প্রবন্ধ রচনা
সুপ্রিয় ২০২৪ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থী বন্ধুরা, শুভেচ্ছা নিও। আজ তোমাদের বাংলা দ্বিতীয় পত্র থেকে ‘মানবকল্যাণে বিজ্ঞান’ বিষয়ে ১টি ‘প্রবন্ধ রচনা’ নিয়ে আলোচনা করা হলো।
মানবকল্যাণে বিজ্ঞান/ দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান/ বিজ্ঞানের জয়যাত্রা/ বিজ্ঞানের অবদান
প্রারম্ভিকা: মানুষের অনুসন্ধিৎসু চোখের কাছে প্রকৃতির রহস্য আজ উন্মোচিত। মানুষ তার যুগ-যুগান্তরের স্বপ্ন ও সাধনার অনবদ্য ফসল দিয়ে প্রকৃতির বুকে সভ্যতার এই বিশাল ইমারত গড়ে তুলেছে। আপনার প্রাণশক্তি তিল তিল দান করে বুকের বিন্দু বিন্দু রক্ত ঢেলে দিয়ে সে রচনা করেছে সভ্যতার এই তিলোত্তমা মূর্তি। সে সভ্যতার বেদিমূলে দিয়েছে বাহুর বল, জীবনের স্বপ্ন কিন্তু কল্পনার পরিবর্তন ঘটিয়েছে বিজ্ঞান। ‘Man is the best of creature’ বুদ্ধিবৃত্তি আর চিন্তাশক্তি মানুষকে এই শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছে। জীবন আর বিজ্ঞান আজ ওতপ্রোতভাবে জড়িত থেকে মানব জীবনের কল্যাণে বিজ্ঞানের অবদানের অফুরন্ত উদাহরণ প্রতিনিয়ত প্রকাশ পেয়েছে। মানবসভ্যতার মূলে বিজ্ঞানের অবদান যে কত ব্যাপক, তা প্রতিদিনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা থেকে লক্ষ করা যায়। বিজ্ঞানের জয়যাত্রার শেষ নেই। বিজ্ঞান আজ মানবসভ্যতার এক নিত্যসঙ্গী। দৈনন্দিন জীবনে মানুষ বিজ্ঞানের কল্যাণে সমৃদ্ধ ও উপকৃত হচ্ছে। বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলেছেন-
‘Science is reality
Science is bangafide
Science is your constant friend
Science is always creative’
বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য: বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য ও ধারণা নিছক কল্পনাবিলাস নয়। একজন বিজ্ঞানী কোনো তত্ত্বকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম ও নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে অবশেষে সত্যে উপনীত হন। বিজ্ঞানের সাধনা যে নিছক নয় সে সম্পর্কে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলেছেন, ‘এক কেজি ভর বিশিষ্ট কোনো পদার্থকে এবং একটি এক পয়সার মুদ্রাকে একই উচ্চতা থেকে একসঙ্গে ছেড়ে দিলে এক কেজি ভর বিশিষ্ট পদার্থটি আগে মাটি স্পর্শ করবে কিন্তু একজন বিজ্ঞানীর কর্তব্য তা যাচাই করে দেখা।’ এইভাবে সত্যতা নির্ণয়ের নির্দেশনা দেয় বিজ্ঞান।
