ছাত্র-জনতার রক্তঝরা আন্দোলনে শেখ হাসিনার পতনের এক মাস পূর্ণ হলো আজ ৫ সেপ্টেম্বর। গত ৫ আগস্টের পর শুধু যে সরকার পরিবর্তন হয়েছে তা নয়; পরিবর্তন হয়েছে দেশের রাজনীতির গতিপথও। কারণ ওই দিন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগসহ তাদের মিত্র দলগুলোর রাজনীতি যেমন চরম সংকটের মধ্যে পড়েছে; ঠিক এর বিপরীতে বিএনপিসহ আওয়ামী লীগ-বিরোধী দলগুলোর মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। এ ঘটনার প্রভাব পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রশাসন, বিচারালয়সহ দেশের সর্বত্র। বিচারালয় ও প্রশাসনে আওয়ামী লীগ সমর্থক বলে চিহ্নিতদের আস্তে আস্তে সরে যেতে হচ্ছে। আর গত ১৬ বছর ধরে কোণঠাসা হয়ে থাকা কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পদায়ন করা হচ্ছে। বিভক্ত পেশাজীবী সংগঠনের মধ্যেও এক পক্ষ আত্মগোপনে গেছে কিংবা গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ পদে জায়গা পাচ্ছেন বিএনপিপন্থিরা। অর্থাৎ বিএনপিপন্থিরা সর্বত্র এখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন। আর ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন আওয়ামী লীগপন্থিরা।
গত ১৬ বছরে সরকারের পক্ষে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত ভূমিকায় ছিল পুলিশ বাহিনী। কিন্তু ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ওই বাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনেকেই খুনের মামলায় আসামি হওয়ার কারণে এই বাহিনীটি এখন ভাবমূর্তির সংকটে পড়েছে। ফলে পুলিশে সংস্কারের দাবি উঠেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক মনে করেন, মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল বলেই গণজাগরণ হয়েছে। তা ছাড়া শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মর্মার্থ বুঝতে পারেনি। ফলে বিপরীতমুখী অবস্থান তৈরি হয়েছে।
বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক মনে করেন, গত ১৬ বছরে ব্যাপক নির্যাতন ও অত্যাচারের পরও বিএনপি যে বিলীন হয়ে যায়নি, এটি বিএনপির সবচেয়ে বড় শক্তি। তারা সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষায় পাস করেছে। দলটির নেতা-কর্মীদের অবদান এ ক্ষেত্রে অনস্বীকার্য। উল্টো দিকে আওয়ামী লীগ এখন পলায়নপর। শেখ হাসিনার কুশাসন, একনায়কতন্ত্র, অত্যাচার এগুলোর ফলেই তার সরকারের পতন হয়েছে।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনার পরের সারির নেতারাও পতনের দায় এড়াতে পারেন না। কারণ শেখ হাসিনা ভুল করলে দলটির সিনিয়র নেতাদের এই ভুল ধরিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তারা সেটি করতে ব্যর্থ হয়েছেন। শেখ হাসিনার ভুলের প্রতিবাদে একজন নেতাও পদত্যাগ করেননি। ফলে তাদেরও দোষ অনিস্বীকার্য। এক কথায় পুরো দলটি কলুষিত হয়ে গেছে। এ ঘটনা আওয়ামী লীগের জন্য অশনিসংকেত।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, রাজনীতির বাঁক পরিবর্তনের জন্য আওয়ামী লীগই দায়ী। তার মতে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ধরাকে সরা জ্ঞান করতেন। তিনি ভেবেছিলেন তার পক্ষে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। সবকিছুই তিনি জয় করতে পারবেন- এ রকম মানসিকতা ছিল তার। তা ছাড়া তরুণদের তারা ‘আন্ডারএসিবটমেট’ করেছিলেন। এসব কারণেই রাজনীতির গতি পরিবর্তন হয়েছে। তারা অন্যায়ের ভারে ডুবে গেছেন।
সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগ সমর্থক দলগুলোর নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা গ্রেপ্তার আতঙ্কে আত্মগোপনে চলে গেছেন। তাদের অনেকের বিরুদ্ধেই হত্যা মামলা করা হচ্ছে। অন্যদিকে আত্মগোপনে থাকা বিএনপির নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে আসছেন। তারা জামিনে মুক্তিলাভ করছেন। অনেকের মামলাও প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এতদিন ধরে ঝুলে থাকা দুদকের মামলা থেকেও অনেককে দায়মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। যে ‘বিজয়ীভাব’ নিয়ে গত প্রায় ১৬ বছর আওয়ামী লীগ স্বস্তিতে পার করেছে, ঠিক একইভাবে এখন স্বস্তি পাচ্ছে বিএনপি। বিপদে আছে আওয়ামী লীগ।
