ইতিহাসের গতিকে কোনো ব্যক্তি রুদ্ধ বা পরিবর্তন করতে পারে না। তাকে সম্পাদনা করারও কোনো সুযোগ নেই। সব রাজনৈতিক মতাবলম্বীদের এ কথা মনে রাখতে হবে। আমাদের নানাবিধ সমস্যা থাকলেও ১৬ ডিসেম্বর এসেছিল বলেই আমাদের গড় আয় এখন ৪ হাজার ডলার, আয়ু ৭৪ বছর, খালি গায়ে বা খালি পায়ে কোনো মানুষ নেই, গৃহহীন কেউ নেই, খাদ্য সাহায্য নেওয়ার মতো মর্যাদাহীন কোনো মানুষও নেই। দিবসটি আমাদের বারে বারে ডাক দিয়ে যাবে।…
বিজয় দিবসের অমর বাণী আমাদের বারে বারে ডাকে। কারণ ৯ মাসে লাখো প্রাণের ও সম্ভ্রমের এবং কোটি মানুষের আতঙ্কভরা জীবনযাপনের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ছিল ০১.০৩.১৯৭১-এ সূচনা হওয়া নাটকের শেষ অঙ্কের শেষ দৃশ্য। বর্তমানে নানা দিবস নড়বড়ে হওয়া শুরু হয়েছে, ১, ৭ মার্চ এখন অনুল্লিখিত। ১৬ ডিসেম্বর অস্পষ্ট বলে প্রতিয়মান। তবে তাকে ধ্বংস করা কঠিন হবে। তাই স্মরণ করি সে হিরণ্ময় দিনটিকে। পূর্ব পাকিস্তানের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিব ছিলেন এর প্রধান কুশীলব। আর নিষ্ঠুর, বিশ্বাসঘাতক, অপরিণামদর্শী পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর কার্যকলাপ ছিল এর পেছনের প্রধান কারণ। ব্রিটিশ শাসনের শেষ প্রান্তে এসে ভারতীয় উপমহাদেশের অধিবাসীদের ধর্মভিত্তিক পরিসংখ্যানে মুসলমানের হার ছিল মাত্র ১৮.৯০ ভাগ। উচ্চ মেধাবী এবং সবচেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় সনাতনী মানুষের সঙ্গে জীবনের নানা প্রতিযোগিতায় অক্ষম হওয়ার নিশ্চিত আশঙ্কায় মুসলমানদের অবিসংবাদিত নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মুসলমানদের জন্য একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র দাবি করেন। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান নামের এ রাষ্ট্র এবং ভারতীয় ইউনিয়ন রাষ্ট্র দুটি গঠিত হয়। তখন পূর্ব পাকিস্তানিদের সংখ্যা ছিল পাকিস্তানের সমগ্র জনসংখ্যার শতকরা ৫৬ ভাগ। ভারতের পাঞ্জাবের কর্নাল জেলা থেকে সর্বস্ব ত্যাগ করে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে আসা রাজনীতিবিদ লিয়াকত আলী খান পাকিস্তানের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হন। পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষা সম্পর্কে তার কিছুটা পক্ষপাতদুষ্ট মনোভাব ছাড়া অন্যান্য বিচারে তিনি একজন চমৎকার, সৎ, জনপ্রিয় এবং গণতন্ত্রমনা মানুষ ছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী ষড়যন্ত্র করে পশ্চিমাদের সহায়তায় লিয়াকত আলী খানকে আঁততায়ীর মাধ্যমে খুন করায়। লিয়াকত আলী খানের হত্যার পর ১৯৫৮ সালে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল আইয়ুব খান (সীমান্ত প্রদেশ) সরাসরি ক্ষমতা দখল করেন। তার সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব পাকিস্তানিদের চরম বঞ্চনা ও শোষণ আরম্ভ করে। তিনি শামরিক শাসন চাপিয়ে দিয়ে ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানিদের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে কঠোর হস্তে দমন করে রাখেন। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রবল গণ-আন্দোলনের মুখে তিনি পদত্যাগ করলে সেনাপ্রধান জেনালের আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান (উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ) ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ শামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। মেজর জেনারেল হিসেবে এর আগে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং বা জিওসি ছিলেন। সে কারণে এবং স্বভাবগতভাবে তিনি বাঙালি বিদ্বেষী ছিলেন না। ক্ষমতা নেওয়ার পরপরই তিনি পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বেশ কয়েকটি ভালো কাজ করেন।
১. জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আইন পাস।
২. কেন্দ্রীয় বাজেটে পূর্ব পাকিস্তানের হিস্যা তাৎপর্যপূর্ণভাবে বৃদ্ধি করা।
৩. একটি বেসামরিক প্রশাসনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের উদ্দেশ্যে জাতীয় নির্বাচন কর্মসূচি ঘোষণা করা।
৪. ঢাকা প্রাদেশিক রাজধানী হওয়া সত্ত্বেও ইয়াহিয়া ঢাকার শেরেবাংলা নগরে নির্মাণাধীন ভবনে পরবর্তী জাতীয় সংসদ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার জন্য ১৯৭১-এর ফেব্রুয়ারির মধ্যে ভবনটির সাজসজ্জা চূড়ান্ত করার নিদের্শ দেন।
প্রতিশ্রুতি মতো, ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ৩০০ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসন এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ৮৫টি আসনে জয় লাভ করেন। কিন্তু ভুট্টো বলেন, ‘মুজিবের দল পশ্চিম পাকিস্তানে কোনো আসন লাভ করেনি। কাজেই তিনি সমগ্র পাকিস্তানকে শাসনের অধিকার রাখেন না। তিনি তার দল নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানকে শাসন করুন আর আমি পশ্চিম পাকিস্তানের ১৩১টি আসনের ৮৫টিতে জয় লাভ করে এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করার ফলে আমার দল পিপলস পার্টি পশ্চিম পাকিস্তানকে শাসন করবে’। ইয়াহিয়া খান নিজে অনির্বাচিত হওয়ায় ভুট্টোর এসব জটিল যুক্তির সামনে অসহায় বোধ করেন। ভুট্টো এবং পীরজাদা তাকে বোঝান যে, পশ্চিম পাকিস্তানের নির্বাচিত নেতারা সংখ্যাগরিষ্ঠ না হলেও মুজিবের সঙ্গে তাদের একটি বোঝাপড়া ছাড়া জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান এবং ক্ষমতা হস্তান্তর করা ঠিক হবে না। রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ ইয়াহিয়া এ ফাঁদে পা দিয়ে ইতিপূর্বে তার ঘোষিত ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য পরিষদের অধিবেশন এবং ক্ষমতা হস্তান্তর সংক্রান্ত সব পরিকল্পনা থেকে পিছু হঠতে বাধ্য হন। সেই সূত্রে ঘটতে থাকে পরবর্তী ঘটনাক্রম-
১ মার্চ মধ্যাহ্নের কিছু আগে রেডিও পাকিস্তান থেকে পাকিস্তানের প্রসিডেন্ট জেনারেল আগা মো. ইয়াহিয়া খানের বরাতে (স্বকণ্ঠে নয়) এক বিবৃতিতে ৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার কথা বলা হলে সারা পূর্ব পাকিস্তান ক্ষোভ ও হতাশায় ফেটে পড়ে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী এসব স্থানে জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করতে থাকে। সান্ধ্য আইন জারি করে বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা চলতে থাকে। ৭ মার্চ রেসকোর্সে মুজিব বেলা ৩টা ১ মিনিটে এক জনসভায় ভাষণে বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। দেশের মানুষের ট্যাক্সের অর্থ দিয়ে যে অস্ত্র কেনা হয় বহিশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য, আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে আমার দেশের মানুষকে হত্যা করার জন্য। রক্ত যখন দিয়েছি, আরও রক্ত দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ’। (উদ্ধৃতি ক্রমানুসারে নয়)। পরদিন পশ্চিম পাকিস্তানের ওয়াহ সেনানিবাস থেকে লে. জেনারেল টিক্কা খান, কোর কমান্ডার, ঢাকায় বদলি হয়ে আসেন গভর্নরের পদে। প্রধান বিচারপতি কালিয়াকৈরের বি এ সিদ্দিকী নতুন গভর্নরকে শপথ না দেওয়ার দুঃসাহস দেখিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। ৮ মার্চ থেকে সারা প্রদেশে পাকিস্তান সরকার অচল হয়ে পড়ে মুজিবের মুখের নির্দেশে চলতে থাকে। সেনানিবাস ও গভর্নর হাউস ছাড়া আর কোথাও পাকিস্তানি পতাকা দেখা যায়নি। এ অবস্থায় ইয়াহিয়া ১৮ মার্চ ঢাকায় আসেন। পরদিন সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা সিন্ধুর জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় আগমন করলে মুজিব-ইয়াহিয়া-ভুট্টো আলোচনা আরম্ভ হয়। মিন্টো রোডে (বর্তমানে ফরেন সার্ভিস একাডেমি ভবনে) পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের চারটি প্রদেশ এবং কেন্দ্রের মধ্যে ভবিষ্যৎ ক্ষমতা বণ্টন নিয়ে এ আলোচনা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিমা মহলের দীর্ঘদিনের শোষণ বন্ধের লক্ষ্যে মুজিব প্রতিরক্ষা ছাড়া প্রায় বিষয়গুলোর ক্ষমতা প্রদেশের হাতে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেন। ইয়াহিয়া একপর্যায়ে বলেন, এত দেখছি এক কনফেডারেশনের ব্যবস্থা। তবে জাতির পিতা জিন্নাহ যেখানে এমন ব্যবস্থায় সম্মত ছিলেন, সেখানে আমি না করার কে? কিন্তু এতে ভুট্টো আপত্তি করেন।
পাকিস্তান সেনাবা ইয়াহিয়াকে চাপ দিতে থাকেন এতে সম্মত না হয়ে বরং বল প্রয়োগ করে বাঙালিদের গদিতে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করে দিতে। ২৫ তারিখে সকালে কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে কর্নেল এসডি আহমদকে ঢাকায় এনে তার কমান্ডো ইউনিট সদস্যদের দিয়ে মুজিবের ৩২ নম্বর রোডের বাড়ি রেকি করা হয় মুজিবকে পরে গ্রেপ্তার করার জন্য। ইয়াহিয়া হামিদের সঙ্গে পানাহার শেষে তাকে বলেন, Sort the bastards out well and proper. এরপর করাচিগামী পিআইএ ফ্লাইটে তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন। পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী শুরু করে তাদের অপারেশন সার্চলাইট নামের বাঙালি নিধন অভিযান। মুজিব ১২টা ১ মিনিটে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের একখানি বেতার যন্ত্রের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে ঘোষণা করেন। বিবিসি তা প্রচার করে বিশ্বকে জানিয়ে দেয়, যা ইউটিউবে আছে। ঢাকাসহ সারা দেশে ৩২, ১৮, ৪৮ পাঞ্জাব, ২০, ২২ ও ২৪ ফ্রন্টিয়ার ফোর্স, ২০ বালুচ, ৪৩ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি, ৪ ক্যাভালরি ও ২১ নম্বর ব্যাটারি ইউনিট পিলখানায় ইপিআর সদর দপ্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, নীলক্ষেত এবং ঢাকা সেনানিবাসের বাঙালিদের গণহত্যা শুরু করে। হত্যা ছাড়াও নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠনের ভয়ে ১ কোটি মানুষ ক্রমে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। মুজিবকে পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাবের লায়ালপুর জেলা কারাগারে বন্দি করে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে বিচার করার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। ১৭ এপ্রিল, মেহেরপুরের মুজিবনগরে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার গঠিত হয় সৈয়দ নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে এবং বাঙালিরা সাধ্যমতো মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া শুরু করেন। ভারত তাদের সব রকম সহায়তা দিতে থাকে। কারণ বিপুল ভোটে নির্বাচিত মিসেস ইন্ধিরা গান্ধীর সরকার বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারও যে ’৭০-এর নির্বাচনে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছিল সে বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন। তিনি কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদকে সমর্থন করেননি।
করাচি পৌঁছে ২৬ মার্চ প্রেসিডেন্ট, মুজিবকে দোষারূপ করে এক বেতার ভাষণ দেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিক্সনসহ বিশ্বনেতাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, এই শরণার্থী নির্যাতিত এবং এদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করানো এ অঞ্চলে শান্তির জন্য প্রয়োজন। ব্রিটেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মিসর তাকে সমর্থন দেয়। দেশের ভেতর সামান্য প্রশিক্ষণ পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের এবং নিয়মিত সৈন্যদের হাতে ভারী অস্ত্রের অভাব থাকায় যুদ্ধে খুব অগ্রগতি সাধিত হয়নি। কোনো থানা বা মহকুমা মুক্ত করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। তবে বীর মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকী অন্য যেকোনো নিয়মিত সৈন্যের চেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে থাকেন। ইয়াহিয়া সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে লে. জেনারেল আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজি (মিয়াওয়ালি)-কে পূর্ব পাকিস্তানের অধিনায়ক হিসেবে নিয়োগ দেন। বিশিষ্ট অভিনেত্রী শর্মিলী ঠাঁকুরের চাচাশ্বশুর লে. জেনারেল শের আলী খান পতৌদি নিয়াজির আগে ঢাকায় পদায়িত হলে তিনি ইয়াহিয়া খানকে পূর্ব পাকিস্তানে স্বদেশবাসীর ওপর নির্যাতন চালানো বন্ধের জন্য পরামর্শ দেন। কিন্তু এ বিবেকবান সেনাপতির কথা ইয়াহিয়া শোনেননি। মুক্তিযোদ্ধারা পুল, কালভার্ট, ট্রেন ও বিদ্যুৎকেন্দ্র উড়িয়ে দিয়ে পাকবাহিনীর চলাচলকে বিপর্যস্ত করে দিতে থাকেন। নিয়াজি অসহায় অবস্থা বুঝতে পেরে পিন্ডির কাছে নতুন নতুন সেনা ইউনিট চেয়ে পাঠাতে থাকেন। কিন্তু তা ক্রমশ অসম্ভব হয়ে পড়ায় এবং পশ্চিম পাকিস্তানের নিরাপত্তা নাজুক হয়ে ওঠায় ইয়াহিয়া, সেনাপ্রধান হামিদ ও অন্য কর্তারা চালাকি করে নিয়াজিকে শুধু সান্ত্বনা আর সাহস দিতে থাকেন। ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তানে তার পজিশন অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে একটি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পরিকল্পনা করেন যাতে করে জাতিসংঘে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো প্রয়োগ করে যুদ্ধবিরতি আনিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে চিরতরে রুদ্ধ করে দেওয়া যায়। তিনি ৩ ডিসেম্বর ’৭১-এ তাই অতর্কিতে ভারতের পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত আম্বালা, লুধিয়ানা, পাঠানকোর্ট, অমৃতসরও জলন্ধর বিমান ঘাঁটিতে আক্রমণ চালান। ভারত সরকার আত্মরক্ষার্থে পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত পাক সৈন্য, বিমানবাহিনী ও নৌ-ঘাঁটিতে ব্যাপক আক্রমণ চালায়। পাকিস্তানের নেতা ভুট্টো জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আনলেও পোল্যান্ড ও সোভিয়েতের দক্ষ কূটনীতির ফলে তা ব্যর্থ হয়ে যায়। ভারতীয় বাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণে পূর্ব পাকিস্তানের পতন অবশ্যম্ভাবী দেখতে পেয়ে নিয়াজি, ইয়াহিয়ার কাছে নির্দেশনা চান। তিনি উত্তরে প্রতারণাপূর্ণ কথা বলে সিদ্ধান্ত তারই ওপর ছেড়ে দেন। উল্লেখ্য, ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো সেক্টরই স্বাধীন হয়নি। কিন্তু যুদ্ধে মিত্রবাহিনী যোগদানের পর ৩ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বরে সম্পূর্ণভাবে হানাদারমুক্ত হয়। এতে ভারতীয় বাহিনীর ১৭৬৪ জন সৈন্য ও অফিসার শহিদ হন। ভারতীয় কমান্ডার লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার (রাওয়ালাপিন্ডি) নেতৃত্বে মিত্রবাহিনী ঢাকার কাছে এগিয়ে এসে নিয়াজির আত্মসমর্পণের সময় বেঁধে দেয়। নিয়াজি ১৬ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার ঢাকায় বিকেল ৫টা ১ মিনিটে অরোরার কাছে চরম অপমানজনকভাবে আত্মসমর্পণ করেন। তার সঙ্গে ৯৩ হাজার নানা শ্রেণির সৈন্য, পুলিশ, সীমান্তরক্ষী, রেঞ্জার ও স্কাউট ছিল। এদের মধ্যে ৭৪ জন বাঙালি সেনা ছিলেন যারা পাকবাহিনীর সঙ্গে থেকে স্বজাতির বিরুদ্ধে ৯ মাস যুদ্ধ করেছেন। এদের মধ্যে একজন হলেন পুলিশ কমিশনার মীর্জা রকিবুল হুদা। পূর্ব পাকিস্তান থেকে পলাতক বাঙালি সৈন্য, সীমান্তরক্ষী ও পুলিশ এবং নবপ্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর কোনো ঘাঁটির ধ্বংস বা আত্মসমর্পণ ঘটানো সম্ভব হয়নি। কারণ এর জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও গোলাবারুদ তাদের ছিল না। পাক সেনাদল থেকে এসব বাঙালি সেনার পলায়নের সময় ভারী অস্ত্র ও গুলি বহন করে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। জেনারেল ওসমানির বিশেষ সহকারী মেজর (অব.) খালেক তার বইতে লিখেছেন যে, কেবল দলছুট এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অল্পকিছু সংখ্যক সৈন্য বাঙালি যোদ্ধাদের হাতে নিহত হয়। তার পরও মুক্তিযুদ্ধের দলিলের কোথাও এই পাকিস্তানি সৈন্যদের নাম, পদবি, ইউনিট ও ঘটনাস্থলের বর্ণনা প্রায় নেই বলা চলে। কারণ এদের সংখ্যা ছিল সামান্য।
