শেখ হাসিনা তখনো আশায় ছিলেন, ঘাতকরা হয়তো তার পরিবারের অন্য সদস্যদের রেহাই দিয়েছে। অন্তত শিশু ভাইটি বেঁচে আছে। পরের কয়েক দিনের মধ্যে স্পষ্ট হয়, কেউ বেঁচে নেই। তারপর শুধুই আতঙ্ক আর কাছের মানুষদের ক্রমাগত দূরে সরে যাওয়ার দৃশ্য। ১৯৭৫ সালের আগস্টে জার্মানিতে বসে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা যখন এই ধরনের সব অবিশ্বাস্য ঘটনার সম্মুখীন, তখন ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। দ্রুতই নিরাপদে দিল্লিতে এলেন তারা। এরপর ছয় বছরের নির্বাসন জীবন শেষে ১৯৮১ সালের মে মাসে দেশে ফিরলেন পিতা-মাতা, তিন ভাই ও স্বজনহারা শেখ হাসিনা। দেখলেন তার সামনে অন্য রূপের বাংলাদেশ। স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানহীন বাংলাদেশে শুরু হলো তার সংগ্রামের জীবন।
শোকের সেই জগদ্দল পাথর এবং নানা প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দীপ্ত প্রত্যয়ে ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়ান। নেতৃত্ব দেন এইচ এম এরশাদের পতনের গণ-আন্দোলনে। এরপর মুজিবকন্যার একের পর এক ইতিহাস সৃষ্টি। সর্বশেষ এ বছরের ৭ জানুয়ারির দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের মাধ্যমে টানা চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় তার দল আওয়ামী লীগ। বাংলাদেশ ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। গত ১৫ বছরে দেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই সঙ্গে পঞ্চমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে অনন্য রেকর্ডও সৃষ্টি করেছেন তিনি। তার নেতৃত্বে এরই মধ্যে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে ওঠার মানদণ্ড পূরণ করেছে বাংলাদেশ। বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যম বিজনেস ইনসাইডারের মতে, বাংলাদেশ এখন ‘ইমার্জিং টাইগার’। এশিয়ায় টাইগার বলতে এত দিন সবাই হংকং, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানকে বুঝত। এর বাইরে ইমার্জিং টাইগার এখন বাংলাদেশ।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে সারা বিশ্বে নারীর ক্ষমতায়নে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। ২০০৯ সাল থেকে একটানা চারবার এবং এর আগে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল মেয়াদে একবার তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইন্দিরা গান্ধী ১৫ বছরের বেশি শাসন ক্ষমতায় ছিলেন। মার্গারেট থ্যাচার ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রায় সাড়ে ১১ বছর এবং চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রায় ১১ বছর দেশ পরিচালনা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছেন।
শেখ হাসিনা বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী ব্যক্তি হিসেবেও বিবেচিত হয়েছেন। ২০২৩ সালে মার্কিন প্রভাবশালী সাময়িকী ফোর্বসের তালিকায় বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ১০০ নারীর তালিকায় শেখ হাসিনার অবস্থান ছিল ৪৬তম। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ফরেন পলিসি নামক সাময়িকীর করা বিশ্বব্যাপী শীর্ষ ১০০ বৈশ্বিক চিন্তাবিদের তালিকায় শেখ হাসিনা জায়গা করে নিয়েছেন। বৈশ্বিক মহামারি করোনা মোকাবিলা করে প্রশংসিত হয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা করে শক্ত হাতে সামলাচ্ছেন অর্থনৈতিক সংকট। যে কারণে তিনি এখন বিশ্বের বিস্ময়।
দেশের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। আশির দশকের শুরুতে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ সম্মেলনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরসূরি শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করে। তিনি আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নিয়েই জেনারেল জিয়ার সামরিক শাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরেই মানুষের ভাত ও ভোটের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া শুরু করেন। জাতির বুকে চেপে বসা সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে জনমত গঠন এবং মানুষের ভোটের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে দিয়েছেন সামনে থেকে নেতৃত্ব। এই কাজ করতে গিয়ে বারবার বুলেট ও গ্রেনেডের মুখে পড়তে হয়েছে জাতির পিতার কন্যাকে। কিন্তু ভাগ্যক্রমে প্রতিবারই নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন শেখ হাসিনা।
ফখরুদ্দীন আহমদের সরকারের সময় জেলে নিয়ে পুরলেও শেখ হাসিনাকে দমিয়ে রাখা যায়নি। অদম্য শেখ হাসিনা মুক্ত হয়ে নির্বাচন করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় ফেরেন।
অকুতোভয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ সারা বিশ্বে উন্নয়নের মডেল হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেছে। ছাত্রজীবনে রাজনীতি করেছেন এবং ইডেন কলেজের ভিপি ছিলেন তিনি। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার কারণেই বাংলাদেশ বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে আসীন হয়েছে। গণহত্যার শিকার মায়ানমারের ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়ে শেখ হাসিনা বিশ্বে বাংলাদেশকে পরিচিত করেছেন এক মানবতাবাদী দেশ হিসেবে। ফিলিস্তিনে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর সহযোগিতায় ইসরায়েল যখন মুসলিম নিধনে হত্যাযজ্ঞে উন্মত্ত, তখন সেই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সব আন্তর্জাতিক ফোরামেই সোচ্চার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাই তো তিনি অনন্য এবং অদ্বিতীয়।