ক্রোধ বা রাগ মানুষের প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়ার অংশ। প্রতিটি মানুষের জীবনেই রাগের উদ্রেক হয়। তবে সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন তা নিয়ন্ত্রণের সীমা ছাড়িয়ে যায়। অতিরিক্ত রাগ জীবনকে ধ্বংস করে দিতে পারে। গবেষণা বলছে, নিয়ন্ত্রণহীন রাগ উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, এমনকি মানসিক অস্থিরতারও কারণ হয়। রাগের প্রভাবে মানুষ ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, অন্যকে আঘাত করে এবং সম্পর্ক নষ্ট করে ফেলে। তাই রাগ সংবরণ করা মানসিক সুস্থতার পাশাপাশি সামাজিক শান্তির জন্যও অপরিহার্য।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ক্রুদ্ধ হলে সে যেন নীরব থাকে।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৬৯৩, ৪০২৭)। ইমাম বাকির (রহ.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই এই রাগ হলো শয়তানের প্রজ্বলিত একটি স্ফুলিঙ্গ, যা আদম সন্তানের হৃদয়ে জ্বলে ওঠে।’ (আল-কুলায়নী, আল-কাফি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩০৪, হাদিস, ১২)
কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের যা দেওয়া হয়েছে, তা এই পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়ী ভোগ। কিন্তু আল্লাহর কাছে যা আছে, তা উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী। এটি তাদের জন্য যারা ঈমান আনে, তাদের রবের ওপর ভরসা করে, বড় পাপ ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত থাকে এবং রাগের সময় ক্ষমা করে।’ (সুরা শুরা, ৩৬-৩৭)
কোরআনে আরও বলা হয়েছে, ‘তোমাদের যা দেওয়া হয়েছে, তা এই পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়ী ভোগ। কিন্তু আল্লাহর কাছে যা আছে, তা উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী। এটি তাদের জন্য যারা ঈমান আনে, তাদের রবের ওপর ভরসা করে, বড় পাপ ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত থাকে এবং রাগের সময় ক্ষমা করে।’(সুরা শুরা, ৩৬-৩৭)
রাগ সংবরণ: রাগ সংবরণ করা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে রাগ সংবরণ করাকে খোদাভীরুদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘যারা সচ্ছলতায় ও অভাবে আল্লাহর পথে ব্যয় করে, যারা রাগ দমন করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুহসিনদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, ১৩৩-১৩৪)
হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) রাগ থেকে দূরে থাকার তাগিদ দিয়েছেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবিজির কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে অসিয়ত করুন।’ নবিজি বললেন, ‘রাগ করো না।’ লোকটি কয়েকবার একই কথা বলল। নবিজি প্রত্যেকবারই উত্তর দিলেন, ‘রাগ করো না।’ (সহিহ বুখারি, ৬১১৬)। অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘শক্তিশালী সে নয়, যে প্রতিপক্ষকে পরাভূত করে; প্রকৃত শক্তিশালী হলো ওই ব্যক্তি, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (সহিহ মুসলিম, ২৬০৯)
রাগ নিয়ন্ত্রণের উপায়: হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) রাগ সংবরণের বিভিন্ন উপায় শিখিয়েছেন, তন্মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো—
অজু করা: অজু মানুষের হৃদয় ও মনে প্রশান্তি নিয়ে আসে এবং রাগ প্রশমিত করে। হজরত আতিয়া ইবনে উরওয়া সাদি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রাগ আসে শয়তানের পক্ষ থেকে, শয়তানকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে, আর আগুন পানি দ্বারা নির্বাপিত হয়। সুতরাং তোমাদের কোনো ব্যক্তির রাগ হলে সে যেন অজু করে নেয়।’ (সুনানে আবু দাউদ, ৪৭৮৪)
আউজুবিল্লাহ পড়া: আউজুবিল্লাহ পড়া মানে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা। রাগ শয়তানের প্ররোচনা। তাই আল্লাহর নিকট আশ্রয় নেওয়া এর সবচেয়ে কার্যকর প্রতিকার। হজরত সুলাইমান ইবনে সুরাত (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘দুই ব্যক্তি নবিজির সামনে গালাগালি করে। ফলে তাদের একজনের চোখ লাল হয়ে যায় এবং গলার রগ ফুলে ওঠে। নবিজি (সা.) তখন বললেন, আমি এমন একটা দোয়া জানি, যদি কেউ তা রাগের সময় পাঠ করে, তবে তার ক্রোধ চলে যায়। দোয়াটি হলো—‘আউজুবিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজিম পাঠ করা।’ (সুনানে আবু দাউদ, ৪৭০৬)
অবস্থান পরিবর্তন: রাগের সময় অবস্থান পরিবর্তন করলে রাগের মাত্রা অনেকটাই হ্রাস পায়। হজরত আবু জর গিফারি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কারও রাগ হয়, তখন সে দাঁড়িয়ে থাকলে যেন বসে যায়। যদি তাতে রাগ দূর হয় তা হলে তো ভালো, অন্যথায় সে যেন শুয়ে পড়ে।’ (সুনানে আবু দাউদ, ৪৭৮২)
নীরব থাকা: রাগের সময় বলা কথাগুলো অনেক সময় অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তা ছাড়া কথা কাটাকাটি কিংবা চালাচালি হতে থাকলে ধীরে ধীরে রাগও তীব্র আকার ধারণ করে। এ জন্য রাগের সময় চুপ হয়ে যাওয়া উচিত। এতে রাগ প্রশমিত হয়। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কারও রাগ হয়, সে যেন নীরব থাকে।’ (মুসনাদে আহমাদ, ২১৩৬)
রাগ মানুষের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার অংশ হলেও এর সঠিক নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। ইসলাম রাগকে শয়তানের প্ররোচনা হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং তা সংবরণ করার শিক্ষা দিয়েছে। যে ব্যক্তি রাগ দমন করে, সে প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী এবং মহান আল্লাহর প্রিয় বান্দা। জীবনের প্রতিটি স্তরে তাই রাগ সংবরণকে অভ্যাসে পরিণত করা উচিত।
লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