গত বছর ‘টিচিং ইভ্যালুয়েশন’ বা শিক্ষক মূল্যায়ন কার্যক্রম চালুর নীতিমালা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলে (শিক্ষা পরিষদ) অনুমোদনের ১৮ দিনের মাথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেটে চূড়ান্ত হয়। চূড়ান্ত হওয়ার এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও শিক্ষকদের মূল্যায়নের সুযোগ পাচ্ছেন না শিক্ষার্থীরা।
এদিকে কয়েক দফায় চালু হওয়ার কথা শোনা গেলেও এখন পর্যন্ত অধরাই রয়ে গেছে ‘টিচিং ইভ্যালুয়েশন’ বা শিক্ষক মূল্যায়ন কার্যক্রম।
গত বছরের ১২ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একাডেমিক কাউন্সিল সভায় শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর সুপারিশ করা হয়। সেই সভায় এ-সংক্রান্ত একটি গাইডলাইনও উপস্থাপন করা হয়। একাডেমিক কাউন্সিলের সুপারিশের আলোকে এই পদ্ধতি চালুর জন্য ওই বছরের ৩০ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের এক সভায় এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২ জন শিক্ষককে এ-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণও প্রদান করা হয়েছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ওই শিক্ষকদের কাজ হবে তারা নিজেদের বিভাগে এই বিষয়ে আলোচনা করবেন। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি সেমিস্টার শেষে এটি চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে শিক্ষক মূল্যায়নে উন্মুখ হয়ে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী নিয়াজ মাহমুদ বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে শিক্ষক মূল্যায়ন একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্তই নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সম্পর্ক যেমন আরও সুদৃঢ় হবে, তেমনি উভয় পক্ষই বেশ সচেতন থাকবে। এতে শিক্ষার মান আরও বাড়বে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে যথাযথ শিক্ষিত ও আধুনিক মুক্তচিন্তার মানুষ তৈরিতে শিক্ষক মূল্যায়নের এই ধারা বড় প্রভাব রাখতে পারে বলে আমার মনে হয়।’
ফারসি ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের এস এম অনিক বলেন, ‘এটি শিক্ষার্থীদের কাছে নতুন একটি বিষয়। এর মাধ্যমে আমাদের একটি নতুন অভিজ্ঞতার জন্ম হতে যাচ্ছে। শিক্ষকদের পাঠদানসহ পুরো বিষয়ের ওপরে মূল্যায়নের সুযোগ পেতে যাচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিষয়টি প্রশংসার দাবিদার। এটি যত দ্রুত চালু হবে, ততই সবার জন্য ভালো।’
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী এটি বিলম্বিত হওয়ার পেছনে কোনো পক্ষের সদিচ্ছার অভাবও থাকতে পারেন বলে মনে করেন। ওই শিক্ষার্থী খবরের কাগজকে বলেন, ‘এই মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু হলে অনেক শিক্ষকই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারেন। হয়তো এটা একটা কারণ হলেও হতে পারে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের উচিত হবে এ কাজটির দ্রুত বাস্তবায়ন করা।’
চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন মনে করেন, এ বিষয়ে অধিকতর ওরিয়েন্টেশন প্রয়োজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিষয়টি ভালো করে জানার ও বোঝার জন্য অধিকতর ওরিয়েন্টেশন প্রয়োজন। বিষয়টি বিলম্ব হলেও আমাদের তো করতে হবে। তা ছাড়া সবাই এটি সাদরে গ্রহণ করেছে। এটি বাস্তবায়নে যেসব প্রক্রিয়া রয়েছে, সেগুলো মতামতের জন্য বিভিন্ন বিভাগে পাঠানো হয়েছে। তবে সব মিলিয়ে আশা করি অবশ্যই এটি বাস্তবায়ন হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, ‘নতুন একটি পদ্ধতির সঙ্গে অভ্যস্ততা গড়ে উঠতে একটু সময় লাগে। তা ছাড়া এমন পদ্ধতি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নতুন। এটা বাস্তবায়নের পেছনে সদিচ্ছার অভাব নেই; কারণ ডিনস কমিটি, একাডেমিক কাউন্সিল সব ক্ষেত্রেই সব জায়গাতেই পাস হয়েছে। আমি আশাবাদী, যদি কোনো কারণেও স্থবিরতা থেকেও থাকে সেটি কেটে যাবে।’
সার্বিক বিষয়ে গত বুধবার রাতে কথা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামালের সঙ্গে। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) থাকাকালীন এটি তো আমার বিষয় ছিল না, আমার সে সময়ে যেই কাজ ছিল সেটি আমি করেছি। বাকি যেটি রয়েছে, সেটি আগামী ডিনস কমিটির মিটিংয়ে এ বিষয়ে আলোচনা হবে। সেখান থেকে এ বিষয়ে আমরা একটি সিদ্ধান্ত নেব।’
উল্লেখ্য, অনলাইনে শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত ফরমে পাঁচটি সূচক ও উপসূচকের আলোকে শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারবেন। যেখানে রাখা হয়েছে ১৫টির বেশি প্রশ্ন। শিক্ষক কেমন পড়ান, তার কোর্সের বিষয়বস্তু কেমন, সময়মতো ক্লাসে যাচ্ছেন কি না, কোর্স মেটেরিয়ালস সরবরাহ করছেন কি না, মিডটার্ম, অ্যাসাইনমেন্ট ঠিকমতো নিচ্ছেন কি না এবং সেগুলো ঠিকমতো মূল্যায়ন হচ্ছে কি না- এসব বিষয়ে শিক্ষার্থীরা মতামত দেওয়ার সুযোগ পাবেন। শিক্ষার্থীদের মতামতের ভিত্তিতে সেগুলোর গড় করে শিক্ষকের সামগ্রিক স্কোর নির্ধারণ করা হবে। সেই ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর নাম-পরিচয় সবকিছু গোপনও রাখা হবে।