‘যে যাবে বেড়খালী, তার হবে পকেট খালি’। সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার রানীরহাট-বেড়খালী আঞ্চলিক সড়কের পার্শ্ববর্তী এলাকায় বসবাসকারীদের মধ্যে এমন একটি প্রবাদ প্রচলিত রয়েছে। কারণ এই সড়ক দিয়ে সন্ধ্যার পর যাতায়াত করলেই ডাকাতের কবলে পড়তে হয়! আগে মাঝেমধ্যে এমন ঘটনা ঘটলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ডাকাতির পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
গত ১১ মাসে এই সড়কে শতাধিক ডাকাতি হয়েছে বলে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। সব জানার পরও পুলিশ-প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় এই পথ ব্যবহারকারীদের মধ্যে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে পুলিশ জানিয়েছে, রাস্তার দুই পাশের জঙ্গল পরিষ্কার ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করার পাশাপাশি ওই এলাকায় একটি পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা গেলে ডাকাতির ঘটনা কমে আসবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার সঙ্গে বগুড়ার শেরপুর ও নাটোরের সিংড়া উপজেলায় যাতায়াতের একমাত্র পথ এই রানীরহাট-বেড়খালী সড়ক। তিন জেলার সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হওয়ায় এখানে মানুষের বিচরণ বেশি। কিন্তু সাত কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটির বেশির ভাগ অংশে কোনো জনবসতি নেই। সন্ধ্যার পর ডাকাত দল রাস্তার পাশের গাছ ফেলে যানবাহনের পথরোধ করে। মানুষকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে মূল্যবান সামগ্রী ও অর্থ কেড়ে নেয়। এতে অন্ধকার নামলেই মানুষ এই পথে যাতায়াত করতে ভয় পান।
তাড়াশের আশানবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা গোলাম মোস্তফা একবার এই পথে ডাকাত দলের কবলে পড়ে ছিলেন। খবরের কাগজের প্রতিবেদককে তিনি সেদিনের অভিজ্ঞতা শোনান। বলেন, ‘গত ঈদুল ফিতরের আগের কথা। বগুড়া থেকে আমার বাড়িতে ফিরছিলাম। রাত তখন প্রায় ১১টা। পথে ডাকাত দল আমার গাড়ি আটকায়। সঙ্গে থাকা নগদ অর্থ কেড়ে নেয়। গাড়ির চালককে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে কোপ দেয়। এই সড়কের দুই কিলোমিটারের মধ্যে কোনো বাড়িঘর নেই। দুর্বৃত্তরা ডাকাতি করে খুব সহজে পালিয়ে যায়।’
গুড়পিপুল গ্রামের যুবক সুমন হোসেন বলেন, ‘সন্ধ্যার পর থেকে রাত ১০-১১টা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ডাকাত দল রাস্তায় হানা দেয়। যাকে পায় তাকে মারধর করে মোবাইল, টাকা, স্বর্ণালংকার সব ছিনিয়ে নেয়। দীর্ঘদিন ধরে এই পথে এমন অপকর্ম হয়ে এলেও পুলিশ এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করতে পারেনি।’
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল কাদের বলেন, ‘যদি কোনো কারণে বাড়ি ফিরতে রাত হয়ে যায়, তখন এই পথে আসার সাহস পাই না। অনেকখানি রাস্তা ঘুরে ভিন্ন পথে বাড়ি ফিরতে হয়। সড়কের আশপাশে কোনো ঘরবাড়িও নেই। রাত হলেই এই পথে ডাকাতের আতঙ্ক তৈরি হয়। এখানে একটি পুলিশ ফাঁড়ি থাকলে এ সমস্যার সমাধান হতো।’
স্থানীয় গুলতা গ্রামের বাসিন্দা ভ্যানচালক সোরহাব আলী বলেন, ‘রাত হলেই এই পথ দিয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কারণ সড়কের ওপর ডাকাতরা গাছ ফেলে রাখে। অনেক সময় ডাকাতির পবলে পড়া যাত্রীরা নিজেদের সঙ্গে থাকা জিনিসপত্র দিতে চান না। তখন ডাকাতরা তাদের মারধর করে।’
তাড়াশ উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আমিনুর রহমান টুটুল বলেন, ‘সন্ধ্যার পর থেকে রাত ১১টার মধ্যে ডাকাতি-ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি ঘটে। আমরা এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনকে জানিয়েছি। বেড়খালীর আশপাশের গ্রামের মানুষকে সচেতন করতে বৈঠকও করেছি। যারা এমন অপকর্মের সঙ্গে জড়িত, তাদের দিকে নজর রাখতে বলেছি।’
তাড়াশ থানার ওসি জিয়াউর রহমান বলেন, ‘রানীরহাট থেকে বেড়খালী পর্যন্ত আঞ্চলিক এ সড়কটির দুই পাশের জঙ্গল পরিষ্কার করা দরকার। এ ছাড়া পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করাসহ একটি যাত্রী ছাউনি ও অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প করা হলে ডাকাতি কমে আসবে। তখন এই পথ অনেকটা নিরাপদ হবে।’ ডাকাতির ঘটনায় এখন পর্যন্ত একটি মামলা হলেও কাউকে আটক করতে না পারার তথ্য নিশ্চিত করেন তিনি।
তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান বলেন, ‘চলতি মাসের আইনশৃঙ্খলা মিটিংয়ে আমরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে এই সড়কের আগাছা পরিষ্কার, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা ও পুলিশি টহল বৃদ্ধি করার জন্য কাজ করা হচ্ছে। আশা করছি সবার সহযোগিতায় ওই সড়কের ডাকাতির সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে।’