গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা; নিজ সময়ের অন্যতম ভয়ংকর স্ট্রাইকার। যেন বজ্রনিনাদে ছুটে চলা এক তূণীর ধন। ‘বাতিগোল’ নামে পরিচিত এই আর্জেন্টাইন ছিলেন এমন এক ফরোয়ার্ড, যার পায়ের ঝড় থামাতে পারতেন না কোনো রক্ষণের দেয়াল।
বাম কিংবা ডান পা- দুই দিকেই সমান ধারালো। বজ্রগতি, ক্ষিপ্রতা এবং বুদ্ধিদীপ্ত নড়াচড়ায় প্রতিপক্ষের রক্ষণকে করে তুলতেন বিভ্রান্ত। তার মধ্যে ছিল এমন এক সহজাত খেলার নেশা, যা বড় মঞ্চে জ্বলে উঠত আগুনের মতো।
১৯৯৪ ফুটবল বিশ্বকাপ। যুক্তরাষ্ট্রের মাঠে প্রথমবার পা রাখেন বাতিস্তুতা। পেছনে ফেলে এসেছেন দুটি কোপা আমেরিকা জয়ের স্মৃতি। ১৯৯১ আর ১৯৯৩- দুবারই ফাইনালে গোল করে তুলে ধরেন দেশের পতাকা। তাই বিশ্বমঞ্চে তার আত্মপ্রকাশ যে দুর্দান্ত হবে, তা যেন আগেই লেখা ছিল নিয়তির পাতায়।
ফক্সবোরো স্টেডিয়ামে ৫০ হাজারেরও বেশি দর্শকের সামনে গ্রিসের বিপক্ষে ম্যাচে শুরু হয় বাতিস্তুতার বিশ্বকাপ-যাত্রা। ম্যাচ শুরু হতেই বাজ পড়ার মতো ছুটে যান সামনে। ম্যাচের বয়স মাত্র দুই মিনিট। ঠাণ্ডা মাথার এক ফিনিশে বল জড়ান জালে। প্রথমার্ধের শেষদিকে বাতিস্তুতার আরও একটি গোল। এরপর দিয়েগো ম্যারাডোনার জাদুকরি গোলে আর্জেন্টিনার লিড ৩-০তে।
শেষ বাঁশি বাজার আগ মুহূর্তে স্পটকিক থেকে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন বাতিস্তুতা- যেন গোলপোস্ট ভেঙে দেওয়ার মতো এক আগুনঝরা শট। স্বপ্নময় অভিষেকের পর এক অনন্য বিশ্বকাপ গল্পে পরিণত হন তিনি। এরপর রোমানিয়ার বিপক্ষে শেষ ষোলোতে আরও একটি গোল। তবে সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনা হেরে যায় ৩-২ গোলে- এবং থেমে যায় আলবিসেলেস্তাদের বিশ্বকাপ যাত্রা।
চার বছর পর, ইতালির সিরি আ-তে দুর্দান্ত সময় পার করে বাতিস্তুতা আবার ফিরে এলেন বিশ্বকাপে। এবার ফ্রান্স ১৯৯৮। জাপানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই ম্যাচজয়ী গোল। কিন্তু ইতিহাস গড়া শুরু হলো দ্বিতীয় ম্যাচে জ্যামাইকার বিপক্ষে। আর্জেন্টিনা তখন ২-০ গোলে এগিয়ে। তবু বাতিস্তুতার পা থামেনি। প্রথমে এক দুর্দান্ত শটে পেলেন দলের তৃতীয় গোল, তারপর আরেকটি জোরালো শটে বল ঢুকল জালে। জামাইকার গোলরক্ষক ওয়্যারেন ব্যারেট কিছুই করতে পারলেন না। আর ৭ মিনিট বাকি থাকতে অ্যারিয়েল ওর্তেগা ফাউলের শিকার হলেন বক্সের ভেতর। রেফারি বাজালেন পেনাল্টির বাঁশি। এখন সুযোগ বাতিস্তুতার সামনে- বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবার দুই আসরে হ্যাটট্রিকের রেকর্ড গড়ার।
এমন মুহূর্তে বাতিস্তুতা যেন হয়ে উঠলেন ঝড়ের মতো প্রলয়ঙ্কর। ১৯৯৪ সালের মতোই সেই পুরোনো কৌশলে বল নিলেন পজিশনে। তারপর যেন বজ্রাহত এক আঘাত- বল জালে, আর বাতিস্তুতার দুই পা মাটি ছেড়ে শূন্যে উড়ল ক্ষণিকের মুক্তিযোদ্ধার মতো।
এই হ্যাটট্রিকের মাধ্যমে চিরস্মরণীয় এক কীর্তি গড়লেন বাতিস্তুতা। দুই বিশ্বকাপে দুটি হ্যাটট্রিক করা এখন পর্যন্ত একমাত্র ফুটবলার তিনিই। দুই হ্যাটট্রিকই তিনি করেছিলেন ২১ জুন, কী কাকতালীয়। অবশ্য ১৯৯৮ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার যাত্রা থেমে যায় কোয়ার্টার ফাইনালে ডাচদের কাছে ২-১ গোলে হেরে। তবু ফ্রান্স বিশ্বকাপে বাতিস্তুতা রেখে যান তার কিংবদন্তির ছাপ।
একজন নিখুঁত স্ট্রাইকার, এক যোদ্ধা, এক কবি-বাতিগোলের ভাষা ছিল শুধুই গোল।