ঢাকা ২২ আষাঢ় ১৪৩৩, সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
হালান্ডের জোড়া গোলে বিদায় ব্রাজিল, মধ্যরাতে উল্লাস মৌলভীবাজারে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন কৌশলে যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতা দিবসে ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারমূলক ভাষণ ২৩ বছর ধরে আমাকে শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে: রোনালদো কৃষিকে আধুনিকায়নে ঝিনাইদহে ৯০ কৃষকের হাতে উঠল স্প্রে মেশিন দেনমোহর আদায়ে নীতিমালা করতে হাইকোর্টে রিট জাতিসংঘের স্থায়ী প্রতিনিধি হচ্ছেন আইরিন খান ট্রাম্পের ফোনে বালোগানের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিল ফিফা, বিশ্বকাপে তোলপাড় ৩ বছর পর বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে মুখোমুখি ৬ বিভাগে ভারী বৃষ্টি, ৫ জেলায় বন্যার সতর্কতা ইস্টার্ন ব্যাংকের আলী রেজার দুর্নীতি: তথ্যের অপেক্ষায় অনুসন্ধান স্থবির আ.লীগের বিচার হবে কি না, তদন্ত চলছে ব্যবসায়ীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ শিশু বলাৎকার ও যৌন হয়রানির অভিযোগে গ্রেপ্তার ২ শূলের মঞ্চে দুই রাকাত লুঙ্গি পরা যুবকের ‘প্যান্টের পকেটে’ মিলেছে গাঁজা! কোয়ার্টার ফাইনালে কার মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড? কালো লেডিবার্ড বিটল ‘ট্রাম্পকে হত্যা করো’ স্লোগান, ইরানে ক্ষোভের আগুন এনসিটি পরিচালনার ভার পাচ্ছে ডিপি ওয়ার্ল্ড! মেক্সিকোর বিপক্ষে নাটকীয় জয় ১০ জনের ইংল্যান্ডের এনবিআরের অদক্ষতায় নিষ্পত্তি হচ্ছে না রাজস্ব মামলা! মেক্সিকো-ইংল্যান্ড ম্যাচ ড্র হলে ভবিষ্যৎ কী? স্পেন-পর্তুগালের ডু অর ডাই কর্ণফুলী টানেল: নিয়ম ভেঙে লুটপাটের মহোৎসব ফিফা বিশ্বকাপে কতজন ইংলিশ খেলোয়াড় হ্যাটট্রিক করেছেন? ৬ জুলাই: তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীনের আজকের রাশিফল সিলেটে মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ৩ স্কুলছাত্র নিহত এখনো নোবেল পুরস্কার না পাওয়ায় ট্রাম্পের আক্ষেপ ৬ জুলাই: মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ ও কন্যার আজকের রাশিফল

‘বারে বারে কে যেন ডাকে আমায়’

প্রকাশ: ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০৪ পিএম
আপডেট: ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০৫ পিএম
‘বারে বারে কে যেন ডাকে আমায়’
অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম

ইতিহাসের গতিকে কোনো ব্যক্তি রুদ্ধ বা পরিবর্তন করতে পারে না। তাকে সম্পাদনা করারও কোনো সুযোগ নেই। সব রাজনৈতিক মতাবলম্বীদের এ কথা মনে রাখতে হবে। আমাদের নানাবিধ সমস্যা থাকলেও ১৬ ডিসেম্বর এসেছিল বলেই আমাদের গড় আয় এখন ৪ হাজার ডলার, আয়ু ৭৪ বছর, খালি গায়ে বা খালি পায়ে কোনো মানুষ নেই, গৃহহীন কেউ নেই, খাদ্য সাহায্য নেওয়ার মতো মর্যাদাহীন কোনো মানুষও নেই। দিবসটি আমাদের বারে বারে ডাক দিয়ে যাবে।…

বিজয় দিবসের অমর বাণী আমাদের বারে বারে ডাকে। কারণ ৯ মাসে লাখো প্রাণের ও সম্ভ্রমের এবং কোটি মানুষের আতঙ্কভরা জীবনযাপনের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ছিল ০১.০৩.১৯৭১-এ সূচনা হওয়া নাটকের শেষ অঙ্কের শেষ দৃশ্য। বর্তমানে নানা দিবস নড়বড়ে হওয়া শুরু হয়েছে, ১, ৭ মার্চ এখন অনুল্লিখিত। ১৬ ডিসেম্বর অস্পষ্ট বলে প্রতিয়মান। তবে তাকে ধ্বংস করা কঠিন হবে। তাই স্মরণ করি সে হিরণ্ময় দিনটিকে। পূর্ব পাকিস্তানের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিব ছিলেন এর প্রধান কুশীলব। আর নিষ্ঠুর, বিশ্বাসঘাতক, অপরিণামদর্শী পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর কার্যকলাপ ছিল এর পেছনের প্রধান কারণ। ব্রিটিশ শাসনের শেষ প্রান্তে এসে ভারতীয় উপমহাদেশের অধিবাসীদের ধর্মভিত্তিক পরিসংখ্যানে মুসলমানের হার ছিল মাত্র ১৮.৯০ ভাগ। উচ্চ মেধাবী এবং সবচেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় সনাতনী মানুষের সঙ্গে জীবনের নানা প্রতিযোগিতায় অক্ষম হওয়ার নিশ্চিত আশঙ্কায় মুসলমানদের অবিসংবাদিত নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মুসলমানদের জন্য একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র দাবি করেন। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান নামের এ রাষ্ট্র এবং ভারতীয় ইউনিয়ন রাষ্ট্র দুটি গঠিত হয়। তখন পূর্ব পাকিস্তানিদের সংখ্যা ছিল পাকিস্তানের সমগ্র জনসংখ্যার শতকরা ৫৬ ভাগ। ভারতের পাঞ্জাবের কর্নাল জেলা থেকে সর্বস্ব ত্যাগ করে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে আসা রাজনীতিবিদ লিয়াকত আলী খান পাকিস্তানের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হন। পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষা সম্পর্কে তার কিছুটা পক্ষপাতদুষ্ট মনোভাব ছাড়া অন্যান্য বিচারে তিনি একজন চমৎকার, সৎ, জনপ্রিয় এবং গণতন্ত্রমনা মানুষ ছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী ষড়যন্ত্র করে পশ্চিমাদের সহায়তায় লিয়াকত আলী খানকে আঁততায়ীর মাধ্যমে খুন করায়। লিয়াকত আলী খানের হত্যার পর ১৯৫৮ সালে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল আইয়ুব খান (সীমান্ত প্রদেশ) সরাসরি ক্ষমতা দখল করেন। তার সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব পাকিস্তানিদের চরম বঞ্চনা ও শোষণ আরম্ভ করে। তিনি শামরিক শাসন চাপিয়ে দিয়ে ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানিদের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে কঠোর হস্তে দমন করে রাখেন। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রবল গণ-আন্দোলনের মুখে তিনি পদত্যাগ করলে সেনাপ্রধান জেনালের আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান (উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ) ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ শামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। মেজর জেনারেল হিসেবে এর আগে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং বা জিওসি ছিলেন। সে কারণে এবং স্বভাবগতভাবে তিনি বাঙালি বিদ্বেষী ছিলেন না। ক্ষমতা নেওয়ার পরপরই তিনি পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বেশ কয়েকটি ভালো কাজ করেন।

১. জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আইন পাস।
২. কেন্দ্রীয় বাজেটে পূর্ব পাকিস্তানের হিস্যা তাৎপর্যপূর্ণভাবে বৃদ্ধি করা। 
৩. একটি বেসামরিক প্রশাসনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের উদ্দেশ্যে জাতীয় নির্বাচন কর্মসূচি ঘোষণা করা। 
৪. ঢাকা প্রাদেশিক রাজধানী হওয়া সত্ত্বেও ইয়াহিয়া ঢাকার শেরেবাংলা নগরে নির্মাণাধীন ভবনে পরবর্তী জাতীয় সংসদ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার জন্য ১৯৭১-এর ফেব্রুয়ারির মধ্যে ভবনটির সাজসজ্জা চূড়ান্ত করার নিদের্শ দেন।

প্রতিশ্রুতি মতো, ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ৩০০ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসন এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ৮৫টি আসনে জয় লাভ করেন। কিন্তু ভুট্টো বলেন, ‘মুজিবের দল পশ্চিম পাকিস্তানে কোনো আসন লাভ করেনি। কাজেই তিনি সমগ্র পাকিস্তানকে শাসনের অধিকার রাখেন না। তিনি তার দল নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানকে শাসন করুন আর আমি পশ্চিম পাকিস্তানের ১৩১টি আসনের ৮৫টিতে জয় লাভ করে এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করার ফলে আমার দল পিপলস পার্টি পশ্চিম পাকিস্তানকে শাসন করবে’। ইয়াহিয়া খান নিজে অনির্বাচিত হওয়ায় ভুট্টোর এসব জটিল যুক্তির সামনে অসহায় বোধ করেন। ভুট্টো এবং পীরজাদা তাকে বোঝান যে, পশ্চিম পাকিস্তানের নির্বাচিত নেতারা সংখ্যাগরিষ্ঠ না হলেও মুজিবের সঙ্গে তাদের একটি বোঝাপড়া ছাড়া জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান এবং ক্ষমতা হস্তান্তর করা ঠিক হবে না। রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ ইয়াহিয়া এ ফাঁদে পা দিয়ে ইতিপূর্বে তার ঘোষিত ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য পরিষদের অধিবেশন এবং ক্ষমতা হস্তান্তর সংক্রান্ত সব পরিকল্পনা থেকে পিছু হঠতে বাধ্য হন। সেই সূত্রে ঘটতে থাকে পরবর্তী ঘটনাক্রম-