বিজ্ঞান কথাটির অর্থ: সাধারণভাবে বিজ্ঞান কথাটির অর্থ বলতে বিশেষ জ্ঞান বোঝায় যা অনুসন্ধিৎসু মানুষের বস্তুজগৎ সম্পর্কে ধারণা এবং বিচিত্র কৌশলে তার ওপর আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা থেকে বিশ্বের তাবৎ জিনিস আবিষ্কৃত হয়েছে। এসব আবিষ্কারের পেছনে আছে কার্যকর সূত্র আর এ ধরনের যুক্তিযুক্ত আবিষ্কারকেই বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার বলে অভিহিত করা যায়। বিজ্ঞানের এই আবিষ্কার ঘটেছে মানুষের প্রয়োজনে। মানুষের অভাববোধ থেকে। মানুষের যাত্রাপথের সঙ্গে তাই বিজ্ঞান জড়িত হয়ে আছে। মানবজীবনের বিচিত্র গতির নিয়ন্ত্রক হলো বিজ্ঞান। মানবসভ্যতার বিকাশের সহায়ক হিসেবে কাজ করে বিজ্ঞান। মানবসভ্যতার অগ্রগতির পেছনে শক্তি সঞ্চার করে বিজ্ঞান মানুষের জীবনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছে। যতই দিন যাচ্ছে মানুষের নিরন্তর প্রয়োজন মেটানোর জন্য বিজ্ঞান আরও সৃষ্টিমুখর হয়ে উঠেছে।
বর্তমান যুগ বিজ্ঞানের যুগ: মানুষ বিশ্বের বুকে যে দ্বিধাজড়িত পদক্ষেপকে বিজ্ঞানের অবদানের বদৌলতে সুদৃঢ় প্রতিষ্ঠিত করেছে, তা সভ্যতার বিকাশের পরিপ্রেক্ষিতে বিপুল সফলতা লাভ করেছে। দীর্ঘপথ পরিক্রমা শেষে মানুষ আজ যে যুগে উপনীত হয়েছে তাকে বিজ্ঞানের যুগ বলে অভিহিত করা যায়। মানুষ বেড়েছে, তার প্রয়োজনও ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। এই ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে মানুষ বিজ্ঞানের অজস্র আবিষ্কারকে নিজের প্রয়োজনে কাজে লাগিয়ে জীবনকে সুখকর করে তুলেছে। বিজ্ঞানকে নানাভাবে প্রয়োগ করে মানুষ তার সভ্যতা সমৃদ্ধ করেছে। আজকের সভ্য জগতে প্রতি মুহূর্তে বিজ্ঞানের ব্যবহার অবশ্যম্ভাবী। এখন বিজ্ঞান ছাড়া একটি মুহূর্তও চলে না। কারণ দৈনন্দিন জীবনে যা প্রয়োজন তা এখন বিজ্ঞানের অবদান থেকে লাভ করা যায়। সবকিছুতেই বিজ্ঞানের আধিপত্যের পরিপ্রেক্ষিতে এ যুগকে বিজ্ঞানের যুগ বলে নির্দেশ করা যায়।
বিজ্ঞানের সার্বজনীন স্পর্শ: বিজ্ঞান ছাড়া জীবন অসম্ভব। ধরুন না আমার এ লেখায় কষ্টটারই কথা। চেয়ার, টেবিল, দরজা-জানালা, লাইট, বৈদ্যুতিক পাখা, আমার হাতের কলম, লেখার কাগজ, কালি- সবকিছুতেই বিজ্ঞানের কী সুন্দর স্পর্শ! শুধু কি এই? জামা-কাপড়, জুতা মোজা এমনকি একটু আগে পান করা Soft drink পর্যন্ত বিজ্ঞানের ছোঁয়ায় ধন্য।
বিজ্ঞানের জয়যাত্রা: যুগ-যুগান্তরের স্বপ্ন ও সাধনা দিয়ে মানুষ আয়ত্ত করেছে বিজ্ঞানের ওপর প্রভুত্ব। তার অক্লান্ত কর্মসাধনার ক্রমপরিণতি হচ্ছে বিংশ শতাব্দীকে অতিক্রম করা একবিংশ শতাব্দীর সভ্যতা। মানবসভ্যতার এই তিলোত্তমা মূর্তি রচিত হয়েছে অনেক বিজ্ঞান গবেষকের ত্যাগ-তিতিক্ষা, ব্যর্থতার হা-হুতাশ ভেদ করে। বিজ্ঞানের বলে বলীয়ান মানুষ আজ খনির অন্ধকারে আলো জ্বেলেছে; ঘুম ভাঙিয়েছে পাতালপুরীর ঘুমন্ত রাজকন্যার, দৈত্যপুরের বন্দিশালা থেকে তাকে মুক্ত করে এনে তাকে নিজের পরিকল্পনা অনুসারে সাজিয়েছে। উদ্ভাবন করেছে বিজ্ঞানের নব নব কৌশল ও প্রকরণ। পৃথিবীর শৈশবের জড়তা কাটিয়ে এনে দিয়েছে যৌবনের অফুরন্ত কর্মশক্তি ও গতির উল্লাস। অন্যদিকে বিজ্ঞানের ঐন্দ্রজালিক শক্তিবলে মানুষ উদ্দাম উচ্ছৃঙ্খল নদীস্রোতকে বশীভূত করে উষর মরু প্রান্তরকে করেছে জলসিক্ত, চাষাবাদের উপযোগী। ভূগর্ভের সঞ্চিত শস্য সম্ভাবনাকে করে তুলেছে উজ্জ্বল। ধরণীর সর্বদেহে সঞ্চারিত করেছে অপূর্ণ প্রাণস্পন্দন। বিজ্ঞান আজ উর্বরতা দিয়ে ক্ষয়িষ্ণু বসুধাকে শস্যবতী করে তুলেছে। শিল্প-শৈলীর নব নব প্রবর্তনে সে উৎপাদন জগতে এনেছে যুগান্তর এবং সুদূরকে করেছে আমাদের নিকটতম।
