ঢাকা ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩, রোববার, ২৮ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ: পানিসম্পদ মন্ত্রী হোন্ডার নতুন সাশ্রয়ী বৈদ্যুতিক হ্যাচব্যাক গাড়ি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সর্বোচ্চ দুর্নীতি হয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চট্টগ্রাম বন্দরে উন্নত সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার উদ্বোধন প্রাণী কি মৃত্যু বুঝতে পারে? যেভাবে তৈরি হয়েছিল গিজার গ্রেট পিরামিড ২৭ জুন পর্যন্ত রেমিট্যান্স বেড়েছে ১৭.৩ শতাংশ আঁতুড়ঘর থেকে বিশ্বমঞ্চে তরুণ ফুটবলার গোবিপ্রবির ১৭ শিক্ষককে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করল প্রশাসন দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হেরে লক্ষ্য পূরণ হলো না জ্যোতিদের অতিরিক্ত আইজি, ডিআইজি ও এসপিসহ ২১ কর্মকর্তার নতুন দায়িত্ব ডেইলি স্টার হামলা মামলায় এনসিপির আনোয়ার রিমান্ডে প্রাথমিক শিক্ষকদের পদমর্যাদা বাড়ানোর ঘোষণা প্রতিমন্ত্রীর ইন্টেল কোর আল্ট্রা প্রসেসরের শক্তি নিয়ে বাজারে এলো লেনোভো আইডিয়াপ্যাড স্লিম ৫ সিরিজ দেশব্যাপী ২৫ হাজার মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপনের ঘোষণা শিক্ষামন্ত্রীর একক কোনো মাস্টারমাইন্ড আমরা মানি না: বিরোধীদলীয় নেতা আদ্-দ্বীন হাসপাতালের বাণিজ্যিক আকাঙ্ক্ষা ছিল পুরোপুরি অনৈতিক: স্বাস্থ্যমন্ত্রী দুধকুমার নদীতে ৩ ঘণ্টায় ৫৪ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি, নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ অপতথ্যের ভিড়ে ‘খবরের ভেতরের খবর’ খুঁজে বের করুন: তথ্য সচিব শ্রীমঙ্গলে বাস-মোটরসাইকেল সংঘর্ষ, নিহত ২ ক্রীড়া কার্ডের সংখ্যা বাড়িয়ে ৫০০ করা হবে: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী কোনো বিষয়ে ভয় অনুভব করলে যে আমলটি করবেন সৌদি আরবে তেল কোম্পানির হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, ১৪ আরোহী সবাই নিহত নায়ক-নায়িকা খোঁজার বিচারক তারা মানবস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব উদ্বেগজনক তিস্তার পানি বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার ওপরে, নিম্নাঞ্চলে বন্যার শঙ্কা তোপের মুখে শ্রদ্ধার ‘ইথা’ ফ্রান্সে উড়োজাহাজ বিধ্বস্তে প্রশিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ নিহত ১১ তাসকিন ও মিমের সঙ্গে মেতে উঠলেন ওয়ালটনের ২৪ ক্রেতা সোনারগাঁ মেঘনা নদীতে বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং, চাঁদা না পেয়ে অপপ্রচারের অভিযোগ

ফিলিপাইনে জ্বালানি জরুরি অবস্থা: বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিত

প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৪৪ পিএম
আপডেট: ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৪৪ পিএম
ফিলিপাইনে জ্বালানি জরুরি অবস্থা: বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিত
ড. মো. আব্দুল মোমেন

দেশের শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা টাস্কফোর্স’ গঠন করুন। আজকের সঠিক একটি পদক্ষেপ আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন সংকট থেকে রক্ষা করতে পারে। আমরা চাই না আমাদের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা জ্বালানিসংকটের চোরাবালিতে হারিয়ে যাক।...

সম্প্রতি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশ ফিলিপাইন থেকে একটি সংবাদ বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র দেশটিতে এক বছরের জন্য ‘জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেছেন। এর নেপথ্যে মূল কারণ হিসেবে বলা হয়েছে- মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের ধমনী হিসেবে পরিচিত ‘হরমুজ প্রণালি’ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। প্রেসিডেন্ট মার্কোস সরাসরি বলেছেন, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বর্তমানে ‘আসন্ন বিপদের’ মুখে।

ফিলিপাইনের এ সিদ্ধান্ত কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়, বরং এটি বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য একটি বড় ‘ও্যক-আপ কল’ বা সতর্কবার্তা। বিশ্বায়নের এ যুগে মধ্যপ্রাচ্যের একটি স্ফুলিঙ্গ কীভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দ্বীপরাষ্ট্রের রান্নাঘর পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিতে পারে, ফিলিপাইন তার জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই অশনিসংকেত পড়ার জন্য প্রস্তুত?

বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও হরমুজ প্রণালির সমীকরণ
জ্বালানি নিরাপত্তার আলোচনায় ‘হরমুজ প্রণালি’ এক অবিচ্ছেদ্য নাম। ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী এ সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট পেট্রোলিয়াম ব্যবহারের প্রায় ২১ শতাংশ পরিবাহিত হয়। প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এবং প্রচুর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) এ পথ দিয়েই বিশ্ববাজারে যায়। যদি কোনো কারণে ইরান এ পথটি রুদ্ধ করে দেয়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক রাতেই আকাশচুম্বী হবে। ফিলিপাইন দূরদর্শী দেশ হিসেবে বুঝতে পেরেছে যে, সংকটের পর হাহাকার করার চেয়ে সংকটের আগে প্রস্তুতি নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। তারা ৫ হাজার পেসো করে পরিবহন কর্মীদের সহায়তা দিচ্ছে এবং বাজারে কৃত্রিমসংকট রোধে কঠোর টাস্কফোর্স গঠন করেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ফিলিপাইন ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোতে অনেক মিল রয়েছে; বিশেষ করে রেমিট্যান্স এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাতের ওপর আমাদের উভয়েরই নির্ভরতা প্রচুর।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ বর্তমানে একটি রূপান্তরের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে। আমাদের শিল্পায়ন ও বিদ্যুৎ খাতের সিংহভাগ গ্যাস ও তেলের ওপর নির্ভরশীল। গত কয়েক বছরে আমরা দেখেছি কীভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়লে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং লোডশেডিংয়ের কবলে পড়তে হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ রয়েছে, তার একটি বড় অংশ ব্যয় হয় জ্বালানি আমদানিতে। এ অবস্থায় যদি ফিলিপাইনের আশঙ্কানুযায়ী মধ্যপ্রাচ্যে বড় কোনো বিপর্যয় ঘটে, তবে আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতি তিনটি বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে:
১.     মুদ্রাস্ফীতির ত্বরান্বিত হওয়া: জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে চাল, ডাল ও সবজির মতো নিত্যপণ্যের বাজারে।
২.     উৎপাদন খাতের সংকট: আমাদের টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক শিল্প (RMG) নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানি সংকটে উৎপাদন খরচ বাড়লে বিশ্ববাজারে আমাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যাবে।
৩.     কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা: সেচ মৌসুমে ডিজেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত না হলে বোরোসহ অন্যান্য ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে, যা সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

কৌশলগত সমাধান: আমাদের যা করণীয়
একজন বিপণন বিশেষজ্ঞ এবং সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি মনে করি, সম্ভাব্য এ সংকট মোকাবিলায় সরকারকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বহুমুখী কৌশল অবলম্বন করতে হবে:
১.    কৌশলগত মজুত সক্ষমতা (Strategic Petroleum Reserve) নিশ্চিত করা: উন্নত দেশগুলোতে জরুরি সংকটের জন্য কয়েক মাসের জ্বালানি মজুত থাকে। আমাদের বর্তমান মজুত সক্ষমতা যথেষ্ট কি না, তা পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি। কেবল বিপিসি (BPC) নয়, বেসরকারি খাতের বড় কোম্পানিগুলোকেও নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি মজুত রাখতে আইনি বাধ্যবাধকতার আওতায় আনা যেতে পারে। জরুরি ভিত্তিতে ‘ফ্লোটিং স্টোরেজ’ বা ভাসমান মজুত ব্যবস্থার কথা ভাবা যেতে পারে।
২.     আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ ও জ্বালানি কূটনীতি: আমরা দীর্ঘকাল ধরে নির্দিষ্ট কিছু দেশের ওপর নির্ভরশীল। বৈশ্বিক এ অস্থিরতায় আমাদের উচিত ‘এনার্জি ডিপ্লোম্যাসি’ বা জ্বালানি কূটনীতি জোরদার করা। মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প হিসেবে মধ্য এশিয়া (Central Asia) বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি (G2G) করা প্রয়োজন। বিশেষ করে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার ঝুঁকি কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
৩.     অভ্যন্তরীণ খনিজ সম্পদ উত্তোলনে ‘যুদ্ধকালীন’ তৎপরতা: আমাদের নিজের ভূখণ্ডে থাকা প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লা উত্তোলনে যে শ্লথগতি রয়েছে, তা আমাদের জন্য বিলাসিতা। গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করতে আকর্ষণীয় পিএসসি (PSC) মডেল দ্রুত কার্যকর করতে হবে। নিজেদের সম্পদ মাটির নিচে রেখে আমদানিনির্ভর হওয়া কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না।
৪.    জ্বালানি সাশ্রয়ে জাতীয় সচেতনতা ও স্মার্ট ম্যানেজমেন্ট: ফিলিপাইনের মতো আমাদেরও কঠোরভাবে অপচয় রোধ করতে হবে। দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা, অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ করা এবং ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে গণপরিবহন ব্যবহারে জনগণকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। অফিসের কাজ বা মিটিংয়ের ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বাড়ানো গেলে পরিবহনের ওপর চাপ অনেকখানি কমে আসবে।
৫.    প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও শ্রমজীবী মানুষের সুরক্ষা: জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার হন সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষ। সরকার যদি এখনই একটি ‘এনার্জি ক্রাইসিস ফান্ড’ গঠন করে, তবে সংকটের সময় কৃষক, মৎস্যজীবী এবং ছোট পরিবহন কর্মীদের সরাসরি নগদ সহায়তা বা ‘ফুয়েল কার্ড’ প্রদান সহজ হবে। এটি কেবল মানবিক নয়, বরং অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য একটি দরকারি বিনিয়োগ।
৬.    নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে বিপ্লব: আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর একমাত্র দীর্ঘমেয়াদি পথ হলো নবায়নযোগ্য শক্তি। সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং উচ্চ কর কাঠামো তুলে দিয়ে ব্যাপক হারে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে হবে। বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেল বসানোকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপান্তর করতে হবে।