১ মার্চ মধ্যাহ্নের কিছু আগে রেডিও পাকিস্তান থেকে পাকিস্তানের প্রসিডেন্ট জেনারেল আগা মো. ইয়াহিয়া খানের বরাতে (স্বকণ্ঠে নয়) এক বিবৃতিতে ৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার কথা বলা হলে সারা পূর্ব পাকিস্তান ক্ষোভ ও হতাশায় ফেটে পড়ে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী এসব স্থানে জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করতে থাকে। সান্ধ্য আইন জারি করে বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা চলতে থাকে। ৭ মার্চ রেসকোর্সে মুজিব বেলা ৩টা ১ মিনিটে এক জনসভায় ভাষণে বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। দেশের মানুষের ট্যাক্সের অর্থ দিয়ে যে অস্ত্র কেনা হয় বহিশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য, আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে আমার দেশের মানুষকে হত্যা করার জন্য। রক্ত যখন দিয়েছি, আরও রক্ত দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ’। (উদ্ধৃতি ক্রমানুসারে নয়)। পরদিন পশ্চিম পাকিস্তানের ওয়াহ সেনানিবাস থেকে লে. জেনারেল টিক্কা খান, কোর কমান্ডার, ঢাকায় বদলি হয়ে আসেন গভর্নরের পদে। প্রধান বিচারপতি কালিয়াকৈরের বি এ সিদ্দিকী নতুন গভর্নরকে শপথ না দেওয়ার দুঃসাহস দেখিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। ৮ মার্চ থেকে সারা প্রদেশে পাকিস্তান সরকার অচল হয়ে পড়ে মুজিবের মুখের নির্দেশে চলতে থাকে। সেনানিবাস ও গভর্নর হাউস ছাড়া আর কোথাও পাকিস্তানি পতাকা দেখা যায়নি। এ অবস্থায় ইয়াহিয়া ১৮ মার্চ ঢাকায় আসেন। পরদিন সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা সিন্ধুর জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় আগমন করলে মুজিব-ইয়াহিয়া-ভুট্টো আলোচনা আরম্ভ হয়। মিন্টো রোডে (বর্তমানে ফরেন সার্ভিস একাডেমি ভবনে) পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের চারটি প্রদেশ এবং কেন্দ্রের মধ্যে ভবিষ্যৎ ক্ষমতা বণ্টন নিয়ে এ আলোচনা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিমা মহলের দীর্ঘদিনের শোষণ বন্ধের লক্ষ্যে মুজিব প্রতিরক্ষা ছাড়া প্রায় বিষয়গুলোর ক্ষমতা প্রদেশের হাতে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেন। ইয়াহিয়া একপর্যায়ে বলেন, এত দেখছি এক কনফেডারেশনের ব্যবস্থা। তবে জাতির পিতা জিন্নাহ যেখানে এমন ব্যবস্থায় সম্মত ছিলেন, সেখানে আমি না করার কে? কিন্তু এতে ভুট্টো আপত্তি করেন। 

পাকিস্তান সেনাবা ইয়াহিয়াকে চাপ দিতে থাকেন এতে সম্মত না হয়ে বরং বল প্রয়োগ করে বাঙালিদের গদিতে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করে দিতে। ২৫ তারিখে সকালে কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে কর্নেল এসডি আহমদকে ঢাকায় এনে তার কমান্ডো ইউনিট সদস্যদের দিয়ে মুজিবের ৩২ নম্বর রোডের বাড়ি রেকি করা হয় মুজিবকে পরে গ্রেপ্তার করার জন্য। ইয়াহিয়া হামিদের সঙ্গে পানাহার শেষে তাকে বলেন, Sort the bastards out well and proper. এরপর করাচিগামী পিআইএ ফ্লাইটে তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন। পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী শুরু করে তাদের অপারেশন সার্চলাইট নামের বাঙালি নিধন অভিযান। মুজিব ১২টা ১ মিনিটে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের একখানি বেতার যন্ত্রের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে ঘোষণা করেন। বিবিসি তা প্রচার করে বিশ্বকে জানিয়ে দেয়, যা ইউটিউবে আছে। ঢাকাসহ সারা দেশে ৩২, ১৮, ৪৮ পাঞ্জাব, ২০, ২২ ও ২৪ ফ্রন্টিয়ার ফোর্স, ২০ বালুচ, ৪৩ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি, ৪ ক্যাভালরি ও ২১ নম্বর ব্যাটারি ইউনিট পিলখানায় ইপিআর সদর দপ্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, নীলক্ষেত এবং ঢাকা সেনানিবাসের বাঙালিদের গণহত্যা শুরু করে। হত্যা ছাড়াও নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠনের ভয়ে ১ কোটি মানুষ ক্রমে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। মুজিবকে পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাবের লায়ালপুর জেলা কারাগারে বন্দি করে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে বিচার করার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। ১৭ এপ্রিল, মেহেরপুরের মুজিবনগরে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার গঠিত হয় সৈয়দ নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে এবং বাঙালিরা সাধ্যমতো মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া শুরু করেন। ভারত তাদের সব রকম সহায়তা দিতে থাকে। কারণ বিপুল ভোটে নির্বাচিত মিসেস ইন্ধিরা গান্ধীর সরকার বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারও যে ’৭০-এর নির্বাচনে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছিল সে বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন। তিনি কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদকে সমর্থন করেননি। 

করাচি পৌঁছে ২৬ মার্চ প্রেসিডেন্ট, মুজিবকে দোষারূপ করে এক বেতার ভাষণ দেন। 

ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিক্সনসহ বিশ্বনেতাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, এই শরণার্থী নির্যাতিত এবং এদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করানো এ অঞ্চলে শান্তির জন্য প্রয়োজন। ব্রিটেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মিসর তাকে সমর্থন দেয়। দেশের ভেতর সামান্য প্রশিক্ষণ পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের এবং নিয়মিত সৈন্যদের হাতে ভারী অস্ত্রের অভাব থাকায় যুদ্ধে খুব অগ্রগতি সাধিত হয়নি। কোনো থানা বা মহকুমা মুক্ত করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। তবে বীর মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকী অন্য যেকোনো নিয়মিত সৈন্যের চেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে থাকেন। ইয়াহিয়া সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে লে. জেনারেল আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজি (মিয়াওয়ালি)-কে পূর্ব পাকিস্তানের অধিনায়ক হিসেবে নিয়োগ দেন। বিশিষ্ট অভিনেত্রী শর্মিলী ঠাঁকুরের চাচাশ্বশুর লে. জেনারেল শের আলী খান পতৌদি নিয়াজির আগে ঢাকায় পদায়িত হলে তিনি ইয়াহিয়া খানকে পূর্ব পাকিস্তানে স্বদেশবাসীর ওপর নির্যাতন চালানো বন্ধের জন্য পরামর্শ দেন। কিন্তু এ বিবেকবান সেনাপতির কথা ইয়াহিয়া শোনেননি। মুক্তিযোদ্ধারা পুল, কালভার্ট, ট্রেন ও বিদ্যুৎকেন্দ্র উড়িয়ে দিয়ে পাকবাহিনীর চলাচলকে বিপর্যস্ত করে দিতে থাকেন। নিয়াজি অসহায় অবস্থা বুঝতে পেরে পিন্ডির কাছে নতুন নতুন সেনা ইউনিট চেয়ে পাঠাতে থাকেন। কিন্তু তা ক্রমশ অসম্ভব হয়ে পড়ায় এবং পশ্চিম পাকিস্তানের নিরাপত্তা নাজুক হয়ে ওঠায় ইয়াহিয়া, সেনাপ্রধান হামিদ ও অন্য কর্তারা চালাকি করে নিয়াজিকে শুধু সান্ত্বনা আর সাহস দিতে থাকেন। ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তানে তার পজিশন অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে একটি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পরিকল্পনা করেন যাতে করে জাতিসংঘে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো প্রয়োগ করে যুদ্ধবিরতি আনিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে চিরতরে রুদ্ধ করে দেওয়া যায়। তিনি ৩ ডিসেম্বর ’৭১-এ তাই অতর্কিতে ভারতের পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত আম্বালা, লুধিয়ানা, পাঠানকোর্ট, অমৃতসরও জলন্ধর বিমান ঘাঁটিতে আক্রমণ চালান। ভারত সরকার আত্মরক্ষার্থে পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত পাক সৈন্য, বিমানবাহিনী ও নৌ-ঘাঁটিতে ব্যাপক আক্রমণ চালায়। পাকিস্তানের নেতা ভুট্টো জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আনলেও পোল্যান্ড ও সোভিয়েতের দক্ষ কূটনীতির ফলে তা ব্যর্থ হয়ে যায়। ভারতীয় বাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণে পূর্ব পাকিস্তানের পতন অবশ্যম্ভাবী দেখতে পেয়ে নিয়াজি, ইয়াহিয়ার কাছে নির্দেশনা চান। তিনি উত্তরে প্রতারণাপূর্ণ কথা বলে সিদ্ধান্ত তারই ওপর ছেড়ে দেন। উল্লেখ্য, ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো সেক্টরই স্বাধীন হয়নি। কিন্তু যুদ্ধে মিত্রবাহিনী যোগদানের পর ৩ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বরে সম্পূর্ণভাবে হানাদারমুক্ত হয়। এতে ভারতীয় বাহিনীর ১৭৬৪ জন সৈন্য ও অফিসার শহিদ হন। ভারতীয় কমান্ডার লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার (রাওয়ালাপিন্ডি) নেতৃত্বে মিত্রবাহিনী ঢাকার কাছে এগিয়ে এসে নিয়াজির আত্মসমর্পণের সময় বেঁধে দেয়। নিয়াজি ১৬ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার ঢাকায় বিকেল ৫টা ১ মিনিটে অরোরার কাছে চরম অপমানজনকভাবে আত্মসমর্পণ করেন। তার সঙ্গে ৯৩ হাজার নানা শ্রেণির সৈন্য, পুলিশ, সীমান্তরক্ষী, রেঞ্জার ও স্কাউট ছিল। এদের মধ্যে ৭৪ জন বাঙালি সেনা ছিলেন যারা পাকবাহিনীর সঙ্গে থেকে স্বজাতির বিরুদ্ধে ৯ মাস যুদ্ধ করেছেন। এদের মধ্যে একজন হলেন পুলিশ কমিশনার মীর্জা রকিবুল হুদা। পূর্ব পাকিস্তান থেকে পলাতক বাঙালি সৈন্য, সীমান্তরক্ষী ও পুলিশ এবং নবপ্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর কোনো ঘাঁটির ধ্বংস বা আত্মসমর্পণ ঘটানো সম্ভব হয়নি। কারণ এর জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও গোলাবারুদ তাদের ছিল না। পাক সেনাদল থেকে এসব বাঙালি সেনার পলায়নের সময় ভারী অস্ত্র ও গুলি বহন করে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। জেনারেল ওসমানির বিশেষ সহকারী মেজর (অব.) খালেক তার বইতে লিখেছেন যে, কেবল দলছুট এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অল্পকিছু সংখ্যক সৈন্য বাঙালি যোদ্ধাদের হাতে নিহত হয়। তার পরও মুক্তিযুদ্ধের দলিলের কোথাও এই পাকিস্তানি সৈন্যদের নাম, পদবি, ইউনিট ও ঘটনাস্থলের বর্ণনা প্রায় নেই বলা চলে। কারণ এদের সংখ্যা ছিল সামান্য। 