বিজ্ঞানের দান: উনিশ এবং বিশ শতকে বিজ্ঞান নতুন শক্তি সঞ্চার করে এবং অভিনব আবিষ্কারের মাধ্যমে মানুষের জীবনে আমূল পরিবর্তন আনে। জেমস ওয়াটের স্টিম ইঞ্জিন আবিষ্কার মানবজাতির সম্মুখে উন্নততর সভ্যতার সূচনা করেছে। রোটারি, প্রেস, ফটো, অফসেট মেশিনের আবিষ্কারের ফলে মুদ্রণ জগতে এক অভাবনীয় উন্নতি সাধিত হয়েছে। রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের উড়োজাহাজ আবিষ্কার, ভেখ মলারের মোটরসাইকেল, ইগন মিগস্কির হেলিকপ্টার এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীর সাফল্যমণ্ডিত আবিষ্কার যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখেছে। আনবিক শক্তি, কম্পিউটার, রোবট ইত্যাদি আবিষ্কারের মাধ্যমে বিজ্ঞান মানুষের জীবনে অগ্রগতির ধারাকেই সূচিত করেছে।
দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান: বিজ্ঞানী মাদাম কুরি বলেছেন, আমার চোখে বিজ্ঞান অনিন্দ্যসুন্দর এবং আমরা সবাই এর সদস্য। প্রতিদিন প্রতিটি মানুষ সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠা এবং রাতে বিছানায় যাওয়ার আগ পর্যন্ত অকাতরভাবে বিজ্ঞানের দান গ্রহণ করছে। আমাদের অনেকেরই ঘুম ভাঙে ঘড়ির অ্যালার্ম শুনে। ঘুম থেকে উঠে দাঁতের মাজন, টুথপেস্ট, টুথব্রাশ তারপর হাতমুখ ধোয়ার জন্য শহরে ‘বেসিন শাওয়ার’ আর গ্রামে টিউবওয়েল, দেশ-বিদেশের খবরের জন্য সংবাদপত্র থাকে নাশতার টেবিলে। এ ছাড়া রেডিও, টেলিভিশন ইত্যাদি থেকে খবর জানা যায়। নাশতার টেবিলে থাকে স্টেইনলেস স্টিল, মেলামাইন, চিনামাটি ও কাঁচের তৈরি তৈজসপত্র। বাজারের জন্য ব্যাগ, পড়াশোনার জন্য বইখাতা কাগজ কলম। গৃহ সাজানোর জন্য ওয়াল ম্যাট, বিভিন্ন প্রকার গৃহসজ্জার সামগ্রী। রান্নার জন্য ইলেকট্রিক হিটার, ওভেন, প্রেশার কুকার, গ্যাসের চুলা ইত্যাদি জিনিস পাওয়া যাচ্ছে। বিনোদনের জন্য কম্পিউটার, ইন্টারনেট, মোবাইল, অনলাইন গেমস, টেলিভিশন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের জন্য এয়ার কন্ডিশন, খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণের জন্য ফ্রিজ, রেফ্রিজারেটর, চলাচলের জন্য অত্যাধুনিক যানবাহন, যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য টেলিগ্রাম, ফ্যাক্স, ইন্টারনেট, টেলিফোন, প্রভৃতি বিজ্ঞানিক উপকরণের ওপর মানুষকে নির্ভর করতে হয়। তাছাড়া বাড়িতে বা অফিসে সংকেত প্রদানের জন্য কলিংবেল ব্যবহার করা হয়। প্রতিক্ষেত্রে বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব লক্ষ করা যায়।