সংকট আসার আগে সতর্ক হওয়া ভীরুতা নয়, বরং বিচক্ষণতা। ফিলিপাইন যা আজ করছে, আমাদের হয়তো তা কাল করতে হবে। কিন্তু আমরা যদি কাল পর্যন্ত অপেক্ষা করি, তবে তা হবে অনেক দেরি। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা আমাদের নাগালের বাইরে, কিন্তু আমাদের প্রস্তুতি অবশ্যই আমাদের সামর্থ্যের ভেতরে।

সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের প্রতি সবিনয় অনুরোধ থাকবে- দেশের শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা টাস্কফোর্স’ গঠন করুন। আজকের সঠিক একটি পদক্ষেপ আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন সংকট থেকে রক্ষা করতে পারে। আমরা চাই না আমাদের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা জ্বালানি সংকটের চোরাবালিতে হারিয়ে যাক।

লেখক: গবেষক এবং চেয়ারম্যান, মার্কেটিং বিভাগ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প দুর্যোগ প্রস্তুতিতে বাংলাদেশের করণীয়

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬, ০৫:০৩ পিএম
দুর্যোগ প্রস্তুতিতে বাংলাদেশের করণীয়
ড. মো. আব্দুল মোমেন

ভূমিকম্প এমন এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ যার কোনো পূর্বাভাস আজ পর্যন্ত বিজ্ঞান দিতে পারেনি। ভেনেজুয়েলার জোড়া ধাক্কা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতির আদালতে মানুষের অবহেলা, দুর্নীতি বা অসচেতনতার কোনো ক্ষমা নেই। ভেনেজুয়েলার এই প্রলয়ংকরী ট্র্যাজেডি থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা যদি আজ অবহেলা ও উদাসীনতা ঝেড়ে জেগে না উঠি, তবে আগামীর যেকোনো একটি বড় ভূকম্পন আমাদের চিরতরে শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।...

সম্প্রতি দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার প্রলয়ংকরী জোড়া ভূমিকম্প বিশ্ববাসীকে প্রকৃতির রুদ্ররূপের সামনে দাঁড় করিয়েছে। দেশটির রাজধানী কারাকাসসহ উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলে শতাব্দীর ভয়াবহতম এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়েছে অসংখ্য বহুতল ভবন, অচল হয়ে পড়েছে যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং প্রাণ হারিয়েছেন শতাধিক মানুষ। ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ এখনো নিরূপণ করা সম্ভব না হলেও, এ ঘটনাটি বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এবং তীব্র ভূমিকম্প ঝুঁকিতে থাকা দেশের জন্য এক চরম ও জরুরি সতর্কবার্তা। ভূমিকম্পের মতো মহাবিপর্যয়কে রুখে দেওয়ার সাধ্য মানুষের নেই। কিন্তু সঠিক পূর্বপ্রস্তুতি ও সতর্কতার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি এবং প্রাণহানি যে বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব, সেটিই বিজ্ঞানের চরম সত্য। মহান আল্লাহ না করুন, ভেনেজুয়েলার মতো এমন জোড়া বা একক কোনো শক্তিশালী ভূকম্পন যদি আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় আঘাত হানে, তবে আমাদের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে এবং তা সামাল দিতে আমাদের কী প্রস্তুতি প্রয়োজন–সেটি আজ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এবং বৈজ্ঞানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবার সময় এসেছে।

ভূতাত্ত্বিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ দীর্ঘকাল ধরেই ভূমিকম্পের এক বিশাল এবং সক্রিয় ডেডজোনের ওপর অবস্থান করছে। আমাদের উত্তর ও পূর্বে ভারতীয়, ইউরেশীয় ও বার্মিজ প্লেটের সংযোগস্থল বা বাউন্ডারি রয়েছে, যা রিখটার স্কেলে ৮ মাত্রারও বেশি শক্তিশালী মেগা আর্থকোয়েক তৈরি করতে সক্ষম। বিশেষ করে মধুপুর ফল্ট, ডাউকি ফল্ট এবং সিলেট-চট্টগ্রামের সাবডাকশন জোনগুলো দীর্ঘ সময় ধরে ভূগর্ভে বিপুল পরিমাণ শক্তি সঞ্চয় করে চলেছে। বিজ্ঞানী ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করছেন যে, বাংলাদেশে যেকোনো সময় বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি মানসিক ও পরিকাঠামোগতভাবে আসলেই প্রস্তুত? ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ট্র্যাজেডি থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের রাষ্ট্রীয়, প্রাতিষ্ঠানিক, ব্যবসায়িক এবং সামাজিক পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট পূর্বপ্রস্তুতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার লড়াই।

সরকারি পর্যায়ে সবচেয়ে প্রাথমিক ও জরুরি পদক্ষেপ হলো ‘ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড’ (বিএনবিসি)-এর কঠোর, আপসহীন এবং দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। ভেনেজুয়েলায় ২২ তলার বহুতল ভবন ধসে পড়ার প্রধান কারণ হিসেবে প্রাথমিক তদন্তে ভবনের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং নির্মাণসামগ্রীর নিম্নমানের বিষয়টি উঠে এসেছে। আমাদের দেশে, বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম বা সিলেটের মতো মেগা সিটিগুলোয় অপরিকল্পিত আবাসন এবং ভবন নির্মাণ বিধিমালা বা রাজউকের নিয়ম লঙ্ঘনের এক ভয়াবহ মহোৎসব চলছে। রাজউক, সিডিএ বা স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষগুলোকে শুধু কাগজে-কলমে নকশা অনুমোদন করলেই চলবে না; ভবন নির্মাণকালে শতভাগ ভূমিকম্প সহনীয় প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে কি না, তা মাঠপর্যায়ে কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে। একই সঙ্গে শহরের পুরোনো এবং অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে ‘রেট্রোফিটিং’ বা শক্তিশালীকরণ করতে হবে, অন্যথায় সেগুলোকে ভেঙে ফেলার জন্য কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে।

ভূমিকম্পের মূল কম্পনের চেয়েও পরবর্তী অনুষঙ্গ বিষয়, যেমন–গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে অগ্নিকাণ্ড এবং বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট অনেক সময় বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটায়। ভেনেজুয়েলার ঘটনায় দেখা গেছে, মূল কম্পনের সঙ্গে সঙ্গেই স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে শহরের গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল, যা একটি বড় ধরনের বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড থেকে শহরটিকে রক্ষা করেছে। আমাদের দেশেও বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগের ক্ষেত্রে অবিলম্বে স্বয়ংক্রিয় শাট-অফ সংবলিত স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি প্রবর্তন করা প্রয়োজন।

পাশাপাশি, ভূমিকম্প-পরবর্তী অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি করা দরকার। আমাদের ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স এবং সশস্ত্র বাহিনীকে আরও আধুনিক জিপিএস ট্র্যাকার, লাইভ ডিকটেটর ড্রোন, থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরা এবং ভারী রাবল-রিমুভার বা ধ্বংসস্তূপ সরানোর অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে সুসজ্জিত করতে হবে। ঢাকার মতো পুরোনো ও ঘনবসতিপূর্ণ শহরের সরু গলিগুলোয় যেন উদ্ধারকারী যান ও ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি সহজে পৌঁছাতে পারে, সে জন্য এখনই দীর্ঘমেয়াদি নগর পুনর্বাসন পরিকল্পনা এবং রাস্তা প্রশস্তকরণ প্রকল্প হাতে নেওয়া দরকার।

একটি বিপণন ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে আমি মনে করি, দুর্যোগ-পরবর্তী পরিস্থিতি ও ক্ষয়ক্ষতি সামাল দিতে ‘স্ট্র্যাটেজিক লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভূমিকম্পের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লাখ লাখ আহত ও গৃহহীন মানুষের জন্য তাৎক্ষণিক খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, জরুরি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ এবং অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে হয়। ভেনেজুয়েলার প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটির রানওয়েতে ফাটল ধরায় এবং এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক উদ্ধার তৎপরতা ও ত্রাণ পৌঁছাতে ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ সরকারকে দেশের প্রধান বিমানবন্দর ও মহাসড়কগুলোর বিকল্প ব্যাকআপ ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখতে হবে। দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ‘ডিজাস্টার রিলিফ হাব’ বা জরুরি রসদ ভাণ্ডার গড়ে তুলতে হবে, যেখানে আপৎকালীন সময়ের জন্য শুকনো খাবার, পানি বিশুদ্ধকরণ কিট এবং জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম সব সময় মজুত থাকবে। এটি দুর্যোগের প্রথম গোল্ডেন আওয়ার বা ৭২ ঘণ্টায় হাজারো জীবন বাঁচাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে।

