পৃথিবী আমাদের একটা গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে দেখতে চায়। শুধু নামে গণতন্ত্র না, শুধু ভোটে গণতন্ত্র না। সত্যিকার অর্থে মানবাধিকার সংরক্ষণসহ নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা- এই বিষয়গুলোর দিকে মনোযোগী হয়ে আমি যদি গণতান্ত্রিকভাবে প্রাণবন্ত করতে পারি তাহলে সেটা হবে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার সর্বোত্তম অস্ত্র।…
বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক উদারনৈতিক দেশ। ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য উপযুক্ত জায়গা। শান্তিপূর্ণ বিশ্ব রক্ষায় জাতিসংঘের আওতায় সবগুলো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ যুক্ত থাকবে। গণতান্ত্রিক, উদারনীতির ক্ষেত্রে ভাবমূর্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেই ভাবমূর্তি রক্ষা করতে হবে। পুবের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হয়, আবার পশ্চিমের দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক রাখতে হয়। নিরাপত্তার জন্য, রপ্তানির জন্য, রেমিট্যান্সের জন্য, বিনিয়োগের জন্য, ব্যবসায়ীদের জন্য ভাবমূর্তি রাখতে হবে। বিদেশি ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশকে কীভাবে দেখে? কোনো দেশের সঙ্গে রেষারেষি থাকলে, সম্পর্ক খারাপ করলে ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়- দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই ১৯৭২ সালে এই নীতিমালায় আমরা ধ্রুবতারা হিসেবে জড়িয়ে ছিলাম। পরবর্তীতে মনে হয়েছে, কারও সঙ্গে বেশি বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে কম বন্ধুত্ব কেন করছি না। প্রয়োজনের নিরিখে, জাতীয় স্বার্থের নিরিখে, কারও সঙ্গে একটু বেশি হবে, কারও সঙ্গে একটু কম হবে। কিন্তু সরাসরি কারও সঙ্গে বৈরিতায় যাওয়ার প্রয়োজন মনে করছি না। এবং সেটা আমাদের জন্য উপাদেয় হবে বলে মনে করি না। সবার সঙ্গেই বন্ধুত্ব থাকবে। বন্ধুত্বের জায়গায় বন্ধুত্ব। জাতীয় স্বার্থ, জনগণের প্রত্যাশার ভিত্তিতেই আমরা পররাষ্ট্রনীতি পরিপক্ব করব। মোটা দাগে যেটা বলে শেষ করব, সেটা হচ্ছে, এই নীতিমালা এখনো আমাদের সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে। এটা পরিবর্তনের প্রয়োজন এখন পর্যন্ত মনে হয় না। বাস্তব অবস্থাও সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত বা সুযোগ দিচ্ছে না।
বাংলাদেশের মানুষ কী চায়? ভারতের সঙ্গে সম্পোর্কন্নয়নে কী তাদের প্রত্যাশা। সেটা মনে রেখে যদি উদ্যোগ নেওয়া হয় তাহলে সম্পর্কোন্নয়নে কোনো ঘাটতি থাকবে না। আমরা চাই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে। কাজেই এ ব্যাপারে উভয় দেশের মনোযোগী হওয়া উচিত। সরকার যাবে, সরকার আসবে। কিন্তু দুই দেশের মানুষ যদি সম্পর্কটাকে গ্রহণ করে এবং তারা যদি এটাকে মূল্যায়ন করে তাহলেই টেকসই হওয়া সম্ভব। কাজেই বাংলাদেশের সরকার পরিবর্তন হওয়া মানে ভারতের কিছু চলে গেল, স্বার্থসম্পৃক্ত হচ্ছে না- এমন মনে করা ঠিক না। কারণ আমরা পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। তাদেরও আমাদের প্রয়োজন, আমাদেরও তাদের প্রয়োজন। এমন কিছু বিষয় আছে যা আমরা এককভাবে কেউই করতে পারব না। কাজেই সেই প্রেক্ষাপটে আমি মনে করি, গত ১৫-১৬ বছরে যে রাজনৈতিক বিবেচনা যোগ হয়েছিল, তা উভয় দেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন হয়েছে। আমরা যদি সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যেতে চাই, তাহলে প্রয়োজন দুই দেশের স্বার্থ কোথায় আছে, সেই জায়গাটা বের করা, সেই জায়গার ভিত্তিতে সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক হওয়া, উদ্যোগী হওয়া এই মুহূর্তে জরুরি। গত সরকারের আমলে সরকার ভারতের সঙ্গে বাড়তি জোর দিয়ে সম্পর্ক করতে সচেষ্ট ছিল। তার প্রথম কারণ ছিল রাজনৈতিক। গত সরকার ক্ষমতায় আসার পরে মনে করেছিল ভারত যদি রাজনৈতিকভাবে তাকে সমর্থন করে, তাহলে তাদের চিরদিন ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য সুবিধাজনক হবে। সে কারণে তারা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কটা যেটা দুই দেশের মধ্যে স্বাভাবিক ছিল বা আছে, সেখানে একটা বাড়তি চাপ যোগ করে সম্পর্ক জটিলতায় নিয়ে গেছে। এখন যে জটিলতা অর্থাৎ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে টানাপোড়েন তার প্রধান কারণ কিন্তু ওটাই। সম্পর্ক যদি স্বাভাবিকভাবে চলতে পারত তাহলে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক যা ছিল তাই থাকত। এর মধ্যে রাজনৈতিক উপাদান যোগ হওয়ায় বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন ঘটেছে। মানুষের অধিকার বঞ্চনার বিষয়গুলো ঘটেছে, নাগরিক অধিকার হরণ করে তার ওপর নিষ্পেষণের যে বিষয়গুলো ঘটেছে- সেগুলো একেবারে অন্যায় কাজ। এ বিষয়গুলো এড়িয়ে যেতে পারলে সম্পর্কটা স্বাভাবিক পর্যায়ে থাকত। জনগণ মনে করছে সম্পর্কটা সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। ভারত আমাদের প্রতিবেশী দেশ। আমাদের বহুমাত্রিক সম্পর্ক আছে। সরকার বলেন, জনগণ বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য বলেন- সবখানে একটা পারস্পরিক নির্ভরশীলতা আছে। এ পারস্পরিক নির্ভরশীলতাটা যদি থাকে তাহলে সুসম্পর্ক আবারও ফিরিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু সেটা যদি রাজনৈতিক মূল্যায়ন দিয়ে বিচার করতে চান তাহলে কিন্তু এ টানাপোড়েন চলতে থাকবে। যেহেতু অনেক বিষয়ে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা আছে, সে ক্ষেত্রে ভারতের দিক থেকেও স্বচ্ছতাটা প্রয়োজন।
আমি মনে করি যে, বাংলাদেশে একটা নতুন বাস্তবতা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটা নতুন বাস্তবতা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের একটা ভালো অর্থনৈতিক সম্পর্ক আছে। বাংলাদেশ সরকার যে ধরনের সংস্কার প্রক্রিয়া হাতে নিয়েছে, সেগুলো যদি সম্পন্ন হয় তাহলে আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়ক হবে। আমাদের দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগটা বাড়বে। কাজেই যুক্তরাষ্ট্র এ অর্থনৈতিক সম্পর্কটাকে সমৃদ্ধ করতে চাইবে না বা বাংলাদেশে অর্থনৈতিক জায়গাটা সম্প্রসারিত হোক তা চাইবে না- এটা মনে করার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। যুক্তরাষ্ট্র একটি বলয়। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ভারতের চোখ দিয়ে দেখতে পারে। কাজেই কৌশলগত অর্থনৈতিক অবস্থা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক, দুই দেশের স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক- এসবের আলোকে বিশ্লেষণ করলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের এই মুহূর্তে আগের সম্পর্কের চাইতে সম্পর্ক খুব বেশি পরিবর্তিত হওয়ার কোনো জায়গা নেই। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের এই চলমান সংস্কার প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে যাচ্ছে। আমরা সবগুলো সম্পর্কই ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে দেখতে আগ্রহী। আমার ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র সে বিষয়টা গ্রহণ করবে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা থেকেই হয়ে থাকে। বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বের আগ্রহের অন্যতম প্রধান কারণ আমাদের অভ্যন্তরীণ কিছু উপাদান। পৃথিবী আমাদের একটা গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে দেখতে চায়। এটা আমার বাইরে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি। সবাই বাংলাদেশকে একটা প্রাণবন্ত গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে দেখতে চায়। এটা হলো ১ নম্বর উপাদান। শুধু নামে গণতন্ত্র না, শুধু ভোটে গণতন্ত্র না। সত্যিকার অর্থে মানবাধিকার সংরক্ষণসহ নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা- এই বিষয়গুলোর দিকে মনোযোগী হয়ে আমি যদি গণতান্ত্রিকভাবে প্রাণবন্ত করতে পারি তাহলে সেটা হবে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার সর্বোত্তম অস্ত্র। দ্বিতীয় হলো- বাংলাদেশে এখনো ২০ শতাংশ অর্থাৎ জনসংখ্যার এক পঞ্চমাংশ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। কাজেই দারিদ্র্য বিমোচন আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং গত জুলাই-আগস্টে যে অভিজ্ঞতাটা পেলাম, সেখানে আরেকটা উপাদান বেশ জোরালোভাবে সামনে এসেছে। তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা দরকার। এটা কীভাবে হবে ভাবতে হবে। দেশে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিদেশি বিনিয়োগ বলেন, আর অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বলেন ১০ বছরে ধরে এর অবস্থা ভালো না। কাজেই এখানে এমন একটা অর্থনীতি কাঠামো দাঁড় কারানো দরকার, যে কাঠামো হবে স্বচ্ছ, গোষ্ঠীকেন্দ্রিক নয় এবং সব মানুষের জন্য সমানভাবে সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। যে কাঠামোটা তরুণ প্রজন্মের কাজের ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে পারে। সেই কাঠামোটার ভিত্তি হবে শিক্ষিত এবং দক্ষ জনগোষ্ঠী। সেটা যদি করতে পারি, তাহলে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষিত হবে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক একটা জায়গায় নিজেকে উপস্থাপন করতে পারবে। তৃতীয়ত- বাংলাদেশকে উদারনীতির দেশ হতে হবে। যেখানে বাংলাদেশকে অসাম্প্রদায়িক, সব মানুষের উদার ও মুক্তচিন্তার দেশ হিসেবে তৈরি করতে পারি। সেটা ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করবে। সেই ভাবমূর্তিটাকে আমরা কাজে লাগাতে পারি সক্রিয় কূটনীতির মাধ্যমে। তাহলে বাংলাদেশের প্রতি মানুষ আকৃষ্ট হবে। আমরা যে সম্পর্ক গড়তে চাচ্ছি, সেই সম্পর্কটা একটা যুক্তিসঙ্গত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে।
বৈশ্বিকভাবে আমাদের একটা পরিবর্তন হচ্ছে। আপনি ভূ-রাজনীতির কথা বলেন, অর্থনীতি বলেন, রাজনৈতিক নীতি-নৈতিকতার কথা বলেন- সব বিষয়কে কেন্দ্র করে বিশ্বে একরকম পরিবর্তন হচ্ছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও একটা বড় পরিবর্তন হয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরেও একটা নতুন প্রজন্মের উত্থান আমি দেখতে পাচ্ছি। এই নতুন প্রজন্মের উত্থান বাংলাদেশের পরিবর্তনের ধারা কোথায় নিয়ে যাবে। এ ধারাটা তরুণ প্রজন্ম নিয়ন্ত্রণ করবে আগামী দুই, তিন, পাঁচ দশক। কাজেই এ তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশাকে ধারণ করে বাইরের পৃথিবীর বাস্তবতা মনে রেখে পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন। সেখানে রাজনীতি থাকতে পারে, অর্থনীতি থাকতে পারে, সমাজনীতি থাকতে পারে, শিক্ষা থাকতে পারে। একইভাবে বাইরের পৃথিবীর পরিবর্তনগুলো মাথায় রেখে কূটনৈতিক দক্ষতা বলেন, সক্ষমতা বলেন, বিনিয়োগ বলেন- সবগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করে দক্ষতা বৃদ্ধির প্রতি আমাদের মনোযোগ দিতে হবে।
লেখক: যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত