প্রবন্ধ
আমার পথ
অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন: ‘আমি আছি- এই কথা না বলে সবাই বলতে লাগলাম গান্ধী আছেন’ উক্তিটি দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: ‘আমি আছি এই কথা না বলে সবাই বলতে লাগলাম গান্ধী আছেন’ উক্তিটি দ্বারা সেকালের ভারতবর্ষের মানুষের পরনির্ভরশীলতার কথা বোঝানো হয়েছে।
মহাত্মা গান্ধী জাতির অভিভাবকরূপে ভারতের মানুষকে স্বাবলম্বনের শিক্ষা দিচ্ছিলেন। সবাইকে শেখাচ্ছিলেন নিজের ওপর বিশ্বাস অটুট রাখতে। কিন্তু সেদিন ভারতের মানুষ তার আদর্শ, তার কথা ঠিক বোঝেনি। ফলে তারা নিজের অস্তিত্বেও প্রতি শ্রদ্ধাশীল, সক্রিয় না হয়ে গান্ধী আছেন, এ কথা বলে গান্ধীর ওপর নির্ভরশীলতার বিষয়টিই ব্যক্ত করেছিলেন। প্রাবন্ধিক ভারতীয় জনগণের এমন পরাবলম্বনকে প্রকাশ করতেই এ কথা বলেছেন।
প্রশ্ন: অন্তরে মিথ্যার ভয় থাকলে কেন বাইরের ভয়কে মানুষ ভয় মনে করে? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: অন্তরে যদি ভণ্ডামি, ছলনা, দুর্বলতা, অযোগ্যতা থাকে তাহলে বাইরের যেকোনো শক্তিই তাকে পরাজিত করে বলে ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক আলোচ্য উক্তিটি করেছেন।
আত্মনির্ভরশীলতায় উজ্জীবিত মানুষ যদি নির্ভীক চিত্তে যথার্থ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে তবেই ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে সচেতনতার ধারাবাহিক উজ্জীবন ঘটবে। পরাধীন ভারতবর্ষে আত্মবিশ্বাসী হয়ে আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন মানুষের ভীষণ অভাব ছিল। ফলে তারা বাইরের ব্রিটিশ শক্তিকে যমের মতো ভয় পেয়ে তাদের দাসত্বে নিজেদের বহুকাল পরাধীন রেখেছি। অন্তরে শক্তি না থাকায়, যোগ্যতা ছিল না বলে, অন্তরের মিথ্যা ভয়ে মানুষ সেদিন বাইরে ব্রিটিশ শক্তিকে ভয় পেত।
প্রশ্ন: কাজী নজরুল ইসলাম ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে হিন্দু-মুসলমানের মিলনের অন্তরায়কে দূর করতে চেয়েছিলেন কেন?
উত্তর: মানব-ধর্মকে সবচেয়ে বড় ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করে একতাবদ্ধ ভারত গঠন করার প্রত্যয়ে প্রাবন্ধিক ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে হিন্দু-মুসলমানের মিলনের অন্তরায় দূর করতে চেয়েছিলেন।
কাজী নজরুল ইসলাম আজীবন মানব-ধর্মে বিশ্বাসী। তার কাছে মানুষ-ধর্মই সবচেয়ে বড় ধর্ম। তার উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু-মুসলমানের মিলনের অন্তরায় বা ফাঁকি কোনখানে তা দেখিয়ে দিয়ে এর গলদ দূর করা এবং দেশব্যাপী মানব-ধর্ম তথা সব ধর্মের মানুষের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করা। আর এই কারণেই তিনি হিন্দু-মুসলমানের মিলনের অন্তরায় দূর করতে চেয়েছিলেন। জাতীয় জীবনে উন্নতি এবং সমৃদ্ধিতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানবিক চেতনা দ্বারা উদ্বুদ্ধ হতে না পারলে কখনোই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাত থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়; এমনকি স্বাধীনতা অর্জন করলেও তার সুফল ভোগ করা যাবে না। এটি-ই প্রাবন্ধিক বিশ্বাস করতেন।
প্রশ্ন: ‘ভুলের মধ্য দিয়েই সত্যকে পাওয়া যায়।’ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ভুল থেকে প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করলে তার মধ্য দিয়েই প্রকৃত সত্যের সন্ধান পাওয়া যায়, যা মানবজীবনে সুস্থ-সুন্দর পথে পরিচালিত করে বলেই ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক ‘ভুলের মধ্য দিয়েই সত্যকে পাওয়া যায়।’ এমন কথা বলেছেন।
যেখানে ভুল হবে সেখান থেকেই নতুন শিক্ষায় জাতিকে এগিয়ে যেতে হবে ভুলকে পেছনে রেখে। মনে রাখতে হবে, জাতীয় জীবনে উন্নতি এবং সমৃদ্ধিতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানবিক চেতনা দ্বারা উদ্বুদ্ধ হতে না পারলে কখনোই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাত থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়; এমনকি স্বাধীনতা অর্জন করলেও তার সুফল ভোগ করা যাবে না। ভারতবাসী বারবার ভুল করছিল সাম্প্রদায়িক সংঘাতে গিয়ে নিজেদের ভেতরকার বিরোধ বাড়িয়ে, যার সুফল ভোগ করছিল ব্রিটিশ বেনিয়া শক্তি। ভুল যদি নিজের জ্ঞান দ্বারা মানুষ নিজে উপলব্ধি করে তাহলে নিজেকে সংশোধন করা যায়। সংশোধিত হওয়ার পর সে তার প্রকৃত সত্য খুঁজে পায়। তাই এ কথা বলা যায় যে, মানুষ ভুল করে, সে ভুল আবার কখনো ফুল হয়ে ফুটে ওঠে।
লেখক: প্রভাষক, বাংলা বিভাগ,
আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, ঢাকা
জাহ্নবী