ভূমিকম্পের মতো মেগা দুর্যোগের প্রস্তুতি কেবল সরকারের একার পক্ষে নেওয়া সম্ভব নয়। এখানে অন্যান্য স্টেকহোল্ডার, বিশেষ করে করপোরেট সেক্টর, বেসরকারি সংস্থা (এনজিও), গণমাধ্যম এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক ও সমন্বিত ভূমিকা রয়েছে। দেশের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তাদের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার তহবিলের একটি নির্দিষ্ট অংশ জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি, গবেষণা এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক উদ্ধারকর্মী তৈরিতে বরাদ্দ করা উচিত। আমাদের এনজিওগুলো তৃণমূল পর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দক্ষ, তাদের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চল ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ভলান্টিয়ার বা স্বেচ্ছাসেবী দল গঠন করে উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে।

গণমাধ্যমগুলোর দায়িত্ব কেবল দুর্যোগ ঘটে যাওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতির লাইভ কভারেজ বা সংবাদ পরিবেশন করা নয়, বরং দুর্যোগের আগে নিয়মিত জনসচেতনতামূলক ও শিক্ষণীয় ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা। দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত তিন মাস পরপর বাধ্যতামূলক ‘আর্থকোয়েক ড্রিল’ বা ভূমিকম্প মহড়া আয়োজন করা উচিত। ফলে নতুন প্রজন্ম ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা জানতে পারবে যে, ভূমিকম্পের প্রথম কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আতঙ্কিত না হয়ে কীভাবে নিজেদের রক্ষা করতে হয় (যেমন–ড্রপ, কভার অ্যান্ড হোল্ড অন পদ্ধতি)।

ভূমিকম্প এমন এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ যার কোনো পূর্বাভাস আজ পর্যন্ত বিজ্ঞান দিতে পারেনি। ভেনেজুয়েলার জোড়া ধাক্কা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতির আদালতে মানুষের অবহেলা, দুর্নীতি বা অসচেতনতার কোনো ক্ষমা নেই। সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, রাজউক এবং নগর পরিকল্পনাবিদদের সমন্বয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্বায়ত্তশাসিত ‘জাতীয় ভূমিকম্প প্রস্তুতি ও বাস্তবায়ন সেল’ গঠন করে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ শুরু করা এখন সময়ের দাবি।

আল্লাহতায়ালা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করুন। তবে পবিত্র কোরআনেও বলা হয়েছে, মানুষ নিজের ভাগ্য নিজে পরিবর্তন না করলে আল্লাহ তার ভাগ্য পরিবর্তন করেন না। তাই স্রষ্টার ওপর ভরসা রাখার পাশাপাশি আমাদের নিজেদের সর্বোচ্চ বৈজ্ঞানিক ও বাস্তবিক প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। ভেনেজুয়েলার এই প্রলয়ংকরী ট্র্যাজেডি থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা যদি আজ অবহেলা ও উদাসীনতা ঝেড়ে জেগে না উঠি, তবে আগামীর যেকোনো একটি বড় ভূকম্পন আমাদের চিরতরে শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
মার্কেটিং বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ
[email protected]

বাস্তবমুখী বাজেটে ব্যয়ের দক্ষতা থাকতে হবে

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬, ০৪:৪৪ পিএম
আপডেট: ২৮ জুন ২০২৬, ০৪:৪৬ পিএম
বাস্তবমুখী বাজেটে ব্যয়ের দক্ষতা থাকতে হবে
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান

শুধু ঋণ নিলে হবে না। অপচয় কীভাবে কমানো যায়, সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি ব্যয় যৌক্তিকীকরণ করতে হবে। এ ছাড়া আয় বাড়াতে নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। বেসরকারি খাতে নীতি সহায়তা দিয়ে ব্যবসার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি। তবে যাদের জন্য সংস্কার, অবশ্যই তাদের সঙ্গে আলাপ করতে হবে। কারণ বাজেট বাস্তবসম্মত ও বাস্তবায়নযোগ্য হওয়াটা সবচেয়ে জরুরি।...

 

বাজেটে দেশের অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা মূল্যায়নে বিদ্যমান বাস্তবতার গ্রহণযোগ্য বিশ্লেষণ থাকতে হবে। নানারকম সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও নতুন সরকারের কাছে মানুষের আকাঙ্ক্ষা অনেক বড়। এ প্রত্যাশা সম্পূর্ণভাবে পূরণ করা সম্ভব না হলেও, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে যতটুকু প্রত্যাশা পূরণ করা যায়, আমাদের সে চেষ্টা থাকতে হবে। একই সঙ্গে বাস্তবায়নযোগ্য ও বাস্তবমুখী বাজেটে যৌক্তিক বরাদ্দ ও ব্যয়ের দক্ষতা বাড়াতে হবে। ২০১৩ সাল থেকে দুর্নীতিগ্রস্ত স্বৈরাচারী শাসন ছিল। তার অন্যতম একটি কারণ হলো কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টকে (স্বার্থের দ্বন্দ্ব) মেইন স্ট্রিম করে ফেলা। অর্থাৎ স্বার্থের দ্বন্দ্বকে নিয়ন্ত্রণ তো দূরের কথা, সরকারের পক্ষ থেকে চূড়ান্তভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ–বিভিন্নভাবে ব্যাংক, বিমা কিংবা মিডিয়ার মালিকানা দখল করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে সম্পদ লুট করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। সরকারের ভেতরে এখনো তাদের ক্যাপাসিটি আছে। ফলে নতুন শক্তি নিয়ে তাদের ফিরে আশার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে মূল্যস্ফীতি এবং বিনিয়োগ এই দুই সূচক স্বস্তির জায়গায় নিয়ে যাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। 

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, রাজস্ব আয় এবং আর্থিক খাতের ব্যাপক সংস্কার দরকার। সামষ্টিক অর্থনীতি যেভাবে ভঙ্গুর অবস্থায় চলে গিয়েছিল, সেখানে বর্তমানে অনেকটা স্থিতিশীল হয়েছে। তবে দুটি সূচক এখনো উদ্বেগজনক। এর মধ্যে একটি হলো মূল্যস্ফীতি, অপরটি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ। এখানে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। আর অগ্রগতি না হওয়ার অন্যতম কারণ, দেশের অর্থনীতিকে যেভাবে গোষ্ঠীতন্ত্রের কবলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেখান থেকে এখনো সম্পূর্ণ উত্তরণ হয়নি। অর্থাৎ আগের সরকার বিদায় নিয়েছে, আর গোষ্ঠীতন্ত্র চলে গেছে বিষয়টি এমন নয়। সামষ্টিক অর্থনীতির অন্য সূচকগুলো বিবেচনা করলে দেখা যাবে ঋণ ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি ছিল। কিন্তু আমরা খেলাপি হইনি। এ ছাড়া বর্তমানে বৈদেশিক রিজার্ভ বাড়ছে। মুদ্রার বিনিময় হার যৌক্তিক করা হচ্ছে।

এবারের বাজেটের প্রেক্ষাপট অবশ্যই ভিন্ন। কারণ গভীর রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এর আগের বাজেটগুলো গোষ্ঠীতন্ত্র প্রভাবিত দুর্নীতিগ্রস্ত নীতির মধ্যদিয়ে হচ্ছিল। কিন্তু এবার মানুষের সীমাহীন প্রত্যাশা আছে। সমাজের বা অর্থনীতির প্রয়োজনে প্রতি বছরই আগের বাজেটগুলোর কিছু ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হয়। যেমন, দারিদ্র্যবিমোচন, কৃষকের সমস্যা মেটানো এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির গতি স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে নিয়ে আসা অন্যতম।

বাজেটে তিন ধরনের চ্যালেঞ্জ আছে। এর মধ্যে দেশে সম্পদের স্বল্পতা রয়েছে। রাজস্ব আহরণ কম এবং নানাভাবে বিদেশে অর্থ পাচার হয়েছে। এটি একটি বাস্তবতা। দ্বিতীয়ত, বিশাল পট-পরিবর্তন হয়েছে। ফলে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের চাহিদা বা আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছে। এর একটি চাপ আছে। আবার এই দুই বাস্তবতার মধ্যে আমলাতান্ত্রিক গতানুগতিকতা পরিহার করে উদ্ভাবনী নেতৃত্ব (লিডারশিপ) দেখানোর সুযোগ আছে। তবে সুযোগের মানে এই নয় যে, হঠাৎ করে বিশাল কোনো প্রকল্প নিতে হবে। চ্যালেঞ্জের তৃতীয় বিষয় হলো–অর্থ বরাদ্দের আকার। এ আকার অবশ্যই বাস্তবসম্মত হবে, পাশাপাশি বাড়াতে হবে ব্যয়ের দক্ষতা। স্বৈরাচারী শাসনামলে তিনটি অগ্রহণযোগ্য প্রবণতা দিয়ে সেই সময়ের বাজেটকে সংজ্ঞায়িত করা যায়। একটি হলো, বাস্তবতাবিবর্জিত অর্থনীতির বিশ্লেষণ। এমনভাবে বিশ্লেষণ করা হতো, যেন অর্থনীতিতে কোনো সমস্যা নেই। সবকিছু ভালো আছে। দ্বিতীয়ত, গোষ্ঠীতন্ত্রকে তোয়াজ করার জন্যই নীতিজগৎকে জানানো হতো। অর্থাৎ এমন পদক্ষেপ নেওয়া হতো যাতে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে উৎসাহিত হয়। তৃতীয়টি হলো, ব্যয় অদক্ষতা। অনেকে মেগা প্রকল্পের সমস্যার কথা বলেন। কিন্তু আমার মতে, মেগা প্রকল্প বড় সমস্যা নয়। সমস্যা হলো ব্যয়ের দক্ষতা ছিল না। যেমন বালিশের দাম এবং রাস্তা নির্মাণ খরচসহ বেশকিছু অস্বাভাবিক ব্যয়ের তথ্য প্রকাশ হয়েছে। এই তিন খাতেই এবারের বাজেটে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বাজেটের তিনটা দিক খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটি হলো–অর্থনৈতিক বাস্তবতার গ্রহণযোগ্য বিশ্লেষণ করতে হবে। দ্বিতীয় বিষয় হলো বিভিন্ন খাতে সিগন্যাল জরুরি। বেসরকারি খাত, সম্পদ আহরণ এবং ব্যবহারের বিষয়ে কী সিগন্যাল দেওয়া হচ্ছে সেটি গুরুত্বপূর্ণ। অগ্রাধিকার খাত বা সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ব্যাপারে সরকার কী তা স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। অর্থাৎ সব খাতে বরাদ্দ বাড়ানো সম্ভব না হলেও পলিসি সাপোর্ট (নীতি সহায়তা) দেওয়া জরুরি। যেমন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ইতোমধ্যে দুভাগ করা হয়েছে। এটি বড় ধরনের সিগন্যাল। এর মাধ্যমে একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে, রাজস্ব আহরণকে সরকার আরও বাস্তবমুখী করতে চায়। সর্বশেষ বিষয় হলো বরাদ্দ। আবার বরাদ্দের দুটি অংশ আছে। প্রথমত, বরাদ্দ দেওয়া এবং দ্বিতীয়ত, ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর বাইরেও কিছু বিষয় রয়েছে। যেমন, কর্মসংস্থান বাড়াতে নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। তবে কর্মসংস্থান মানে এই নয় যে, সরকার নিজেই কর্মসংস্থান বাড়াবে। বেসরকারি খাতের বিকাশে সরকারকে নীতি-সহায়তা দিতে হবে। কৌশলের ক্ষেত্রে আমার কিছু প্রত্যাশা আছে। যেমন, লো হ্যাংগিং ফ্রুটস (সহজে অর্জনযোগ্য লক্ষ্য) বাস্তবায়নে জোর দেওয়া। এটি বাস্তবায়নে গভীর কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজন নেই। যেমন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাড়াতে হবে। এখানে বাজেটের আকারের বিষয় আছে। এরপরও সেখানে নজর দিতেই হবে। শিক্ষা খাতে প্রাইমারি স্টাইফেন নামে একটি কর্মসূচি আছে। ২০০৪ সালে এটি শুরু হয়। ৭৮ লাখ শিক্ষার্থীকে মাসে ১০০ টাকা করে দেওয়া হতো। এখানে স্বচ্ছতা আছে। লিকেজের আশঙ্কা কম। ফলে এই খাতে বরাদ্দ বাড়ানো উচিত। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন প্রকল্পে ৪০ শতাংশ পদ এখনো খালি আছে। জনবলের এ ঘাটতির কারণে মানুষ সেবা পান না। ফলে এখানে বিশেষ বরাদ্দ দিলে একটি উদাহরণ হয়ে থাকত। চূড়ান্ত কথা হলো সম্পদের নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও আকাঙ্ক্ষা বিশাল। এটি মাথায় রাখতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় গত তিন-চার দশক ধরে দুটি চালকই প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। একটি হলো তৈরি পোশাক এবং অন্যটি রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়)। এই দুটি থাকবে। এর সঙ্গে প্রবৃদ্ধির নতুন চালক তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কৃষি, ওষুধ খাত, আইটি সেবা এবং চামড়াশিল্প অন্যতম। বাজেটে এসব খাত নিয়ে একটি বার্তা আসা উচিত। খাতগুলোকে উৎসাহিত করতে প্রণোদনা দিতে হবে। অবশ্যই আয়ের খাতগুলো দুর্বল হয়েছে। এটি একটি বাস্তবতা। এ অবস্থার উত্তরণ জরুরি। সে ক্ষেত্রে ঋণ নেওয়া একটি কৌশলগত দিক। কিন্তু শুধু ঋণ নিলে হবে না। অপচয় কীভাবে কমানো যায়, সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি ব্যয় যৌক্তিকীকরণ করতে হবে। এ ছাড়া আয় বাড়াতে নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। বেসরকারি খাতে নীতি সহায়তা দিয়ে ব্যবসার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি। তবে যাদের জন্য সংস্কার, অবশ্যই তাদের সঙ্গে আলাপ করতে হবে। কারণ বাজেট বাস্তবসম্মত ও বাস্তবায়নযোগ্য হওয়াটা সবচেয়ে জরুরি। 

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান (পিপিআরসি)

শিক্ষা বাজেট বাড়ল, এবার কি বদলাবে শ্রেণিকক্ষ?

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ১০:৫২ এএম
শিক্ষা বাজেট বাড়ল, এবার কি বদলাবে শ্রেণিকক্ষ?

বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাত নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বরাদ্দ বেড়েছে, জিডিপির হিসাবে অংশও বেড়েছে। আগের অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা, এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকায়। জিডিপির হিসাবে এটি ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ থেকে ২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। সংখ্যার দিক থেকে এটি অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। কিন্তু শিক্ষা খাতের প্রশ্ন কখনো শুধু সংখ্যার প্রশ্ন নয়। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ, গবেষণা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নচিন্তার প্রশ্ন। তাই বড় বরাদ্দের আনন্দের সঙ্গে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি তুলতে হবে–এই অর্থ কি সত্যিই শিক্ষার মান বদলাবে?

শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক বার্তা। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ নিয়ে হতাশা ছিল। অনেকেই বলতেন, উন্নয়ন যদি মানুষকেন্দ্রিক হতে হয়, তবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিতেই হবে। এবার শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির মাধ্যমে সেই প্রত্যাশার একটি অংশ প্রতিফলিত হয়েছে। তবে এখানেই আলোচনার শেষ নয়, বরং শুরু। কারণ টাকা বাড়লেই শিক্ষা বদলায় না। শিক্ষা বদলায় তখনই, যখন অর্থ সঠিক জায়গায়, সঠিক পদ্ধতিতে এবং সঠিক জবাবদিহির মাধ্যমে ব্যয় হয়। তাই বাজেটের পরবর্তী বড় প্রশ্ন হলো–এই অতিরিক্ত বরাদ্দ কোন খাতে যাবে, কীভাবে যাবে এবং তার ফল কীভাবে মাপা হবে?

শিক্ষা সংস্কারের কেন্দ্রে থাকতে হবে শিক্ষককে। ভবন, যন্ত্রপাতি, বই, প্রযুক্তি–সবই প্রয়োজন; কিন্তু শ্রেণিকক্ষের প্রাণ হলো শিক্ষক। একজন দক্ষ, অনুপ্রাণিত ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক একটি দুর্বল শ্রেণিকক্ষকেও জীবন্ত করে তুলতে পারেন। আবার বিপরীতে, দুর্বল শিক্ষকতা ভালো অবকাঠামোকেও অকার্যকর করে দিতে পারে। তাই এই বাজেটে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পেশাগত উন্নয়ন, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষণপদ্ধতি এবং শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু একবারের প্রশিক্ষণ নয়, ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ দরকার। একজন শিক্ষক যেন নতুন পাঠ্যক্রম, প্রযুক্তি, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শিক্ষার্থীর মানসিক পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে নিয়মিতভাবে আপডেট করতে পারেন–সে ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

বাংলাদেশে শিক্ষার বড় দুর্বলতা হলো, অনেক সময় পরীক্ষার ফল ভালো হলেও বাস্তব দক্ষতা দুর্বল থাকে। শিক্ষার্থী পাস করে, কিন্তু সমস্যা সমাধান করতে পারে না; ডিগ্রি নেয়, কিন্তু কর্মক্ষেত্রের প্রস্তুতি থাকে না; মুখস্থ করে, কিন্তু চিন্তা করতে শেখে না। এই জায়গায় বাজেটের অর্থকে নতুনভাবে ব্যবহার করতে হবে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ দক্ষতা, ডিজিটাল দক্ষতা, ভাষা দক্ষতা, উদ্যোক্তা মনোভাব এবং হাতে-কলমে শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষা যেন শুধু সনদ না দেয়; শিক্ষা যেন মানুষকে কাজের যোগ্য, চিন্তার যোগ্য এবং সমাজের জন্য দায়িত্বশীল করে তোলে।

বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষাকে এখনো অনেক পরিবার দ্বিতীয় সারির শিক্ষা হিসেবে দেখে। এই মানসিকতা বদলানো জরুরি। উন্নত দেশগুলোতে দক্ষতা, প্রযুক্তি, উৎপাদন ও উদ্ভাবনের সঙ্গে কারিগরি শিক্ষার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ যদি কর্মসংস্থানমুখী অর্থনীতি গড়তে চায়, তাহলে 
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে মর্যাদাপূর্ণ ধারায় আনতে হবে। এ জন্য শুধু ট্রেড কোর্স খুললেই হবে না। শিল্প খাতের সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সরাসরি সংযোগ তৈরি করতে হবে। কোন খাতে কী ধরনের দক্ষ জনবল দরকার, সে চাহিদা বুঝে কোর্স তৈরি করতে হবে। স্থানীয় শিল্প, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, আইসিটি, স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সেবা খাতের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে যুক্ত করতে হবে।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু পরীক্ষা নেওয়া ও ডিগ্রি দেওয়ার প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান শক্তি হওয়া উচিত গবেষণা, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, নীতি-সহায়তা এবং সমাজের সমস্যার বাস্তব সমাধান দেওয়া। শিক্ষা বাজেটের একটি স্পষ্ট অংশ গবেষণার জন্য রাখতে হবে। তবে গবেষণা বরাদ্দও যেন কাগজে আটকে না থাকে। 

