বর্ষা মৌসুম পুরোপুরি শুরু হয়নি। এ পর্যন্ত যে বৃষ্টিপাত হয়েছে, তাকে সেই অর্থে মুষলধারে বলা যাবে না। তবে রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতা নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। গত কয়েক সপ্তাহের মাঝারি বৃষ্টিপাতেই আবারও স্পষ্ট হয়েছে সমস্যার বাস্তব চিত্র। বৃষ্টি থামার ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলিতে পানি জমে থাকতে দেখা যাচ্ছে। জলজটে কোথাও যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, কোথাও হাঁটুসমান পানিতে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন নগরবাসী। এতে পুরোদমে বর্ষা শুরুর আগে নতুন করে ভোগান্তির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
- হাজার কোটি টাকার প্রকল্প, তবু পানির নিচে ঢাকা!
- বৃষ্টি নামলেই থমকে যায় শহর, জলাবদ্ধতার পুরোনো আতঙ্কে নগরবাসী
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য গত দেড় দশকে একের পর এক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। খাল পুনরুদ্ধার, ড্রেনেজব্যবস্থার উন্নয়ন, পাম্পিং স্টেশন নির্মাণ, বক্স কালভার্ট সংস্কার এবং পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার আধুনিকায়নে ব্যয় হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। এমনকি রাজধানীর খাল ও নালা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও বিভিন্ন সময়ে এক সংস্থা থেকে অন্য সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। কিন্তু এত সব উদ্যোগ ও বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও বাস্তব চিত্র খুব একটা বদলায়নি। সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা এখনো পানির নিচে তলিয়ে যায়।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যার কারণ কেবল অবকাঠামোগত দুর্বলতা নয়, বরং দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং সমন্বয়হীন ব্যবস্থাপনা। একসময় ঢাকার চারপাশে বিস্তৃত খাল, জলাধার ও নিম্নাঞ্চল বৃষ্টির পানি ধারণ এবং দ্রুত নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক পথ হিসেবে কাজ করত। কিন্তু নগর সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে এসব খালের বড় একটি অংশ দখল, ভরাট কিংবা সংকুচিত হয়ে গেছে। ফলে শহর তার স্বাভাবিক পানি ধারণ ও নিষ্কাশন ক্ষমতার উল্লেখযোগ্য অংশ হারিয়েছে। যে পানি একসময় খাল ও জলাধার হয়ে সহজেই নদীতে চলে যেত, এখন সেই পানিই সড়ক ও জনবসতিতে জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে।
সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় সাত হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার প্রায় ১৫ শতাংশই প্লাস্টিকজাত। এসব প্লাস্টিক, পলিথিন ও অন্য বর্জ্যের বড় অংশ শেষ পর্যন্ত গিয়ে জমা হয় ড্রেন, নালা ও খালে। ফলে পানি চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হয় এবং সামান্য বৃষ্টিতেই ড্রেন উপচে পানি রাস্তায় উঠে আসে। অনেক স্থানে ড্রেনের অস্তিত্ব থাকলেও পলি ও ময়লার স্তূপে সেগুলো কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
কয়েক সপ্তাহ ধরে থেমে থেমে বৃষ্টির পর রাজধানীর নিউ মার্কেট, আজিমপুর, মালিবাগ, শান্তিনগর, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, ধানমন্ডি, মিরপুর, শেওড়াপাড়া, মতিঝিল, খিলক্ষেত, বাড্ডা, পুরান ঢাকা ও উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা গেছে। কোথাও সড়কে যানবাহন বিকল হয়ে পড়েছে, কোথাও দীর্ঘ সময় ধরে যানজট স্থায়ী হয়েছে। বিশেষ করে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী এবং রোগীদের দুর্ভোগ ছিল সবচেয়ে বেশি।
দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর অন্তত ১৪১টি এলাকা বর্তমানে জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতায় রয়েছে ১০৮টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় রয়েছে ৩৩টি এলাকা। ঝুঁকিপূর্ণ এসব এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে আগেই। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্থায়ী সমাধানের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনো চোখে পড়ছে না।