আমাদের জন্য পরম গৌরবের এবং পাকিস্তানিদের জন্য চরম অপমানকর এই ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ আসার কারণ খুব জটিল ছিল না। এগুলো হচ্ছে সশস্ত্র সার্ভিসগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাজনীতিবিদদের মনোযোগ না দেওয়া ও শাসনতন্ত্র প্রণয়নে আট বছর কালক্ষেপণ করা। সশস্ত্রবাহিনী ক্ষমতা দখলের সুযোগ পেয়ে যথেচ্ছা সম্পদ ভোগ দখল করতে থাকে। বাজেটের ৬৬ শতাংশ প্রতিরক্ষায় ব্যয় হওয়ায় এবং তাতে পূর্ব পাকিস্তানের অংশগ্রহণ যৎসামান্য হওয়ায় বাঙালিরা সংক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তা বলপূর্বক দমন করতে গিয়ে সশস্ত্রবাহিনী ভুলে যায় যে, পাকিস্তান এনেছিলেন যে জিন্নাহ সাহেব এবং তাতে সশস্ত্র বাহিনীর কোনো অবদান ছিল না, এ কথাও তারা বিস্মৃত হয়ে যায়। রাষ্ট্র যে জনগণের এবং সশস্ত্র বাহিনী যে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন এবং সরকারের আদেশ পালনে বাধ্য একটি সার্ভিস মাত্র- রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এ অমোঘ সূত্র তারা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করলেও ইতিহাস তা তাদের মনে করিয়ে দেয়। স্মরণ করা যেতে পারে যে ’৭১-এর মুক্তিসংগ্রামে পাঠান, বালুচ ও সিন্ধিরা সাধারণভাবে বাঙালিদের সমর্থন দেয়। এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান (পাঠান) জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ’৭১-এর আগস্ট মাসে মুজিবের ধানমন্ডির বাসভবনে বেগম মুজিবের সঙ্গে দেখা করে বলেন যে, এ দুর্দিন থাকবে না। পাঞ্জাবি সংস্কৃতি জগতের বিশিষ্ট কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিবৃতি দিয়ে কারারুদ্ধ হন। ইয়াহিয়া খান রাজনীতি বুঝতেন না। ভুট্টো যখন বিরোধী দলের নেতার আসন গ্রহণ করতে অসম্মত হয়ে পশ্চিম পাকিস্তানকে আলাদাভাবে শাসন করার প্রস্তাব দেন, সিআরপিসির অধীনে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে ইয়াহিয়ার উচিত ছিল তাকে তখনই আইনের আওতায় এনে শাস্তির বিধান করা। কিন্তু তিনি তা করেননি। ইয়াহিয়া সমরনীতিও বুঝতেন না। তিনি ভুলে গিয়ে ছিলেন যে, ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে হামলাকারী ছিল পাকিস্তান এবং ভারতীয় ও সোভিয়েত নেতাদের কাছে কাকুতি-মিনতি করে যুদ্ধ বিরতি সম্মত করিয়ে পাকিস্তান সেবার নিজেকে কোনোরকম রক্ষা করেছিল। ফেব্রুয়ারি ১৯৭১-এ পাকিস্তানের বিমানসমূহকে ভারতের আকাশ নিষিদ্ধ করার ভারত সরকারের সিদ্ধান্তের ফলে শ্রীলঙ্কা হয়ে ৩.৫ গুণ পথ অতিক্রম করে পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য ও গোলাবারুদ এনে যুদ্ধ যাত্রা করা যে দরিদ্র পাকিস্তানের পক্ষে কয়েক মাসও সম্ভব হবে না তা তিনি অনুধাবন করেননি। বিচ্ছিন্ন একটি প্রদেশে ৪ গুণ শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার পরিণতি তিনি সামান্যও বুঝতে পারেননি। তিনি আরও ভুলে গিয়েছিলেন একটি দেশের সশস্ত্র বাহিনী জনগণের সমর্থন ছাড়া সফল হতে পারে না। 

শ্রেণিবিভক্ত সমাজ এবং সম্পদ ও সম্মানের সর্বোত্তম বণ্টনের ব্যবস্থাসংবলিত রাজনীতিকে অস্বীকারকারী কোনো শাসনব্যবস্থা যে টিকতে পারে না তা রাজনীতিবিদ, আইন প্রণেতা এবং সশস্ত্র বাহিনীকে অবশ্যই বুঝতে হবে। আর দুর্বৃত্তদের সংঘ স্থায়ী হয় না- এ দিবসের আর এক বাণী। হিটলার তার বাহিনীকে মহাবিপদের মধ্যে ফেলে পরিত্যাগ করেছেন। ইতিহাস ও পরিণতিবোধহীন ইয়াহিয়া-হামিদ-পীরজাদা-ভুট্টো চক্রও নিয়াজিকে পরিত্যাগ করেছেন। 

নয় মাসে একবারও ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা দেখতে আসেনি

বাংলাদেশেরই ঠিকানাহীনসহ বিশাল রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা প্রশ্ন করেন যে, ৩০ লাখ শহিদের নামের তালিকা কোথায়, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। এটা ঠিক যে তালিকাটি তৈরি করা হয়নি। তবে তারা যখন বলেন, ’৭১-এ পাক হানাদার বাহিনী আমাদের সঙ্গে তেমন নিষ্ঠুরতা করেনি তা অত্যন্ত আত্মঘাতী এবং পাকিস্তানিদের কাছে আমাদের হাস্যাসপদ করে তোলার নামান্তর। তাদের করা নৃশংসতাকে লঘু করে দেখার যুক্তি এবং ’৭১-এর মার্চে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য ও গোলাবারুদ আনার সুযোগ করে দেওয়ার জন্যই নাকি মুজিব, ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছিলেন- এ ধরনের কথা বলা একান্ত আত্মঘাতী। তিনি পালিয়েছিলেন- বলাটাও বেআইনি। কারণ সরকার মুজিবের বাসভবন রেকি করিয়ে কর্নেল এসডি আহমদের তত্ত্বাবধানে মেজর বেলালকে দিয়ে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার করে; যা ২৬ মার্চ ইয়াহিয়া বেতার ভাষণে উল্লেখ করেন। আইয়ুব খানের বেআইনি সরকারের বিরুদ্ধে আান্দোলন করার অপরাধে ’৬৯-এ ঢাকায় মতিউর, আসাদ, আনোয়ারা বেগমকে পাক সেনাবাহিনীর খুন করার নিষ্ঠুরতার কথাও এই পাক সমর্থকরা ভুলে গেছেন। তেমনি ঢাকা সেনানিবাসে বাঙালি বিচারাধীন বন্দি সার্জেন্ট জহুরুল হক হত্যার মধ্যেও তারা পাকিস্তানের অন্যায় দেখতে পাননি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি মিছিলে রসায়নের রিডার ড. শামসুজ্জোহাকে পশ্চিম পাকিস্তানি সীমান্ত সেনা কর্তৃক বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুন করার নির্মমতার ঘটনায়ও তারা পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সমর্থন করার যুক্তি খুঁজে পেয়েছেন। স্বদেশের লাখ লাখ মানুষ খুন ও নারীর সম্ভ্রমহন্তা পাকিস্তান সরকার আমাদের কাছে কোনো মাফ চায়নি। অথচ চরম কাপুরুষের মতো তারা তাদের ভাষ্যমতে, পরম শত্রু ভারতীয় সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ না করেই আরাম ও অসম্মানের পথে আত্মসমর্পণ করে এ দিনে। যখন সোনার ভরি ১১০ টাকা এবং চালের সের ১.২৫ টাকা, তখনকার মূল্যমানে তারা ২ কোটি ১৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার সমরাস্ত্রও ভারতের হতে তুলে দেয় বিনা বাধায়। আবার আওয়ামী মন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল খোন্দকার লিখেছেন যে, স্বাধীনতা যুদ্ধ ভারতের সহয়তা ছাড়া একাই তিনি ও তার বাহিনী পরিচালনা করতে পারতেন অথচ যুদ্ধের ৯ মাস তিনি ও তার বাহিনী ভারতে বসবাস করে তাদের দেওয়া খাদ্য, গুলি ও বারুদ ব্যবহার করেছেন। পাক বিমানবাহিনীর কোনো ঘাঁটিতে তিনি একটি বিমান হামলাও চালাননি। মুজিবের শাসনামল দোষত্রুটিতে পরিপূর্ণ ছিল। কিন্তু ’৭১-এর অবিসংবাদিত নেতা কে, তা ইতিহাস স্থির করেছে। ইতিহাসের গতিকে কোনো ব্যক্তি রুদ্ধ বা পরিবর্তন করতে পারে না। তাকে সম্পাদনা করারও কোনো সুযোগ নেই। সব রাজনৈতিক মতাবলম্বীদের এ কথা মনে রাখতে হবে। আমাদের নানাবিধ সমস্যা থাকলেও ১৬ ডিসেম্বর এসেছিল বলেই আমাদের গড় আয় এখন ৪ হাজার ডলার, আয়ু ৭৪ বছর, খালি গায়ে বা খালি পায়ে কোনো মানুষ নেই, গৃহহীন কেউ নেই, খাদ্য সাহায্য নেওয়ার মতো মর্যাদাহীন কোনো মানুষও নেই। দিবসটি আমাদের বারে বারে ডাক দিয়ে যাবে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও প্রজাতন্ত্রের সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল
[email protected]

বিদ্যুৎসংকটে দিশেহারা শেরপুরবাসী

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৮ এএম
আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৭ এএম
বিদ্যুৎসংকটে দিশেহারা শেরপুরবাসী
প্রতীকী ছবি

প্রচণ্ড গরমের মধ্যে শেরপুর জেলাজুড়ে লোডশেডিং ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে দিনের পাশাপাশি রাতেও বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছে শিশু, বৃদ্ধ আর অসুস্থ রোগীরা। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলার বিভিন্ন এলাকায় দিনে কয়েক দফা বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও টানা এক থেকে দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। সন্ধ্যার পর লোডশেডিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। বৈদ্যুতিক পানির পাম্প বন্ধ থাকায় অনেক এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকটও দেখা দিয়েছে। এদিকে সম্প্রতি চলমান বিশ্বকাপ খেলা দেখার সময় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগে পল্লি বিদ্যুতের দুটি অফিসে হামলার ঘটনা ঘটেছে।  

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলা সদর, শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী ও নকলা উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং চলছে। কোনো কোনো এলাকায় দিনে ৮ থেকে ১০ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। লোডশেডিংয়ের কারণে সেচকাজ ব্যাহত হওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। অন্যদিকে ফ্রিজে রাখা খাদ্যপণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া অনলাইনভিত্তিক কাজ, মোবাইল ব্যাংকিং সেবা এবং ইন্টারনেটনির্ভর কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

ভোগান্তির বর্ণনা দিয়ে জেলা শহরের নারায়ণপুর মহল্লার বাসিন্দা শামীম আহম্মেদ বলেন, ‘গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় পরিবারের সবাই কষ্টে আছি। বিশেষ করে ছোট শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে দুর্ভোগের শেষ নেই। আমরা দ্রুত এর সমাধান চাই।’

শ্রীবরদী উপজেলার ভায়াডাঙ্গা এলাকার শিক্ষার্থী আয়েশা বলেন, ‘রাতে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারছি না। সামনে পরীক্ষা, কিন্তু এ অবস্থায় প্রস্তুতি নেওয়া খুব কঠিন। সন্ধ্যা থেকেই আমাদের এদিকে বিদ্যুৎ থাকে না।’

একই এলাকার বাসিন্দা আব্দুল করিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এইডা কী অবস্থা হইল। দিনেও কারেন্ট থাহে না, রাইতেও না। আমরা এল্লা ঘুমাবারও পাই না। সবজি লাগাইছি পানি দিমু, সেটাও হয়তাছে না। পানি না দিলে সবজির ক্ষতি হবে, আমরা বড় বিপদে আছি।’

ঝিনাইগাতী উপজেলা দিঘীরপাড় এলাকার ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘দোকানে ফ্রিজে রাখা ঠাণ্ডা জিনিস নষ্ট অইয়া যায়। কারেন্টের এই অবস্থা থাকলে ব্যবসা কইরা টিক্যা থাকা মুশকিল অইব।’

পল্লি বিদ্যুৎ সমিতির শেরপুর জেলা শাখার ভারপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৭০ মেগাওয়াট। তবে আমরা গড়ে ৩০-৩২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাচ্ছি। ফলে প্রায় ৪০-৪২ মেগাওয়াটের ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া প্রতি ঘণ্টায় বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের পরিমাণ ওঠানামা করে। তবু আমরা গ্রাহকদের ভোগান্তি কমিয়ে চাহিদা পূরণের চেষ্টা করছি। সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ চলছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি চলমান বিশ্বকাপ খেলা দেখার সময় বিদ্যুতের লোডশেডিংকে কেন্দ্র করে পল্লি বিদ্যুতের দুটি অফিসে হামলার ঘটনা ঘটে। আমাদের দোষ কোথায়? আমরা তো সরবরাহ কম পাচ্ছি, সে জন্য পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।’

জেলা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘গত দুই দিন ধরে কিছুটা উন্নতি হয়ে বর্তমানে চাহিদার তুলনায় ৭-৮ মেগাওয়াট কম পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ জেলায় বিদ্যুতের মোট চাহিদা প্রায় ৫৩ মেগাওয়াটের বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৪৪-৪৫ মেগাওয়াট। আবার কখনো কখনো ৩৩-৩৪ মেগাওয়াট পাওয়া যায়।’

তিনি বলেন, ‘মূলত জাতীয় গ্রিড থেকে কম বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়ায় আমরা পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং করতে বাধ্য হই। সরবরাহ যখন বাড়ে তখন লোডশেডিং অনেকটাই কমে যায়। সাময়িক এই ভোগান্তির জন্য আমরা গ্রাহকদের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।’

বাড়ি যেন এক টুকরো আর্জেন্টিনার ক্যানভাস

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৭ এএম
আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৯ এএম
বাড়ি যেন এক টুকরো আর্জেন্টিনার ক্যানভাস
আর্জেন্টিনার পতাকার রঙে রাঙানো বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন মেহেদী হাসান। জয়পুরহাট সদর উপজেলার আউশগাড়া গ্রাম থেকে তোলা/ খবরের কাগজ

গ্রামের সড়ক ধরে সামনে এগোতেই দেখা মিলছে সারি সারি আর্জেন্টিনার পতাকা। আরেকটু যেতেই আর্জেন্টিনার পতাকার রঙে রাঙানো একটি বাড়ি। দেয়াল, গেট, বারান্দা সবখানেই আকাশি-সাদা রঙের ছোঁয়া। এটি যেন শুধু একটি ইট-সুরকির বাড়ি নয়, বরং এক ফুটবলপ্রেমীর স্বপ্ন ক্যানভাসে আঁকা গল্প। বাড়িটির এক পাশের দেয়ালে আর্জেন্টাইন ফুটবল কিংবদন্তি লিওনেল মেসির ছবি আঁকা। এসব দেখে মনে হতেই পারে আর্জেন্টিনার কোনো গ্রামের দৃশ্য! ১৭ হাজার কিলোমিটার দূরের দেশ আর্জেন্টিনার ফুটবল আর লিওনেল মেসির প্রতি ভালোবাসা থেকেই নিজের বাড়িটিকে এমন রূপ দিয়েছেন জয়পুরহাটের মেহেদী হাসান।

জয়পুরহাট সদর উপজেলার আউশগাড়া গ্রামের এই তরুণের কাছে আর্জেন্টিনা শুধু একটি ফুটবল দল নয়, বরং এটি আবেগের নাম। সেই আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন ‘ফুটবলের জাদুকর’ লিওনেল মেসি। প্রিয় দল আর প্রিয় খেলোয়াড়ের প্রতি ভালোবাসা থেকেই নিজের আট শতক জায়গাজুড়ে থাকা বাড়িটিকে আর্জেন্টিনার পতাকার আদলে সাজিয়েছেন তিনি। দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে ফুটে উঠেছে আর্জেন্টিনার ফুটবল ঐতিহ্যের ছাপ। শুধু বাড়ির রং নয়, গ্রামের সড়কের মোড় থেকে কয়েক শ গজ দূরে তার বাড়ি পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে লাগিয়েছেন আর্জেন্টিনার পতাকা।

ছোটবেলা থেকেই মেহেদী আর্জেন্টিনার সমর্থক। সময়ের সঙ্গে সেই ভালোবাসা আরও গভীর হয়েছে। বিশেষ করে মেসির প্রতি ভালোবাসা তাকে সব সময় অনুপ্রাণিত করে। মেসির খেলা ও ব্যক্তিত্ব তাকে এত বিমোহিত করেছে যে, প্রায় ২ লাখ টাকা ব্যয়ে নিজের পুরো বাড়ি আর্জেন্টিনার পতাকার আদলে রং করেছেন। ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনায় প্রিয় দলকে ঘিরে এমন আয়োজন নজর কেড়েছে জেলার মানুষের। তাই সেই বাড়ি দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন ফুটবলপ্রেমীরা। 

জেলা সদরের খনজনপুর গ্রামের মারজান হোসেন বাড়িটি দেখতে এসে তার অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘জয়পুরহাটে এ রকম পতাকার আদলে বাড়িতে রং করা আগে কখনো দেখিনি। তাই মেহেদীর বাড়িটি দেখতে এসেছি। তিনি আর্জেন্টিনার একজন ভক্ত। নিজের জেলায় এমন উদ্যোগ দেখে খুবই আনন্দ লাগছে।’

এলাকাবাসী জানান, এ গ্রামের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ আর্জেন্টিনার সমর্থক। তাই মেহেদী হাসানের এই কাজ গ্রামবাসীর বিশ্বকাপের আনন্দ আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

সদরের দুর্গাদহ গ্রামের মামুন হোসেন ফেসবুকের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার পতাকার মতো বাড়ি রং করার বিষয়টি জানতে পেরে দেখতে আসেন। তিনি বলেন, ‘আর্জেন্টিনার ভক্ত বলে এই বাড়িটি না দেখে থাকতে পারলাম না।’

মেহেদীর এই আয়োজনে খুশি তার পরিবারের সদস্যরাও। তার স্ত্রী পাপড়ী আক্তার বলেন, ‘আমার স্বামীর মতো আমিও আর্জেন্টিনার সমর্থক। আমার স্বামীর এই কাজ আমার ভালোই লাগছে।’

মেহেদী হাসান বলেন, ‘আমি ও আমার পরিবারের সবাই আর্জেন্টিনার সমর্থক। মেসিকে আমার খুবই পছন্দ। এ ছাড়া ম্যারোডোনা ও ডি মারিয়ার মতো খেলোয়াড় আর্জেন্টিনায় খেলেছে। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা মার্জিতভাবে ফুটবল খেলে। দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই বাড়িটি দেখতে আসায় আমার অনেক ভালো লাগছে। বিশ্বকাপ উপলক্ষে আমার বাড়িতে বড় পর্দায় খেলা দেখার ব্যবস্থা করেছি, সঙ্গে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থাও করা আছে।’

বিশ্বকাপে এবারের আসরে আর্জেন্টিনার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দিন গুনছেন মেহেদী হাসান। তাই আগেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন প্রিয় দল বিশ্বকাপ জিতলে খাসি জবাই করে এলাকাবাসীকে আপ্যায়ন করবেন। ফুটবল বিশ্বকাপের আমেজ শেষ হয়ে যাবে কিছুদিন পর, কিন্তু ফুটবলপ্রেম আর মেসির প্রতি ভালোবাসার নীরব সাক্ষী হয়ে থাকবে এই ব্যতিক্রমী বাড়িটি।

ভালোবাসা বটমূলে

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২২ পিএম
ভালোবাসা বটমূলে
অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম

ভোর ৫টায় মোবাইল ফোনটা বেজে উঠতেই শমীকের ঘুম ভেঙে গেল। ডানপাশে টেবিলের ওপর থেকে ফোনটা নিয়ে দেখে স্ক্রিনে তার বন্ধু চন্দন রায়ের নাম।
‘কীরে শমীক, ঘুম ভেঙেছে? আজ পয়লা বৈশাখ, মনে আছে তো?’
‘হ্যাঁ, মনে আছে। আমি ৬টার আগেই বটমূলে পৌঁছাতে চাই। তুই সময়মতো রমনা পার্কের প্রধান গেটে গিয়ে অপেক্ষা করবি, আমরা একসঙ্গে ভেতরে যাব।’
‘ঠিক আছে দোস্ত, আজ সারা দিন আমরা একসঙ্গে কাটাব। বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠান দেখব, গান শুনব। তার পর যাব চারুকলায়, মঙ্গল শোভাযাত্রা দেখব, ওদের সঙ্গে হাঁটব।’
‘তার পর আমরা যাব ধানমন্ডি লেকের পাড়ে, ওখানে নববর্ষের অনেক অনুষ্ঠান হয়। খাওয়াদাওয়ার বিশেষ ব্যবস্থাও থাকে। আজ দুপুরের খাওয়া ওখানেই হবে।’
‘সবই ঠিক আছে, সবই হবে। কিন্তু তোর গার্লফ্রেন্ড চৈতি আজকের দিনে আমাদের সঙ্গে থাকবে না, এটা ভাবতেও আমার খারাপ লাগছে। আগে প্রতিটি পয়লা বৈশাখে আমরা তিনজন একসঙ্গে ঘুরে বেড়াতাম, কত আনন্দ করতাম। হঠাৎ তোদের কী হলো? তোরা আড়ি দিলি কেন?’
‘আমি তো আড়ি দিইনি, ওই দিয়েছে। মেয়েটা বড় সেনসিটিভ, ওর আঁকা পেইন্টিং নিয়ে ঠাট্টা করে কিছু একটা বলতেই ও রেগে গেল, কথা বন্ধ করে দিল। তিন মাস হয়ে গেল আমাকে ফোন করে না, ফোন ধরে না। দেখা হলে কথাও বলে না।’
‘ঠিক আছে, আজ যদি চৈতিকে বটমূলে পাই, আমি কথা বলব ওর সঙ্গে। আড়ি ভাঙিয়ে তোদের ভাব করিয়ে দেব। চিন্তা করিস না। এখন তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে যা। ৬টার মধ্যেই বটমূলে পৌঁছতে হবে।’ 

