উত্তরবঙ্গকে তিলে তিলে হত্যা করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘উত্তরবঙ্গকে তিলে তিলে হত্যা করা হয়েছে। এখনো এই অঞ্চল থেকে মানুষ ছুটে যায় রাজধানীর দিকে। তিনটি বাস্তব প্রয়োজনে ছোটেন তারা। উন্নত শিক্ষা, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা ও ছোট্ট একটা চাকরি। আমরা মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে কথা দিচ্ছি, ঘরে বসে উত্তরবঙ্গকে আপনারা রাজধানী বানাবেন ইনশাল্লাহ’।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) বেলা ১১টায় গাইবান্ধার পলাশবাড়ী এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত নির্বাচনি জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি নির্যাতিত মানুষের কন্ঠ হয়ে এসেছেন জানিয়ে বলেন, ‘বিগত সাড়ে ১৫ বছর গোটা দেশ এবং জাতি ফ্যাসিবাদের কবলে পড়ে নির্যাতিত হয়েছে। আমি এসেছি সেই নির্যাতিত মানুষের কন্ঠ হয়ে। যে সমস্ত কচি শিশুরা বাবা হারিয়ে এতিম হয়েছে, তাদের গল্প শোনাতে। আমি ১০ দলের পক্ষ থেকে তাদেরকে সান্ত্বনা দিতে এসেছি’।
তিনি বলেন, ‘বিগত তিনটি নির্বাচনে আমাদের যুব সমাজ সাধারণ জনগণ তাদের ভোট দিতে পারেনি। এবার অনেক অপেক্ষার পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট হচ্ছে। এই ১২ তারিখ শহিদদের সম্মান করতে গিয়ে বাংলাদেশের বস্তাপচা অতীতের ৫৪ বছর যে ব্যবস্থা শাসকদেরকে দুর্নীতিবাজ, দখলবাজ, চাঁদাবাজ, অত্যাচারী, খুনি, ধর্ষক এবং আয়নাঘরের নায়ক নায়িকা বানায়, তা পরিবর্তন করে দেওয়ার জন্য আমরা হ্যাঁ ভোট দেব ইনশাল্লাহ। হ্যাঁ ভোটের পক্ষে জোয়ার তুলতে হবে। তবে অতীতের বস্তাপচা সকল ব্যবস্থা যেন ভেসে যায়। গণভোট সফল হলে সাধারণ নির্বাচন সফল হবে’।
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাইবান্ধা-৩ (পলাশবাড়ী-সাদুল্লাপুর) আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ও জেলা জামায়াতের রাজনৈতিক সেক্রেটারি মাওলানা নজরুল ইসলাম।
বক্তব্য দেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনের জামায়াতের প্রাথী ও জেলা জামায়াতের সাবেক আমির আবদুর রহিম সরকার, গাইবান্ধা-২ ( সদর) আসনের জামায়াতের প্রাথী ও জেলা জামায়াতের আমির মো. আবদুর করিম, গাইবান্ধা-৫ (ফুলছড়ি-সাঘাটা) আসনের জামায়াত প্রার্থী ও জেলা জামায়াতের সিনিয়র নায়েবে আমির বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল ওয়ারেছ, গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের জামায়াতের প্রার্থী ও জেলা জামায়াতের সিনিয়র নায়েবে আমির মাজেদুর রহমানসহ স্থানীয় নেতারা বক্তব্য রাখেন।
শেষে জামাতের আমির গাইবান্ধার পাঁচজন দলীয় প্রার্থীকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক হাতে দিয়ে সবার সামনে পরিচয় করিয়ে দেন।
জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা যুবকদের হাতে বেকার ভাতা দেব না, বেকার ভাতা বেকার তৈরির কারখানায় পরিণত হবে। আমাদের যুবকরা বেকার ভাতা চায় না। আমাদের যুবক যারা আছেন, তারা তাদের হাতের ন্যায্য কাজটা চায়। আমরা ইনশাআল্লাহ প্রত্যেকটা যুবক-যুবতীর হাতকে আমরা বাংলাদেশের দেশ গড়ার কারিগরের হাতে পরিণত করব। আমরা তাদেরকে বাস্তব শিক্ষা দিয়ে দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলব। এরপর গৌরবের সাথে দেশে হোক প্রবাসে হোক, সম্মানের সাথে সে আয় রোজগার করবে, চাকরি করবে, ব্যবসা করবে ইনশাল্লাহ’।