বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই আমরা অনুভব করি দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমের নিবিড় স্পন্দন, সব বন্ধন থেকে মুক্তির প্রাণোচ্ছ্বাস। বাঙালি মুক্তিদাতা বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির মাঝে অনুপ্রেরণা, আস্থা, বিশ্বাস ও আশ্রয়ের প্রতীক হিসেবে চিরদিন ভাস্বর হয়ে থাকবেন। বঙ্গবন্ধুর জীবনদর্শনই আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী।…
১৫ই আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের শহিদ সদস্যসহ ওই অভিশপ্ত প্রত্যুষে শাহাদাতবরণকারী সবার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। বিগত ৫০ বছরের ইতিহাসে পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট আমাদের জীবনে একটি অভিশপ্ত দিন, কলঙ্কিত দিন।
১২১ বছর আগে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত কবিতার পঙ্ক্তি ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’ বঙ্গবন্ধুর জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্টের সেই অভিশপ্ত প্রত্যুষে যিনি নির্ভয়ে, নিঃশঙ্ক চিত্তে আভিজাত্যের সঙ্গে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারেন, যিনি একাত্তরের ২৫ মার্চের ভয়াবহ রাতে ভয়শূন্যভাবে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের নিজ বাসভবনে বসে ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন- ‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন’, যিনি একত্তরের ৭ই মার্চ অপরাহ্নে ঢাকার তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বিশাল জনসমুদ্রের ওপর যখন বর্বর পাকিস্তান বাহিনীর সেনা হেলিকপ্টার উড্ডয়নরত তখন বজ্রকণ্ঠে উচ্চারণ করেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’, যিনি ১৯৫২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি কারাগারে বসেই বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে অনশন শুরু করতে পারেন, তখন বাংলা ভাষাভাষী কাউকে আর বলতে হয় না যে রবীন্দ্রনাথ জীবন সায়াহ্নে এসে ‘ওই মহামানব আসে’ বলে যে ইঙ্গিত করেছিলেন তা সংগ্রামমুখর, রোমাঞ্চকর, মানবমুক্তির অনুভূতিশীলতায় পরিপূর্ণ সম্মোহনী ব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধুর সংক্ষিপ্ত কিন্তু বহুবর্ণিল জীবনের সঙ্গে সর্বাংশে সমার্থক। বাঙালির স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে বাঙালিকে সন্নিবদ্ধ জাতিসত্তা পরিচয়ে পরিচিত করে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে বঙ্গবন্ধু আজ বিশ্বস্বীকৃত।
সর্বদা মাথা উঁচু রেখে আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু আমৃত্যু রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়ে বাঙালি জাতিকে এক অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করে গেছেন।
১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকায় এসে প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট বঙ্গবন্ধুর এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে ফ্রস্টের প্রশ্ন ছিল যে, ‘(একাত্তরের ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে) আপনার ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাড়ি থেকে যখন আপনি বেরিয়ে এলেন, তখন কি ভেবেছিলেন আর কোনো দিন আপনি এখানে ফিরে আসতে পারবেন?’ প্রত্যুত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘না, আমি তা কল্পনা করতে পারিনি। কিন্তু আমার মনের কথা ছিল, আজ যদি আমি আমার দেশের নেতা হিসেবে মাথা উঁচু রেখে মরতে পারি, তাহলে আমার দেশের মানুষের অন্তত লজ্জার কোনো কারণ থাকবে না। কিন্তু আমি ওদের কাছে আত্মসমর্পণ করলে আমার দেশবাসী পৃথিবীর সামনে আর মাথা তুলে তাকাতে পারবে না। আমি মরি, তাও ভালো। তবু আমার দেশবাসীর যেন মর্যাদার কোনো হানি না ঘটে।’
ডেভিড ফ্রস্টের অপর এক প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘যে মানুষ মরতে রাজি তাকে কেউ মারতে পারে না। আপনি একজন মানুষকে হত্যা করতে পারেন, সে তো তার দেহ। কিন্তু তার আত্মাকে কি আপনি হত্যা করতে পারেন? না, তা কেউ পারে না। এটাই আমার বিশ্বাস।’ ফ্রস্টের আর এক প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘সাধারণ মানুষের প্রতিই আমার প্রথম ভালোবাসা। আমি জানি আমি অমর নই। আজ কিংবা কাল, কিংবা পরশু আমাকে মরতে হবে। মানুষ মাত্রই মরণশীল। কাজেই আমার বিশ্বাস, মানুষ মৃত্যুবরণ করবে সাহসের সঙ্গে।’ পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট ঘাতকদের সামনে একইভাবে বঙ্গবন্ধু ছিলেন শান্ত, স্থির, নিরুদ্বেগ ও নির্ভীক। তিনি মাথা উঁচু রেখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন। কারাগারে বসে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকথা এখন গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু রচিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’ ও ‘আমার দেখা নয়া চীন’ গ্রন্থত্রয় নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের অবশ্যপাঠ্য।
বঙ্গবন্ধু রচিত এই তিনটি মূল্যবান গ্রন্থ থেকে আমরা ইতিহাসের বহু অজানা তথ্যের সন্ধান পাই। এই তিনটি গ্রন্থ লেখার পেছনে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বেগম শেখ ফজিলাতুন নেসা মুজিবের নিরন্তর প্রচেষ্টা ও অনুপ্রেরণা আমাদের জাতীয় জীবনে যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে সেজন্য আমরা তার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। দেশের বিভিন্ন সংকটকালে বেগম মুজিব সময়োপযোগী ও বিচক্ষণ পরামর্শ দিয়ে জাতিকে চিরঋণী করে গেছেন।
মানবজীবনের ঘটনাবলির কত অদ্ভুত সাদৃশ্য আমরা দেখতে পাই। কারাগারে বসে লেখা বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের ভূমিকা লিখেছেন তারই কন্যা শেখ হাসিনা ২০০৭ সালে শোকাবহ আগস্ট মাসের ৭ তারিখে ঢাকায় স্থাপিত সাবজেলের অন্ধকার কক্ষে বসে।
বাবার আদর্শ সমুন্নত রেখেই কন্যা শেখ হাসিনা ১৬ কোটি মানুষকে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের ভূমিকায় শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘আমার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের সব থেকে মূল্যবান সময়গুলো কারাবন্দি হিসেবেই কাটাতে হয়েছে। জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলন করতে গিয়েই তাঁর জীবনে বারবার এই দুঃসহ নিঃসঙ্গ কারাজীবন নেমে আসে। তবে তিনি কখনও আপোস করেন নাই। ফাঁসির দড়িকেও ভয় করেন নাই। তাঁর জীবনে জনগণই ছিল অন্তঃপ্রাণ। মানুষের সুখ-দুঃখে তাঁর মন কাঁদত। বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটাবেন, সোনার বাংলা গড়বেন- এটাই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য- এ মৌলিক অধিকারগুলো পূরণের মাধ্যমে মানুষ উন্নত জীবন পাবে, দারিদ্রের কশাঘাত থেকে মুক্তি পাবে, সেই চিন্তাই ছিল প্রতিনিয়ত তাঁর মনে। যে কারণে তিনি নিজের জীবনের সব সুখ আরাম আয়েশ ত্যাগ করে জনগণের দাবি আদায়ের জন্য এক আদর্শবাদী ও আত্মত্যাগী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন, বাঙালি জাতিকে দিয়েছেন স্বাধীনতা।’
বঙ্গবন্ধু আজীবন ন্যায়ের পক্ষে ছিলেন, সত্যের পক্ষে ছিলেন ও সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারের পক্ষে ছিলেন। সত্যের শক্তি আর ন্যায়ের শক্তির চাইতে শক্তিধর আর কী হতে পারে। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থায়ই ১৯৪৮ সালে বলতে পারেন, ‘পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলা না হওয়া পর্যন্ত আমরা সংগ্রাম চালিয়ে যাব। তাতে যাই হোক না কেন, আমরা প্রস্তুত আছি।’ এই উক্তির সঙ্গেই সেই সাহসের সুর নিহিত। মাতৃভাষার অধিকার আদায়ে বাঙালিরা একদিন মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে প্রতিবাদমুখর হয়েছিল। সদ্য প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানে প্রথমবার কারাগারে নেওয়া হয় তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চে। তারপর থেকে পাকিস্তানের ২৪ বছরের ঔপনিবেশিক আমলে এক যুগেরও অধিক সময় বঙ্গবন্ধুকে কারাগারের অভ্যন্তরে সময় কাটাতে হয়। তবে তিনি কারাগারেই থাকুন অথবা কারাগারের বাইরে থাকুন, বঙ্গবন্ধুর সার্বক্ষণিক চিন্তা ছিল বাঙালির সার্বিক মুক্তি ও কল্যাণ।
