটে গেছে। এর সুপারিশমালা এবং বাস্তবায়নের উপায়সংক্রান্ত রূপরেখাও পাওয়া গেছে। সরকারের জন্য এখন দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠানের যাবতীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন করা জরুরি। পূর্বঘোষিত সময়ে নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই।