কে এই অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাস? ১৯৭১ সালের ১৮ মে কেতাদুরস্ত পোশাকে যে মানুষটি আমার অফিসে আসেন তার বয়স চল্লিশের কোঠায়। গোঁফ-অলা চৌকো মুখ। দেখে মিলিটারি বলে মনে হয়। গভীর মায়াবী চোখে বিষাদের ছায়া। মি. সকারেনহাসকে আমি আগে কখনো দেখিনি। বিদেশ পাতার সম্পাদক ফ্রাঙ্ক গাইলসের সঙ্গেও তার কখনো সাক্ষাৎ হয়নি। মি. ম্যাসকারেনহাস করাচি মর্নিং নিউজ-এর সহকারী সম্পাদক। পত্রিকাটিতে তার রিপোর্টিংয়ের হাত দেখে আমরা তাকে পাকিস্তান থেকে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করতে বলি। পাকিস্তানি পাসপোর্টধারী মি. ম্যাসকারেনহাসের পূর্বপুরুষ ভারতের গোয়ার খ্রিষ্টান। তিনি জীবনের বেশির ভাগ সময় পাকিস্তানে কাটিয়েছেন।
দুই মাস আগে মার্চে, পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা, তাদের দৃষ্টিতে, ভৌগলিকভাবে বিভক্ত দেশটির অবাঙালি সামরিক শাসকদের হাতে নিগ্রহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। (প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও তার প্রশাসন পশ্চিম পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অবস্থিত।) স্বাধীনতা ত্বরান্বিত করার অসময়োচিত ও অশুভ প্রচেষ্টায় পূর্ব পাকিস্তানের ১ লাখ ৭৫ হাজার সৈনিক লাখো বাঙালির সঙ্গে যোগ দিয়ে অবাঙালিদের বিরুদ্ধে হত্যাযজ্ঞ চালান। হাজার হাজার নারী-পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করা হয়। এই ঘটনার ওপর আমার ঘনিষ্ঠ দৃষ্টি ছিল। কারণ, আমার সবচেয়ে ছোট ভাই জন তখন ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তরের ইসলামাবাদ অফিসে কর্মরত। জন আমাকে লেখে: ঢাকা থেকে আমাদের লোক জানান, পূর্ব পাকিস্তানিরা লোকজনকে শূকরের মতো গাছে ঝুলিয়ে গলা কেটে হত্যা করছে।’ ম্যাসকারেনহাস এবং আমাদের নিজস্ব সংবাদদাতা নিক টমালিন যশোর থেকে এসব নৃশংসতার খবর পাঠান।
মার্চের শেষে ইসলামাবাদ সরকার পূর্ব পাকিস্তানে আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের জন্য দুই ডিভিশন সৈন্য পাঠান। সরকার সব আন্তর্জাতিক সংবাদদাতাকে বহিষ্কার ও খবর ব্ল্যাকআউট করেন। এই ঘটনার পর পূর্ব পাকিস্তান থেকে পাওয়া খবরে বলা হয়, সেনাবাহিনী প্রদেশটিতে শান্তি ফিরিয়ে এনেছে। পাকিস্তানের সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে এই খবরই প্রচার করা হতো। টেলিভিশনে দেখানো হতো শান্তি ফিরে আসায় গ্রাম ও শহরের মানুষ পাকিস্তানি পতাকা নিয়ে মিছিল করছেন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একটি প্রতিনিধি দল পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তান সফর করে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলে সন্তোষ প্রকাশ করে।
কিন্তু, ম্যাসকারেনহাস আমার অফিসে বিকেলের আলোয় বসে দীর্ঘ আলাপে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও মর্মন্তুদ ঘটনার চিত্র তুলে ধরেন। এপ্রিলের শেষের দিকে তথ্য মন্ত্রণালয় আটজন সিনিয়র সাংবাদিককে পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে যান। এই আটজনের মধ্যে ম্যাসকারেনহাস ছিলেন। সে সময় বাঙালি শরণার্থীদের স্রোত দ্রুত বাড়ছিল এবং মূলত শরণার্থীদের মাধ্যমে খবর পাওয়া যাচ্ছিল সেনাবাহিনী হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। সরকারের উদ্দেশ্য ছিল এসব খবরকে মিথ্যা প্রমাণ করা। ম্যাসকারেনহাস বলেন, ‘ইসলামাবাদ আমাদের দেখাতে চাইছিল, দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী মহান দায়িত্ব পালন করছে। কিন্তু, আমি যা দেখলাম তা হচ্ছে গণহত্যা।’
মার্চে বাঙালিদের উন্মত্ততা দেখে তিনি মর্মাহত হয়েছিলেন। কিন্তু, তিনি বলেন, সেনাবাহিনী যা করছে তা ঘোরতর নৃশংসতা এবং তার ব্যাপকতা অনেক বেশি। সেনাবাহিনী প্রয়োজনীয় আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের কাজ নিয়ে সন্তুষ্ট ছিল না, বা তাদের সহিংসতা কেবল বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ ছিল না। ম্যাসকারেনহাস বলেন, গোটা দেশে তারা ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। সৈন্যরা নিয়মিত গ্রামে গ্রামে, শহরে শহরে ঘুরে হিন্দুদের হত্যা করছে (পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে ৭ কোটি মানুষের প্রায় ১০ শতাংশ হিন্দু); ৭৫ হাজার অবাঙালি মুসলিম বিদ্রোহীর মধ্যে যাকে ধরতে পারছে তাকেই খতম করছে; বিদ্রোহের সমর্থক হিসেবে বিবেচিত হাজার হাজার শিক্ষিত অবাঙালি মুসলমানকে হত্যা করছে- যাদের মধ্যে শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, ছাত্র, বামপন্থি রাজনৈতিক ক্যাডার রয়েছেন। (ম্যাসকারেনহাস অথবা হ্যারল্ড ইভান্স দুজনের কেউ একজন এখানে বিদ্রোহী ও হাজার হাজার শিক্ষিতকে ‘অবাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এটি অনবধানতাবশতঃ বা মুদ্রণপ্রমাদ হয়ে থাকতে পারে- অনুবাদক)। নিহতদের মধ্যে আছেন আমার বন্ধু সাংবাদিক সিরাজুদ্দিন হোসেন। একবার তিনি শিশু অপহরণকারী চক্র উদঘাটন ও সে বিষয়ে রিপোর্ট করেছিলেন। হত্যার পর হোসেনের লাশ এক ইটের ভাটায় ফেলে দেওয়া হয়।
ম্যাসকারেনহাস বলেন: শীর্ষস্থানীয় অফিসাররা আমাকে জানান, তারা একটা ‘চূড়ান্ত ফয়সালা’ চাচ্ছেন। তাদের সবার একটাই কথা- পূর্ব পাকিস্তানকে আমরা চিরদিনের জন্য বিচ্ছিন্নতার হুমকিমুক্ত করতে বদ্ধপরিকর; সে জন্য যদি লাখো কোটি মানুষকে নিকেশ করতে হয় এবং ৩০ বছর এই উপনিবেশকে প্রদেশ হিসেবে শাসন করতে হয় তাও আচ্ছা।’
মানুষটিকে কি বিশ্বাস করা যায়? সফরে আমন্ত্রিত আটজন সাংবাদিকের মধ্যে সাতজন তাদের চাক্ষুষ দেখার যে বিবরণ দিয়েছেন তার সঙ্গে ম্যাসকারেনহাসের বর্ণনার কোনো মিল নেই। আমি জিজ্ঞেস করি কেন তিনি তার বিপরীত রিপোর্ট নিজের পত্রিকায় ছাপলেন না। ‘সামরিক সেন্সরশিপের অধীন পত্রিকা এটি ছাপবে না।’ তিনি বলেন, বিবেক দংশনে তিনি কষ্ট পাচ্ছেন। ‘আমি যা দেখেছি হয় তার পুরোটা আমাকে লিখতে হবে, অথবা আমাকে লেখা বন্ধ করে দিতে হবে। আমি আর কখনো সততার সঙ্গে লিখতে পারব না।’ তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের কোথাও ঘটনার পুরো বিবরণ লেখা অসম্ভব; তাকে কেবল বাঙালিদের নৃশংসতার কথা লেখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এমনকি দুর্ভিক্ষের আশঙ্কার উল্লেখও সেন্সর মুছে দিয়েছে। এ কারণেই আমি লন্ডন এসেছি। আমি চাই সত্য প্রকাশিত হোক, কিন্তু এটা লিখে আমি পাকিস্তানে থাকতে পারব না।’
