বাংলাদেশ থেকে লুটপাটের টাকার অধিকাংশ পাচার হয়েছে বলে নানা দেশি-বিদেশি সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার বলেছে, সব মিলিয়ে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। তবে পাচার বন্ধ করা গেলেও ব্যাংক খাতে চলমান অস্থিরতা কাটেনি। আমানতকারীদের আস্থাহীনতাও পুরো ফিরে আসেনি।
ড. আহসান এইচ মনসুর গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে বলেছিলেন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরকার চিত্র উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো। অর্থনীতি গভীর খাদের কিনারে চলে গেছে। ইসলামি ধারাসহ বেশ কয়েকটি ব্যাংককে দুর্বল আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, এই ব্যাংকগুলোর অবস্থা এত খারাপ যে সেগুলো চলার সক্ষমতা নেই। এর পর থেকে তিনি ধাপে ধাপে প্রায় ১৪টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে নতুন পর্ষদ গঠন করে দেন। আরও কয়েকটি ব্যাংকের পর্ষদ ভাঙার সিদ্ধান্ত রয়েছে।
এরপর বিভিন্ন ব্যাংক থেকে গ্রাহকের আমানত তোলার হিড়িক লেগে যায়। এতে এসব ব্যাংকে তীব্র তারল্যসংকট দেখা দেয়। একপর্যায়ে ব্যাংকে ব্যাংকে ঘুরেও গ্রাহকরা টাকা তুলতে পারেননি। এতে ব্যাংক খাতের প্রতি গ্রাহকের আস্থা তলানিতে নেমে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, গত এক বছরে ব্যাংক খাতে নগদ টাকার অভাব ছিল প্রকট। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে- অর্থ পাচার, লাগামহীনভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি, গ্রাহকদের আস্থার অভাবে ব্যাংক থেকে টাকা তোলার হিড়িক এবং কয়েকটি ব্যাংককে বিগত সরকারের সময়ে দেওয়া অনৈতিক সুবিধা প্রত্যাহার করা।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গভর্নর তার অবস্থান পরিবর্তন করে সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা দেন। সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি উত্তরণে প্রথমে ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের আওতায় সবল ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে অর্থ সহায়তা নিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে এসব ব্যাংককে তারল্য সহায়তা দেয়। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত এই ব্যাংকগুলোকে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এদিকে ব্যাংক রেজল্যুশন অ্যাক্টের মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূতকরণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পাঁচ ব্যাংকের সম্পদের মান নিরীক্ষাকাজ শেষ হয়েছে। আরও কয়েকটি ব্যাংকে নিরীক্ষা করা হবে বলে জানা গেছে। এই একীভূতকরণের ঘোষণার ফলে ব্যাংক খাতে গ্রাহক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক।
ব্যাংক খাতের আরও একটি বড় সংকট হচ্ছে লাগামহীনভাবে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি। বিগত সরকার খেলাপি ঋণের তথ্য গোপন করলেও এই সরকার তা প্রকাশ করছে। এতে খেলাপি ঋণ বাড়ছে বিদ্যুৎগতিতে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে লুটের অর্থ এখন খেলাপি হচ্ছে। সর্বশেষ গত জুনে খেলাপি ঋণ বেড়ে ৫ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। আগের বছরের জুনে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা। এ হিসাবে এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ লাখ কোটি টাকার বেশি। বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ চিহ্নিত হলেও তা পুনরুদ্ধারে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে নানা সংকটের মধ্যেও আশার খবর হচ্ছে, গত এক বছরে দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রয়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স অব্যাহতভাবে বাড়ছে। ফলে স্থিতিশীল রয়েছে রিজার্ভও। ডলারের বাজারও স্থিতিশীল রয়েছে।
সব মিলিয়ে গত এক বছরে খাদের কিনার থেকে আর্থিক খাত মোটামুটি ঘুরে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আমরা দায়িত্ব নেওয়ার সময় ব্যাংক খাতটি আইসিইউতে ছিল, সেখান থেকে আমরা বেরিয়ে এসেছি। এখন দেশের অর্থনীতি কেবিন থেকে বাড়ি ফিরে আসছে। এবার সামনে এগিয়ে যাওয়ার পালা।’
অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরে ব্যাংক খাতের অগ্রগতি বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, বিগত সরকার অর্থ পাচার, দুর্নীতি, অনিয়ম আর লুটপাট করে দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছিল। সেই জায়গা থেকে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে পরিস্থিতি উত্তরণের চেষ্টা করছে। কিছু জায়গায় সফলতা এসেছে। কিছু জায়গায় আরও অনেক কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, এই সরকারের সময়ে সবচেয়ে বড় সফলতা হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারকে স্থিতিশীল করা। এটা না হলে পুরো অর্থনীতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা ছিল। এই সরকার দায়িত্ব নিয়ে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারকে স্থিতিশীল করেছে। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় অব্যাহতভাবে বাড়ছে, ফলে রিজার্ভ স্থিতিশীল রয়েছে। তবে বিগত সরকারের সময়ে সবচেয়ে বেশি আশঙ্কাজনক অবস্থায় ছিল দেশের ব্যাংকিং খাত। খাতটা ভেঙে পড়বে কি না, সেই আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। তবে এখন পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়িয়েছে, সেটা না বললেও সেই আতঙ্কটা এখন আর নেই। কিছু কাজ হয়েছে, কিছু হচ্ছে। এখন যে জায়গায় দেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। সামনে এগোতে হবে। তবে বেশ কিছু জায়গায় রক্তক্ষরণটা বন্ধ করা গেছে। কিছু জায়গায় চিকিৎসা শুরু করা হয়েছে। তবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে দ্বিগুণ গতিতে এগোতে হবে সরকারকে। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের উদ্যোগ চলছে। এখন দেশ থেকে অর্থ পাচারও অনেকাংশে কমেছে। তবে পাচারের অর্থ ফেরাতে সরকারকে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
সার্বিক বিষয়ে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘ব্যাংক খাতকে পুনরুদ্ধারের জন্য তিনটি বিশেষায়িত টাস্কফোর্স গঠনসহ বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। ব্যাংক খাতকে আগের অবস্থায় পুনরাবৃত্তি হতে দেব না। আমরা চেষ্টা করব, ভালো একটা অবস্থানে নিয়ে যেতে। আমরা অনেক সংস্কারমূলক কাজ হাতে নিয়েছি, যা আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যপদ্ধতি পরিবর্তন হবে। সেখানে স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা হবে। তিনি বলেন, সবার আগে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। তাদের স্বার্থই দেশের স্বার্থ। তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারলেই দেশের স্বার্থ রক্ষা করা যাবে।