শিক্ষা সংস্কারের ভিত্তি হলো প্রাথমিক শিক্ষা। একটি শিশু যদি প্রাথমিক পর্যায়েই পড়া, লেখা, গণিত, ভাষা, কৌতূহল ও আত্মবিশ্বাসে পিছিয়ে পড়ে, তাহলে পরবর্তী স্তরে গিয়ে তার ক্ষতি পূরণ করা কঠিন হয়ে যায়। তাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট, শ্রেণিকক্ষের মান, পুষ্টি, উপস্থিতি, শেখার ঘাটতি এবং গ্রাম-শহর বৈষম্য কমাতে বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন। দরিদ্র পরিবারের শিশু, চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা, উপকূলীয় অঞ্চল ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা সহায়তা দরকার। কারণ শিক্ষায় সমতা না এলে উন্নয়নও অসম থেকে যায়।

শিক্ষক প্রশিক্ষণ ছাড়া প্রযুক্তি দিলে তা অনেক সময় অব্যবহৃত সরঞ্জামে পরিণত হয়। তাই প্রযুক্তির সঙ্গে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, বাংলা ভাষায় মানসম্মত পাঠ্যবস্তু, শিখন মূল্যায়ন, শিক্ষার্থীর শিখন-উপাত্ত এবং দূরবর্তী এলাকার জন্য মিশ্র শিক্ষাব্যবস্থা যুক্ত করতে হবে। প্রযুক্তি যেন প্রদর্শনী না হয়ে শিক্ষার মানোন্নয়নের হাতিয়ার হয়।

ভালো নীতি ও বরাদ্দ থাকলেও দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল আসে না। শিক্ষা বাজেটে শুধু কত টাকা বরাদ্দ হলো, তা নয়; টাকা সময়মতো খরচ হলো কি না, কী কাজে খরচ হলো এবং তার ফল কী–এসবও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি বড় শিক্ষা প্রকল্পে পরিমাপযোগ্য সূচক থাকা দরকার। যেমন–শেখার মান কতটা বাড়ল, কতজন শিক্ষক প্রশিক্ষণ পেলেন, কত বিদ্যালয়ে বাস্তব পরিবর্তন হলো, কারিগরি শিক্ষার কত শিক্ষার্থী কর্মসংস্থানে গেল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা থেকে কতটি নীতি বা শিল্পসমাধান তৈরি হলো। জবাবদিহি না থাকলে বড় বরাদ্দও পরিবর্তন আনতে পারে না।

এই বাজেটকে বিচ্ছিন্ন বরাদ্দ হিসেবে না দেখে জাতীয় শিক্ষা রূপান্তরের সূচনা হিসেবে দেখতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, শিল্প খাত, স্থানীয় সরকার, শিক্ষক সংগঠন এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান–সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। একটি পাঁচ বছরমেয়াদি শিক্ষা রূপান্তর পরিকল্পনা দরকার, যেখানে থাকবে স্পষ্ট অগ্রাধিকার: শিক্ষক উন্নয়ন, প্রাথমিক শিক্ষার মান, কারিগরি দক্ষতা, গবেষণা, প্রযুক্তি, মূল্যায়ন সংস্কার এবং কর্মসংস্থান সংযোগ। বাজেটের অর্থ সেই পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত না হলে বরাদ্দ বাড়বে, কিন্তু পরিবর্তন ছড়িয়ে পড়বে না।

শিক্ষা খাতে এবারের বরাদ্দ বৃদ্ধি আশার জায়গা তৈরি করেছে। কেবল অর্থ বরাদ্দ নয়, অর্থের ব্যবহার, ব্যবহারকারীর দক্ষতা এবং ফলাফলের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তার তরুণ প্রজন্মের ওপর। আর তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শিক্ষার ওপর। তাই শিক্ষা বাজেটকে শুধু হিসাবের খাতা হিসেবে দেখা যাবে না; এটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের নকশা। বরাদ্দ বাড়ল–এবার দরকার শিক্ষার বাস্তব রূপান্তর।

লেখক: শিক্ষক, গবেষক ও লেখক, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম
[email protected]

গণতন্ত্র ও দারিদ্র্য কি একসঙ্গে চলে?

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ১০:৪৮ এএম
গণতন্ত্র ও দারিদ্র্য কি একসঙ্গে চলে?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

এটা খুবই সহজ কথা যে, গণতন্ত্র ও দারিদ্র্য একসঙ্গে চলতে পারে না। সবাই বলেন একথা। আসলে দারিদ্র্য হচ্ছে এক ধরনের ব্যাধি। খুবই বাজে রোগ সে। মানুষকে হেয়, বিব্রত, বিপন্ন করে। ছোট করে ফেলে। খুবই আত্মসচেতন করে রাখে। বিপদে ফেলে দেয় যখন তখন, যেখানে সেখানে। না, দারিদ্র্যের মধ্যে মাহাত্ম্য বলে কিছু নেই। অসামান্যদের কথা আলাদা, দারিদ্র্যের আগুনে পুড়ে পুড়ে তারা অনেকেই খাঁটি সোনা হয়ে উঠেছেন, এ আমরা জানি। জীবনীতে পড়েছি। তা ভেতরে সোনা ছিল বলেই ‘খাঁটি’ হয়েছেন, নইলে পুড়ে কয়লা হতেন, কিংবা ছাই: ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যা সত্য। কাজী নজরুল ইসলামের সেই ‘দারিদ্র্য’ কবিতাটি আমি যতবার পড়েছি, কিংবা তার সম্পর্কে যতবার ভেবেছি, ততবারই মনে হয়েছে কবি ব্যতিক্রমীদের একজন। নইলে দারিদ্র্য মহৎ করেছে। মানুষকে এমন তো দেখিনি। পঙ্গু করেছে, পাত্র করেছে ভিক্ষার, কিংবা তার চেয়েও যা খারাপ, ক্ষেত্র করেছে অবজ্ঞার–এই তো দেখে এলাম সারা জীবন। আমার বাপ-দাদাও তাই দেখে এসেছেন, এই গরিব দেশে।

আমাদের যত যত সমস্যা ও ব্যর্থতা তার পেছনে যে দারিদ্র্য রয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে কি? যেমন, পরিবার পরিকল্পনা। ছোট পরিবার সুখী পরিবার–এটা সত্য; কিন্তু তারও চেয়ে বড় সত্য হচ্ছে ধনী পরিবার মানেই ছোট পরিবার। পরিবার ছোট হলেই যে সুখী হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। অসুখ-বিসুখ, ঝগড়া-কলহ, মনোমালিন্য, অধিক আদরে ছেলেমেয়ে নষ্ট–ইত্যাদি সমস্যা থাকতেই পারে। থাকেই। অনেকে তো বিয়েই করতে পারেনি, নিজেই নিজের পরিবার এবং পরিবার পরিকল্পনার দৃষ্টিকোণ থেকে আদর্শ বটে, কিন্তু তেমন পুরুষ কিংবা মহিলা, বিশেষ করে মহিলা, নিজেকে আদর্শ মানুষ কিংবা স্বর্গসুখ ভোগকারী ব্যক্তিত্ব বলে মনে করেন, এমনটা মনে হয় না। আলাপ করে দেখুন, বিষণ্ন হয়ে ফিরে আসবেন। এদের অনেকেই দুঃখের প্রতিমূর্তি।

ব্যতিক্রম সবক্ষেত্রেই সম্ভব, কিন্তু সাধারণভাবে বলতে গেলে বলা যাবে, ধনী পরিবারেই পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি সফল হয়েছে। দরিদ্রদের মধ্যে তা ব্যর্থ। যে জন্য জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে কিছুতেই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা যাচ্ছে না, শত চেষ্টা করেও কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে পারছে না। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এখন আগের তুলনায় সচেতন, তাদের ক্ষেত্রেও পরিবার এখন ছোট হয়ে আসছে। তবে মধ্যবিত্তও ধনীই বটে, বিপুল সংখ্যক দরিদ্র মানুষের তুলনায় ধনী।

দরিদ্র মানুষ আগামী বছরের কথা দূরে থাক, আগামীকালের কথাই ভাবতে পারে না, তারা সকালে ভাবে দুপুরে কী খাবে, দুপুরে ভাবে রাতের কথা, এর বেশি ভাববার ক্ষমতাই রাখে না। মনে করে ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই। এই হতাশা সব রকমের সম্ভাবনাকে অপহরণ করে নেয়। গরিব মানুষ উচ্চতর জীবনের স্বপ্ন রাতেও দেখে না, দিনে তো নয়ই। ভাবে এ রকমই ছিল আমার বাবার, বাবার বাবা, এরকমই থাকব আমি, থাকবে আমার সন্তানসন্ততি। ভবিষ্যহীন, চেতনাহীন, দায়িত্বজ্ঞানহীন এই মানুষদের কাছ থেকে অনেক কিছুই আশা করা যায় না, পরিবার পরিকল্পনাও নয়। এটা পরিবার পরিকল্পনার কর্মীরাও বোঝেন, কিন্তু অধিকাংশ সময়েই বলেন না। জানেন বলে লাভ হবে না, ক্ষতি হওয়ারই আশঙ্কা।