আমার মন বলে ম্যাসকারেনহাসকে বিশ্বাস করা যায়। তিনি টাকা-পয়সা চাননি। মনে হয়, শুধুমাত্র পরিশীলিত খ্রিষ্টীয় আবেগ ও অন্তর্গত গ্লানির তাড়নায় তিনি এখানে এসেছেন। আমার সহকারী ও বিদেশ পাতার সম্পাদক ফ্রাঙ্ক গাইলসের একই মত, যদিও তার সেকশন সতর্ক করে দিয়ে জানায়, ম্যাসকারেনহাসকে আমরা খুব অল্পদিন হলো চিনি। মানুষের দুরবস্থা দেখে তা যথাযথভাবে তুলে ধরার স্বার্থে তিনি তার পাকিস্তানের জীবন, সব বিষয়-আশয়, চাকরি ছেড়ে দিতে এবং স্ত্রী ও পাঁচ সন্তানের শিকড়চ্যুতির মতো ত্যাগ শিকারে প্রস্তুত। এটি দেখে আমি অভিভূত হই। তার প্রধান উৎকণ্ঠার বিষয় ছিল প্রথমে তার পরিবারকে পাকিস্তানের বাইরে নিয়ে আসা। তার আগে কিছুই ছাপা যাবে না, বা অন্য এমন কোনো অনুসন্ধান চালানো যাবে না যার দরুন সন্দেহ হতে পারে তিনিই এসবের মূলে।
আমি ঝুঁকি নিলাম। আমি তাকে বললাম, রিপোর্টটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখার ও ঘটনার শেষ পর্যন্ত যাওয়ার ব্যাপারে তার দৃঢ় অঙ্গীকারের শর্তে আমরা তার পরিবারকে সরিয়ে আনার খরচ বহনে রাজি, তবে আমি তাকে চাকরি দিতে পারব না। রিপোর্টটি পাকিস্তানে বসে লেখা অনিরাপদ ভেবে তিনি টুকে রাখা নোট মুখস্থ করে নোটবই নষ্ট করে ফেলেছেন। নরকে ১০ দিনের অভিজ্ঞতার ওপর তার ৫ হাজার শব্দের রিপোর্টটি এক প্রত্যক্ষদর্শীর অসাধারণ বিশদ দক্ষ প্রামাণিক বিবরণ। পূর্ব পাকিস্তানের লাখ লাখ মানুষ কেন ভিটেমাটি ছেড়ে পালাচ্ছেন এই জিজ্ঞাসার জবাব পাওয়া যায় রিপোর্টটিতে। এতে নাম-ধামসহ ঘটনার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। আব্দুল বারী নামের একজন হাড্ডিসার দর্জি গ্রামে মিলিটারি এসেছে দেখে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে দৌড়ে পালাচ্ছিলেন। তাকে ধরে আনা হলো গুলি করে মারার জন্য। ম্যাসকারেনহাস তার সাংবাদিকের নিরপেক্ষতা বিসর্জন দিয়ে হায় হায় করে ওঠেন এবং চিৎকার করে মেজর রাঠোরকে বলেন, ‘দোহাই ওকে গুলি করবেন না।’ বারীর লুঙ্গি খুলে দেখা গেল তার খতনা করা হয়েছে, তার মানে তিনি মুসলমান, হিন্দু নন। হিন্দু হলে সঙ্গে সঙ্গে গুলি করা হতো। পিঠে বেতের কয়েক ঘা বসিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হলো। তবে, কুমিল্লা সেনা সদরে ম্যাসকারেনহাস দেখেছেন, ট্রাক বোঝাই করে হিন্দুদের ভিতরে আনা হচ্ছে। পিটিয়ে মারার সময় তাদের আর্তচিৎকার তিনি শুনেছেন।
পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি সম্পর্কে শরণার্থী ও মিশনারিদের কাছ থেকে পাওয়া টুকরো টুকরো অসমর্থিত খবরের মাঝে মাঝে যেসব ফাঁকফোকর ছিল, ম্যাসকারেনহাসের বিবরণ তা ভরাট করে দিল।
ম্যাসকারেনহাস তার স্ত্রী ইভোনের সঙ্গে যে বন্দোবস্ত করলেন তা হচ্ছে: আমি যদি রিপোর্টটি ছাপানোর জন্য গ্রহণ করি, তিনি স্ত্রীকে টেলিগ্রামে জানাবেন ‘এনের অপারেশন সফল’। ইভোনের জন্য এই সংকেতের অর্থ হবে সবকিছু ছেড়েছুড়ে রোমে আত্মীয়দের উদ্দেশে রওনা হওয়া। টেলিগ্রাম পেয়ে ইভোন সন্তানদের নিয়ে দেশত্যাগ করলেন। কিন্তু, ম্যাসকারেনহাস করাচি গিয়ে বের হতে পারলেন না, কারণ, বছরে একবারের বেশি বিদেশ ভ্রমণের নিয়ম নেই। তিনি বিমানযোগে পেশোয়ার গেলেন এবং হাঁটাপথে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আফগানিস্তান পৌঁছলেন। সেখান থেকে পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমাদের এক স্টাফের ব্যক্তিগত ঠিকানায় বার্তা পাঠালেন: ‘রপ্তানির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন। সোমবার শিপমেন্ট শুরু।’
আমি এক ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ নিলাম: পত্রিকার ১৩ জুন সংখ্যার পুরো সেন্টার স্প্রেড খালি করে সেখানে রিপোর্টটি ছাপলাম। পৃষ্ঠাজুড়ে কালো হরফে এক শব্দের বিশাল হেডিং দিলাম ‘জেনোসাইড’। সম্পাদকীয় দিলাম ‘স্টপ দ্য কিলিং’ শিরোনামে।
নীরবতার যে পর্দা আমরা ছিন্ন করলাম তা বিশ্বজুড়ে হইচই ফেলে দিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে মিত্র হিসেবে চান বলে গণহত্যার ঘটনা উপেক্ষা করেন। এক মেমোতে তিনি নির্দেশ দেন: ‘এই সময়ে ইয়াহিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করা যাবে না।’ জুলাইয়ের শেষ নাগাদ ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলোতে আশ্রিতের সংখ্যা ৫০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। শরণার্থীর স্রোত তখনো থামেনি। বেশ কয়েক বছর পরে দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আমাকে বলেন, ম্যাসকারেনহাসের রিপোর্ট পড়ে তিনি গভীরভাবে বিচলিত হন। রিপোর্টটি তাকে ভারতের সশস্ত্র হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র প্রস্তুতের লক্ষ্যে ইউরোপের বিভিন্ন রাজধানী ও মস্কোয় ব্যক্তিগত কূটনৈতিক অভিযানে নামার প্রেরণা হিসেবে কাজ করে।
১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে। ম্যাসকারেনহাসের কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা ছিল না; তিনি অতি চমৎকার একজন রিপোর্টার ছিলেন এবং সততার সঙ্গে নিজের কাজ করে গেছেন। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি পাকিস্তানি মিলিটারির শত্রুতে পরিণত হন। ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর গ্রুপ তাকে টেলিগ্রাম পাঠায়: ‘শুয়োরের বাচ্চা, তুই নিজের দেশের বিরুদ্ধে কাজ করিস, আমরা তোকে ছাড়ব না।’ (গ্রুপটি পরের বছর অলিম্পিক গেমসে ইসরায়েলের কয়েকজন এথলেটকে হত্যা করে)।
আমি ম্যাসকারেনহাসকে রিটেইনার হিসেবে রেখে দিই। তিনি তার যোগ্যতার যথেষ্ট প্রমাণ রাখেন এবং সাত বছর পর বিদেশ পাতার স্থায়ী স্টাফ হন।
অনুবাদক : সুমন রাহমান, সাংবাদিক ও ব্রডকাস্টার