বাঙালি অবিসংবাদিত নেতা, গণমানুষের নেতা বঙ্গবন্ধু একাত্তরের ৩ জানুয়ারি রমনার রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনসমাবেশে আওয়ামী লীগের নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যসহ ছয় দফা ও এগারো দফা কর্মসূচির ওপর বিশ্বস্ত থাকার শপথ গ্রহণ করেন। লাখ লাখ জনতার সামনে নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের সেদিন অপরাহ্নে নেওয়া শপথবাণীর শেষ বাক্যটি ছিল- ‘জনগণ অনুমোদিত আমাদের কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির প্রয়াসী যেকোনো মহল ও অশুভশক্তির বিরুদ্ধে আমরা প্রবল প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলব এবং সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠাকল্পে যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতঃ আপসহীন সংগ্রামের জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত থাকব।’
প্রাজ্ঞ ও বিচক্ষণ বঙ্গবন্ধু সঠিকভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন যে, নির্বাচিত এই সদস্যগণ সম্ভবত পাকিস্তানের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের ফ্লোরে শপথ নেওয়ার সুযোগ পাবেন না। তাই সাধারণ মানুষের সামনে উন্মুক্ত ময়দানে সব নির্বাচিত সদস্যসহ বঙ্গবন্ধু বাঙালির অধিকার রক্ষায় আত্মত্যাগের শপথ গ্রহণ করে আমাদের মুক্তির সংগ্রামকে তার সম্মোহনী নেতৃত্বে কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যান।
পরবর্তীতে একাত্তরের ৭ মার্চে যখন শপথ গ্রহণের একই স্থানে বঙ্গবন্ধু ১০ লাখ মানুষের সামনে ঘোষণা দেন যে, বাঙালির মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত খাজনা ও ট্যাক্স প্রদান সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে, দেশের সব সরকারি, বেসরকারি অফিস, হাইকোর্ট ও নিম্ন আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সচিবালয় বন্ধ থাকবে ও পশ্চিম পাকিস্তানে কোনো টাকা পাঠানো যাবে না, তখন শপথ অনুষ্ঠানের আগে ও পরে বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন সময় প্রদত্ত বক্তব্য ও মন্তব্যের তাৎপর্য দেশবাসী গভীরভাবে উপলব্ধি করে। বঙ্গবন্ধু যখন বলেন, ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল’ তখন জনগণ সম্মুখ সমর ও মুক্তিযুদ্ধের সব প্রস্তুতি গ্রহণ করে। বাঙালি মুক্তির সনদ ছয় দফা ঘোষণার পর বঙ্গবন্ধু একপর্যায়ে সম্মুখ সমরের কথা বলেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ছিল রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের মূলমন্ত্র আর অবরুদ্ধ দেশবাসীর বীজমন্ত্র। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে যখন বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠে সম্মোহনী ও আবেগমথিত ৭ মার্চের ভাষণ সম্প্রচারিত হতো তখন আক্ষরিক অর্থেই প্রত্যেক বাঙালি দেহের রোম খাড়া হয়ে যেত ও স্মরণে আসত বঙ্গবন্ধুর বৈপ্লবিক উক্তি ‘সংগ্রামী বাংলা দুর্জয়, দুর্বিনীত। কাহারও অন্যায় প্রভুত্ব মানিয়া নেওয়ার জন্য, কাহারও কলোনি হইয়া, বাজার হইয়া থাকার জন্য বাংলার মানুষের জন্ম হয় নাই।’