যদিও নির্বাচনে বিএনপি এখনো জয়লাভ করেনি বা আওয়ামী লীগের বিপরীতে বিএনপি ক্ষমতায়ও বসেনি। ক্ষমতায় বসেছে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন একটি অন্তবর্তী সরকার। বেশির ভাগ মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা পদে নিয়োগ পেয়েছেন সুধী সমাজের প্রতিনিধিরা। কারণ এই সরকারের নিজস্ব কোনো কর্মী বা সমর্থক গোষ্ঠী নেই। ফলে আওয়ামী লীগের বিপরীত স্রোত বা মতবাদে বিশ্বাসী লোকেরা এখন গুরুত্ব পাচ্ছেন সরকার পরিচালনাসহ সর্বত্র। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এর সুফল বিএনপি পাচ্ছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, প্রায় ১৬ বছর পরে বাংলাদেশের রাজনীতি নতুন বাঁক নিয়েছে। যেমন বাঁক পরিবর্তন হয়েছিল ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর। ওই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় এলে বিএনপিসহ সমর্থক দলগুলো কোণঠাসা হয়ে পড়ে। যদিও বিএনপি তখন মাত্র ৩০টি আসন নিয়ে কোনোমতে সংসদের বিরোধী দলের আসনে বসতে পেরেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও দলটির রাজনীতিতে তখন থেকেই ভাটার টান শুরু হয়। এর পরবর্তী তিনটি নির্বাচনের মধ্যে একটিতে অংশ নিয়ে এবং অন্য দুটি বর্জন করে রাজনীতিতে বিএনপি আরও কোণঠাসা হয়ে পড়ে।
বিএনপির দলীয় এক হিসাব মতে, গত প্রায় ১৬ বছরে দেড় লাখ মামলায় বিএনপির ৫০ লাখ লোককে আসামি করা হয়। ফলে দলটির রাজপথে রাজনীতি করা কঠিন হয়ে পড়ে। ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন বর্জনের আন্দোলন, ২০১৫ সালে সরকারবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে বিএনপিকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। এমনকি ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়েও দলটি স্বস্তি পায়নি। কারণ ওই বছরের ১ নভেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রেন্টর বৈঠকের পরও বিরোধী দলগুলোর কোনো মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি। ওই সময়ও বিভিন্ন মামলার অজুহাতে বিএনপির কয়েক হাজার নেতা-কর্মীকে কারাগারে রাখা হয়। আর প্রচণ্ড চাপের মধ্যে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপি মাত্র ৭টি আসন লাভ করে।
সর্বশেষ গত বছরের ২৮ অক্টোবর নয়াপল্টনে বিএনপির জনসভাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতার ঘটনায় বিএনপির ২০ হাজারের বেশি নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। বস্তুত ওই সময় গ্রেপ্তারকৃতরা জামিন লাভ করেন চলতি বছরের ৭ জানুয়ারির দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে। ওই নির্বাচনের মাধ্যমে টানা চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় যায় আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে এক-এগারো পরবর্তী দুই বছরসহ বিএনপির তখন ক্ষমতায় বাইরে থাকার ১৭ বছর পূর্ণ হয়। সব মিলিয়ে এই ১৭ বছরে বিএনপির নেতা-কর্মীরা ছিলের বিপর্যস্ত অবস্থায়। আর বিপরীতে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ছিল স্বস্তি।
বদিউল আলম মজুমদারের মতে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের বছরের পর বছর ধরে দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন, লুটপাট, টাকা পাচার, সংবিধান নিয়ে খেলা, মানুষের ভোটাধিকার হরণের কারণে মানুষের ভেতর চরম ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। এই ক্ষোভের পরিমাণ এত ভয়াবহ ছিল যে আমরা একটা বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে ছিলাম। আর এই জনবিস্ফোরণের ফলেই দেশের রাজনীতির পাশাপাশি সামগ্রিক চিত্র পাল্টে গেছে।
তার মতে, রাজনীতির বাঁক পরিবর্তনে ফলে অপূর্ব সম্ভাবনা যেমন আছে, শঙ্কাও তেমন কম নয়। আমরা যদি নিজেদের পরিবর্তন করতে পারি, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ ও স্বচ্ছ হতে পারি, তাহলে আমাদের জন্য অপূর্ব সম্ভাবনা রয়েছে।