এখন দেশে শিক্ষার ব্যাপারে আগের আগ্রহ নেই। বিশেষ করে উচ্চপর্যায়ের শিক্ষায়। এর কারণটাও ওই দারিদ্র্যই। মানুষ দেখতে পাচ্ছে লেখাপড়া শিখে লাভ হচ্ছে না। চাকরি হচ্ছে না। উপার্জনের আশা নেই। এ পরিস্থিতিতে ছাত্রসমাজের মধ্যে খুব স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক হতাশা দেখা দিয়েছে। শিক্ষার ব্যাপারে অনীহা এবং ঠিক বিপরীতে সন্ত্রাসের ব্যাপারে আগ্রহ ওই হতাশারই দুটি ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ বটে।

মৌলবাদও দারিদ্র্যের সঙ্গে যুক্ত। দরিদ্র মানুষ ভরসা করার মতো কিছু পাচ্ছে না, আশ্রয় নেই, বিচার নেই, ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি নেই, এ রকম মানসিক অবস্থায় ইহজাগতিকতার চর্চা অসম্ভব। আমরা বিদ্যাসাগরের কথা জানি। বিদ্যাসাগরের পক্ষে ইহজাগতিকতার চর্চা অসম্ভব হতো যদি গ্রামের দরিদ্র ব্রাহ্মণ থাকতেন, যদি তাকে পরনির্ভর হয়ে থাকতে হতো। সেটা ছিলেন না বলেই ইহজাগতিক হয়েছেন, অন্যরা হননি, তারা মন্ত্র পড়েছেন এবং দক্ষিণা কী পাওয়া যাবে বা যাবে না তার হিসাব করেছেন।

আমরা যে ব্যাপক হারে ইহকালের ভূমি ছেড়ে জীবিত অবস্থাতেই পরকালের দিকে প্রবল বেগে ধাবিত হতে পছন্দ করি, তার কারণ আর কিছুই নয়, ইহকালের দুরবস্থা ছাড়া। কেবলই উচ্ছেদ হচ্ছি, উদ্বাস্তু হয়ে পরকালে জায়গা-জমির দরদাম করছি। এই যে অন্তঃসারশূন্য আধ্যাত্মিকতা, এই যে ফকিরি, উদাসীনভাব এ বড়ই বাস্তবিক সত্য; এবং তা বাস্তবিক কারণ থেকেই উদ্ভূত। এর পেছনে কোনো অলৌকিক অণুপ্রেরণা নেই।

আর দারিদ্র্য তো আজকের নয়, যুগ-যুগান্তের। সেই অন্তহীন দারিদ্র্য ব্যক্তির জীবনে এমন হীনম্মন্যতা তৈরি করে রেখেছে যে, অবস্থা ভালো হলেও গরিবই থেকে যাই মনের দিক থেকে। ঈর্ষা, অবিশ্বাস, ক্ষুদ্র স্বার্থের পাহারাদারি, কলহ, কোন্দল কেবল যে কাজ হয়ে দাঁড়ায় তা নয়, প্রধান বিনোদনেও পর্যবসিত হয়। অন্য কোনো আনন্দে অভ্যাস নেই, ঝগড়া-ফ্যাসাদ ভিন্ন।

আজকাল আমরা দারিদ্র্যও বিক্রি করছি দেশ-বিদেশে। কিন্তু দরিদ্র মানসিকতা বিক্রি করতে পারব না। কেউ কিনবে না। বৈষয়িকভাবে মোটেই অভাবে নেই, কিন্তু দেখলেই মনে হবে অত্যন্ত অভাবগ্রস্ত, সাহায্য চাইছেন না, তবু মনে হবে চাইছেন–এরকম অবস্থাপন্ন কিন্তু তবু দুস্থ মানুষ কি আপনি দেখেননি, দেখেছি। আপনিও দেখেছেন, আমার দৃঢ় বিশ্বাস। দারিদ্র্য যখন কারও সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়ায় তখন তাকে কাটিয়ে ওঠা দুঃসাধ্য। টাকা-পয়সায় কাটে না। এক প্রজন্মে কাটতে চায় না। আর আগের প্রজন্মে আমরা কেইই বা কি ছিলাম, বাপ-দাদা কি-ই বা রেখে গেছেন, অভাব ছাড়া? শুধু ব্যাধি কেন বলব, দারিদ্র্য অত্যন্ত কঠিন ও জটিল ব্যাধি।

তাই বলে কি আমরা ভোগ-বিলাসের পক্ষে? না, অতিরিক্ত ভোগ-বিলাস, কিংবা অপচয় কোনোটারই পক্ষে নই আমরা। আমরা চাই সুস্থ ও সমৃদ্ধ জীবন, তাতে আনন্দ থাকবে, অবকাশ থাকবে, থাকবে সৃষ্টিশীলতা। ভুল ভোগ-বিলাসে সৃষ্টি নেই, দেওয়া নেই, কেবল নেওয়াই আছে। দারিদ্র্যের সংজ্ঞা যে আপেক্ষিক তাও জানি। কিন্তু তবু দারিদ্র্য যে কি বস্তু তা বাংলাদেশের মানুষ আমরা যদি না বুঝি তবে কে বুঝবে।

এর সঙ্গে গণতন্ত্রের শত্রুতা একেবারেই স্বভাবগত। গণতন্ত্র ও দারিদ্র্য একে অপর থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র স্বভাবের। গণতন্ত্রের একটি মূল বিষয় হচ্ছে অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া; কিন্তু দরিদ্র মানুষ কী ভাগ করবে, অভাব ছাড়া। অভাব তো অবিভাজ্য, যারটা তারই থাকে, ভাগ করতে গেলে নেওয়ার লোক পাওয়া যায় না খুঁজে, নাম শুনলেই দৌড়ে পালায়। গণতন্ত্র প্রকাশ্য, আবার গোপনীয়। গণতন্ত্র সবল, দারিদ্র্য দুর্বল। গণতন্ত্র মানুষকে মেলায়, দারিদ্র্য বিচ্ছিন্ন করে। গণতন্ত্র জগৎমুখী, দারিদ্র্য আত্মমুখী। গণতন্ত্র আলাপ করে দারিদ্র্য করে কলহ। না, গণতন্ত্র ও দারিদ্র্য কিছুতেই একসঙ্গে থাকতে পারে না। তার চেয়েও বড় কথা, দারিদ্র্য থাকলে গণতন্ত্র থাকে না, থাকতে পারে না। কেবল যে ভোট কেনাবেচা কিংবা ছিনতাই হয় তাই নয়, মানুষে মানুষে মিলনটাই গড়ে ওঠে না। গৃহহীনরাই সবচেয়ে বড় গৃহী, তারা কেবলই গৃহ খুঁজে বেড়ায়; উন্মুক্ত প্রান্তরে আসে না, অপরের সঙ্গে সমঝোতা, সহযোগিতা কিছুই করে না। মন্ত্রীরা যখন বলেন দারিদ্র্যই গণতন্ত্রের প্রধান শত্রু তখন খুবই যথার্থ কথা বলেন বটে। না, প্রধান শত্রু হচ্ছে দারিদ্র্য।

কিন্তু দারিদ্র্যের কারণ কী, তা তো বলেন না। না, সেটা বলেন না। বলেন যখন, তখন আসল কথা না বলে আজেবাজে কথা বলেন। মুখ্যকে গৌণ করে, গৌণকেই ধরে টানাটানি করেন। বলেন, দারিদ্র্যের কারণ আমাদের আলস্য। আমরা কাজ করি না। ফাঁকি দিই। বলেন, দারিদ্র্যের কারণ আমাদের জনসংখ্যা। এত মানুষ, এদের কে খাওয়াবে, যা আছে খাওয়াতেই শেষ, উন্নতি কী করে হবে? কী করে ঘুচবে দারিদ্র্য? কেউ বলেন, অন্য কিছু নয়, দায়ী আমাদের দুর্নীতি। চোর। চোরে ছেয়ে গেছে দেশ। চাটার দল। বেত চাই। বেতাতে হবে। এসব বলেন, কিন্তু দারিদ্র্যের আসল কারণটা দেখেন না, বা দেখলেও মানতে চান না।

অন্য কারণ অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু আসল কারণ হচ্ছে বৈষম্য। এই বৈষম্যই দারিদ্র্য সৃষ্টি করছে এবং করেছে। না, দারিদ্র্য বৈষম্য সৃষ্টি করেনি। উল্টোটাই সত্য। বলা হবে, এবং হচ্ছে যে, প্রতিযোগিতা থাকা ভালো। হ্যাঁ, তা ভালো বৈকি।

প্রতিযোগিতা ছাড়া উন্নতি নেই। কিন্তু কার সঙ্গে কার প্রতিযোগিতা, সেটা তো দেখতে হবে। হাত-পা বেঁধে পানিতে ফেলে দিয়ে যদি বলি তুমি আমার সঙ্গে সাঁতরাও দেখি, পাল্লা দাও, তা হলে লোকটি তো পারবে না, ডুবেই মরবে। সাঁতরাতে বলার আগে তার হাত-পায়ের বন্ধনগুলো কাটতে হবে, তাকে মুক্ত করতে হবে, তবেই সাঁতারের প্রশ্নটা উঠবে, নইলে তা নিষ্ঠুর বিদ্রুপ ছাড়া আর কী। দেশের অধিকাংশ মানুষই এই হাত-পা বাঁধা অবস্থায় রয়েছে, তারা নিক্ষিপ্ত হয়েছে দারিদ্র্যের জলাশয়ে। তাদের অবস্থা সাঁতরে তীরে ওঠার নয়, অবস্থা ডুবে মরার।

দেশের যে বৈষম্য রয়েছে তার দরুণ অধিকাংশ মানুষই নিজেকে উৎপাদনশীল। কাজে যুক্ত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। জনসংখ্যা বোঝা হয়ে উঠছে, তাকে সম্পদে পরিণত করা যাচ্ছে না। শিক্ষা কর্মসূচি ভেঙে পড়ছে। পরিবার পরিকল্পনা তথৈবচ। কাজ নেই। অদক্ষ লোকে দেশ ছেয়ে যাচ্ছে।
পুঁজি যা রয়েছে তা অল্প কিছু লোকের হাতে। এই লোকেরা দেখছে দেশের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। তাই পুঁজি বিনিয়োগ না করে তা তারা বিদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে। এই ধনীরাই আবার আমদানি করছে বিদেশি জিনিসপত্র। ব্যবস্থা করছে চোরাচালানের। ফলে দেশি পণ্যের বাজার গড়ে উঠছে না। ধনীদের মধ্যে দেশপ্রেম ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। তারা আবার দ্রুত গতিতে ভোগবাদিতার পথে এগোচ্ছে। প্রতিযোগিতা উৎপাদনের নয়, প্রতিযোগিতা ভোগের। পুঁজির সঞ্চয় বিঘ্নিত হচ্ছে এভাবে পদে পদে।

বাংলাদেশের মূল সমস্যাটা হলো বৈষম্য। দারিদ্র্য এই বৈষম্য থেকেই সৃষ্টি। ধনী গরিবকে শোষণ করে, গরিবকে কর্মক্ষম হতে দেয় না, এবং ধনী শোষণ করে যা পায় তা ভোগ করে এবং যা বাঁচে তা বিদেশে পাঠিয়ে দেয়। গরিব মানুষ অন্য কিছু উৎপাদন করতে পারে না, হতাশা ও সন্তান ভিন্ন। ফলে সে আরও গরিব হয়। অপরাধ বাড়ে, বাড়ছে, আরও বাড়বে। বিদেশ-নির্ভরতা বাড়ে, বাড়ছে, আরও বাড়বে। এটাই হচ্ছে বাংলাদেশের ছবি। অন্য সমস্যা রয়েছে হাজারে হাজারে, কিন্তু সবই বৈষম্যের সঙ্গে বাঁধা। আসল গ্রন্থিটা ওখানেই।

আর গণতন্ত্রের কথা যে বলি, তার মূল কথাটাই হলো অধিকার ও সুযোগের সাম্য। এ না থাকলে গণতন্ত্র থাকার প্রশ্নই ওঠে না। ওই অধিকার ও সুযোগের সাম্য বাংলাদেশে কী পরিমাণে রয়েছে তার যদি হিসাব করি তাহলেই জানতে ও বুঝতে পারব, বাংলাদেশে গণতন্ত্র কতটা আছে, বা তার ভবিষ্যৎ কী?

বৈষম্য ইংরেজ আমলে ছিল। ইংরেজ ও বাঙালি এক ছিল না। বৈষম্য পাকিস্তান আমলে ছিল। পাঞ্জাবি ও বাঙালি এক ছিল না। বৈষম্য বাংলাদেশ আমলেও রয়েছে। বাঙালিও এক নয়। মূল তফাৎ অর্থনৈতিক। আমরা ইংরেজ হটিয়েছি, পাকিস্তানিদের তাড়িয়েছি, কিন্তু তবু বৈষম্য দূর করতে পারিনি। আর সে জন্যই দুর্দশা ঘুচছে না। স্বস্তি নেই, অগ্রগতিও নেই। এগোতে হলে দুপায়ে হাঁটতে হয়, একটি পা যদি খোঁড়া থাকে, তাহলে যা করা যায় তাকে হাঁটা বলা চলে না। অথচ আমরা দৌড়াচ্ছি। আশঙ্কা রয়েছে, অচিরেই ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ব।

দারিদ্র্য ঘোচানোর চেষ্টা যে নেই, তা নয়। আছে, সরকারি উদ্যম আছে, সাম্রাজ্যবাদের তলপিবাহক এনজিওরা রয়েছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। কারণ দারিদ্র্যের আসল কারণ যে বৈষম্য তা কমিয়ে আনার চেষ্টা নেই। রোগের কারণ না জেনে লক্ষণ ধরে টানাটানি করলে রোগ সারবে কি? সারবে যে না, তা তো দেখতেই পাচ্ছি।

আমরা গণতন্ত্র চাই। কিন্তু গণতন্ত্র আসবে না দারিদ্র্য থাকলে। আর দারিদ্র্য যাবে না। বৈষম্য থাকলে। পরস্পরটি এ রকমেরই। পাকিস্তান আমলে ২২ পরিবার শোষণ করত, এখন হয়তো করে ২২০০ পরিবার; এবং এরা পরিচয়ে বাঙালি। এই পরিচয়ের গৌরব নিয়ে গরিব বাঙালি যে আহ্লাদে আটখানা হবে তার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। লক্ষণ বরঞ্চ উল্টো রকম। বিস্ফোরণোন্মুখ। যাত্রা বৈষম্য নিরসনের দিকে নয়। যাত্রা উল্টো দিকে, তাই বিস্ফোরণের আশঙ্কা বাড়ছেই, কমছে না। এটা যেন না ভুলি। অনেকেই ভাবেন, পালাবেন। কিন্তু পালাবেন কোন পথে, কোন সীমান্ত পার হয়ে, কোন সমুদ্র সাঁতরে?

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্বকাপের উন্মাদনা, ফুটবল ফাইন্যান্সের বিস্ময়

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬, ০৫:০৪ পিএম
বিশ্বকাপের উন্মাদনা, ফুটবল ফাইন্যান্সের বিস্ময়
ড. লিপন মুস্তাফিজ

ফুটবলের জনপ্রিয়তা যত বাড়ছে, ততই এর অর্থনৈতিক গুরুত্বও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই ফুটবলকে বুঝতে হলে শুধু খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স নয়, এর পেছনের অর্থনীতিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। ফুটবল ফাইন্যান্সের এই বিশাল জগৎই প্রমাণ করে যে, আধুনিক ক্রীড়াঙ্গনে অর্থনীতি এবং খেলা এখন একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ।...

শুরু হয়েছে বিশ্বের মানুষের ঘুম হারাম করা এক খেলা। আগামী ১৯ জুলাই ২০২৬ অব্দি এ নেশায় বুঁদ হয়ে থাকবে সারা বিশ্ব। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো টান টান উত্তেজনায় ভরে থাকবে বাংলাদেশ। রাত জেগে অনেকেই খেলা দেখছে। হাটে মাঠে ঘাটে আলোচিত হচ্ছে নানা গল্প। চায়ের দোকানে চা-পানের পরিমাণ বেড়েছে। তর্কবিতর্ক হচ্ছে দেশ নিয়ে, খেলা নিয়ে, খেলোয়াড় নিয়ে। রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়েও হচ্ছে। আমাদের দেশের টিভি রুমের বাইরেও বড় পর্দার আয়োজন করা হয়েছে এ খেলা উপভোগের জন্য। চারপাশে এক মোহনীয় পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। খেলা নিয়ে হচ্ছে মারামারি, হচ্ছে হাতাহাতি। বাজি ধরা, রান্নাবান্না, জবেহ করা হচ্ছে গরু-খাসি। আমাদের পেটে ভাত নেই, তবুও আমাদের উচ্ছ্বাসের জোয়ারে ভাটা পড়তে দেব না। এই আমরা, এই আমাদের বৈশিষ্ট্য, এই আমাদের বাঙালিয়ানা।

ফুটবলকে আমরা সাধারণত একটি খেলা হিসেবেই দেখি। মাঠে ২২ জন খেলোয়াড়, লাখো দর্শক, গোলের উল্লাস আর পরাজয়ের বেদনা; সবকিছুই ফুটবলের দৃশ্যমান রূপ। এই খেলার পেছনে যে বিশাল অর্থনৈতিক কাঠামো কাজ করে, তা অনেক সময় সাধারণ দর্শকের চোখের আড়ালে রয়ে যায়। আধুনিক ফুটবল এখন শুধু একটি ক্রীড়া নয় বরং এটি একটি বহুমাত্রিক শিল্প, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে সম্প্রচার অধিকার, স্পন্সরশিপ, খেলোয়াড় স্থানান্তর, বাণিজ্যিক বিপণন, স্টেডিয়াম ব্যবসা এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগ। ফুটবল ফাইন্যান্স আজ বিশ্ব অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। গত দুই দশকে ফুটবলের অর্থনৈতিক মূল্য অভাবনীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলো; বিশেষ করে ইংল্যান্ড, স্পেন, জার্মানি, ইতালি এবং ফ্রান্সের লিগ; এখন বিলিয়ন ডলারের বাজার। একটি বড় ক্লাবের বার্ষিক আয় অনেক দেশের মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠানের মোট আয়ের চেয়েও বেশি। এর প্রধান কারণ হলো ফুটবলকে ঘিরে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক দর্শকগোষ্ঠী। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশে ফুটবলের সমর্থক রয়েছে, আর সেই জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করেই গড়ে উঠেছে বিশাল আর্থিক নেটওয়ার্ক।

