হাঁসছানাটা সব সময়ই তাড়াহুড়ো করত। তড়িঘড়ি করে সে যখন ঘাসের ওপর দিয়ে হেঁটে যেত, তখন তাকে দেখে মনে হতো হলদে একটা বল কাদার মধ্য় দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে। ওর নাম বোধহয় ক্র্যাচিক ছিল। সবাই তো ওকে ওই নামেই ডাকত। সে যা-ই হোক।
ক্র্যাচিক কখনোই স্নান করতে চাইত না। নদীতে নেমে স্নান করা তো দূরের কথা, রাস্তায় জমে থাকা পানিতেও ওকে টেনে নামানো যেত না।
একদিন ক্র্যাচিকের মা ওকে বলল, ‘আর কতদিন তুমি এভাবে স্নান না করে থাকবে বলো তো? সব সময়ই গায়ে ময়লা আর কাদা নিয়ে ঘুরে বেড়াও!’
কিন্তু মায়ের কথায় ক্র্যাচিক কান দিল না। হাত নাড়িয়ে বলল, ‘কোথায়, আমি তো দিব্য়ি আছি!’
ক্র্যাচিক স্নান করে না বলে ওর বন্ধুরাও ভীষণ বিরক্ত ওর ওপর। মুরগিছানা ফেউ আর কুকুরছানা ইয়েপ এবার বুদ্ধি করল ওদের বন্ধু ক্র্যাচিককে শিক্ষা দেবে বলে। ঠিক করল, যতদিন ক্র্যাচিক স্নান না করবে, ততদিন ওরা ওকে না চেনার ভান করবে।
এক দিন সকালে ক্র্যাচিক ঘুম ভেঙে বিছানা থেকে নেমে সরাসরি গেল বন্ধুদের খোঁজখবর নিতে। স্নান তো করলই না, হাতমুখেও পানি দিল না।
যখনই সে ফেউয়ের কাছে গিয়ে বলল, ‘প্যাঁক প্যাঁক! কী খবর?’
ফেউ বলল, ‘তুমি কে? আমি তোমাকে চিনি না!
এবার ক্র্যাচিক কুকুরছানা তিয়াভকার কাছে গিয়ে বলল, ‘প্যাঁক প্যাঁক! কী খবর?’
তিয়াভকা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল, ‘আমি অপরিচিত পাখিদের সঙ্গে কথা বলি না।’
হাঁসছানা বন্ধুদের আচরণে ভড়কে গেল। ভাবতে লাগল, ‘কী হয়েছে ওদের? হঠাৎ করেই কেন আমাকে চিনতে পারছে না ওরা?’
এমন সময় ঝুম বৃষ্টি নামল। বৃষ্টির পানিতে ক্র্যাচিকের গায়ের ময়লা-কাদা সব ধুয়ে গেল। ঝকঝক তকতক করতে লাগল ওর হলুদ পালকগুলো। তাই দেখে ফেউ আর তিয়াভকা দৌড়ে এসে বলল, ‘কী খবর, কেমন আছ? কী সুন্দর লাগছে তোমাকে!’
একটু রেগেই ক্র্যাচিক ওর বন্ধুদের বলল, ‘এখন এসেছ যে! একটু আগে যখন আমি তোমাদের খবর নিতে গেলাম তখন চিনতে পারলে না কেন শুনি?’
ফেউ কককককক করে বলল, ‘কী বলো, তুমি ছিলে ওটা? আমি ভাবলাম কোনো কদাকার একটা পাখি এসে সুধাচ্ছে আমাকে। তাই আর কথা বাড়াইনি।’
তিয়াভকাও এগিয়ে এসে বলল, ‘হ্যাঁ আমার কাছেও বোটকা গন্ধওয়ালা একটা পাখি এসে কী যেন বলছিল। সেটা তুমি হতেই পারো না!’
হাঁসছানা ক্র্যাচিক একগাল হেসে বলল, ‘ওরে বোকারা, ওটা তো আমিই ছিলাম। মাত্র বৃষ্টি এসে আমাকে ধুয়ে দিয়ে গেল।’
একটু দূরেই এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল ইয়েপ। এবার সেও এগিয়ে এসে বলল, ‘তুমি যদি সব সময়ই চাও যে আমরা তোমাকে চিনতে পারি, তাহলে বৃষ্টির অপেক্ষায় থেকো না। রোজই স্নান করে নিও।’
মুরগিছানা ফেউ দুই ডানা নেড়ে বলে গেল, ‘নইলে আমরা আর কখনোই তোমাকে চিনব না!’

লেখক পরিচিতি: মিখাইল প্লিয়াৎস্কোভস্কি জন্মেছেন ১৯৩৫ সালের ২ নভেম্বর সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের রিকোভায়। বড়দের জন্য লেখার পাশাপাশি লিখেছেন ছোটদের জন্য। খুব ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছেন। মা কাজ করতেন লজেন্স কারখানায়। মাধ্যমিক পাস করে মিখাইল কাজ করা শুরু করলেন ইনাকিয়েভস্কির এক লোহার কারখানায়। তখন থেকেই লেখালেখির অভ্যাস তার। আরেকটু বড় হয়ে চলে এলেন মস্কোয়। সেখানে গোর্কি সাহিত্য ইনস্টিটিউটে শুরু করলেন পড়াশোনা। সোভিয়েত লেখক শিবিরের সদস্য ছিলেন। তার লেখা গান এখনো রাশিয়ায় জনপ্রিয়। শিশুদের জন্য লেখাগুলো এখনো পড়ে শোনানো হয়। ১৯৯১ সালের মস্কোতে তার জীবনাবসান ঘটে।
কলি