পাকিস্তান সেনা শাসকদের নির্দেশে পাক হানাদার বাহিনী এ দেশে যেভাবে বর্বরোচিত গণহত্যা, গণধর্ষণ, গ্রামের পর গ্রাম অগ্নিসংযোগ ও পুরুষশূন্য করার মতো মানবতার বিরুদ্ধে নানা অপরাধ সংঘটিত করে, তখন তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আমাদের গেরিলারা প্রাণপণ যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করে। এ বিজয়ের নির্মাতা বঙ্গবন্ধু তার অনুসারী বীরদের এমনভাবেই দীর্ঘ সময় নিয়ে প্রস্তুত করেছিলেন, যা কবি সুকান্তের উচ্চারণে বলতে পারি ‘সাবাস বাংলাদেশ, এ পৃথিবী/ অবাক তাকিয়ে রয়;/ জ্বলে-পুড়ে মরে ছারখার/ তবু মাথা নোয়াবার নয়।’ মাথা উঁচু রাখার রাজনৈতিক দর্শনের উত্তরাধিকার বঙ্গবন্ধু আমাদের দিয়ে গেছেন- আমরা যেন সবসময় তা স্মরণে রাখি। জেল, জুলুম, অত্যাচার, অবিচার, অন্যায় সব সহ্য করেও বঙ্গবন্ধুর আপসহীন নেতৃত্বের শিক্ষাই হচ্ছে আত্মত্যাগ অনুশীলনের শিক্ষা।
বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই আমরা অনুভব করি দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমের নিবিড় স্পন্দন, সব বন্ধন থেকে মুক্তির প্রাণোচ্ছ্বাস। বাঙালি মুক্তিদাতা বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির মাঝে অনুপ্রেরণা, আস্থা, বিশ্বাস ও আশ্রয়ের প্রতীক হিসেবে চিরদিন ভাস্বর হয়ে থাকবেন। বঙ্গবন্ধুর জীবনদর্শনই আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী।
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বাঙালির যে সম্পর্ক সে সম্পর্ক তাকে হত্যা করার মাধ্যমে কখনো ছিন্ন করা যায় না। বাংলাদেশের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্ক, বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্ক একটি চিরস্থায়ী সম্পর্ক। যে কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব প্রকৃত অর্থে মৃত্যুঞ্জয়ী। ব্যক্তি মুজিবকে হত্যা করলেও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা যায় না। তিনি বাঙালি জাতির মাঝে চিরঞ্জীব হয়ে থাকবেন। তিনি বাঙালির চিরস্বজন। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির মূল লক্ষ্যই ছিল বাঙালিসহ সব শোষিত জনগণের মুক্তি ও পৃথিবীর সার্বিক প্রগতি। তিনি মানুষ, মাতৃভাষা, মাতৃভূমি ও বিশ্বমানবতার মুক্তির সংগ্রাম করেই জীবনদান করে গেছেন। বঙ্গবন্ধুর বিশ্বজনীনতা প্রকাশ পায় আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোতে প্রদত্ত ভাষণ-অভিভাষণে।
সদ্য স্বাধীন একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধু যে কয়টি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সেসব সম্মেলনে সবকিছু আবর্তিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে।
জ্যামাইকার কিংস্টনে অনুষ্ঠিত ২০তম কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলনে মৃত্যুর কিছুদিন আগে ১৯৭৫ সালের ২ মে বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘খুব বিলম্ব না হওয়ার আগেই ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক নির্ভরশীলাতাভিত্তিক একটি নয়া আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপনে কমনওয়েলথ রাষ্ট্রসমূহ কাজ করবে।’ ১৯৭৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বঙ্গবন্ধু সে সময়কার বিশ্ববাস্তবতা তুলে ধরে বলেন, ‘এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারে আমাদের মধ্যে মানবিক ঐক্যবোধ ও ভাতৃত্ববোধের পুনর্জাগরণ। বর্তমানের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে একটা ন্যায়সংগত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য যুক্তির শক্তিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা। এ ব্যবস্থায় থাকবে নিজের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর প্রতিটি দেশের সার্বভৌম অধিকারের নিশ্চয়তা।’