২.
শমীক মাহমুদ ও চন্দন রায় দুজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের ছাত্র। তৃতীয় বর্ষ অনার্সে ওরা পড়ছে। শমীক থাকে শহীদুল্লাহ হলে, জগন্নাথ হলে থাকে চন্দন। ওরা এইচএসসি পাস করেছে একই সঙ্গে ঢাকা কলেজ থেকে। সেখানে হোস্টেলে থেকেছে একই রুমে। শুরু থেকেই ওদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব। শমীক কবিতা লেখে স্কুলজীবন থেকেই। এখন তার কবিতা প্রায় প্রতি সপ্তাহেই সংবাদপত্রের সাহিত্য পাতায় ছাপা হয়। কবি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বন্ধু চন্দন কবিতা না লিখলেও শমীককে কাব্যচর্চায় উৎসাহ দেয়। 
শমীক ও চন্দন দুজনেই চিত্রশিল্পের অনুরাগী। চারুকলা ইনস্টিটিউটে কোনো প্রদর্শনী থাকলে ওরা যাবেই। এ কারণেই চারুকলায় তাদের যাতায়াত ছিল। এমনি এক চিত্র প্রদর্শনী দেখতে গিয়ে ওদের পরিচয় হয়ে গেল ফাইন আর্টস বিভাগের ছাত্রী চৈতি রহমানের সঙ্গে। চারুকলা চিত্রশিল্প নিয়ে কথা বলতে বলতে ওদের সম্পর্ক, আরও ঘনিষ্ঠ হলো। শমীক কবিতা লেখে জেনে চৈতি খুশি হলো। সেও কবিতা পছন্দ করে, মাঝেমধ্যে লিখেও ফেলে। 
ওদের প্রায়ই দেখা যায় টিএসসি অথবা মধুর রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে বসে আড্ডা দিচ্ছে, চা খাচ্ছে। কখনো ওরা বেইলি রোডের কোনো রেস্তোরাঁয় গিয়ে বসে। শিল্পকলা একাডেমির অনুষ্ঠানেও যায়, নাটক দেখে। এভাবে দিন গড়িয়ে যায়, ওদের লেখাপড়াও এগিয়ে চলে। 
চন্দন একদিন বুঝতে পারে শমীক ও চৈতির সম্পর্কটা বন্ধুত্বের পর্যায় ছেড়ে আরও কিছুটা এগিয়ে গেছে। চৈতির প্রতি চন্দনের দুর্বলতা ছিল ঠিকই, কিন্তু সে বাস্তববাদী। বাস্তবকেই মেনে নেয় চন্দন। নিজেকে সে গুটিয়ে নিতে থাকে ওদের কাছ থেকে। মনে মনে বলে, ‘সত্য যে বড়ই কঠিন/ সে কখনো করে না বঞ্চনা/ তাই কঠিনেরে ভালোবাসিলাম।’ 
কিন্তু শমীকের কাছে ধরা পড়ে যায় চন্দন। শমীক তাকে সরাসরি প্রশ্ন করে, ‘কী হয়েছে তোর? তুই আমাদের কাছ থেকে দূরে থাকিস কেন?’
‘দূরে কোথায়, তোদের কাছেই তো থাকি। আমাকে ডাকলেই পাওয়া যায়।’
‘তা পাওয়া যায়, কিন্তু ডাকতে হবে কেন? আমরা তিনজন একসঙ্গে ছিলাম, এক সঙ্গেই থাকতে চাই। কিন্তু তুই একটু দূরে সরে গেছিস। কেন বুঝতে পারছি না। তাই জানতে চেয়েছি কী হয়েছে।’
এবার চন্দন হেসে ফেলে। শমীকের পিঠে হাত রেখে বলে, ‘কিছুই হয়নি দোস্ত, সব ঠিক আছে। আমি তোকে খুব ভালোবাসি, সব সময় তোর ভালোটাই আমি চাই। তাই তোর পথ থেকে একটু সরে দাঁড়ালাম। তোরা দুজন এগিয়ে যা। আমি তোদের পাশে না হলেও ঠিক পেছনে আছি।’ 
‘না, আমি তোকে আমার পাশেই চাই। আমরা তিনজন আগের মতোই একসঙ্গে থাকব, একসঙ্গে ঘুরে বেড়াব। একজনকে পাওয়ার জন্য তোকে আমি হারাতে চাই না চন্দন।’
‘বোকার মতো কথা বলছিস শমীক। আমি তো হারিয়ে যাচ্ছি না। তোদের সঙ্গেই থাকব। আমি শুধু তোদের দুজনকে স্থায়ীভাবে এক করে দিতে চাই। তোর আর চৈতির জুটিটা চমৎকার হবে। একজন কবি, আরেকজন শিল্পী, তোদের দুজনেরই কাজ অনেক সুন্দর হবে, সৃষ্টিশীলতা অনেক বাড়বে।’

৩.
সেদিন বাংলা নববর্ষ-পয়লা বৈশাখ। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল। ভোর ৬টার মধ্যেই শমীক পৌঁছে যায় রমনা পার্কের প্রধান গেটে। গিয়ে দেখে চন্দন আগেই এসেছে সেখানে।
‘শুভ নববর্ষ শমীক। তোকে অনেক ধন্যবাদ, সময়মতো এসেছিস। হালকা নীল রঙের পাঞ্জাবি পরেছিস, তোকে খুব মানিয়েছে।’
‘শুভ নববর্ষ চন্দন। হ্যাঁ, এই পাঞ্জাবিটা আমার খুব পছন্দের। গত বছর নববর্ষে চৈতি উপহার দিয়েছিল। একবার ভাবলাম এটা আর পরব না। তার পরেই মনটা কেমন হয়ে গেল। এটাই পরে ফেললাম।’
‘খুব ভালো করেছিস। তোকে এই পাঞ্জাবি পরা দেখলে চৈতির মনটাও নরম হয়ে যাবে। তোদের মান-অভিমানের মীমাংসা আজই করে ফেলব। চল বটমূলের দিকে যাই। দেখি চৈতি এসেছে কি না।’
ওরা দুজন মাঠের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে থাকে। তখন ঘড়িতে সোয়া ৬টা। নগরীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ এসে গেছে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে। নবীন-প্রবীণ সব বয়সী মানুষ আসছেন রমনায়, অনেক দম্পতির সঙ্গে তাদের শিশু সন্তানও আছে। 
রমনার প্রাঙ্গণে জনতার ভিড় ক্রমেই বাড়ছে। বেশির ভাগ পুরুষের পরনে পাঞ্জাবি-সাদা অথবা রঙিন। মেয়েরা প্রায় সবাই লালপাড় সাদা শাড়ি পরেছে। চুলে কানের পাশে অথবা খোঁপায় ফুল গুঁজেছে অনেকেই। অল্পবয়সী মেয়েরা ফুলের রিং মাথায় দিয়ে হাসি-উল্লাসে মেতেছে। তরুণ-তরুণীদের জটলা এখানে-ওখানে। সকালের নরম রোদ আর স্নিগ্ধ বাতাস, আনন্দ-মুখর মানুষের সমাবেশ আর বর্ষবরণের গান, রমনার প্রাঙ্গণকে নতুন রূপে সাজিয়েছে। 
‘এটাই বাঙালির বর্ষবরণ। এক সময় পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপন হতো শুধু গ্রামাঞ্চলে, এখন এটা এসে গেছে শহরে, নগরে। ঢাকা মহানগরীতে নববর্ষের অনুষ্ঠান বেশি হয়। তাই না শমীক?’
‘ঠিকই বলেছিস চন্দন। পাকিস্তানি শাসনামলে ওরা বলত পয়লা বৈশাখের বর্ষবরণ উদ্‌যাপন এ দেশের সংস্কৃতি নয়, ওটা ভারতীয় সংস্কৃতি। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ঘোষণা করলেন, পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপন করতে দেওয়া হবে না। ফলটা কী হলো? বাঙালিরা খেপে গিয়ে আরও বেশি করে নববর্ষ উদ্‌যাপন করতে থাকে। রমনা বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠান শুরু হয় ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে। প্রতি পয়লা বৈশাখে ছায়ানটের অনুষ্ঠান এখনো চলছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় শুধু একবার বন্ধ ছিল।’
চন্দন লক্ষ করে শমীক যখন কথা বলছে, তার চোখ এদিকে-ওদিকে কাকে যেন খুঁজছে। বোঝা গেল শমীকের চোখ খুঁজছে চৈতিকে। চন্দন চুপ করে থাকে, কিছু বলার তো নেই। যে করেই হোক আজ চৈতিকে খুঁজে বের করতেই হবে। 
হঠাৎ চন্দনের সামনে এসে দাঁড়ায় ওদের সহপাঠী অপর্ণা বড়ুয়া। অপর্ণা হেসে বলে, ‘শুভ নববর্ষ। তা তোমরা দুজন কেন, আরেকজন কোথায়?’
‘কার কথা বলছ অপর্ণা?’ শমীক জানতে চায়।
‘ন্যাকা। কিছুই বোঝ না? চৈতি কোথায়? তোমাদের সঙ্গে নেই কেন?’
‘চৈতি এখনো আসেনি, আসবে।’
‘আসবে বলছ কেন? ও তো এসে গেছে। বটমূলে অনুষ্ঠানের ডানদিকে দাঁড়িয়ে গান শুনছে। লালপাড়, সাদা শাড়ি, কপালে লালটিপ, ওকে কী সুন্দরই না লাগছে। বেচারা একা দাঁড়িয়ে আছে। তোমরা ওর কাছে যাও।’
চন্দন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। শমীকের হাত ধরে বলে, ‘চলো দোস্ত বটমূলে যাই। চৈতি তোর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।’
‘তুই যা। ওকে আমার কাছে আসতে বল।’
‘ঢং করিস না তো। ওটা মেয়েদের মানায়, পুরুষদের নয়। চল আমার সঙ্গে।’ 
শমীকের হাত ধরে চন্দন এগিয়ে যায় বটমূলের দিকে। তখন সকাল ৮টা বাজতে কিছু সময় বাকি। বহু মানুষ বিশাল বটগাছের ছায়ায় বসে গান শুনছে-বর্ষবরণের গান। বটমূলে নিচ থেকে ওপরে, সারি সারি কাঠের বেঞ্চ দিয়ে তৈরি বিরাট মঞ্চে বসে ছায়ানটের শিল্পীরা গান গাইছে। শিল্পীদের মধ্যে কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী, সবাই আছে। এরা সবাই ছায়ানটের শিক্ষার্থী। একই রঙের পোশাক পরেছে। 
বটমূলে মঞ্চের ঠিক বিপরীত দিকে এসে দাঁড়ায় শমীক ও চন্দন। ওদের সামনেই বিপুল সংখ্যক শ্রোতা মাঠে বসে গান উপভোগ করছে। মাঠের একপাশে উঁচু প্লাটফর্মে বিটিভির ক্যামেরা দিয়ে অনুষ্ঠানের সরাসরি সম্প্রচার চলছে। 
চন্দনের চোখ হঠাৎ গেল ডানদিকে। সে দেখে চৈতি দাঁড়িয়ে আছে আরও অনেক মানুষের সঙ্গে। তাকিয়ে আছে এই দিকে। লালপাড় সাদা শাড়িতে ওকে অপূর্ব লাগছে। 
‘শমীক, ওই দ্যাখ তোর চৈতি, এদিকেই তাকিয়ে আছে। যা ওর কাছে।’
শমীক যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই বিকট শব্দে একটা বিস্ফোরণ। একটি শক্তিশালী বোমা ফেটেছে বসে থাকা শ্রোতাদের মাঝখানে। ধোঁয়া, বারুদের গন্ধ, আহত মানুষের আর্তনাদ। শিল্পীদের গান থেমে গেছে। মানুষের হুড়োহুড়ি, সবাই ছুটে যাচ্ছে যে যেদিকে পারে। পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবী, সবাই যাচ্ছে আহতদের উদ্ধার করতে। 
কিছুক্ষণ পরেই আর একটি বোমা ফাটল একই জায়গায়। শমীক যখন কোনোদিকে যাবে ভাবছে, ঠিক তখনই তাকে কেউ জড়িয়ে ধরল সামনের দিক থেকে। শমীক দেখে একজন নারী তাকে জড়িয়ে ধরেছে। তার চুলের গন্ধ আর দেহের স্পর্শে শমীক বুঝতে পারে এ তার হারিয়ে যাওয়া প্রিয়বান্ধবী চৈতি। ভয়ে থর থর করে কাঁপছে। শমীক ওকে শক্ত করে ধরে রাখে। 
‘ভয় নেই চৈতি। আমি তো আছি তোমার সঙ্গে। চলো আমরা এখান থেকে অন্যদিকে যাই।’

নববর্ষের উৎসব: উৎস থেকে নিরন্তর

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১৭ পিএম
নববর্ষের উৎসব: উৎস থেকে নিরন্তর
ছবি: খবরের কাগজ

বাঙালির উৎসবের আয়োজনে সামর্থ্যের চেয়ে অতিশয়োক্তি থাকে বৈকি। জাতি হিসেবে এ ধারা আমাদের উৎসবমুখর বললে বাড়িয়ে বলা হবে না বোধকরি।

উৎসব মানেই আনন্দ, হইহুল্লোর, খাওয়াদাওয়া, বেড়ানো- কত কী। বাঙালির জীবনে ঈদ, পূজা ও বাংলা নববর্ষ বড় উৎসব। ঈদ ও পূজা ধর্মীয় উৎসব হলেও বাংলা নববর্ষ সব ধর্মের মানুষ উদ্‌যাপন করে এ জন্য এ উৎসব সর্বজনীন। একসময় গ্রাম বাংলায় নববর্ষকে ঘিরে গ্রামের মেলা, লাঠিখেলা, নৌকাবাইচ, ঘুড়ি ওড়ানোসহ নানা আয়োজনে নববর্ষকে কেন্দ্র করে আনন্দের ধুম পড়ে যেত। স্মৃতির খাতার পাতা উল্টিয়ে আজও উঁকি দেয় ছোটবেলার গ্রামের মেলার কাঁচাগোল্লা, গরমজিলিপি, খাজা, মাটির পুতুল, ঘোড়াসহ হরেক রকম জিনিস। নাগরদোলার দোল যেন আজও মনে দোলা দেয়। নববর্ষের মেলার মাটির খেলনা ছোটবেলায় যজ্ঞের ধন মনে হতো। সময় বদলে নববর্ষের উৎসব ভিন্ন আঙ্গিকে রূপ নিয়েছে। সরকার বাংলা নববর্ষে সরকারি কর্মচারীদের বাড়তি একটি উৎসব ভাতা প্রদান করায় বাংলা নববর্ষের আয়োজনে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। 

প্রতি বর্ষের সমাপ্তে বাংলা নববর্ষ হাজির হচ্ছে বৃহৎ পরিসরে বাঙালির জীবনে। বাংলা নববর্ষ দিনদিন পরিসর বৃদ্ধি করে রং ছড়াচ্ছে। মানুষের গায়ের জামা থেকে শুরু করে মঙ্গল শোভাযাত্রার পাপেটের রং ও বৈচিত্র্যে ভরপুর। উৎসবের আমেজে বাঙালি নববর্ষে সাজায় নিজেকে নতুন কাপড়ের মোড়কে। নববর্ষকে কেন্দ্র করে বাঙালিয়ানাকে ধারণ করে আমরা জীবনের চলার পথের নতুন আনন্দ খুঁজে পাই। যদিও সারা বছরে নববর্ষের বাঙালিয়ানার রক্ষক আমরা থাকি না। তবু নববর্ষ জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে এক সর্বজনীন উৎসব। বাঙালির মহামিলনের একটি উপলক্ষ। 

বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস পাঠ মত-মতান্তরে ভরপুর। বাংলা নববর্ষের প্রচলন- এমনকি ছায়ানটের নববর্ষের উদ্‌যাপনের সূচনার ইতিহাস নিয়েও মত-মতান্তর রয়েছে। কবে, কোথায়, কে বা কারা করেছিলেন এরূপ প্রশ্ন ছুড়লে বাংলা নববর্ষের উৎপত্তির ইতিহাস তর্কের বেড়াজালে জড়িয়ে যায়। আর যারা এসব বিষয় নিয়ে চর্চা করেন তারা সমাধানে পৌঁছনোর চেয়ে নিজের শক্ত বা নরম-যুক্তি যাই হোক না কেন- সেই অবস্থানেই থিতু হয়ে থাকতে চান। বাংলা নববর্ষের প্রবর্তনের ইতিহাসে অনেকের নাম এলেও সবচেয়ে আলোচিত ও প্রচলিত নামটি হচ্ছে মুঘল সম্রাট জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ আকবরের। মুঘলরা মুসলিম হিসেবে রাজ্য শাসন অনুসরণ করত হিজরি সন অনুযায়ী। হিজরি সন চান্দ্র সন। সমস্যা হচ্ছে হিজরি সন সৌরবর্ষের চেয়ে ১০-১১ দিন ছোট। ফলে গাণিতিক হিসেবে তিন বছর অন্তর সৌর সনের চেয়ে হিজরি সন এক মাস এগিয়ে আসে, এভাবে আকবরের সিংহাসন আরহণের সময় ১৫৫৬ খ্রি. থেকে শুরু করে মোট ২৯ বছর রাজত্বকালে প্রচলিত শতাব্দের সঙ্গে হিজরি সনের সময় তারতম্য ঘটেছিল ৯ মাসের।

আরেকটি বড় সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল খাজনা আদায় নিয়ে। কারণ মুঘলরা হিজরি সনের অনুসারী হয়ে রাজ্য পরিচালনা করলেও হিজরি সনের মাসগুলো মৌসুম ঋতুকেন্দ্রিক ছিল না। এ পরিপ্রেক্ষিতে ফসল কাটার সময় নির্দিষ্ট করে খজনা আদায়ে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। সাধারণ মানুষের অর্থনীতি ছিল কৃষিভিত্তিক। তখনকার জনজীবন মূলত কৃষির আবহে চলত। কৃষিকাজ ও খাজনা আদায়ে সুবিধার জন্য আকবর তারিখ-ই-ইলাহি সন বলে নতুন সন চালু করেছিলেন। মূলত আকবরের আদেশে দরবারের সেরা পণ্ডিত জ্যোতিষ শাস্ত্রবিদ আমির ফাতেহ উল্লাহ্ সিরাজি বাংলা সনের উদ্ভাবন করেন। ফাতেহ উল্লাহ সিরাজি আকবরের সিংহাসনে আরোহণের তারিখ, ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৫৫৬ খ্রি.-কে ভিত্তি ধরে সন গণনা শুরু করেন। সেই থেকে বাংলা সনের পথচলা। একটি বিষয় বলে রাখা উচিত আকবরের প্রচলিত সর্বজনীন নতুন ধর্ম ‘দ্বিন-ই-ইলাহি’ ও তারিখ-ই-ইলাহির সময়কাল অভিন্ন। কালের আবর্তে দীন-ই-ইলাহি পথ চলতে না পারলেও আকবরের নির্দেশে ফতেহ উল্লাহ্ সিরাজি প্রবর্তিত বাংলা সনকে কার্যকর করেছিলেন আকবরের সজ্ঞা ও প্রজ্ঞায় ঋদ্ধ অর্থ উপদেষ্টা টোডরমল। তিনি ১৫৮৫ খ্রি. ১০ মার্চ ইলাহি সনের কার্যকরণ ঘটান। এ সময় থেকে বাংলায় খাজনা আদায়ে বাংলা সন গণনা করা হয়। উল্লেখ্য, বাংলা সন প্রবর্তনের আগে হিসাব সমন্বয়ের কাজটি জটিল ছিল। কারণ উপমহাদেশে শতাব্দসহ হিসাব ছিল সৌর বর্ষ। কিন্তু হিন্দু-মুসলিম বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি চন্দ্র মাসের হিসাবে মান্য করা হতো। সৌরবর্ষ যেহেতু হিসাবের নিক্তিতে তিন বছর অন্তর এক মাস এগিয়ে যেত তাই হিসাবের সুবিধার্থে প্রতি তিন বছর অন্তর প্রাচীন আরবি রীতির মতো এক মাস নামমন্ত্র হিসাবে সংযোগ করে বাদ দেওয়া হতো। গোঁজামিলের এ পদ্ধতির নাম ছিল ‘সাবনমিতি’। 

চন্দ্রমাস ও সৌরবর্ষের ব্যবহারের প্রাচীন রীতির একটি সমন্বয় ও সরলীকরণের মানসেই আকবর বাংলা সনের প্রচলন করেছিলেন। সৌরবর্ষ ও চন্দ্রবর্ষের সমন্বয়ে বাংলা সন ও মাসে সৌর ও চন্দ্রের রেশ বয়ে যায়। যেমন বিশাখা নক্ষত্রের আদলে নাম বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠা নক্ষত্রের আদলে জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়া নক্ষত্রের আদলে আষাঢ়, শ্রবণা নক্ষত্রের আদলে শ্রাবণ, ভাদ্রপদা নক্ষত্রের নামের আদলে ভাদ্র, অশ্বিনী নক্ষত্রের আদলে আশ্বিন, কৃত্তিকা নক্ষত্র থেকে কার্তিক, আমন থেকে অগ্রহায়ণ, পুষ্য নক্ষত্র থেকে পৌষ, মঘা নক্ষত্রের আদলে মাঘ, ফাগুনী নক্ষত্র থেকে ফাগুন এবং চিত্রা নক্ষত্র থেকে চৈত্র।