চিকিৎসাক্ষেত্রে বিজ্ঞান: একজন বিজ্ঞানী বলেছেন, ‘Our every share of life is attached to the gift of science’.. অর্থাৎ আমাদের জীবনের সব ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানের অবদান রয়েছে। তেমনি চিকিৎসা ক্ষেত্রেও বিজ্ঞানের অবদান রয়েছে। বিজ্ঞানীরা আজ চিকিৎসা ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়েছেন। আগে যেসব রোগে মানুষকে অকালমৃত্যুর হিমশীতল স্পর্শ অনুভব করতে হতো আজকাল সেসব রোগব্যাধির নিরাময়ের জন্য উন্নততর এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে। কঠিন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি ও আজ আরোগ্য লাভ করে নতুন আশার মন্ত্রে উজ্জীবিত হচ্ছে। দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিও আজ বাঁচার অধিকার রাখে। অধ্যাপক মাদাম কুরি ও পিয়েরে কুরির আবিষ্কৃত ‘রেডিয়াম’ ক্যানসার নিরাময়ে সহায়ক। আমাদের ব্যস্ততাময় জীবনের অসুস্থ মুহূর্তগুলো নিতান্তই কৃপাপ্রত্যাশী। বিজ্ঞান এখন মরণকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়। প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে মানুষ নিজ ইচ্ছামতো চেহারা তৈরি করছে। পেনিসিলিন আবিষ্কারের মাধ্যমে বিজ্ঞানের অগ্রগতি আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছে। অধ্যাপক রল্টগেট রঞ্জনের আবিষ্কৃত রঞ্জনরশ্মি বা এক্স-রে মানুষের দেহের ভেতরকে দৃশ্যমান করতে সক্ষম। কিডনি সংযোজন, ওপেন হার্ট সার্জারি, আল্ট্রাসনোগ্রাফি প্রভৃতি এখন চিকিৎসা ক্ষেত্রের অন্যতম সাফল্য। বর্তমানে বিজ্ঞানের নিত্য নতুন আবিষ্কারের ফলে মৃত্যুর হার অনেক কমে আসছে।
কৃষিক্ষেত্রে বিজ্ঞান: আমাদের খাদ্য সংস্থানের জন্য আমরা কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তাই কৃষি উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিনিয়ত পৃথিবীতে জনসংখ্যা বাড়ছে। এজন্য প্রয়োজন বাড়তি খাদ্য। আর সে কারণেই বিজ্ঞান কৃষিক্ষেত্রে প্রভূত অগ্রগতি সাধন করেছে। চাষাবাদের জন্য আবিষ্কৃত হয়েছে কলের লাঙল, পাওয়ার ট্রিলার, আগাছা নিড়ানির জন্য হস্তচালিত নিড়ানি, ধান কাটার কল হারভেস্টার, অধিক ফসল ফলানোর জন্য রাসায়নিক সার, কীটপতঙ্গ দমনে কীটনাশক ইত্যাদি বিজ্ঞানের অবদান। বিজ্ঞান কৃষি ক্ষেত্রে এনেছে বিপ্লব, শিল্পে অচিন্তনীয় সাফল্য। পারমাণবিক রিঅ্যাক্টরের সাহায্যে মরু অঞ্চলকে শস্য শ্যামল করে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এই রিঅ্যাক্টরের সুবিধা এই যে, একে বিমানযোগে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে গিয়ে চালান যায়। এই শক্তিকে কাজে জলাবদ্ধ ভূমির পানি নিষ্কাশন ও মরু অঞ্চলে পানি সেচ করে লাখ লাখ একর ভূমিকে কৃষিযোগ্য করা যায়। তাছাড়া শীতপ্রধান দেশে অধিক ফসল উৎপাদনের জন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ‘গ্রিন হাউস’ নামে এক বিশেষ ঘর ব্যবহার করা হয়।
