শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘রাসেল আব্বাকে ছায়ার মতো অনুসরণ করত। আব্বাকে মোটেই ছাড়তে চাইত না। রাসেলের সবচেয়ে আনন্দের দিন এলো যেদিন আব্বা ফিরে এলেন। একমুহূর্ত যেন আব্বাকে কাছ-ছাড়া করতে চাইত না। সব সময় আব্বার পাশে ঘুরে বেড়াত।’…
বঙ্গবন্ধু আজীবন শিশু-কিশোরদের ভালোবেসে এসেছেন। ছেলেবেলা থেকেই তার দরদি মনের পরিচয় পাই। গরিবদের চাল দেওয়া, নিজের গায়ের চাদর দিয়ে দেওয়া- এ ধরনের নানা কাহিনি তার জীবনী পড়লে জানা যায়।
বঙ্গবন্ধু যে সোনার বাংলা গড়তে চেয়েছিলেন তার অন্তর্গত ছিল শিশু-কিশোররাও। তার মনে হয়েছিল সোনার বাংলা গড়তে হলে শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি তাদের আন্দোলনেও অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন।
গত শতকের ষাটের দশকে বাংলাদেশে শিশু-কিশোরদের জন্য রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই গড়ে তুলেছিলেন ‘কচি-কাঁচা’ নামে একটি সংগঠন। কবি সুফিয়া কামাল, বিজ্ঞানী আবদুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দিন, শিল্পী হাশেম খান- এরা জড়িত ছিলেন এ সংগঠনের সঙ্গে। আমাদের ছেলেবেলায় আমরাও সভ্য ছিলাম এই সংগঠনের। শিশুদের সাংস্কৃতিক বিকাশে সংগঠনটি বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছিল। বঙ্গবন্ধুও খুব ভালোবাসতেন এই সংগঠনটিকে। বঙ্গবন্ধু মনে করতেন, শিক্ষা-সংস্কৃতির চর্চা না করলে ছেলেমেয়েরা মুক্তমনা হতে পারে না। তাই তিনি চাইতেন এ ধরনের শিশু সংগঠনগুলোর সঙ্গে যেন শিশু-কিশোররা জড়িত থাকে।
প্রয়াত লেখক-গবেষক শামসুজ্জামান খান এ প্রসঙ্গে একটি গল্প বলেছিলেন-
‘১৯৬২ সালে কচি-কাঁচার মেলার পক্ষ থেকে প্রেস ক্লাবে শিশু আনন্দমেলা হয়েছিল। তখন তিনি বঙ্গবন্ধু না, আমাদের তরুণ নেতা। তাকে আমরা আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম, তিনি এসেছিলেন। তখন দেখা গেল, তিনি যেখানেই যাচ্ছিলেন, সেখানে ছেঁড়া কাঁথা গায়ে দেওয়া এক লোক যাচ্ছেন। মেলায় আমাদের একটি গোয়েন্দা বাহিনীও ছিল। সুলতানা কামালের নেতৃত্বে সেই গোয়েন্দা বাহিনী ওই লোকটাকে ধরে নিয়ে এলো।
পরে তার গায়ের কাঁথা সরিয়ে দেখা গেল, তার কাছে মেলার ম্যাপ আছে, আর শেখ সাহেব কোন গেট দিয়ে ঢুকতে পারে, সেটা আছে। আমরা খুব উত্তেজিত, সুলতানা কামালও ছাড়বেন না। তখন বঙ্গবন্ধু তার আঞ্চলিক ভাষায় বললেন, চান্দু আমি বাচ্চাদের সাথে একটু আনন্দ করতে আসছি, এইখানেও আমার পেছনে পেছনে আসছ? ঠিক আছে যা যা ভাগ।’
এর আগে আইয়ুব খান পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করে সামরিক আইন জারি করেন। বঙ্গবন্ধুসহ অনেক রাজনীতিবিদকে গ্রেপ্তার করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করার আগমুহূর্তে তিনি বলে গেছিলেন, ‘এই পাঁচ বছর তোমরা শিশু সংগঠন কচি-কাঁচার মেলার মাধ্যমে কাজ করো। নিজেদের সচল রাখো।’
১৯৬৩ সালে প্রেস ক্লাবে কচি-কাঁচার মেলা আনন্দ মেলার আয়োজন করেছে। বঙ্গবন্ধু গেলেন সেখানে। বললেন, ‘এই পবিত্র শিশুদের সঙ্গে মিশে মনটাকে একটু হাল্কা করার জন্য এলাম।’
কচি-কাঁচার মেলার দাদাভাই ১৯৭২ সালে কচি-কাঁচার সদস্যদের দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ছবি আঁকিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী কীভাবে সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার করেছে, নারী ও শিশুদের নির্যাতন করেছে, মুক্তিযোদ্ধারা কীভাবে দেশের জন্য লড়াই করেছে- এগুলোই ছিল ছবির বিষয়বস্তু। খুদে শিল্পীদের বয়স ছিল ৫ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। দাদাভাই বাছাই করে কিছু ছবি নিয়ে গেলেন ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুকে দেখাবার জন্য। বঙ্গবন্ধু তখন রাশিয়া যাবেন। ছবিগুলো দেখে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমার দেশের শিশুরা এমন নিখুঁত ছবি আঁকতে পারে, এসব না দেখলে তা বিশ্বাস করা যায় না।’ তিনি বললেন, ছবিগুলো তিনি রাশিয়া নিয়ে যাবেন রাষ্ট্রীয় উপহার হিসেবে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জাতির উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। তিনি বলেছিলেন বাধ্যতামূলক অবৈতনিক শিক্ষাব্যবস্থা তিনি গড়ে তুলবেন পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য। দরকার হলে ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ চালু করবেন। দারিদ্র্য শিশুদের শিক্ষার বাধা হয়ে দাঁড়াবে, তা তিনি চাইতেন না।
তিনি যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তখন ১৯৭৩ সালে প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। সেখানে ৫ হাজার নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। বাংলাদেশে তখন সবকিছুর অভাব। তার মধ্যেও তিনি শিশুদের জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যতের চিন্তা করছিলেন। তিনি জানতেন, উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ভিত্তি হচ্ছে শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা।
আমাদের যে সংবিধান তৈরি হয়েছিল ১৯৭২ সালে তার নেতৃত্বে, সেখানে ১৭নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে-
‘রাষ্ট্র (বা) একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য, (খ) সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সংগতিপূর্ণ করিবার জন্য এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করিবার উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছা প্রযোচিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য, (গ) আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করিবার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে।’
বঙ্গবন্ধু প্রায়ই বলতেন- ‘শিশুদের যথাযথ শিক্ষার ব্যত্যয় ঘটলে কষ্টার্জিত স্বাধীনতা অর্থহীন হবে।’
শিক্ষা কমিশন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু, যা আমাদের কাছে ‘কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন’ হিসেবে পরিচিত। সেখানে সুপারিশ করা হয়েছিল প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ ৫ থেকে বাড়িয়ে ৮ বছর করা হোক। আজকে বঙ্গবন্ধুকন্যা শিশুদের হাতে যে পাঠ্যবই তুলে দিচ্ছেন তা শুরু হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর আমলেই। তার আমলে বিনামূল্যে প্রাথমিক স্কুলে বই শুধু নয়, শিক্ষার উপকরণ, খাবারও দেওয়া হতো। দরিদ্র ছাত্রদের পোশাক, এমনকি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্রীদের বিনা বেতনে পড়ানোর ব্যবস্থাও বঙ্গবন্ধু করেছিলেন। অন্য কথায় বলা যেতে পারে, ১৯৭৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ‘দি প্রাইমারি স্কুলস (টেকিং ওভার) অ্যাক্ট ১৯৭৪’ প্রণয়নের মাধ্যমে শিক্ষাকে জাতীয়করণ করা হয়। সুনির্দিষ্টভাবে প্রাথমিক শিক্ষাকে। ফলে শিক্ষক থেকে কর্মচারী সব বেতনের দায়িত্ব রাষ্ট্র তুলে নেয়। বঙ্গবন্ধু যখন ষাটের দশকে ছয় দফা নিয়ে আন্দোলন করছেন, তখনো প্রাথমিক শিক্ষা ও শিক্ষকদের কথা অনেকবার বলেছেন।
১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু আরেকটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। ওই সময় যখন খাবার নেই, বাড়িঘর নেই, পথঘাট নেই, অনেক শিশু অনাথ- তখন ওই দুঃসময়েও বঙ্গবন্ধু প্রথমেই শিশুদের কথা ভেবেছিলেন। রীতা ভৌমিক লিখেছেন-
