২২ বছর বয়সী তানভীর হোসেন। এসএসসি পাসের পর চাকরি পাচ্ছিলেন না চট্টগ্রামের এই তরুণ। অভাব-অনটনের মধ্যেই মা-বাবার ইচ্ছায় বিয়ে করেন। সেই থেকে কোনোমতে দিনে এনে দিনে খেয়ে চলছিল তার সংসার। জুলাই মাস থেকে দেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু হলে একজন সাবেক ছাত্র হিসেবে তিনিও যোগ দেন।
আন্দোলনে বেশ কয়েকবার আহত হলেও সেরে ওঠেন তিনি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ছাত্র-জনতার বিজয় মিছিলে তিনি পুলিশের গুলিতে বিদ্ধ হন। এরপর তার ঠিকানা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ২ নম্বর ক্যাজুয়ালিটি ওয়ার্ডের এক্স-৬ নম্বর বেড। গুলির ক্ষতের অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে ঘুমাতেও পারছেন না তিনি।
সোমবার( ২৬ আগস্ট) সরেজমিন দেখা গেছে, বিছানায় পড়ে নীরব-নিস্তব্ধ হয়ে আছেন তানভীর। কথা বলতে পারছেন না। তলপেটে আঘাতের চিহ্ন; বুকে গুলির ক্ষত এখনো স্পষ্ট। মাথার ওপরে পেছনের দিকে জাতীয় পতাকা টাঙানো আছে। তার ছোট্ট বাচ্চাটি এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছে। স্ত্রী আনজু আক্তার আনমনে বসে আছেন।
তানভীরের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার লাকসামে। পরিবারসহ থাকেন চট্টগ্রামের টেক্সটাইল পানির কল এলাকায়। একপর্যায়ে কিছুটা চাপা স্বরে তানভীর হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা ছাত্র-জনতা স্বৈরাচারের পতনের খবরে আনন্দ মিছিল করছিলাম। তখনো পুলিশ আমাদের ওপর গুলি চালায়। আমি হঠাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। কয়েকজন আমাকে ধরে একটি প্যাডেলচালিত রিকশায় করে চমেক হাসপাতালে নিয়ে আসে। আমার অপারেশন হয়। শরীর থেকে গুলি বের করে আনা হয়। কিন্তু অপারেশনের পর আমার তলপেটে ইনফেকশন হয়ে যায়। গুলির কারণে কিডনি একটা কেটে গেছে। এটি রিপোর্টে ধরা পড়েছে। এখনো নড়তে-চড়তে পারি না। ঘুমাতে পারি না। কেননা একদিকে ফিরে ঘুমানো যায় না।’
তানভীর আরও বলেন, ‘এখন পর্যন্ত অনন্ত ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু জেলা প্রশাসনের কিছু সাহায্য ছাড়া আর তেমন কোনো কিছু পাইনি। পরিবার নিয়ে আছি বড্ড বেকায়দায়।’ তবে এত কষ্ট-যন্ত্রণাকে বিজয়ের আনন্দে উড়িয়ে দিয়ে তানভীর বলেন, ‘শরীরের শত কষ্ট সইছি ঠিকই। কিন্তু আবার প্রিয় দেশটাকে স্বৈরাচারমুক্ত দেখছি। এতে অন্য রকম একটা আনন্দ লাগছে। আমাদের দেশটাকে এগিয়ে নিতে হবে।’
শুধু তানভীরই নন, চমেক হাসপাতালে বর্তমানে কাতরাচ্ছেন ২২ জন। এদের মধ্যে ৩ জন আইসিইউতে আছেন, যাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আর ২ নম্বর ক্যাজুয়ালিটি বিভাগে আছেন মোট ৪ জন। তারাও ব্যথায় ভুগছেন, দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। চিকিৎসার পেছনে ছুটতে গিয়ে পরিবারগুলোরও করুণ দশা।