শিক্ষা ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের অবদান: বিজ্ঞানের কল্যাণে পাঠ্যপুস্তক সহজলভ্য হয়েছে। লেখার লেখনী ও কাগজ, জ্ঞানার্জনের সংবাদপত্র ও পুস্তকরাশি সবকিছু্ই দিয়েছে এ বিজ্ঞান। ছাত্র সমাজের পরম বন্ধু বিজ্ঞান তাদের লেখার কাগজ বহন করে আনছে স্টিমারে, বই ছাপা হচ্ছে ছাপাখানার বিদ্যুতের সাহায্যে। ক্লাস ঘরে মাথার ওপরে ঘুরছে বৈদ্যুতিক পাখা। অন্ধ শিক্ষার্থীদের জন্য হয়েছে ব্রেইল পদ্ধতির আবিষ্কার। প্রতিবন্ধীদের জন্য বিজ্ঞান আবিষ্কার করেছে নানা ব্যবস্থা। ইন্টারনেটের কল্যাণে এখন ছাত্রছাত্রীরা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে না গিয়েও কম্পিউটারের মাধ্যমে অনলাইনে পড়ালেখা করতে পারছে। ঘরে বসেই মোবাইলে ও কম্পিউটারে মাস্টার মশাইয়ের বক্তব্য বা লেকচার শুনতে পারছে। টর্চ লাইট, বৈদ্যুতিক বাল্ব যেমন অন্ধকার থেকে মানুষকে আলোর পথে চলার পথ করে দিয়েছে তেমনি কাগজ, লেখনী ইত্যাদির আবিষ্কারের ফলে মানুষ অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে পেয়েছে মুক্তি ও আলোর পথনির্দেশ।
অবসর বিনোদনে ও আমোদ-প্রমোদে বিজ্ঞানের দান: শুধু কর্মকাণ্ডেই নয়, অবসর বিনোদনেও মানুষের একান্ত আপনজন বিজ্ঞান। জীবনকে সুখী ও সুন্দর করার কাজে বিজ্ঞান নানাভাবে সাহায্য করছে মানুষকে। বিচিত্র পণ্যের বিস্ময়কর সমাবেশ, সিনেমা, রেডিও, টেলিভিশন ইত্যাদি সমাজের চেহারাই বদলে দিচ্ছে। রেডিও আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর অবদান সিনেমার কথা স্মরণীয়। অন্যান্য আমোদ প্রমোদের সঙ্গে সিনেমার পার্থক্য আছে। সিনেমা গতিশীল এবং বাঙ্ময়। একই সঙ্গে তা আমাদের দর্শন এবং শ্রবণ শক্তিকে উদ্দীপ্ত করে। এখানে টেলিভিশনের কথা উঠতে পারে। বহু দূরের ও দূরধিগম্য স্থানের সব ছবি সিনেমা ও টেলিভিশন প্রদর্শন করে। অর্থাৎ কাল ও দূরত্বের বন্ধনকে এরা যেভাবে অতিক্রম করে আমোদ-প্রমোদের অন্য কোনো উপকরণই তা পারে না। এ কারণেই আমোদ প্রমোদের ক্ষেত্রে সিনেমা ও টেলিভিশনের গুরুত্ব এবং বৈশিষ্ট্য আজ সর্বজন বিদিত। বিজ্ঞানের বদৌলতে সিনেমা, রেডিও টেলিভিশন ছাড়াও আজ বহু কিছু আনন্দের উপকরণ আমাদের সামনে।
বিজ্ঞানের বিস্ময়কর আবিষ্কার: বিজ্ঞানের কল্যাণে মানুষের বহু অভাব দূর হয়েছে, আনন্দ লাভ হয়েছে, স্বাচ্ছন্দ্য পেয়েছে। সুতরাং প্রাত্যহিক জীবনে বিজ্ঞানের দান যথেষ্ট। কিন্তু এত কিছুর পরেও মানুষের কৌতূহলের অন্ত নেই, তার তৃষ্ণা মেটেনি। ফলে মানুষ সৃষ্টি করেছে নানা ধরনের যন্ত্র ও মহাশূন্য যান যা বিজ্ঞানের অন্যতম কৃতিত্ব। দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে মানুষ আকাশের বহু গোপন রহস্যের আচ্ছাদন উন্মোচন করতে সক্ষম হয়েছে। অনুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে সূত্র থেকে সূত্রে পৌঁছেছে। আর কম্পিউটার যন্ত্রের সাহায্যে এমন সব কাজ করছে, যা কিনা কিছুদিন আগে কল্পনাও করা যেত না। আর রোবট সে যেন মানুষের গোলাম। সে মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের নানা কাজই করে দিচ্ছে। এভাবেই মানুষ বিজ্ঞানের দ্বারা বলীয়ান হয়েছে এবং হচ্ছে। মানুষ প্রকৃতির ওপর উড়িয়েছে বিজ্ঞানের বিজয় কেতন। বিজ্ঞানের অবদান সম্পর্কে বারট্রান্ড রাসেল বলেছেন:
‘Science is our guidence
Science is our animation’
বিজ্ঞানের ক্ষতিকর দিক: ‘There is no rose without thorn’ কাঁটা ছাড়া গোলাপ হয় না। তেমনি প্রত্যেকটি জিনিসের ভালো-মন্দ উভয় দিক আছে। আমাদের জীবনে বিজ্ঞান শুধু আশীর্বাদ আনেনি, অভিশাপও এনেছে ঢের। যন্ত্রের ওপর নির্ভর করতে করতে মানুষের জীবনে এসেছে যন্ত্রনির্ভরতা, কর্মবিমুখতা। দিন দিন মানুষের মধ্যে ঘনীভূত হচ্ছে কৃত্রিমতা, অসৎ প্রবৃত্তি হয়ে উঠছে চাঙ্গা হচ্ছে। অ্যাসিডে ঝলসে যাচ্ছে কত ফুলের মতো নিষ্পাপ মুখ। অবৈধ অস্ত্রে হারিয়ে যাচ্ছে কত তাজা প্রাণ, নিঃশব্দে ঝরে যাচ্ছে কত না ফোটা কলি। কম্পিউটার এনেছে বেকার সমস্যা। আর ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া, ডিশ অ্যান্টেনা ও অশ্লিল সিনেমা আমাদের সমাজে এনেছে অপসংস্কৃতি এজন্য যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয় হচ্ছে। পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার পৃথিবীকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ১৯৪৫ সালে হিরোশিমা ও নাগাসাকি এই দুটি শহরে আণবিক বোমা বিস্ফোরণের ফলে ধ্বংস হয়েছে এই দুটি জনপদ, প্রাণ হারিয়েছে লাখ লাখ মানুষ, লাখ লাখ একর জমি হয়েছে চাষাবাদের অযোগ্য। তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের এবং বর্তমান ইউক্রেনের অন্তর্ভূত চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে চুল্লী ধ্বংসের কারণে এর তেজস্ক্রিয়তা নিঃসরণের ফলে অনেক এলাকার ফসল নষ্ট হয়ে যায় এবং লাখ লাখ একর উর্বর জমি সম্পূর্ণ উৎপাদন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এছাড়া টেলিভিশনের প্রতিফলিত রশ্মি ক্ষতি করছে মানুষের চোখের। অস্ত্রের ঝংকারে আজ প্রকম্পিত পৃথিবীর আকাশ বাতাস। এতে বিজ্ঞানের অনেক ক্ষতিকর দিক স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
উপসংহার: ভালোর পরশে মন্দের উপস্থিতি আলো আঁধারের মতো লুকোচুরি খেলবেই। দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞানের দান তাই ভালোর সঙ্গে অপ্রীতিকর কিছুও বৈকি। আর এজন্যই হয়তো বিজ্ঞানী হলডেন বলেছেন- ‘We need science more than ever before’ বাতাস ছাড়া যেমন জীবন চলতে পারে না তেমনি বিজ্ঞান ছাড়াও বর্তমান সভ্যতা নিষ্প্রাণ, নিষ্পন্দন। তাই বর্তমান যুগে প্রতি মুহূর্তে এবং প্রতি পদক্ষেপে সভ্য জগৎ বিজ্ঞানের কাছে দায়বদ্ধ। বিজ্ঞানকে বাদ দিয়ে আজ জীবন ও সমাজের মুখচিত্র কল্পনাও করা যায় না।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, ঢাকা
জাহ্নবী