ওপরের বর্ণনা তো গেল আকবর অখ্যান। কিন্তু বাংলা সনের ব্যুৎপত্তির উৎসে আকবরের নাম ছাড়া তো আরও কিছু নাম, স্থান ও সময়ের সংযোগ রয়েছে। বাংলা সনের হিসাবের সূত্রপাতে আকবরের পাশে পেরেক ঠুকে নাম আছে- রাজা শশাঙ্ক তিব্বতের রাজা রিস্প্রভ-সন, বাংলার স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ্, মুর্শিদ কুলি খাঁসহ আরও অনেকের নাম। তবে বাংলা সন প্রবর্তক হিসেবে মহামতি আকবরের পাল্লাই ভারী। আকবর ছিলেন সুন্নি মুসলিম। তার জাতিসত্তার ঐতিহ্য ছিল তুর্কি আতর মাখা। জাতিক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারে মুঘলরা ছিল ইন্দো-পারসিক। শাসক হিসেবে আকবর বিচক্ষণ ছিলেন। তার আমলেই মুঘল রাজ্য সর্বাধিক বিস্তৃত হয়েছিল। তিনি সৌর ও চন্দ্রবর্ষের সমন্বয় করে প্রজাদের ফসল তোলার সময় বর্ষের গণনা শুরু করেছিলেন সুদূরপ্রসারী ধ্যান ও ধারণা থেকে। তিনি দিব্যদৃষ্টিতে বুঝেছিলেন প্রজাদের আর্থিক সচ্ছলতার সময় খাজনা আদায় সুবিধাজনক। আকবরের বাংলা সনে প্রজাদের খাজনা নবায়নের পাশাপাশি বাংলায় বাংলা সনের শুরুতে ব্যবসায়ীদের হালখাতা প্রচলন ধীরে ধীরে রেওয়াজে পরিণত হয়। তবে বাঙালি সমাজে নববর্ষকে নাগরিক মোড়কে নানা রঙে উৎসবের ডামাডোলে গ্রহণের রেওয়াজ সাম্প্রতিক। বাঙালির জীবনের বিশেষত ঢাকার নাগরিক সমাজে নববর্ষ বরণের প্রসঙ্গ এলেই প্রভাতে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ সংগীতের কথা আসে। ছায়ানটের বর্ষবরণে শুরুর সময়ে ১৯৬৪, ১৯৬৫, ১৯৬৭ সালের দাবি আছে। তবে ড. সন্জিদা খাতুনের লেখার তথ্য হলো, ‘১৯৬৭ সালের ১৫ এপ্রিল শনিবার ছিল পয়লা বৈশাখ। অবজারভার ১৪ তারিখের কাগজে নতুন বছরকে আবাহন করেছে- welcome pahela Baishakh শিরোনামে। সে বছর দেশের নানা অঞ্চল থেকে বর্ষবরণের খবর আসে ঢাকায়। প্রত্যুষে ছায়ানটের অনুষ্ঠান, এ বছরেই প্রথম রমনার বটমূলে। 

অবজারভার পত্রিকা পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপনের ছবি ছাপে। এতে দেখা যায় হার্মোনিয়ামে আছে শাহীন আক্তার, তানপুরা বাজিয়ে গান গাইছেন মাহমুদুর রহমান মাহমুদ (বেনু)। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন ১৯৬৭ সালের নববর্ষে শহিদ মিনার থেকে প্রভাতফেরি শুরু করেছিল।’

পয়লা বৈশাখে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎসবের আয়োজন নগরের গণ্ডি পেরিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে নববর্ষে যে বাঙালিয়ানা পরিচয়ে প্রকাশিত- আমরা সারা বছর সেই ভাবনা ও চর্চা থেকে দূরে থাকি। ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটের মঙ্গল শোভাযাত্রার মঙ্গল কামনায় মানুষের ঢল আমাকেও তাড়িত করে। কিন্তু প্রতিদিন আটপৌঢ়ে বাঙালি জীবনচর্চার মেলবন্ধন থেকে আমাদের সরে যাওয়া কাঙ্ক্ষিত নয়। মাঝে মাঝে সর্বস্তরে বাংলার প্রচলনে সরকার কিছু নির্দেশনাও জারি করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা অনেকটাই দূরে থাকে। আমরা বাংলা দিন তারিখ এমনকি অনেক সময় মাসের নামও মনে রাখি না। 

শুধুই নববর্ষে বাঙালির হাজার বছরের লৌকিক আচারকে প্রতীকীরূপে ধারণ ও পালন করা নববর্ষের তাৎপর্য হতে পারে না। নববর্ষের নানা রঙের সঙ্গে মিশে আছে অসাম্প্রদায়িক বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য। ধর্ম ও সংস্কৃতিভেদে আমাদের জাতিগত ইতিহাসের পথ পরিক্রমণের সমন্বয়সূত্র। নববর্ষের নব আভায় আমাদের প্রাচীন ইতিহাসের শিকড়ের অনুসন্ধান প্রয়োজন।

বাংলা নববর্ষের উৎসবের পরিবর্তনে আমাদের গ্রামবাংলার নববর্ষের মেলাগুলোর রূপান্তর সবচেয়ে বেশি। গ্রাম্য নববর্ষের মেলায় কিছুদিন আগেও বাতাসা, কদমা, চিনির সাজ, জিলাপি, তিলের খাজা, গজা, ঝুরি, ইত্যাদি ছিল অন্যতম উপকরণ। এ ছাড়া গ্রামীণ জীবনের প্রয়োজনীয় সব উপকরণ যেমন- চাষের লাঙল, জোঁয়াল, মই, ডালা, ঢেঁকি, চালুন, কুলা, শীতলপাটি ইত্যাদি পাওয়া যেত। এখন গ্রাম্য মেলায় শহরের জিনিসপত্র বেশি দেখা যায়। লোকজ বাংলার গ্রাম্য মেলার উপকরণগুলো আস্তে আস্তে উধাও হয়ে যাচ্ছে।

গ্রাম্য মেলাগুলোর চিরায়ত রূপ পরিবর্তন বৈশাখী নববর্ষের রূপের সঙ্গে বড়ই অপরিচিত। বাঙালির বর্ষবরণের অসাম্প্রদায়িক চেতনার খবর ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। এখন শুধু চর্চা ও চেতনায় প্রয়োজন বাঙালিয়ানা ধারণ ও লালন করার বছরব্যাপী প্রত্যয়ের। তবেই আমাদের পথচলায় প্রকাশ পাবে নববর্ষের বাঙালির জাতিসত্তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের।

নববর্ষের উৎসবের শেকড়ের সন্ধান যেমন ছিল একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতির নবায়ন ও নিরন্তর যাত্রার উপলক্ষ ছিল আজ নববর্ষের উৎসবের মোড়কি রূপ আরও ঝকমকে হয়েছে- কিন্তু কমেছে ভূমিজ সংস্কৃতির কর্ষণের উত্তাপ। তাই আজও মনোজমিনে হারিয়ে খুঁজি শৈশবের নববর্ষের ‘মদনার মার’ মেলার কাঁচাগোল্লা ও মাটির খেলনা।

লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক

রবীন্দ্রনাথের বৈশাখ

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০৩ পিএম
রবীন্দ্রনাথের বৈশাখ
অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম

বাংলাদেশ অপূর্ব ঋতুবৈচিত্র্যের দেশ। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এ দেশের প্রকৃতির রূপ-রসের বদল ঘটে। হাজার বছর ধরে চক্রাকারে এ বদল ঘটে আসছে। কীভাবে এবং কেমন করে এ বদল ঘটে- তার স্বরূপটি ধরা আছে আমাদের হাজার বছরের সাহিত্য ও সংগীতে। বাংলা সাহিত্যের পাঠক মাত্রই তা জানেন। প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে প্রকৃতির চালচিত্র ছিটাফোঁটা থাকলেও মধ্যযুগের সাহিত্যে বিধৃত হয়েছে। কালকেতু উপাখ্যানে ফুল্লরার বারোমাস্যায় সব ঋতুরই বিবরণ আছে। বৈষ্ণব-পদাবলিতে ঋতুবদলের সঙ্গে প্রকৃতির রূপের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। রাধার প্রেমানুভূতির নানামাত্রিক প্রকাশও অনেকটা ঋতুসাপেক্ষ। বাংলা আধুনিক সাহিত্যে মানব জীবনের অনুষঙ্গে এ দেশের ঋতু ও প্রকৃতির উপস্থিতি কোনো কোনো সাহিত্যিক অবিস্মরণীয় করে রেখেছেন; এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, জসীম উদদীন, বন্দে আলী মিয়া প্রমুখের নাম উল্লেখ করা যায়। এমনকি তিরিশোত্তর আধুনিক কবিদের মুখ্যজন জীবনানন্দ দাশ হেমন্ত ঋতুকে বাংলা সাহিত্যে চিরস্থায়ী করে গেছেন।

রবীন্দ্রনাথ তার নানাবিধ সৃজনকর্মে- বিশেষত কাব্য, নাটক, ছোটগল্প, সংগীত, চিঠিপত্র ইত্যাদি রচনায় বাংলার ঋতুভিত্তিক প্রকৃতির রূপ-সৌন্দর্য চিত্রিত রেখেছেন। তিনি গীতবিতানের গানগুলোর বিষয়ভিত্তিক যে বিন্যাস করেছেন তাতে প্রকৃতি পর্যায়ের ২৮৩টি গান আছে। এ ছাড়া গীতবিতানের প্রেম ও প্রকৃতি পর্যায়ের গান এবং  গীতিনাট্যের কিছু গানেও প্রকৃতির প্রসঙ্গ লক্ষণীয়। 

রবীন্দ্রনাথ রচিত, আমাদের বাল্যকালে স্কুলপাঠ্য, সেই অবিস্মরণীয় (সহজপাঠ, প্রথম ভাগ, প্রকাশকাল: বৈশাখ ১৩৩৭) কবিতা ‘আমাদের ছোট নদী’। এর প্রথম দুটি পঙ্‌ক্তি বাঙালি-পড়ুয়া মাত্রই স্মরণ করতে পারেন: ‘আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে,/ বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে।’ কবিতাটির দ্বিতীয় পঙ্‌ক্তিতেই ‘বৈশাখ’ মাসের উল্লেখ আছে। এ কবিতায় বৈশাখের প্রকৃতি-পরিবেশ কবি পঙ্‌ক্তিবদ্ধ করেছেন। বৈশাখের রুক্ষতা, দাবদাহ, প্রায় জলশূন্য হাঁটুজলের নদী এবং এরকম অনুষঙ্গে যে জঙ্গম মানবজীবন তারই চালচিত্র রয়েছে রচনাটিতে। বাঙালি কিশোর-কিশোরীর চিরকালীন দুরন্ত ছেলেবেলার চিত্র পাই বৈশাখের হাঁটুজলের নদীর বিবরণে: ‘তীরে তীরে ছেলেমেয়ে নাহিবার কালে/ গামছায় জল ভরি গায়ে তারা ঢালে।/ সকালে বিকালে কভু নাওয়া হলে পরে/ আঁচলে ছাঁকিয়া তারা ছোটো মাছ ধরে।’

বাংলা নববর্ষ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত কবিতা ‘নববর্ষে’। কবিতাটি চিত্রা কাব্যের অন্তর্ভুক্ত। এর রচনাকাল পয়লা বৈশাখ ১৩০১। প্রত্যক্ষভাবে বৈশাখের কথা উল্লেখ না করলেও মূলত বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে (বৈশাখের প্রথম দিন) কবির উপলব্ধি কী তা অভিব্যক্ত হয়েছে এভাবে: ‘আমি আজি ধূলিতলে এ জীর্ণ জীবন/ করিলাম নত।/ বন্ধু হও, শত্রু হও,/ যেখানে যে কেহ রও,/ ক্ষমা করো আজিকার মতো/ পুরাতন বর্ষের সাথে/ পুরাতন অপরাধ যত।’ কিন্তু নববর্ষের শুভলগ্নটি কবির কাছে আনন্দবেদনা মিশ্রিত: ‘এসো এসো নতুন দিবস/ ভরিলাম পুণ্য অশ্রুজলে/ আজিকার মঙ্গলকলস।’ 