ফুটবল ক্লাবগুলোর আয়ের প্রধান উৎস সাধারণত তিনটি, যেমন–সম্প্রচার স্বত্ব, বাণিজ্যিক আয় এবং ম্যাচডে আয়। সম্প্রচার স্বত্ব বর্তমানে সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস হিসেবে বিবেচিত। টেলিভিশন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো জনপ্রিয় লিগগুলোর খেলা সম্প্রচারের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করে। উদাহরণস্বরূপ, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের সম্প্রচার চুক্তির মূল্য কয়েক বিলিয়ন ডলার। এই অর্থ পরে লিগের ক্লাবগুলোর মধ্যে নির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে বণ্টন করা হয়। ফলে মাঠে সফলতার পাশাপাশি টিভি দর্শকসংখ্যাও ক্লাবগুলোর আর্থিক শক্তি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দ্বিতীয় বড় আয়ের উৎস হলো বাণিজ্যিক কার্যক্রম। জার্সি স্পন্সর, কিট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, অফিসিয়াল পার্টনারশিপ এবং পণ্যের বিক্রি থেকে ক্লাবগুলো বিপুল অর্থ উপার্জন করে। একটি জনপ্রিয় ক্লাবের জার্সি শুধু একটি পোশাক নয়; এটি একটি ব্র্যান্ড। সমর্থকরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ক্লাবের জার্সি, স্কার্ফ, ক্যাপ ও অন্যান্য পণ্য কিনে থাকেন। ফলে ব্র্যান্ড ভ্যালু যত বাড়ে, ক্লাবের বাণিজ্যিক আয়ও তত বৃদ্ধি পায়।

ম্যাচডে আয়ও একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। স্টেডিয়ামে টিকিট বিক্রি, ভিআইপি বক্স, আতিথেয়তা সেবা এবং অন্যান্য সুবিধা থেকে ক্লাবগুলো আয় করে। যদিও কোভিড-১৯ মহামারির সময় দেখা গেছে, শুধু ম্যাচডে আয়ের ওপর নির্ভরশীলতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। দর্শকশূন্য স্টেডিয়ামে খেলা হওয়ার কারণে বহু ক্লাব আর্থিকসংকটে পড়ে। সেই অভিজ্ঞতা ক্লাবগুলোকে আয় বৈচিত্র্যকরণের গুরুত্ব আরও ভালোভাবে বুঝিয়েছে। ফুটবল ফাইন্যান্সের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো খেলোয়াড় স্থানান্তর বা ট্রান্সফার মার্কেট। বর্তমান সময়ে একজন তারকা ফুটবলারের জন্য শত শত মিলিয়ন ইউরো ব্যয় করা অস্বাভাবিক কিছু নয়। অনেক সময় একজন খেলোয়াড়কে কেনার জন্য যে অর্থ ব্যয় করা হয়, তা একটি ছোট ক্লাবের পুরো মৌসুমের বাজেটের চেয়েও বেশি। তবে ট্রান্সফারকে শুধু ব্যয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বড় ক্লাবগুলো অনেক ক্ষেত্রে খেলোয়াড়কে বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করে। তরুণ প্রতিভা কম দামে কিনে পরবর্তীতে বেশি দামে বিক্রি করা এখন অনেক ক্লাবের ব্যবসায়িক মডেলের অংশ।

এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের সঙ্গে ঝুঁকিও রয়েছে। কোনো খেলোয়াড় প্রত্যাশিত পারফরম্যান্স দিতে ব্যর্থ হলে সেই বিনিয়োগ ক্ষতিতে পরিণত হতে পারে। আবার দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এবং উচ্চ বেতনের কারণে ক্লাবের আর্থিক ভারসাম্যও নষ্ট হতে পারে। এ কারণেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং আর্থিক বিশ্লেষণের ব্যবহার বেড়েছে। ক্লাবগুলো এখন খেলোয়াড় কেনার আগে শুধু মাঠের পারফরম্যান্স নয়, তার বাণিজ্যিক সম্ভাবনা, বয়স, আঘাতের ইতিহাস এবং ভবিষ্যৎ বাজারমূল্যও বিবেচনা করে। ফুটবল অর্থনীতিতে বেতনের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শীর্ষ ক্লাবগুলোর ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ সাধারণত খেলোয়াড় এবং কোচিং স্টাফের বেতন। অনেক ক্লাব তাদের মোট আয়ের অর্ধেকেরও বেশি বেতন খাতে ব্যয় করে। অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি ক্লাবের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বেতন-আয় অনুপাত নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। কারণ আয় কমে গেলে উচ্চ বেতনের চাপ দ্রুত আর্থিকসংকট সৃষ্টি করতে পারে। এ বাস্তবতা মোকাবিলার জন্য ইউরোপীয় ফুটবলে বিভিন্ন আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো ফিন্যান্সিয়াল ফেয়ার প্লে (FFP)। এই নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো ক্লাবগুলো যেন তাদের আয়ের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যয় না করে। যদিও এনিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবুও আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সাম্প্রতিক সময়ে আরও কঠোর আর্থিক নিয়ম প্রণয়ন করা হয়েছে, যাতে ক্লাবগুলো টেকসই ব্যবসায়িক মডেল অনুসরণ করতে বাধ্য হয়।

ফুটবলে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও ক্রমাগত বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং এশিয়ার বিভিন্ন বিনিয়োগ গোষ্ঠী ইউরোপের ক্লাবগুলোতে বিনিয়োগ করছে। অনেক ক্ষেত্রে ক্লাবকে শুধু ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সম্পদ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নতুন মালিকরা আধুনিক স্টেডিয়াম নির্মাণ, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক বাজার সম্প্রসারণে অর্থ ব্যয় করছেন। এর ফলে ক্লাবগুলোর আয় বাড়ছে। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। নারী ফুটবলের অর্থনীতিও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। একসময় যে খাতটি প্রায় সম্পূর্ণভাবে অনুদাননির্ভর ছিল, এখন সেখানে স্পন্সরশিপ, সম্প্রচার চুক্তি এবং দর্শকসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক বড় ক্লাব তাদের নারী দলকে আলাদা ব্যবসায়িক ইউনিট হিসেবে গড়ে তুলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দশকে নারী ফুটবল হবে ক্রীড়া অর্থনীতির সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ক্ষেত্রগুলোর একটি।

ডিজিটাল প্রযুক্তি ফুটবল ফাইন্যান্সে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম এবং কনটেন্ট ব্যবসা এখন ক্লাবগুলোর জন্য নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি করছে। একটি ক্লাবের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনুসারীর সংখ্যা আজ তার বাণিজ্যিক মূল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সমর্থকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ ব্র্যান্ডিং এবং বিপণনকে আরও শক্তিশালী করেছে। তবে ফুটবল অর্থনীতির সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অতিরিক্ত ব্যয়, ঋণের বোঝা, প্রতিযোগিতামূলক বৈষম্য এবং আর্থিক স্বচ্ছতার অভাব অনেক সময় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ধনী মালিকানার ক্লাব এবং ঐতিহ্যবাহী কিন্তু সীমিত আয়ের ক্লাবগুলোর মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। এর ফলে খেলাধুলার প্রতিযোগিতামূলক সৌন্দর্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল নিয়ে আয়োজিত হচ্ছে বিশ্বকাপ, যার আয়োজক তিনটি দেশ–যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। দল এবং ম্যাচ সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে টিকিট বিক্রি, সম্প্রচার স্বত্ব, স্পন্সরশিপ এবং পর্যটন খাত থেকে রেকর্ড পরিমাণ আয় হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে বিশ্বের বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান এই আসরকে ঘিরে বিপণন পরিকল্পনা সাজাতে শুরু করেছে। বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ এখন শুধু ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং একটি বাণিজ্যিক পণ্যও বটে।

বাংলাদেশও এ অর্থনৈতিক প্রবাহের বাইরে নয়। যদিও বিশ্বকাপে আমাদের কোনো দল নেই, তবুও এ আয়োজনকে কেন্দ্র করে দেশের বাজারে ফুটবল জার্সি, পতাকা, টেলিভিশন, ইন্টারনেট সেবা এবং বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। বিজ্ঞাপনদাতারা বিশেষ প্রচার চালায়, রেস্টুরেন্ট ও ক্যাফেগুলো খেলা দেখার আয়োজন করে, এমনকি ছোট ব্যবসায়ীরাও বাড়তি আয়ের সুযোগ পান। অর্থাৎ বিশ্বকাপের উত্তেজনা শুধু আবেগের নয়, এটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক। ফুটবলের প্রতি মানুষের ভালোবাসাই আজ বিশ্বব্যাপী একটি বিশাল অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ নিয়েছে, যার প্রভাব মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে সমাজ ও ব্যবসার বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। সবশেষে বলা যায়, আধুনিক ফুটবল আর শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়। এটি একটি জটিল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে কৌশল, বিনিয়োগ, বিপণন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা সমান গুরুত্বপূর্ণ। মাঠে গোল যেমন ম্যাচের ফল নির্ধারণ করে, তেমনি বোর্ডরুমে নেওয়া আর্থিক সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে একটি ক্লাবের ভবিষ্যৎ। ফুটবলের জনপ্রিয়তা যত বাড়ছে, ততই এর অর্থনৈতিক গুরুত্বও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই ফুটবলকে বুঝতে হলে শুধু খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স নয়, এর পেছনের অর্থনীতিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। ফুটবল ফাইন্যান্সের এই বিশাল জগৎই প্রমাণ করে যে, আধুনিক ক্রীড়াঙ্গনে অর্থনীতি এবং খেলা এখন একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

লেখক: ব্যাংকার ও লেখক