মায়ানমার থেকে ইয়াবা চোরাচালান বন্ধে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে বর্তমান সরকার। সে লক্ষ্যে চালানো হয়েছে একাধিক বিশেষ অভিযান। আত্মসমর্পণ করেছেন ১০১ জন ইয়াবা কারবারি। আর বিশেষ অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন ২৯৪ জন মাদক কারবারি। এত কিছুর পরও ইয়াবা পাচারকারীদের থামানো সম্ভব হয়নি। মায়ানমারের জান্তা বাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে চলমান সংঘাতে ইয়াবা পাচার বন্ধ রয়েছে বলে ধারণা করা হলেও বাস্তব চিত্র উল্টো।
জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ৫২ লাখ ৯৬ হাজার ৩৮১ পিস ইয়াবা, ২৩ কেজি ১৩ গ্রাম ক্রিস্টাল মেথ বা আইস, ৩ হাজার ৫৭৬ ক্যান বিয়ার, ১৯৩ কেজি ৭০ গ্রাম গাঁজা, ২ হাজার ৩২৩ লিটার দেশীয় মদ, ৩৬৫ বোতল বিদেশি মদ, ২৮৯ বোতল ফেনসিডিল, ৯০ লিটার মদ তৈরির ওয়াস ও ১ কেজি ৯৫০ গ্রাম ইয়াবার গুঁড়া উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ৬০৬টি, যেখানে আসামি করা হয় ৮৪০ জনকে। ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন ১৮০ জন মাদক কারবারি, বাকিরা পলাতক।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মো. মাহফুজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘আত্মসমর্পণ বা মাদকসহ গ্রেপ্তারের পর কারাগারে থাকা বেশির ভাগ চোরাকারবারি জামিনে বেরিয়ে আবারও পুরোনো পথে ফিরে গেছেন। আবার কেউ কেউ নিজেকে শুধরে আলোর পথে এসেছেন। জনপ্রতিনিধি ও প্রান্তিক পর্যায়ে মানুষের চেষ্টায় মাদক চোরাচালান বন্ধ সম্ভব।’
কক্সবাজারে সরেজমিনে দেখা যায়, প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হচ্ছে কক্সবাজার বড়বাজার এলাকায়। এ রকমভাবে শহরের অলিগলিতে এভাবে মাদক বিক্রির সময় সাংবাদিক দেখলেই হেনস্তা করেন কারবারিরা। শহরের বড় বাজার, রাখাইনপল্লি, টেকপাড়া, বাহারছড়া, পেশকার পাড়া, বাস টার্মিনাল, কলাতলী, পাহাড়তলী, লাইট হাউজ, গোলদীঘিসহ প্রায় ১৭টি পয়েন্টে ইয়াবা, গাঁজা, চোলাই মদসহ অন্যান্য মাদক বিক্রির সিন্ডিকেট রয়েছে।
সম্প্রতি গা-ঢাকা দেওয়া ও জেলফেরত মাদক ব্যবসায়ীরা সক্রিয় হয়েছে বলে দাবি করেছেন কক্সবাজারের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা জানান, কক্সবাজারকে মাদকের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কক্সবাজার পিপলস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবাল বলেন, ‘মায়ানমার থেকে সহজেই মাদক আসে কক্সবাজারে। এটি সারা দেশসহ ছড়িয়ে পড়ায় কক্সবাজারের বদনাম হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে সম্মিলিত প্রতিবাদ করা জরুরি। একই সঙ্গে আত্মস্বীকৃত কারবারিদের জামিনে বের হওয়ার পর থেকে নজরদারিতে রাখা উচিত।’
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের মুখপাত্র এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘কোনো চালান ধরা পড়ার পর সবাই নড়েচড়ে বসেন, এরপর আর কোনো খবর থাকে না। সীমান্তে বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ করে প্রশাসন, কিন্তু কোনো চোরাকারবারি ধরা পড়ে না। এসব নিয়ে সাধারণ মানুষ শঙ্কিত, কারণ নতুন প্রজন্মের কাছে মাদক ছড়িয়ে পড়ছে সহজে। এটি দ্রুত রোধ করা প্রয়োজন।’
কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, ‘মাদক মামলায় দ্রুত বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করার চেষ্টা অব্যাহত আছে। সর্বোচ্চ শাস্তির বিচার কার্যক্রম মাদক ব্যবসায়ীদের জন্য সচেতন হওয়ার দৃষ্টান্ত হবে বলে আমি মনে করি।’
সারা দেশে মাদকের ভয়াবহতা রোধে ২০১৮ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সমন্বয়ে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু হলে কক্সবাজারে চার নারীসহ ২৯৯ মাদক ব্যবসায়ী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নিহত হন। চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী খবরের কাগজকে বলেন, ‘রুটের সঙ্গে সঙ্গে কৌশল পাল্টে ইয়াবা পাচার করছে চোরাকারবারিরা। যাতে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে পারে। তবে আমরাও নিয়মিত নজরদারি রাখছি।’
চলতি বছরের ২০ মে মেরিনড্রাইভ সড়কের পাটোয়ারটেক থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত আত্মসমর্পণকৃত ইয়াবা কারবারি আবদুল আমিনকে (৪০) সাত লাখ পিস ইয়াবা ও তার তিন সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। এ বিষয়ে র্যাব-১৫-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আত্মস্বীকৃত পাচারকারীরা বারবার পুরোনো পথে ফিরছে। তাদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে নতুনরা। সাত লাখ ইয়াবা পাচারে কৌশল হিসেবে একটি সরকারি দপ্তরের লোগো গাড়িতে ব্যবহার করেছিল পাচারকারীরা। র্যাবের গোয়েন্দাদের তৎপরতায় সেটি ধরা পড়ে। আমাদের নজরদারি চলমান। যেকোনো পরিস্থিতিতে মাদক বন্ধে আমাদের অবস্থান কঠোরতর হবে।’