রবীন্দ্রনাথের কল্পনা কাব্যের অন্তর্ভুক্ত ‘বৈশাখ’ শিরোনামের কবিতাটি বেশ জনপ্রিয়। রচনাকাল ১৩০৬। বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান এ কবিতাপাঠ ছাড়া যেন সম্পন্ন হয় না। বাংলা মাসগুলোর মধ্যে বৈশাখ মাসের যে স্বতন্ত্রতা রয়েছে তা এ কবিতা পাঠে সুস্পষ্ট হয়। বৈশাখ দিয়ে বাংলা নববর্ষের সূচনা। এ মাসটির বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন: ‘হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ।/ ধুলায় ধূসর রুক্ষ উড্ডীন পিঙ্গল জটাজাল,/ তপ্তঃক্লিষ্ট তপ্ত তনু, মুখে তুলি বিষাণ ভয়াল/ কারে দাও ডাক/ হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ।’ বৈশাখ যে রুদ্র কালবৈশাখী নিয়ে আসে তার ভয়ংকর রুদ্ররূপ রবীন্দ্রনাথ তুলে ধরেন: ‘কী ভীষ্ম অদৃশ্য নৃত্যে মাতি উঠে মধ্যাহ্ন-আকাশে/ নিঃশব্দ প্রখর/ ছায়ামূর্তি তব অনুচর!’ কেবল তো ঝড়ঝঞ্ঝা নয়, বৈশাখের তীব্র দাবদাহও রয়েছে। কবি বৈশাখের মধ্যে প্রবল শক্তির উন্মত্ততাও প্রত্যক্ষ করেছেন এবং তাকে আবাহন করছেন: ‘দুঃখ সুখ আশা ও নৈরাশ/ তোমার ফুৎকারক্ষুব্ধ ধুলা-সম উড়ুক গগনে...।’ বৈশাখের শুধু শক্তিমত্ততা প্রত্যক্ষণ নয়, কবির প্রত্যাশা: ‘হে বৈরাগী করো শান্তি পাঠ/ উদার উদাস কণ্ঠ যাক ছুটে দক্ষিণে ও বামে,/... পূর্ণ করি মাঠ।/ হে বৈরাগী করো শান্তি পাঠ।’

বৈশাখ কেবল ‘ভৈরব’ ও ‘রুদ্র’ রূপের জন্য কবির কাছে আগ্রহের মাস নয়। এ মাসেই তার জন্মের শুভক্ষণ। তাই পঁচিশে বৈশাখ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ যেমন কবিতা লিখেছেন তেমনি অবিস্মরণীয় গানও রচনা করেন। কবিতাটি পূরবী কাব্যের অন্তর্ভুক্ত ‘পঁচিশে বৈশাখ’ (রচনা ২৫ বৈশাখ ১৩২৯)। জন্মদিন নিয়ে কবির উচ্ছ্বাস-আনন্দ এবং কৌতূহল: ‘রাত্রি হল ভোর।/ আজি মোর/ জন্মের স্মরণপূর্ণ বাণী,/ প্রভাতের রৌদ্রে-লেখা লিপিখানি/ হাতে করে আনি/ দ্বারে আসি দিল ডাক/ পঁচিশে বৈশাখ।’  কবি উপলব্ধি করেন তার জন্ম দিবসটি ‘নানা বেশে ফিরে আসে ধরণীর পরে’। তাই দিবসটির একটিমাত্র তাৎপর্য নয়। প্রতি বছর ফিরে আসা ‘পঁচিশে বৈশাখ’ চির এক নতুনকে নিয়ে এসে কবির জন্মদিনকে ভিন্নতর তাৎপর্য দেয়। তিনি লক্ষ করেন: ‘এই দিন এলো আজ প্রাতে/ যে অনন্ত সমুদ্রের শঙ্খ নিয়ে হাতে,/ তাহার নির্ঘোষ বাজে/ ঘন ঘন মোর বক্ষোমাঝে।/ জন্ম-মরণের দিগ্বলয়-চক্ররেখা জীবনেরে দিয়েছিল ঘের,/ সে আজি মিলাল।’ জন্ম-মৃত্যুর অনিবার্যতা জীবনকে রুদ্ধ করেছিল- তা নতুন জন্মদিনের কাছে পরাভূত হলো। আর তখন নতুন এক পঁচিশে বৈশাখ ‘শুভ্র আলো/ কালের বাঁশরি হতে উচ্ছ্বসি যেন রে/ শূন্য দিল ভরে।’ প্রতিবার পঁচিশে বৈশাখ কবির কাছে ফিরে এসে কেবল তার শূন্যতা দূর করে তা নয়, পূর্ণতাও দান করে ‘শুভ্র আলো’ দিয়ে। জন্মদিনে কবির উপলব্ধি: ‘আলোকের অসীম সঙ্গীতে/ চিত্ত মোর ঝংকারিছে সুরে সুরে রণিত তন্ত্রীতে।’

বৈশাখ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বেশকিছু গানও রচনা করেছেন। সবচেয়ে জনপ্রিয় গানটি হলো: ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো।’ বৈশাখকে আবাহন করে এ গান রচনা করেন ২০ ফাল্গুন ১৩৩৩ শান্তিনিকেতনে। মূলত শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই কবি ঋতুভিত্তিক আনুষ্ঠানিক-সংগীত রচনা শুরু করেন। সারা বছরজুড়ে শান্তিনিকেতনে ঋতুভিত্তিক উৎসবের সূচনা হয়। এর মধ্যে নববর্ষবরণ, বর্ষামঙ্গল, পৌষ মেলা ও উৎসব, শারদোৎসব এবং বসন্ত উৎসব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া বৃক্ষরোপণ ও হলকর্ষণ উৎসব এবং কবির জন্মদিন উপলক্ষে পঁচিশে বৈশাখ উদ্‌যাপনও ছিল। ঋতু-অনুষ্ঠানের জন্যই রবীন্দ্রনাথ বৈশাখ নিয়ে কিছু গান রচনা করেন। ‘এসো হে বৈশাখ’ গানে বৈশাখকে মঙ্গলসূচক বার্তা নিয়ে আসার আহ্বান কবির: ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো/ তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে/ বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক।’ বৈশাখের যে রুদ্রতা, রুক্ষতা এবং শক্তির উগ্রতা- তার মধ্যেও কবি কল্যাণ লক্ষ করেন: ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জ্বরা,/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ বৈশাখ প্রলয়ের শাঁখ বাজিয়ে জীবনের ‘মায়ার কুজ্ঝটিজাল’কে ছিন্ন করবে- তবেই তো আসবে জীবনে নতুন ও শুভ বার্তা।

বৈশাখ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের আরও কয়েকটি গান যেমন: ‘ওই বুঝি কালবৈশাখী’, ‘বৈশাখ হে মৌনী তাপস কোন অতলের বাণী’, ‘নমো নমো হে বৈরাগী’, ‘হৃদয় আমার, ওই বুঝি তোর বৈশাখী ঝড় আসে’, ‘বৈশাখের এই ভোরের হাওয়া আসে মৃদুমন্দ’, ‘চক্ষে আমার তৃষ্ণা ওগো, তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে’ ইত্যাদি। এ ছাড়া বৈশাখ বা গ্রীষ্ম ঋতুর বিশেষত্ব নিয়ে কিছু গান রচিত হয়েছে; এতে বৈশাখের প্রখরতা, শুষ্কতা, ‘দুঃসহ তাপ বহ্নি’, ‘রুদ্রবাণী’ ইত্যাদি প্রকাশ পেয়েছে। ‘চক্ষে আমার তৃষ্ণা ওগো, তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে’ গানটিতে কবি নিজেকে ‘বৃষ্টিবিহীন বৈশাখী দিন’-এর সঙ্গে উপমায়িত করেন। এরকম আরেকটি গান: ‘প্রখর তপনতাপে, আকাশ তৃষায় কাঁপে, বায়ু করে হাহাকার।’ প্রকৃতির মধ্যে আকাশের তৃষ্ণা, বায়ুর হাহাকার ইত্যাদি বিদ্যমান। কিন্তু এই তৃষ্ণা ও হাহাকার কবির নিজেরই- তা তিনি প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে তবেই উপলব্ধি করতে পারেন।

রবীন্দ্রনাথ যেমনটি নিজের জন্মদিন ‘পঁচিশে বৈশাখ’ উপলক্ষে কবিতা রচনা করেন, তেমনই নিজের জন্মদিনের গানও লিখেছেন। বিখ্যাত গানটি: ‘হে নূতন,/ দেখা দিক আর-বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ।’ কবির মৃত্যুর কয়েক মাস আগে ২৩ বৈশাখ ১৩৪৮-এ গানটি রচিত। তার জীবদ্দশায় শেষ জন্মদিনে গানটি গাওয়া হয়। দেশ-বিদেশে উদ্‌যাপিত রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন এ গান ছাড়া সম্পূর্ণতা পায় না। এ গানের অবিস্মরণীয় ভাবৈশ্বর্য লক্ষণীয়। নিজের জন্মদিনের প্রসঙ্গ গানটিতে উল্লেখ থাকলেও তা রচনাকৌশলের কারণে ব্যক্তি প্রসঙ্গ ছাপিয়ে নৈর্ব্যক্তিক হয়ে উঠেছে: ‘ব্যক্ত হোক জীবনের জয়/ ব্যক্ত হোক তোমামাঝে অসীমের চিরবিস্ময়।... চির নূতনেরে দিল ডাক/ পঁচিশে বৈশাখ।’ এ গানে প্রতিটি মানবশিশুর জন্মকে স্বাগত জানানো হয়েছে। এভাবে সসীম জীবনের মধ্যে অসীমের প্রকাশঘটান কবি। নিজের জন্মদিনের শুভক্ষণের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ প্রতিটি মানবশিশুর জন্মের চির নতুনত্ব খুঁজে পেয়েছেন। 

রবীন্দ্রনাথ বাংলার ষড়ঋতু ও বারো মাসের অনুষঙ্গ নিয়ে কিছু না কিছু লিখেছেন। সঙ্গত কারণেই বৈশাখ নিয়েও কবির সবিশেষ কৌতূহল ছিল। মানবচরিত্র এবং মানস গঠনে প্রকৃতি-প্রতিবেশ ও পরিবেশের ভূমিকা প্রশ্নাতীত। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবেশ ও পরিবেশের যে পরিবর্তন ঘটে তার প্রভাব কোনো সংবেদনশীল মানুষ এড়িয়ে যেতে পারে না। রবীন্দ্রনাথও তা এড়াতে পারেননি। আমরা তার বিবিধ রচনায় প্রতিবেশ-পরিবেশের অনুষঙ্গে নানা তাৎপর্যে ঋতুকথন লক্ষ করি। তেমনি ‘বৃষ্টিবিহীন বৈশাখী দিন’ অথবা ‘বৈশাখ হে মৌন তাপস’ এমন শিল্পিত করে বৈশাখ-বন্দনা আমাদের প্রকৃতির আরও নৈকট্যে নিয়ে যায়।

লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া