আমাদের জন্য পরম গৌরবের এবং পাকিস্তানিদের জন্য চরম অপমানকর এই ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ আসার কারণ খুব জটিল ছিল না। এগুলো হচ্ছে সশস্ত্র সার্ভিসগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাজনীতিবিদদের মনোযোগ না দেওয়া ও শাসনতন্ত্র প্রণয়নে আট বছর কালক্ষেপণ করা। সশস্ত্রবাহিনী ক্ষমতা দখলের সুযোগ পেয়ে যথেচ্ছা সম্পদ ভোগ দখল করতে থাকে। বাজেটের ৬৬ শতাংশ প্রতিরক্ষায় ব্যয় হওয়ায় এবং তাতে পূর্ব পাকিস্তানের অংশগ্রহণ যৎসামান্য হওয়ায় বাঙালিরা সংক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তা বলপূর্বক দমন করতে গিয়ে সশস্ত্রবাহিনী ভুলে যায় যে, পাকিস্তান এনেছিলেন যে জিন্নাহ সাহেব এবং তাতে সশস্ত্র বাহিনীর কোনো অবদান ছিল না, এ কথাও তারা বিস্মৃত হয়ে যায়। রাষ্ট্র যে জনগণের এবং সশস্ত্র বাহিনী যে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন এবং সরকারের আদেশ পালনে বাধ্য একটি সার্ভিস মাত্র- রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এ অমোঘ সূত্র তারা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করলেও ইতিহাস তা তাদের মনে করিয়ে দেয়। স্মরণ করা যেতে পারে যে ’৭১-এর মুক্তিসংগ্রামে পাঠান, বালুচ ও সিন্ধিরা সাধারণভাবে বাঙালিদের সমর্থন দেয়। এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান (পাঠান) জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ’৭১-এর আগস্ট মাসে মুজিবের ধানমন্ডির বাসভবনে বেগম মুজিবের সঙ্গে দেখা করে বলেন যে, এ দুর্দিন থাকবে না। পাঞ্জাবি সংস্কৃতি জগতের বিশিষ্ট কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিবৃতি দিয়ে কারারুদ্ধ হন। ইয়াহিয়া খান রাজনীতি বুঝতেন না। ভুট্টো যখন বিরোধী দলের নেতার আসন গ্রহণ করতে অসম্মত হয়ে পশ্চিম পাকিস্তানকে আলাদাভাবে শাসন করার প্রস্তাব দেন, সিআরপিসির অধীনে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে ইয়াহিয়ার উচিত ছিল তাকে তখনই আইনের আওতায় এনে শাস্তির বিধান করা। কিন্তু তিনি তা করেননি। ইয়াহিয়া সমরনীতিও বুঝতেন না। তিনি ভুলে গিয়ে ছিলেন যে, ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে হামলাকারী ছিল পাকিস্তান এবং ভারতীয় ও সোভিয়েত নেতাদের কাছে কাকুতি-মিনতি করে যুদ্ধ বিরতি সম্মত করিয়ে পাকিস্তান সেবার নিজেকে কোনোরকম রক্ষা করেছিল। ফেব্রুয়ারি ১৯৭১-এ পাকিস্তানের বিমানসমূহকে ভারতের আকাশ নিষিদ্ধ করার ভারত সরকারের সিদ্ধান্তের ফলে শ্রীলঙ্কা হয়ে ৩.৫ গুণ পথ অতিক্রম করে পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য ও গোলাবারুদ এনে যুদ্ধ যাত্রা করা যে দরিদ্র পাকিস্তানের পক্ষে কয়েক মাসও সম্ভব হবে না তা তিনি অনুধাবন করেননি। বিচ্ছিন্ন একটি প্রদেশে ৪ গুণ শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার পরিণতি তিনি সামান্যও বুঝতে পারেননি। তিনি আরও ভুলে গিয়েছিলেন একটি দেশের সশস্ত্র বাহিনী জনগণের সমর্থন ছাড়া সফল হতে পারে না।
শ্রেণিবিভক্ত সমাজ এবং সম্পদ ও সম্মানের সর্বোত্তম বণ্টনের ব্যবস্থাসংবলিত রাজনীতিকে অস্বীকারকারী কোনো শাসনব্যবস্থা যে টিকতে পারে না তা রাজনীতিবিদ, আইন প্রণেতা এবং সশস্ত্র বাহিনীকে অবশ্যই বুঝতে হবে। আর দুর্বৃত্তদের সংঘ স্থায়ী হয় না- এ দিবসের আর এক বাণী। হিটলার তার বাহিনীকে মহাবিপদের মধ্যে ফেলে পরিত্যাগ করেছেন। ইতিহাস ও পরিণতিবোধহীন ইয়াহিয়া-হামিদ-পীরজাদা-ভুট্টো চক্রও নিয়াজিকে পরিত্যাগ করেছেন।
নয় মাসে একবারও ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা দেখতে আসেনি
বাংলাদেশেরই ঠিকানাহীনসহ বিশাল রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা প্রশ্ন করেন যে, ৩০ লাখ শহিদের নামের তালিকা কোথায়, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। এটা ঠিক যে তালিকাটি তৈরি করা হয়নি। তবে তারা যখন বলেন, ’৭১-এ পাক হানাদার বাহিনী আমাদের সঙ্গে তেমন নিষ্ঠুরতা করেনি তা অত্যন্ত আত্মঘাতী এবং পাকিস্তানিদের কাছে আমাদের হাস্যাসপদ করে তোলার নামান্তর। তাদের করা নৃশংসতাকে লঘু করে দেখার যুক্তি এবং ’৭১-এর মার্চে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য ও গোলাবারুদ আনার সুযোগ করে দেওয়ার জন্যই নাকি মুজিব, ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছিলেন- এ ধরনের কথা বলা একান্ত আত্মঘাতী। তিনি পালিয়েছিলেন- বলাটাও বেআইনি। কারণ সরকার মুজিবের বাসভবন রেকি করিয়ে কর্নেল এসডি আহমদের তত্ত্বাবধানে মেজর বেলালকে দিয়ে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার করে; যা ২৬ মার্চ ইয়াহিয়া বেতার ভাষণে উল্লেখ করেন। আইয়ুব খানের বেআইনি সরকারের বিরুদ্ধে আান্দোলন করার অপরাধে ’৬৯-এ ঢাকায় মতিউর, আসাদ, আনোয়ারা বেগমকে পাক সেনাবাহিনীর খুন করার নিষ্ঠুরতার কথাও এই পাক সমর্থকরা ভুলে গেছেন। তেমনি ঢাকা সেনানিবাসে বাঙালি বিচারাধীন বন্দি সার্জেন্ট জহুরুল হক হত্যার মধ্যেও তারা পাকিস্তানের অন্যায় দেখতে পাননি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি মিছিলে রসায়নের রিডার ড. শামসুজ্জোহাকে পশ্চিম পাকিস্তানি সীমান্ত সেনা কর্তৃক বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুন করার নির্মমতার ঘটনায়ও তারা পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সমর্থন করার যুক্তি খুঁজে পেয়েছেন। স্বদেশের লাখ লাখ মানুষ খুন ও নারীর সম্ভ্রমহন্তা পাকিস্তান সরকার আমাদের কাছে কোনো মাফ চায়নি। অথচ চরম কাপুরুষের মতো তারা তাদের ভাষ্যমতে, পরম শত্রু ভারতীয় সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ না করেই আরাম ও অসম্মানের পথে আত্মসমর্পণ করে এ দিনে। যখন সোনার ভরি ১১০ টাকা এবং চালের সের ১.২৫ টাকা, তখনকার মূল্যমানে তারা ২ কোটি ১৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার সমরাস্ত্রও ভারতের হতে তুলে দেয় বিনা বাধায়। আবার আওয়ামী মন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল খোন্দকার লিখেছেন যে, স্বাধীনতা যুদ্ধ ভারতের সহয়তা ছাড়া একাই তিনি ও তার বাহিনী পরিচালনা করতে পারতেন অথচ যুদ্ধের ৯ মাস তিনি ও তার বাহিনী ভারতে বসবাস করে তাদের দেওয়া খাদ্য, গুলি ও বারুদ ব্যবহার করেছেন। পাক বিমানবাহিনীর কোনো ঘাঁটিতে তিনি একটি বিমান হামলাও চালাননি। মুজিবের শাসনামল দোষত্রুটিতে পরিপূর্ণ ছিল। কিন্তু ’৭১-এর অবিসংবাদিত নেতা কে, তা ইতিহাস স্থির করেছে। ইতিহাসের গতিকে কোনো ব্যক্তি রুদ্ধ বা পরিবর্তন করতে পারে না। তাকে সম্পাদনা করারও কোনো সুযোগ নেই। সব রাজনৈতিক মতাবলম্বীদের এ কথা মনে রাখতে হবে। আমাদের নানাবিধ সমস্যা থাকলেও ১৬ ডিসেম্বর এসেছিল বলেই আমাদের গড় আয় এখন ৪ হাজার ডলার, আয়ু ৭৪ বছর, খালি গায়ে বা খালি পায়ে কোনো মানুষ নেই, গৃহহীন কেউ নেই, খাদ্য সাহায্য নেওয়ার মতো মর্যাদাহীন কোনো মানুষও নেই। দিবসটি আমাদের বারে বারে ডাক দিয়ে যাবে।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও প্রজাতন্ত্রের সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল
[email protected]