ভাষা আন্দোলন হয়েছে ৭২ বছর। ভাষা আন্দোলনের পর অনেক সংগ্রাম শেষে স্বাধীনতা এসেছে তাও হয়ে গেল ৫৩ বছর। ভাষা আন্দোলনকে এখনো আমরা বাংলাদেশের মাতৃ-আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করি। যেকোনো প্রতিবাদ-আন্দোলনের শুরুতে সমাবেশ করি শহিদ মিনারে। এখনো সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, একই প্রশ্ন, যা করে আসছেন ৫৩ বছর- ‘ভাষা আন্দোলনের চেতনার বাস্তবায়ন হয়েছে কতটুকু’?
এর দুটি দিক আছে, একটি দিক হচ্ছে- আন্দোলনের ফল। আন্দোলনের ফলে পাকিস্তানের সেটি অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হয়েছে, যেটার একটা ইতিবাচক ফল আমরা পেয়েছি। এবং পাকিস্তান-ঔপনিবেশিক আমলে এই ভাষাটাকে কেন্দ্র করে জাতিসত্তা বা জাতীয়তাবাদের বিকাশ হয়েছে। সুতরাং, ভাষা আন্দোলনের ক্ষেত্রে আমরা বলব যে, এটা একটা ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। বাংলা একাডেমি হয়েছে। বাংলা একাডেমি সেই পাকিস্তান আমল থেকে এ পর্যন্ত বাংলা ভাষার উৎকর্ষ সাধনে কাজ করে যাচ্ছে। শহিদ মিনার সারা দেশেই বাংলাদেশের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবং আমি মনে করি, আমাদের সমস্ত আন্দোলন-সংগ্রামের মূলেই ভাষা আন্দোলনের চেতনা নিহিত। নিহিত না-হলেও কিন্তু যেকোনো আন্দোলন শুরু করার আগে আমরা শহিদ মিনারে যাই। কেউ নতুন পদ পেলে শহিদ মিনারে যান। তাই না? প্রতিবাদ জানাতে আমরা শহিদ মিনারে যাই।
সুতরাং, ওইদিক থেকে ভাষা আন্দোলন আমাদের মর্মে গেঁথে গেছে। আমার কাছে মনে হয়েছে- মুক্তিযুদ্ধের থেকে এখনো ভাষা আন্দোলনের জোরটা আমাদের বেশি। মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহিদ হলেন, ২ লাখেরও বেশি নারী ধর্ষিত হলেন। এত অত্যাচার, তারপরও দুঃখজনক হলেও বলতে হয়- মুক্তিযুদ্ধের কথা কিন্তু এ প্রজন্ম তেমন মনে রাখেনি; আমরাও তেমনভাবে মনে রাখিনি! কিন্তু ভাষা আন্দোলনটা বা বায়ান্নটা সব সময় আমাদের গতি পেয়েছে। কারণটা কী? কারণটা হচ্ছে- পরম্পরা। পাকিস্তান আমলের সবকিছুই ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে; আমাদের সব কিছু এগিয়েছে। ফলে এক জেনারেশন থেকে আরেক জেনারেশনে, আরেক জেনারেশন থেকে আরেক জেনারেশনে পরম্পরা হয়েছে, গেঁথে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের পরও তা-ই হয়েছে। এবং মুক্তিযুদ্ধের পরও যে পাকিস্তানি-মনা শাসন ছিল, সেই শাসনেও কিন্তু তারা এই পরম্পরা ব্যাহত করেনি। ফলে ভাষা আন্দোলন সব সময় রয়েই গেছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পর পরই, ’৭৫-এর পর প্রায় ৩০ বছর ‘মুক্তিযুদ্ধের পরম্পরা’ ব্যাহত হয়েছে। যে কারণে আমরা একটা ক্ষেত্রে এর পার্থক্য দেখি।
প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলা ভাষাকে যে মর্যাদা দেওয়ার কথা সেটা কখনো পায়নি। পাকিস্তান আমলে সবার উচ্চপর্যায়ের লেখাপড়া হয়েছে ইংরেজিতে, সেখানে বাংলার স্থান ছিল না। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশ হওয়ার পরও বঙ্গবন্ধু এতবার হুকুম দিয়েও অফিস-আদালত থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় বাংলা ভাষা চালু করতে পারেননি। ’৭৫-এর পর থেকে বাংলাদেশের ৩০ বছর- খুব সুচতুরভাবে বাংলা ভাষাকে হটিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটার কারণ হচ্ছে এই, ভাষার জাতীয়তাবাদ যেন না গড়ে ওঠে এবং শিকড়হীন মানুষ যদি হয়, তাহলে তাদের যে রাজনীতি সে রাজনীতিটা করতে সুবিধা হবে। সে জন্য আমরা দেখছি যে, ভাষা হটে যেতে যেতে একেবারে শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। শুধু তাই নয়, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারের আমলেও কিন্তু এটার প্রশ্নে রয়েছে একেবারে উদাসীন! এমনকি সংবিধানে যেখানে তৃতীয় ধারায় যে আছে, বাংলা ভাষায় সব কিছু করতে হবে, আদালত কিন্তু সংবিধান মানছে না, তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে রায়গুলো বাংলায় দেয় না। এই যে বিষয়, এভাবে আমরা দেখছি যে, সাংবিধানিকভাবে এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলা ভাষা হটে যাচ্ছে। আজকাল শিক্ষাব্যবস্থা থেকেও একটা চরম ঔদাসীন্য দেখানো হচ্ছে বাংলা ভাষার প্রতি। বাংলা ভাষা বিকৃত হচ্ছে। বিশেষ করে টেলিভিশন ও রেডিওতে স্মার্টনেসের নামে যা করা হচ্ছে তা গ্রাম্যতা, কিন্তু এটা যে গ্রাম্যতা ও মূর্খতা, তা বোঝার মতো তাদের সে বোধই নেই। সুতরাং আমি বলব, বাংলা ভাষার অবস্থা এখন প্রাতিষ্ঠানিকগতভাবে খুবই খারাপ।
মন থেকে, মধ্যবিত্ত সমাজ থেকে, সরকার থেকে বাংলা ভাষার এগিয়ে চলার পথে বিভিন্ন প্রতিবন্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। আমার বাবার জেনারেশন আমাদের বাংলা খুলে পড়িয়েছেন, আমি দীর্ঘ ৫০ বছর বাংলায় শিক্ষকতা করেছি। কিন্তু আমাদের পরবর্তী জেনারেশন যারা মধ্যবিক্ত/উচ্চ মধ্যবিত্ত হয়ে গেছে তারা সন্তানদের পাঠাচ্ছে ইংরেজি স্কুলে। বাসায় তাদের সন্তানরা ইংরেজি চর্চা করছে। কথাও বলছে ইংরেজিতে। আমি দেখেছি, পত্রপত্রিকায় আমাদের বন্ধুবান্ধবদের অনেকে কলাম লিখছেন বাংলায় বিভিন্ন ইংরেজি শব্দ মিশিয়ে। চাকরিপ্রার্থীকে প্রথমেই ইংরেজিতে প্রশ্ন করে জানতে চাওয়া হয় তাদের ইংরেজি বিদ্যার দৌড় কতটুকু।
সমস্যা হচ্ছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় (ইংরেজিতেও) পড়ানো হচ্ছে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে। তারপর চাকরির ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে ইংরেজি ভাষাকে। বৈষম্য এখানেই তৈরি হচ্ছে। শুধু তাই নয়, শিক্ষক হিসেবে দেখছি, ছাত্ররা ইংরেজি দূরে থাক, বাংলাতেও মনের ভাব স্পষ্ট করতে পারে না, বাক্য গঠনে ভুল, বানান ভুল। ইংরেজি স্কুল থেকে যারা আসছে তাদের ইংরেজি লেখাতে এত ভুল নেই। এরকমটা হচ্ছে কেন?
এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখেছি, প্রাথমিক বা মাধ্যমিকে খুব কম ক্ষেত্রে সঠিকভাবে পড়ানো হয়। প্রাথমিক শিক্ষকরা বাংলা ও ইংরেজিতে দুর্বল, উচ্চারণ শুদ্ধ নয়। ছাত্ররা নিয়মিত আসে না, শিক্ষকরাও। এক ধরনের শৈথিল্য বিরাজ করছে। পরীক্ষার খাতা ভালোভাবে মূল্যায়ন হয় না। কারণ, একটা অদৃশ্য চাপ থাকে পাশের হার বাড়াতে হবে। মাধ্যমিকেও তাই, এসব প্রতিষ্ঠান পর্যবেক্ষণের জন্য অফিসার আছেন। তারা স্কুলগুলোতে গিয়ে এসব দেখাশোনা করেন না। সরকারি কলেজে শিক্ষক অপ্রতুল। অনার্স খোলা হয়েছে বিভিন্ন কলেজে, কিন্তু শিক্ষক নেই। বেসরকারি কলেজের কথা নাই বা বললাম। আমরা যাদের পাচ্ছি শিক্ষা শেষে, তাদের নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। সরকার আর্থিক/অবকাঠামো উন্নয়নে জোর দিচ্ছেন সেটি প্রশংসনীয়। এ ক্ষেত্রে জিডিপি বাড়ছে। কিন্তু শিক্ষা-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে জিডিপি কি বাড়ছে? এ ক্ষেত্রে জিডিপি না বাড়লে, দক্ষ জনশক্তির অভাবে উন্নয়ন ব্যাহত হবে। আলোচনা করলেও বলা হয় সমালোচনা, যেন আমরা বিরোধী পক্ষ।
ভাষার প্রতি আবেগ ছিল, তাই ভাষা আন্দোলন হয়েছে। বঙ্গবন্ধু সব সময় বাংলার কথা বলে আন্দোলন করেছেন। নিজ ভাষা আবেগের সৃষ্টি করে। সে আবেগ দেশের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে। বাংলা এখন পৃথিবীর ষষ্ঠ বৃহত্তম ভাষা কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তা গণ্য নয়, কারণ এর অনৈতিক শক্তি নেই। ভাষা বৈষম্য সৃষ্টি করা হচ্ছে। এত কিছুর পরও মনে করি বাংলা ভাষাকে হটানো মুশকিল হবে।
বাংলা ভাষা সব সময় গরিবদের ভাষাই ছিল। এ দেশে এক সময় পালি-প্রাকৃত-সংস্কৃত-ফারসি-ইংরেজি এসব ভাষা রাজভাষা হিসেবে ছিল। শাসকদের ভাষা। কিন্তু গরিবরাই তো বাংলা ভাষায় কথা বলেছে, বাংলা ভাষার উন্নয়নটা তারাই করেছে। এখনো সেই গরিবদের ভাষাই রয়ে গেছে বাংলা ভাষা। ওপরের এই যে ভিনদেশি-মনা, পাকিস্তানি-মনা; বা আমি বলব যে শিকড়হীন প্রবাসী এরা হচ্ছে সবাই এক অর্থে ‘প্রবাসী’। এই প্রবাসীদের সংখ্যা কিন্তু ওই তুলনায় অনেক কম। একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, এতকিছু সত্ত্বেও কিন্তু বাংলা ভাষা দমন করা যায়নি। বাংলা ভাষা সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষাই রয়ে গেছে। এখানেও তা-ই থাকবে। শুধু তা-ই না, বাঙালি ও বাংলার কেন্দ্র কিন্তু এই বাংলাদেশেই হবে বা ঢাকাই হবে।
লেখক: শিক্ষাবিদ, লেখক ও ইতিহাস গবেষক