তানভীরের মতোই ভুগছেন ফেনী কলেজের মাস্টার্সের ছাত্র মাহবুবুল হক। তিনি ফেনীর মহীপালের আব্দুল করিম ফরাজী বাড়ির মো. আলীর ছেলে। গত ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনে গিয়ে ফেনীর মহীপাল পাসপোর্ট অফিসের সামনে গুলিবিদ্ধ হন মাহবুবুল। তাকে প্রথমে ফেনীর একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সেখান থেকে চমেক হাসপাতালে পাঠানো হয়।
বুক ও পেট ভেদ করে গুলি বেরিয়ে যায় তার। এখনো কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। চট্টগ্রাম নগরীতে কেউ নেই। মা, ছোট ভাই মিলে তাকে দেখাশোনা করছেন। রাত হলে তারাও ফ্লোরে শুয়ে পড়েন। পরিবারের আয়ের উৎস বলতে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান। কিন্তু চিকিৎসার পেছনে এত খরচ বেশি হচ্ছে যে দোকানের পুঁজি ভেঙে খেতে হচ্ছে।
কষ্টের বিষয়ে মাহবুবুল বলেন, ‘আমার অপারেশন করা হয়েছে। গুলি বের হয়েছে। কিন্তু এখনো ব্যাগে মলমূত্র ত্যাগ করতে হচ্ছে। কবে সুস্থ হব তা জানা নেই।’
নোয়াখালীর যাদবপুরের মো. সাইফুল ইসলাম (২৮) গত ৪ আগস্ট ফেনীর মহীপালে গুলিবিদ্ধ হন। তার পেটে একটি ও পায়ে সাতটি গুলি লাগে। এখনো তিনটি গুলি রয়ে গেছে। সেগুলো অপারেশন করে বের করা হবে। শরীরজুড়ে সেলাই। বর্তমানে দুর্বিষহ যন্ত্রণায় ভুগছেন তিনি। রাত হলেই বাড়ে ব্যথা।
সাইফুল বলেন, ‘পুলিশ-ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগের লোকজন আমাদের নির্বিচারে গুলি করেছে। আমরা আহত হয়ে এখন হাসপাতালে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও বিশিষ্ট আলেম শায়খ আহমদুল্লাহ এসেছেন আমাদের দেখতে। যা কিছু সহযোগিতা পেয়েছি সেটি অতি নগণ্য। এখন পর্যন্ত ৫৫ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। আমাদের সহযোগিতা প্রয়োজন। আমরা ধার করে আর চলতে পারছি না।’
একই ওয়ার্ডে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন গুলিবিদ্ধ রমজান। ১৯ বছর বয়সী রমজানের পেটের মাঝ বরাবর আড়াআড়িভাবে দেওয়া হয়েছে লম্বা সেলাই। সেখান থেকে পুঁজ বের হচ্ছে। কিছুক্ষণ পরপর রমজান চিৎকার করছেন ব্যথায়। তাকে দেখাশোনা করছেন বড় বোন লাইলী।
জানতে চাইলে রমজান বলেন, ‘গত ৫ আগস্ট বিকেলে ছাত্র-জনতার মিছিল শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে নগরের মুনসুরাবাদ পুলিশ লাইনসের সামনে ছাত্রদের ওপর বৃষ্টির মতো গুলি শুরু করে পুলিশ। এ সময় একজনকে রক্ষা করতে গিয়ে আমি গুলিবিদ্ধ হই। তার পর থেকে আছি চমেক হাসপাতালে।’
রমজানের বোন লাইলী আক্তার বলেন, ‘আমার ভাই খাদ্যনালিতে আঘাত পেয়েছে। আমি আমার ছেলেমেয়েদের নিয়ে হাসপাতালে তাকে দেখতে হচ্ছে। ডাক্তাররা বলেছেন সব সময় মাছ-মাংস খাওয়াতে। হাসপাতাল থেকে দেওয়া খাবারে হচ্ছে না। হোটেল থেকে কিনে খাওয়াতে হচ্ছে। ওদিকে গ্রামে মা-বাবাকে দেখাশোনার কেউ নেই। তাদেরও খরচ দিতে হয়। কিন্তু এই মুহূর্তে সেটি পারছি না। আমরা চরম কষ্টের মধ্যে আছি।’