‘স্বাধীন বাংলাদেশে অনেক যুদ্ধশিশু, পিতৃমাতৃহীন, প্রতিবন্ধী, পরিত্যক্ত এবং দুস্থ শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার চিন্তা-ভাবনা থেকে বঙ্গবন্ধু সরকারের সময়ে পরিত্যক্ত শিশুদের জন্য শিশু অধ্যাদেশ ১৯৭২ ঘোষণা করা হয়। জাতীয়ভাবেই শুধু নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও এসওএস শিশুপল্লীর সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। আন্তঃরাষ্ট্রীয় দত্তক শিশু সুরক্ষার জন্য আইন, বিধিমালার মাধ্যমে সব শিশুর সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেন তিনি। ৫৬টি সিপিসিকে শিশু উন্নয়নে সরকারি শিশু পরিবার আখ্যায়িত করে শিশুর তত্ত্বাবধানে এগুলোকে কাজে লাগায়। এই অনুভূতি থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের সংবিধানে ১৫ (খ) অনুচ্ছেদ সংযোজন করেন। এর মাধ্যমে দেশ সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা পায়।’
বঙ্গবন্ধু কী স্নেহভরে শিশু-কিশোরদের দেখতেন, তার দু-একটা উদাহরণ দিই। ১৯৭২ সালে তিনি লঞ্চে করে কোথায় যেন যাচ্ছিলেন। নদীতে দেখলেন এক শিশু গোসল করছে। লঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা বঙ্গবন্ধুকে দেখে সে স্লোগান দিল- ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।’ সে সময় এটিই ছিল প্রধান স্লোগান। বঙ্গবন্ধু লঞ্চ থামিয়ে ছেলেটিকে তুলে আনতে বললেন। দেখা গেল তার পরনে কোনো কাপড় নেই। বঙ্গবন্ধু বললেন, নিয়ে এসো ওকে। শিশুটিকে নিয়ে আসা হলে বঙ্গবন্ধু তাকে আদর করে বিদায় দিলেন।
ওই সময়েরই কথা। বঙ্গবন্ধু বড় ছেলে শেখ কামালকে নিয়ে হাঁটতে বেড়িয়েছেন। দেখলেন, একটি ছেলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। ছেলেটিকে ডাকলেন, তারপর তার জুতা খুলতে বললেন। দেখা গেল পেরেক ভেতরে বেরিয়ে আছে, আর তাতে পা লেগে শিশুটি ব্যথা পাচ্ছে, রক্তও ঝরছে। তখনই দেহরক্ষীকে ডেকে বললেন শিশুটিকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে। শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘রাসেল আব্বাকে ছায়ার মতো অনুসরণ করত। আব্বাকে মোটেই ছাড়তে চাইত না। রাসেলের সবচেয়ে আনন্দের দিন এলো যেদিন আব্বা ফিরে এলেন। একমুহূর্ত যেন আব্বাকে কাছ-ছাড়া করতে চাইত না। সব সময় আব্বার পাশে ঘুরে বেড়াত।’
বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন পালিত হয় জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে। ১৯৯৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর শিশু-কিশোরদের একটি মেলার আয়োজন করা হয়। এর নাম ছিল ‘বঙ্গবন্ধু শিশু-কিশোর মেলা।’ মেলায় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও অধ্যাপক নীলিমা ইব্রাহিম উপস্থিত ছিলেন। সেখানে অধ্যাপক নীলিমা ইব্রাহিম প্রস্তাব করেন বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ১৭ মার্চ জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে পালন করা হোক। শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হলে ১৯৯৭ সাল থেকে ১৭ মার্চ জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। এবারও তা পালিত হয়েছে। এবার প্রতিপাদ্য ছিল- ‘শিশুদের চোখ সমৃদ্ধির স্বপ্নে রঙিন।’
বঙ্গবন্ধু সোনার বাংলা গড়ার কাজ শুরু করেছিলেন, শেখ হাসিনা তার রূপ দিচ্ছেন। আজকের শিশু যখন তরুণ হবে তখন দেখবে বাংলাদেশ এক সমৃদ্ধিশালী উন্নতির দেশ। এবং আজকের শিশুই তখন দেশটিকে আরও এগিয়ে নেবে ও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণ করবে।
লেখক: শিক্ষাবিদ ও ইতিহাস গবেষক
[email protected]