অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর আজ ৮ আগস্ট। সেই সরকারের তথ্য উপদেষ্টার দায়িত্ব পাওয়া নাহিদ ইসলাম পদত্যাগ করে রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন। তার নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তার পরও পাঁচ মাস পেরিয়ে গেছে।
অস্বস্তি নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে এনসিপি। শুরুর দিকে এই রাজনৈতিক দলের প্রতি সারা দেশের মানুষের যথেষ্ট আগ্রহ দেখা গেছে। আত্মপ্রকাশের খবর দেশের সব গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করা হয়। তবে তরুণদের এই রাজনৈতিক দল এখন কোন অবস্থায় আছে, তা নিয়ে রয়েছে নানা মত। অনেকেই মনে করছেন, দল গঠনের প্রাথমিক বাধা কাটিয়ে উঠলেও কঠিন নির্বাচনি চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে তাদের সামনে।
গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া প্ল্যাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতা ছিল দেশের বেশির ভাগ মানুষের কাছে। এই প্ল্যাটফর্ম থেকে দুজনকে উপদেষ্টা পদে এবং একজনকে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ শুরুর পর ছাত্রদের পক্ষ থেকে একটি নতুন দল গঠনের পরিকল্পনার কথা জানা যায়। সেই লক্ষ্যে বৈষম্যবিরোধী প্ল্যাটফর্ম, লিয়াজোঁ কমিটি কাজ করে। পরে জাতীয় নাগরিক কমিটি গঠন করে দল গঠনের কার্যক্রম পুরোদমে চালানো হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে এই প্ল্যাটফর্মটির কমিটিও গঠিত হয়। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসও ছাত্রদের দল গঠনের বিষয়টি ব্রিটিশ গণমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকেও বলেছেন।
দল গঠনের জন্য ২৫ ফেব্রুয়ারি সরকারের তথ্য উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেন নাহিদ ইসলাম। নতুন দলের সদস্যসচিব পদ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। মতবিরোধে বের হয়ে যায় একটি অংশ। তারা আপ বাংলাদেশ নামে নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম গঠন করেন। অন্যদিকে ছাত্রদের নতুন দল নিয়ে সবার মধ্যে আগ্রহ ছিল। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জাঁকজমকভাবে জাতীয় নাগরিক পার্টির আত্মপ্রকাশ ঘটে। সেই দিন নাহিদ ইসলাম বাংলাদেশ গঠনে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
দল গঠনের পর বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ এনসিপির সামনে আসে। দলের নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও উপদেষ্টা থাকার সময় নাহিদ ইসলামের বক্তব্য নিয়ে বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে শুরু হয় তিক্ততা। ঢাকায় কর্মসূচিতে নেতা-কর্মীদের কম জমায়েত নিয়ে প্রশ্নের মুখেও পড়তে হয় নেতাদের।
জুলাই মাস উপলক্ষে দলটির কর্মসূচি জুলাই পদযাত্রা জনগণের মধ্যে যথেষ্ট সাড়া ফেলে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় এনসিপির সমর্থনে লোক সমাগম দেখা যায়। অনেকেই মনে করছেন, এনসিপি প্রথম দিকে ফেসবুক রাজনীতি আর ঢাকাকেন্দ্রিক রাজনীতি শুরু করেছিল। কিন্তু রাজনীতিতে তৃণমূলে অবস্থানই অন্যতম নিয়ামক। তারা দেরিতে হলেও সেটি অনুধাবন করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় গত ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে তারা ২৪ দফার ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। দেশ পুনর্গঠনে এনসিপি নেতারা কর্মপন্থা স্পষ্ট করেছেন। একই সঙ্গে তাদের ব্যর্থতাও স্বীকার করেছেন।
অন্যদিকে এনসিপি নেতাদের কারও কারও বিরুদ্ধে তদবির-বাণিজ্য, চাঁদাবাজির অভিযোগে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে গত কয়েক মাসে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে (এনসিটিবি) কমিশন এবং ডিসি নিয়োগে তদবির করার অভিযোগ ওঠার পর দলটির যুগ্ম সদস্যসচিব সালাহউদ্দীন তানভীরকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। মব তৈরি করে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে ধানমন্ডি থানায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মোহাম্মদপুর থানার আহ্বায়ক সাইফুলকে ছাড়িয়ে আনার ঘটনায় সমালোচনার মুখে পড়েন দলের সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ। যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষারের বিরুদ্ধে এক নারীকে আপত্তিকর শব্দ চয়ন করার অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে তাকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়। সর্বশেষ জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসে দলের রাজনৈতিক পর্ষদকে না জানিয়ে কক্সবাজার ভ্রমণে যাওয়ায় শীর্ষ পাঁচ নেতাকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
এনসিপির বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলের বয়স মাত্র পাঁচ মাস। তারা কোনোভাবেই হতাশ নন। প্রাথমিক অবস্থায় নানা বাধা থাকে। এনসিপির প্রতি মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। এটি তাদের মধ্যে চাপ তৈরি করে। পাশাপাশি বিভিন্ন দল ও মতের মানুষ এখানে যোগ দেন। আদর্শিক সংকটও ছিল। নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়াও কম ছিল। সর্বশেষ জুলাই পদযাত্রায় সবাইকে এক সুতোয় বাঁধা হয়েছে।
নির্বাচনি চ্যালেঞ্জ সামনে
আগামী ফেব্রুয়ারিতে ভোট আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এনসিপির সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ নির্বাচন। নিবন্ধন ও প্রতীক এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে দলটির সম্ভাব্য প্রার্থীরা নির্বাচনি এলাকা টার্গেট করে পরিকল্পনা করছেন। ভোটারদের টার্গেট করে পরিকল্পনাও নিচ্ছেন নেতাদের অনেকেই। এই নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ভোটের মাঠে নিজেদের উপস্থিতি শক্তভাবে জানান দেবেন।
দলের শৃঙ্খলা কমিটির প্রধান ও যুগ্ম সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল আমিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা জুলাই পদযাত্রার মাধ্যমে অনুধাবন করতে পেরেছি, মানুষের মধ্যে আমাদের নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ আছে। আমরা সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধিতে আরও মনোযোগী। একই সঙ্গে জনসম্পৃক্ত কর্মসূচির মাধ্যমে ভোটের চ্যালেঞ্জও কাটিয়ে উঠব।’