এদিকে জলাবদ্ধতা নিরসনে নতুন করে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। ‘খাল পুনরুদ্ধার, সংস্কার ও নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি’ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৮৯৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত চলমান এই প্রকল্পের আওতায় কালুনগর, জিরানী, মান্ডা ও শ্যামপুর খালের প্রায় ২০ দশমিক ৫৯ কিলোমিটার অংশ খনন ও স্লাজ (বর্জ্য জল, শিল্পকারখানা বা প্রাকৃতিকভাবে জমে থাকা ঘন, আঠালো কাদা বা কর্দমাক্ত মিশ্রণ) অপসারণ করা হবে। পাশাপাশি নির্মাণ করা হবে রিটেইনিং ওয়াল, সুরক্ষা বেষ্টনী, ওয়াকওয়ে, পাম্প স্টেশন এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে একাধিক ইটিপি।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু খাল খনন বা ড্রেন পরিষ্কার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ হিসেবে তারা জানিয়েছেন, ঢাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার পুরো শৃঙ্খলই বিভিন্ন স্থানে বাধাগ্রস্ত। সড়কের ক্যাচপিট থেকে শুরু করে ড্রেন, খাল, স্লুইসগেট, পাম্প স্টেশন এবং নদীতে পানিপ্রবাহের প্রতিটি ধাপেই রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। কোথাও অবৈধ দখল, কোথাও বর্জ্যের স্তূপ, আবার কোথাও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা পুরো ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তুলছে। ফলে একটি অংশ সংস্কার করা হলেও অন্য অংশের সমস্যার কারণে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
তবে বরাবরের মতো এবারও আশ্বাসের কথাই শোনালেন সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা। জলাবদ্ধতা নিরসনের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, রাজধানীতে প্রায় ১০০টি হটস্পট চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সেগুলো বিশেষ নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এক জায়গার পানি দ্রুত সরিয়ে অন্য জায়গায় ফেললে সেখানে আবার জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এটি স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায় সমাধান সম্ভব নয়। চলতি বছর হয়তো কাঙ্ক্ষিতভাবে জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। তবে আগামী বছরের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রয়োজনীয় বাজেট পাওয়া গেলে আগামী বছর জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান অগ্রগতি আনা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা। জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে অনেক ছোট ড্রেন আমাদের ব্যবহৃত পলিথিন ও বর্জ্যে আটকে যায়। ফলে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া আমাদের চারটি ড্রেনেজ পাম্প থাকলেও সেগুলো প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত নয় এবং সব কটি পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করছে না।’
এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের একান্ত সচিব (উপসচিব) ও অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ খবরের কাগজকে বলেন, রাজধানীর উত্তর অংশে কয়েকটি জলাবদ্ধপ্রবণ এলাকা রয়েছে, যেখানে বৃষ্টির সময় বিশেষ নজরদারি রাখা হয়। তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোনো অভিযোগ বা তথ্য পেলেই আমাদের টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে ব্যবস্থা নেয়।’
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ড্রেনেজব্যবস্থায় পলিথিন, ময়লা ও বর্জ্য জমে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়া। বিশেষ করে মিরপুর ও উত্তরখান এলাকায় এ সমস্যা বেশি দেখা যায়। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া স্থায়ীভাবে সমাধান সম্ভব নয়। বর্তমানে বিভিন্ন উন্নয়নকাজ চলমান থাকায় অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে শত শত প্রকল্পের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা কোথায় এবং কাদের পকেটে যাচ্ছে তার হিসাব করা প্রয়োজন। পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঢাকায় সম্প্রতি মাত্র ৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। অথচ বর্ষা মৌসুমে ৫০ থেকে ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত আমাদের দেশের জন্য স্বাভাবিক। সাধারণ বৃষ্টিতেই নগরজীবন অচল হয়ে পড়া প্রমাণ করে, দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতা নিরসনে কোনো সমন্বিত ও কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ওয়াসার প্রণীত মাস্টারপ্ল্যান সিটি করপোরেশনের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের পর আর হালনাগাদ করা হয়নি। ফলে বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রম সমন্বয়হীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রত্যাশিত ফল মিলছে না। টেকসই সমাধানের জন্য আধুনিক মাস্টারপ্ল্যানের ভিত্তিতে খাল সংস্কার, ড্রেনেজব্যবস্থার উন্নয়ন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।
এই পরিকল্পনাবিদ অভিযোগ করে বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হলেও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। তাই এসব প্রকল্পের অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে, কারা দায়ী–সেসব বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত করে জবাবদিহি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত। তা না হলে জনগণের অর্থের অপচয়ই চলতে থাকবে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না।