যুবসমাজ দেশের সম্পদ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে সে দেশের তরুণ প্রজন্মকে অভিহিত করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু তরুণদের স্নেহ করতেন, ভালোবাসতেন ও তাদের ওপর আস্থা রাখতেন। বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের প্রথম জাতীয় সম্মেলনে ১৯৭৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানে বঙ্গবন্ধু আত্মশুদ্ধ, আত্মপ্রত্যয়ী, আত্মসংযমী, আত্মসমালোচনায় আগ্রহী ও আত্মবিশ্বাসী যুবসমাজের উন্মেষ ও বিকাশের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। স্বাধীন দেশকে দুর্নীতিমুক্ত রাখার জন্য যুবশক্তির প্রতি বঙ্গবন্ধু স্বভাবসুলভ আন্তরিকতায় বলেন, ‘ওয়াদা কর, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করবি।’ বঙ্গবন্ধুর সব ভাষণেই তিনি সততার কথা বলেছেন, দেশপ্রেমের কথা বলেছেন, মানুষকে ভালোবাসার কথা বলেছেন, সাহসিকতা ও আপসহীনতার কথা বলেছেন, বলেছেন কর্তব্যবোধ ও দায়িত্বপালনের কথা। শুধু শোকাবহ আগস্ট মাসেই নয়, শুধু মুজিব শতবর্ষেই নয়, বছরের প্রতিটি দিন বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা-সম্মান নিবেদন আমাদের দায়িত্ব। বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের অর্থই হচ্ছে তার জীবনদর্শন ধারণ করে নিজের জীবনকে বিশুদ্ধ রাখা, আত্মশুদ্ধ করা।
মানুষ মাত্রই ভুল হয়। বঙ্গবন্ধু চর্চায় নিবেদিত ব্যক্তি প্রতিনিয়ত নিজেকে উত্তরোত্তর পরিশুদ্ধ করবেন সেটিই প্রত্যাশিত। বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেছিলেন, ‘আত্মসমালোচনা না করলে আত্মশুদ্ধি করা যায় না। আমি ভুল নিশ্চয়ই করব, আমি ফেরেশতা নই, শয়তানও নই। আমি মানুষ, আমি ভুল করবই। আমি ভুল করলে আমার মনে থাকতে হবে, আই ক্যান রেকটিফাই মাইসেলফ। আমি যদি নিজেকে রেকটিফাই করতে পারি সেখানেই আমার বাহাদুরি।’ (১৯ জুন, ১৯৭৫)
পরিশীলিত, পরিমার্জিত, পরিশুদ্ধ, পরোপকারী, পরশ্রীকাতরতাবিমুখ, পরিমিতিবোধসম্পন্ন মানুষই ছিল বঙ্গবন্ধুর নিকট সোনার মানুষ। বঙ্গবন্ধু তার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার সূত্রও দিয়ে গেছেন। জীবনে তিনি বহুবার বলেছেন, ‘সোনার বাংলা গড়ার জন্য আমার সোনার মানুষ চাই।’ যে প্রজাতন্ত্রের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’, সে দেশের প্রত্যেক নাগরিক হবে সোনার মানুষ- এই ছিল বঙ্গবন্ধুর আজীবনের প্রত্যয় ও প্রত্যাশা।
বঙ্গবন্ধু শতাব্দীর এ সময়ে আসুন, আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের শোককে শক্তিতে রূপান্তরের লক্ষ্যে নিজেদের সোনার মানুষে পরিণত করার প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করি। বঙ্গবন্ধুর দর্শন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হোক আমাদের পথপ্রদর্শক।
বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে বাংলা একাডেমিতে ১৯৭৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত ভাষণের একটি অংশ উদ্ধৃত করে এ প্রবন্ধের সমাপ্তি টানছি। সপ্তাহব্যাপী জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন উদ্বোধন করে বঙ্গবন্ধু সেদিন বলেছিলেন, ‘একটি সুস্থ জাতি গঠনে শিল্প, কৃষি, যোগাযোগব্যবস্থা বা অন্যান্য সর্বক্ষেত্রে যেমন উন্নয়ন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন চিন্তা ও চেতনার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করা।
আমি সর্বত্রই একটি কথা বলি- সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই। সোনার মানুষ আকাশ থেকে পড়বে না, মাটি থেকেও গজাবে না। এই বাংলার সাড়ে ৭ কোটি মানুষের মধ্য থেকে তাদের সৃষ্টি করতে হবে। নবতর চিন্তা, চেতনা ও মূল্যবোধের মাধ্যমেই সেই নতুন মানুষ সৃষ্টি সম্ভব। মানবাত্মার সুদক্ষ প্রকৌশলী দেশের সুধী সাহিত্যিক, শিল্পী, শিক্ষাব্রতী, বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিসেবী। আমি আজকের এ সাহিত্য সম্মেলনে আপনাদের সোনার মানুষ সৃষ্টির কাজে আত্মনিয়োগ করার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।’
জয়তু বঙ্গবন্ধু।
তথ্যসূত্র: বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রপত্রিকা।
লেখক: সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়