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা উত্তরবঙ্গকে পুরো ইন্ডাস্ট্রিজে পরিণত করতে চাই। এটা সম্ভব। এখানে বাংলাদেশের শস্যের তিন ভাগের এক ভাগ সারা বাংলাদেশকে ধান, চাল, ভুট্টা গম সরবরাহ করে। এক কথায় বলতে গেলে এটি হচ্ছে বাংলাদেশের খাদ্যের একটি ভান্ডার। কিন্তু আফসোস- কৃষক তো পণ্যের ন্যায্য মূল্য পায় না। দুটি কারণে তারা ন্যায্য মূল্য পায় না, একটি হচ্ছে- মধ্যস্বত্বভোগীরা এখানে এসে কামড় দেয়, আরেকটি হচ্ছে ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজরা অস্থির করে তোলে। আমরা সেই চাঁদাবাজদের নির্মূল করবো ইনশাল্লাহ। ভয় পেয়ো না চাঁদাবাজ। তোমরাও এই সমাজের মানুষ। আমরা ইনশাআল্লাহ তোমাদের হাতেও সম্মানের কাজ তুলে দেব। তোমরাও সম্মানের সাথে বসবাস করবা। সেদিন আর মুখ লুকিয়ে তোমাদেরকে চলতে হবে না সমাজে। তোমাদের মা-বাপকে আর কেউ চাঁদাবাদের মা-বাপ বলবে না’।
আমরা পর্যায়ক্রমে সব জায়গায় মেডিকেল কলেজ গড়ে তুলব। সব জায়গায় সরকারি বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে তোলা হবে।
নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেক নেতৃবৃন্দ জেল খেটেছেন, ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলেছেন হাসতে হাসতে। প্রিয় বাংলাদেশ ছেড়ে আমরা যাইনি, আমরা ছিলাম। জীবনের সম্পদের, ইজ্জতের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশের সাথে ছিলাম। কেন ছিলাম, কারণ এই দেশের মাটিটাকে বড় ভালোবাসি। হে মাটি তোমাকে ফেলে যাব না। কিন্তু শুধুমাত্র জালিমের ভয়ে দেশ থেকে পালিয়ে যাব তা করব না। আমরা যদি সময়ের কোকিল হই, তাহলে সময় যখন আসবে, তখন এসে আপনাদেরকে গান শোনাব কুহু কুহু। সময় যখন চলে যাবে, ডানা মেলে তখন আমরা উড়ে যাব। আর যদি আমরা আপনাদের একজন হই, কোথায় যাব আপনজন ফেলে। যাবো না ইনশাআল্লাহ এখানেই থাকব। শিশুদের জন্য মেধা বিকাশের একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই’ যোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের মায়েদের জন্য ঘরে-বাইরে চলাচলে, কর্মস্থলে শতভাগ সম্মান এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই। আমাদের জীবনের চেয়ে মায়ের সম্মান অনেক দামি। ইনশাআল্লাহ আমাদের সকল মেধা যোগ্যতা দিয়ে মায়েদের সম্মান নিশ্চিত করব। তারা দেশ গড়ার কাজে সমান তালে এবং যোগ্যতা প্রয়োজন মোতাবেক তারাও আমাদের সাথে অবদান রাখবেন। রাষ্ট্রের সকল কাজে তারা শরিক থাকবেন ইনশাল্লাহ। এতে দুটি জিনিসের অভাব পূরণ হবে, একটি কর্ম ক্ষেত্রে সম্মান নাই অপরটি নিরাপত্তা নাই। আমরা কথা দিচ্ছি, আপনাদেরকে মায়ের সম্মান দেব এবং জান প্রাণ দিয়ে আপনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করব। আপনারা যদি আমাদের সাথে থাকেন, সেই বাংলাদেশটা আমরা করতে চাচ্ছি’।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘কর্মসংস্থানের জন্য এখানে ইপিজেড হওয়া জরুরি। আমরা অবশ্যই এটার দিকে মনোযোগ দেব। বালাসি ও বাহাদুরাবাদ ঘাটকে সেতুর মাধ্যমে জোড়া দিতে চেষ্টা করব, আপনারা দোয়া করবেন। চুরির টাকাগুলো যদি ফেরত পাই, আর নতুন চোরদের হাত যদি আমরা অবস করে দিতে পারি, তাহলে বাংলাদেশের উন্নয়ন লাফিয়ে লাফিয়ে হবে’।
এর আগে আজ শনিবার সকালে শফিকুর রহমান রংপুরের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহিদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করবেন। পরে বগুড়ায়, সিরাজগঞ্জে ও পাবনায় জনসভা করবেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। এরপর তিনি সড়কপথে ঢাকায় ফিরবেন।
গতকাল শুক্রবার জামায়াতের আমীর শফিকুর রহমান পঞ্চগড়, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও রংপুরে জনসভায় বক্তব্য দেন।
রফিক খন্দকার/অমিয়/